‘লাভ-জ্বিহাদ’ নিয়ে কিছু কথা

‘লাভ-জ্বিহাদ’ শব্দটি এখন বেশ পরিচিত। এর শাব্দিক অর্থ হচ্ছে, ভালোবেসে বা বিয়ে  করে ধর্মান্তকরণ। যেহেতু ‘জ্বিহাদ’ শব্দটি আরবীয় বা ইসলামী, তাই এটিকে মূলত: ভালবেসে ইসলামীকরণ হয়। এরমধ্যে কতটুকু ভালোবাসা আর কতটুকু ‘জ্বিহাদ’ বলা মুশকিল? সম্প্রতি কেরালায় এনিয়ে বেশ হৈচৈ হয়। মিডিয়া জানায়, মধ্যপ্রাচ্যের টাকায় মুসলিম ছেলেরা ফাঁদ পাতে অন্যধর্মীয়

 পাত্রীকে বিয়ে ও ধর্মান্তকরণের। এজন্যেও সর্বোচ্চ মূল্য দেয়া হয় শিখ পাত্রীর জন্যে, তারপর ব্রাহ্মণ? ধর্মের ব্যাপারে মুসলমানরা গোঁড়া তা বলা বাহুল্য। এদের অধিকাংশ বিশ্বাস করেন যে, অন্য ধর্মের কাউকে ইসলামের ছায়াতলে আনতে পারলে চৌদ্ধ পুরুষের বেহেস্ত নিশ্চিত? মুসলিম  সমাজ এটি উৎসাহিত করে। রাষ্ট্র প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সহায়তা করে। ‘নও মুসলিম’ কর্মসূচি নুতন ধর্মান্তরিতদের আর্থিক সহায়তার জন্যে প্রণীত। বাংলাদেশে আগে এই খাতে বাজেটে অর্থ বরাদ্ধ থাকতো, এখনো আছে কিনা জানিনা। লাভ জ্বিহাদ এতকাল একটি একতরফা প্রজেক্ট ছিলো। এখন সময়  পাল্টেছে, প্রশ্ন উঠছে, কেন? একটি ছেলে, একটি মেয়ে সম্পর্ক হতেই পারে, কিন্তু ধর্মান্তর কেন? জোরজবরদস্তি  ইসলামে বেশি। ধরা যাক, দুই ধর্মের দুই পাত্রপাত্রীর মধ্যে একটি সম্পর্ক গড়ে উঠলো। বিয়ের পালা। ধর্ম তখন সামনে এসে দাঁড়ায়। সমস্যা বাঁধে পাত্র-পাত্রীর একটি পক্ষ মুসলিম হলে; সেখানে অন্যপক্ষকে মুসলমান হতে হয়।, এটা এক ধরণের জবরদস্তি। এখানে ধর্মকে ভালবেসে কেউ ধর্মান্তরিত  হচ্ছেন না। আকর্ষণটা ধর্মের নয়, অন্যত্র। চাহিদা ধর্মের নয়, দেহের। প্রশ্ন উঠতে পারে, ছেলে-মেয়ে কাউকে ধর্ম ত্যাগ করতে হবে কেন? আর যদি করতে হয়, তাহলে একজনকে কেন? দু’জনকে নয় কেন? প্রায়শ: দেখা যায়, মেয়েটি ধর্ম ত্যাগ করছে। এতে মেয়েটির ভালবাসার প্রমান হলেও ছেলেটি’র  ভালবাসার প্রমান হয়না। ভালবাসার জন্যে ধর্মান্তর-কে কি ভালবাসা বলা যায়?  দু’জনের ভালবাসার মধ্যে যদি ধর্ম বড় হয়ে দাঁড়ায় তাহলে সেটা আর যাই হোক, ভালবাসা নয়! দু’জন যদি সত্যি একে অপরকে ভালোবাসেন তবে উভয়ে ধর্মত্যাগ করে তৃতীয় ধর্ম গ্রহণ করলে হয়তো কিছুটা যৌক্তিক হতে  পারে। নইলে তো ওই ‘ভালোবাসা’ আর ‘গৃহস্থের মুরগী পোষা’-র মধ্যে খুব একটা তফাৎ থাকেনা। অনেকের মতে শিক্ষার অভাব এজন্যে দায়ী। কথাটা সত্য নয়? পতৌদির নবাব মনসুর আলী  খান অশিক্ষিত ছিলেন না! বাংলাদেশের জহির রায়হান ওপর তলার মানুষ। পতৌদির নবাব শর্মিলা ঠাকুরকে ধর্মান্তরিত করেছেন। শর্মিলা হয়েছেন আয়েশা সুলতানা। জহির রায়হান মুসলমান বানিয়েছেন সুমিতা দেবীকে। শর্মিলা মুসলমান হয়ে পর্দার অন্তরালে চলে যান? জহির রায়হান কিছুদিন পর সুমিতাকে  ফেলে কোহিনুর আক্তার সুচন্দাকে বিয়ে করেন। সমাজের নিন্মস্তরে হয়তো শিক্ষার অভাব কিছুটা দায়ী, বাস্তবতা হচ্ছে, ধর্মান্ধতা ও জবরদস্তি এর মুখ্য কারণ। এই জবরদস্তিটা মোঘল আমলের মত ঠিক তলোয়ার নিয়ে নয়, বরং পারিবারিক এবং সামাজিক, কখনো-সখনো রাষ্ট্রীয় এবং সাথে মোহ-লোভ তো  আছেই; কখনোবা জীবনের ভয়?  বাংলাদেশে বিয়ের নামে ধর্মান্তকরণ, বিশেষত: গ্রামে-গঞ্জে এবং নাবালিকা অপহরণ,অত:পর ধর্মান্তকরণ ও বিয়ে অনেকটা মহামারীর মত। প্রসাশন এসব ক্ষেত্রে উদাসীন, কারণ যদি কিছু ‘ছোয়াব’ মিলে? গ্রামে বেশি। শহরে কম নয়, তবে প্যাটার্ন ভিন্ন। বিনোদন ক্ষেত্রে একশ’ ভাগ। অ-মুসলমান কেউ বিনোদন ক্ষেত্রে যেই একটু ওপরে উঠছেন, তিনিই ধরাশায়ী হচ্ছেন? কুমার বিশ্বজিৎ

 থেকে শুরু করে অপু বিশ্বাস পর্যন্ত, সর্বত্র একই চিত্র। অপুর ঘটনা এখন সর্বত্র। মিডিয়ায় আসছে, অপু বলছেন, ‘সাকিব তাকে জোর করে ধর্মান্তরিত করেছেন’। অপু বিশ্বাস ইসলাম ধর্মকে ভালবেসে ধর্মান্তরিত হননি, হয়েছেন শাকিবকে পাওয়ার জন্যে। অপুর ক্ষেত্রে এটাও সত্য যে, শিল্পে  টিকে থাকতে বা গ্ল্যামার ধরে রাখতে তাকে কোন না কোন মুসলমান পুরুষের হাত ধরতে হতো? আর হাত ধরা মানে ধর্ম বিসর্জন দেয়া। ছলে, বলে, কৌশলে বা লোভ, সুনাম ইত্যাদি দেখিয়ে এ কাজটি করা হয়? ঢাকার ম্যুভি ইন্ডাষ্ট্রিতে হিন্দু মেয়ের সাথে মুসলিম ছেলের প্রেম এখনো বেশ উপাদেয়?  উল্টোটা নাই, থাকলে কেউ আমায় জানালে খুশি হবো।  কিছুদিন আগে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট বলেছে, স্ত্রীকে স্বামীর ধর্ম পালন করতে হবে,  এমন কোন বাধ্যবাধকতা নেই। বাংলাদেশে বা পাকিস্তানের আদালত কি এমন কথা বলতে পারে? সিপিএম পলিটব্যুরো সদস্য বৃন্দা কারাত বলেছেন, ভিন্ন জাতি বা ভিন্ন ধর্মে বিয়ে উদার দৃষ্টিভঙ্গির প্রতীক, কিন্তু হিন্দুত্ববাদীরা লাভ জ্বিহাদ তকমা দিয়ে এর বিরুদ্ধাচরণ করছেন। ওয়ালস্ট্রীট  জার্নাল বলেছে, ভারতের লাভ জ্বিহাদ ঘটনা কাল্পনিক। সর্বশেষ মেডিকেল ছাত্রী হাদিয়া’র ঘটনায় ওয়ালস্ট্রীট জার্নালের এই মন্তব্য। এই ধরণের কথাবার্তা মুসলিম সমাজ বা নেতাদের মুখে খুব একটা শোনা যায়না? তবে সদ্য জেএনইউ ইউনিভার্সিটির এক মুসলিম নারীনেত্রী বলেছেন যে, হিন্দু  ছেলেদের মুসলিম মেয়েদের বিবাহের অধিকার থাকতে হবে। ব্যস, তার বিরুদ্ধে ফতোয়ার  পর ফতোয়া ঝুলছে।  হিন্দুত্ববাদীরা বলছেন, ‘লাভ জ্বিহাদ’ একটি ইসলামী কর্মসূচি। যেমন ‘নও-মুসলমান’ একটি ইসলামী কর্মসূচি।  বাংলাদেশে বিশেষত: নাবালিকারা লাভ-জ্বিহাদের স্বীকার, কারণ, সমাজ, প্রশাসন, পরিবার, সরকার সবাই বেহেস্তে যাবার আশায় এই অপকর্মটিতে সমর্থন যোগায়? পূর্ণিমা সেনগুপ্ত-র কথা অনেকের মনে থাকার কথা। তিনি বাংলাদেশের প্রথম হিন্দু নায়িকা, ধর্মান্তরিত হন, সেই শুরু। পূর্ণিমা সেনগুপ্ত থেকে হালের অপু বিশ্বাস-র ধর্মান্তর মোটামুটিভাবে ‘লাভ জ্বিহাদ’-র দৃষ্টান্ত বলা যায়। লোভ, মোহ আছে, থাকবে, কিন্তু ধর্মান্তর, ওটা শুধু মুসলমানের  একচেটিয়া সম্পদ। হিন্দু নায়িকা মিনা পাল ওরফে কবরী। চটগ্রামের চিত্ত চৌধুরীর  স্ত্রী মীনা পাল হলেন কবরী। তারপর কবরী সরোয়ার। শেষে এমপি হতে গিয়ে হয়ে গেলেন সারাহ বেগম কবরী। ভিন্ন ভিন্ন স্বামীর ঘরে কবরীর সন্তানরা ভিন্ন ভিন্ন ধর্মের। অনজু ঘোষ-র উত্থানকালে আমি ঢাকা থাকতাম। বিয়ে করলেন এক মুসলিম পরিচালককে, মুসলমান হলেন। ছাড়াছাড়ি হলো, আবার হিন্দুধর্মে  ফিরে এলেন। মোল্লারা হুঙ্কার ছাড়লেন, ‘একবার মুসলমান হলে আর ইসলাম ত্যাগ করা যায়না’? অরুণা বিশ্বাস বা মঞ্জুশ্রী একই পথে গেলেন। জহির রায়হান দামী ফিল্ম নির্মাতা। তিনি ধর্মান্তরিত করলেন হেনা ভট্টাচার্যকে। হেনা হলেন সুমিতা রায়হান। আসলে সুমিতা সিনেমার নাম, হেনা হলেন1  নিলুফার বেগম। সুমিতার এই ঘরে দুই পুত্র বিপুল রায়হান ও অনল রায়হান। শমী কায়সার-র প্রথম বিয়ে হয়েছিলো কলকাতার এক হিন্দু ব্রাহ্মণের সাথে। এজন্যে ছেলেটিকে মুসলমান হতে হয়েছিলো? অবশ্য বিয়েটি টেকেনি, ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে গেছেন। সমস্যা হলো, বাংলাদেশে বিষয়টি একপেশে। অর্থাৎ ধর্মান্তর শুধুই ওয়ান ওয়ে, ইসলামীকরণ।  এজন্যে এটিকে ‘লাভ-জ্বিহাদ’ তকমা দেয়া সহজ। বলিউডে এটি ডবল ওয়ে, যদিও সেখানেও ইসলামীকরণ বেশি। শাহরুখ খানের স্ত্রী হিন্দু, গৌরী। সাইফ আলী খান সদ্য বিয়ে করেছেন কারিনা কাপুর-কে। সঞ্জয় দত্তের স্ত্রী দিলনেওয়াজ শেখ। ঋত্বিক রোশন-র বউ সুজানা খান। সুনীল শেঠীর স্ত্রী মুসলমান1 মানা শেঠি বা রাজ্ বাব্বরের স্ত্রী নাদিরা বাব্বর। কলকাতায় মৈত্রিয়ী দেবীর বাড়ীতে ধুমধাম করে বিয়ে হয়েছিলো জয়শ্রী-আলমগীর -এর। বাংলাদেশে বা পাকিস্তানে এমন একটি ঘটনা কি কেউ দেখতে পারবেন বা আছে? নেই? কেন নেই? কারণ, পরিবার, সমাজ বা রাষ্ট্র সেটি হতে দেয়না। পাকিস্তান বা মুসলিম বিশ্বে তো এই প্রশ্নই ওঠেনা? জোর-জবরদস্তিটা সেখানেই! (প্রবন্ধের মতামত লেখকের নিজস্ব।)

—–শিতাংশু  গুহ, নিউইয়র্ক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *