রাজাকার তালিকা মুক্তিযুদ্ধকে বিতর্কিত করার প্রয়াস ‘রাজাকারের সম্প্রদায়ীকরন’

শিতাংশু গুহ

C:\Users\Smita\Downloads\download (54).jpg

বাংলাদেশে ‘হিন্দু রাজাকার’ আছে, মানে একাত্তরে হিন্দু রাজাকার ছিলো এটি নুতন তথ্য। বিকৃত, মিথ্যা। একটি সরকার যখন একটি ধর্মীয় গোষ্ঠীকে ‘টার্গেট’ করে হত্যা করতে উদ্যত হয়, তখন ঐ গোষ্ঠীর কারো পক্ষে সম্ভব নয় সেই খুনি সরকারের সাথে হাত মেলানো। একাত্তরে পাকিস্তানী জান্তার টার্গেট ছিলো হিন্দুরা। তদানীন্তন পূর্ব-পাকিস্তানকে হিন্দু-শূন্য করার জন্যেই তাঁরা গণহত্যায় নেমেছিলো। প্রথম দিন ২৫শে মার্চ থেকে বিজয় দিবস ১৬ই ডিসেম্বর তাঁরা সাফল্যের সাথে সেই কাজটি সুচারুভাবে করেছে। ‘লুঙ্গি খুলে’ যাদের ধর্ম পরীক্ষা দিতে হয়েছে, তাদের পক্ষে কি রাজাকার হওয়া সম্ভব ছিলো? সিনেটর টেড কেনেডী’র রিপোর্ট অনুযায়ী ক্ষতিগ্রস্তদের ৮০% ছিলো হিন্দু অথবা নিউইয়র্ক টাইমসের রিপোর্ট অনুযায়ী হিন্দু বাড়ি ‘এইচ’ লিখে চিহ্নিত করা হতো। এই অবস্থায়  হিন্দু’র পক্ষে পাকিস্তানীদের সাথে হাত মিলিয়ে ‘রাজাকার’ হওয়া সম্ভব ছিলোনা। হিটলার ৬০ লক্ষ ইহূদী হত্যা করেছিলো, কোন ইহুদী কি ‘নাজিদের’ সাথে হাত মিলিয়ে আমাদের সংজ্ঞা মত ‘রাজাকার’ হয়েছিলো? সেটি সম্ভব ছিলোনা। তাই একাত্তরে কোন হিন্দু রাজাকার ছিলোনা, পিরিয়ড।  তবে সব সম্ভবের দেশ বাংলাদেশ, তাই স্বাধীনতার প্রায় অর্ধ-শতাব্দী পর হিন্দু রাজাকার সৃষ্টি হয়েছে।  রাজাকার মুক্তিযোদ্ধা হয়ে গেছে। মুক্তিযোদ্ধা রাজাকার হয়ে গেছে। সেদিক থেকে হিন্দুকে রাজাকার বানানো তেমন কঠিন কিছু নয়? বাংলাদেশে সম্প্রীতির দৃষ্টান্ত উজ্জ্বল করতে ‘সাম্প্রদায়িক রাজাকার তালিকায়’ কিছু হিন্দু ঢুকিয়ে সেটি অসাম্প্রদায়িক করা হয়েছে মাত্র’। সংক্ষেপে এটিকে ‘রাজাকারের অসম্প্রদায়ীকরন’ বলা যেতে পারে। প্রশ্ন হলো, হিন্দুদের রাজাকার তালিকাভুক্তি করার সাহস দুর্বৃত্ত পেলো কিভাবে? পুরো রাজাকার তালিকা দেখিনি, তবে তালিকায় নাকি জামাত ৩৮জন, হিন্দু ৯২জন।  পরিসংখ্যান বলছে, হিন্দুরা পাকিস্তানকে বড্ড ভালোবাসতো? বঙ্গবন্ধু আমলে যাঁরা ‘শত্রূ সম্পত্তি’ আইনকে ‘অর্পিত সম্পত্তি’ করেছিলো, তাদেরই উত্তরসূরীরা শেখ হাসিনা’র আমলে হিন্দুকে ‘রাজাকার’ বানিয়েছে। মন্ত্রী অনেক আবোল-তাবোল বলেছেন। তাতে কিন্তু নাম ঢোকানো বা বাদ দেয়ায় সমস্যা হবার কথা নয়? হয়তো তাই বরিশালের মুক্তিযোদ্ধা তপন চক্রবর্তী রাজাকারের তালিকায় ঢুকে পড়েছেন, অথবা দণ্ডপ্রাপ্ত রাজাকারদের নাম বাদ পরে গেছে; এবং হিন্দুদের নাম ঢুকে গেছে?মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় কতটা ‘অদক্ষ ও অযোগ্য’ এই একটি ঘটনা তা প্রমানে যথেষ্ট। মুক্তিযুদ্ধের পর শেখ ফজলুল হক মনি বলেছিলেন, ‘মোনায়েম খানের প্রশাসন দিয়ে বঙ্গবন্ধু’র সরকার চলতে পারেনা’। ‘মুখে শেখ ফরিদ, বগলে ইট’ প্রশাসন দিয়ে শেখ হাসিনার সরকার ক্যামনে চলছে কে জানে? রাজাকার তালিকা স্থগিত হয়েছে। এনিয়ে মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মধ্যেকার বিতন্ডা থেমেছে। শাহরিয়ার কবীর বলেছেন, তাঁরা ত্রিশ হাজার গেজেটেড রাজাকারের নাম প্রকাশ করবেন। রাশেদ খান মেনন বলেছেন, মুক্তিযোদ্ধা তালিকা প্রণয়নে যে কেলেঙ্কারি হয়েছে, রাজাকার তালিকা নিয়েও তাই হলো। এসব ঘটনা ইচ্ছেকৃত বা অবজ্ঞাভরে ঘটানো হয়, মুক্তিযুদ্ধকে বিতর্কিত করার জন্যে। রাজাকার তালিকায় দণ্ডপ্রাপ্ত রাজাকারদের নাম নেই, এর সুদূরপ্রসারী একটি তাৎপর্য আছে। মন্ত্রী যতই বলুন না কেন, এর পেছনে চক্রান্ত আছে! এই তালিকা নিয়ে ভবিষ্যতে অনেকে ‘সাধু’ হয়ে যাবেন, অনেকের সন্মান ভুলুন্ঠিত হবে! মন্ত্রী হয়তো তখন থাকবেন না, কিন্তু তার অপকর্মটি থেকে যাবে!! মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী সম্পর্কে আমার তেমন কিছু বলার নেই? ক’দিন আগে তিনি একজন হিন্দুকে মুসলমান বানানোর অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন এবং ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলে ‘শোকরানা আদায় করেছেন। তাঁর সম্পর্কে ১৯৭৪ সালের একটি ঘটনার বর্ণনা আছে ‘এন্থনি মাসকারেনহাস’র বাংলাদেশ, লিগেছী অফ ব্লাড’ বইয়ে, পড়ে দেখতে পাতেন। যারা ভেবেছেন রাজাকার তালিকা ইতিহাস বিকৃতি রোধে সহায়ক হবে, তাঁরা হতাশ হবেন, এটি ইতিমধ্যে ইতিহাস বিকৃত করে দিয়েছে। রাজাকার তালিকায় খৃস্টান ও বৌদ্ধ আছে কিনা জানতে পারিন। সময়ের সাথে দেশ একদিন মুক্তিযোদ্ধা শূন্য হবে, কিন্তু কখনো রাজাকার শূন্য হবেনা। মুক্তিযোদ্ধাকে রাজাকারের তালিকায় ঢোকানো নিয়ে হৈচৈ ভালো লক্ষণ। কিন্তু এই ডামাডোলে কতজন রাজাকার মুক্তিযোদ্ধা হয়ে গেছে, তা কে জানে? তাই এটি স্পষ্ট, হিন্দুদের রাজাকার তালিকাভুক্তি একটি নুতন ষড়যন্ত্র, চরিত্র হননের খেলা। ‘জননী জন্মভূমি, স্বর্গাদপী গরিয়সী’-হিন্দুরা জন্মভূমিকে জননীর মত সন্মান করে, বিশ্বাসঘকতা করেনা। গ্যারি ব্যাস তাঁর ‘টি ব্লাড টেলিগ্রাম: নিক্সন, কিসিঞ্জার এন্ড এ ফরগটেন জেনোসাইড’ গ্রন্থে লিখেছেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের শুরুতেই প্রায় এক লক্ষ হিন্দু নিহত হয়’। পঁচিশে মার্চ ১৯৭১ রাতে রাজারবাগ পুলিশ ফাঁড়ির সাথে সাথে হিন্দু অধ্যুষিত শাঁখারি বাজার, জগন্নাথ হল আক্রমন হয়েছিলো, তারপর রমনা কালীবাড়ি, এটাই টার্গেট কিলিং। আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরাও টার্গেট ছিলেন, সেটা ধর্মীয় কারণে নয়, রাজনৈতিক কারণে। প্রকাশিত রাজাকার তালিকায় রাজাকারের সংখ্যাটি দশ হাজারের বেশি, এরমধ্যে আওয়ামী লীগ ৮০৬০, বিএনপি ১০২৪, অন্যান্য ৮৭৯জন। এখানেও গোজামিল আছে। একাত্তরে পুরো দেশ ছিলো আওয়ামী লীগ, এবং কিছু পাকিস্তানপন্থী মুসলিম লীগ বা অন্যান্য ইসলামী দল। তখন আওয়ামী লীগাররা রাজাকার হয়নি, মুক্তিযোদ্ধা হয়েছে। তবে দেশের ভিতরে থেকে যাওয়া অনেকে বহুবিধ কারণে তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের সাথে হাত মিলিয়েছেন। স্বাভাবিক ভাবে ‘রাজাকার’ বলতে আমরা যা বুঝি, আওয়ামী লীগ কর্মীরা তখন তা হয়নি। বিএনপি’র তখন জন্মই হয়নি, বিএনপি এলো কোত্থেকে? রাজাকাররা মুখ্যত: পাকিস্তানপন্থী। পাকিস্তান বাঁচাতে এবং ‘ইসলাম খতরা মে হ্যায়’ ধুয়া তুলে ওঁরা আওয়ামী লীগ, মুক্তিযোদ্ধা ও হিন্দু নিধনে কাজ করে। যেদেশে রাজাকার হয়েও নিজামী-সাকারা মন্ত্রী হয়েছিলেন, সেদেশে আওয়ামী লীগাররা রাজাকার হবেন, তাতে আর আর্শ্চয্য কি? মনে রাখতে হবে, বঙ্গুবন্ধু’র আওয়ামী লীগের কর্মীরা তখন বিচ্যুত হননি; যদিও এখন তাদের অনেকে কক্ষচ্যুত! ( মতামত লেখকের নিজস্ব  নিজস্ব)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *