মোদীর বিজয়।। বাংলায় বিজেপি আসছে?

খবর বা গুজব, যাই হোক, প্রচারণা ছিলো যে, নির্বাচনে জেতার জন্যে মোদী কেদারনাথের গুহায় গিয়ে ধ্যান করেছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সেই সংবাদ শুনে মোদীকে ফোন করে বলেছেন, ২০২০-এ তার জন্যে ওই গুহাটি রিজার্ভ রাখতে। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নেত্তনাহু নির্বাচনে জিতেছেন। মোদী জিতলেন। সামনে ট্রাম্পের পালা। এবার ভারতে নরেন্দ্র মোদী বিশাল বিজয়ের পেয়েছেন। বিজেপি এখন একমাত্র সর্বভারতীয় দল যার আশেপাশে কেউ নেই। কংগ্রেস ৫২টি আসন নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে। পশ্চিমবঙ্গে মমতা ব্যানার্জীর অবস্থা শোচনীয়। বাংলা থেকে কংগ্রেস, বামফ্রন্ট আগেই বিদায় নিয়েছে। এবার তৃণমূলের যাবার পালা। দিদির বিদায় ঘন্টা বেজে গেছে। এজন্যে অবশ্য তিনি নিজেই দায়ী। নিজের হাতে গড়া দল ‘তৃণমূল’ তিনি নিজেই ধ্বংস করে দিচ্ছেন। এ থেকে ফেরার রাস্তা যে নেই তা বোঝা যাবে ২০২১-এ বা হয়তো তার আগেই? আপাতত: মমতার প্রধানমন্ত্রী হবার স্বপ্ন তছনছ হয়ে গেছে। মুখ্যমন্ত্রীত্ব যাই যাই করছে। বাংলায় কমিউনিষ্টরা মৃত। কংগ্রেস নাই। তৃণমূল যাচ্ছে। বিজেপি আসছে?            নির্বাচনে জিতে নরেন্দ্র মোদী বলেছেন, ‘কেউ যদি জিতে থাকে, তবে ভারত জিতেছে; গণতন্ত্র জিতেছে, জনতা জিতেছে’। উৎফুল্ল জনতাকে তিনি বলেছেন, এই জয় নুতন ভারত প্রতিষ্ঠার ম্যান্ডেট। নোবেল বিজয়ী অমর্ত্য সেন বলেছেন, ভারতীয়রা বোকা ও মূর্খ তাই বিজেপি’কে ভোট দিয়েছে। চিত্রশিল্পী শুভাপ্রসন্ন বলেছন, বাংলায় বিজেপি’র উত্থান অশনিসঙ্কেত। আসলে কি তাই? এমন তো হতে পারে, অনেকদিন পর বঙ্গবাসী ‘ভারতীয় সভ্যতার’ মূল খুঁজে পাচ্ছেন? এবারের নির্বাচন মূলত: ছিলো নরেন্দ্র মোদী ভার্সেস রাহুল গান্ধীর মধ্যে রেফারেন্ডাম। মোদী সুনামী রাহুলকে ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। এই নির্বাচন পারিবার কেন্দ্রীক রাজনীতির বিপক্ষে ম্যান্ডেট দিয়েছে। হয়তো এ কারণে আগামী নির্বাচনে গান্ধী পরিবারকে ডিঙ্গিয়ে পাঞ্জাবের ক্যাপ্টেন অমরিন্দর সিং কংগ্রেসের প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী হবেন। তিনি পাঞ্জাবে কংগ্রেসকে আধিপত্য দিয়েছেন। দলে তার প্রভাব বাড়ছে। অনেকের মতে, রাহুল নয়, ক্যাপ্টেন সিং হচ্ছেন মোদীর যোগ্য প্রতিদ্ধন্ধী। রাহুল গান্ধী তাঁর পরিবারের ঐতিহ্যবাহী ‘আমেথি’ আসনে বিজেপি’র স্মৃতি ইরানীর কাছে হেরেছেন। তবে কেরালায় মুসলিম অধ্যুষিত একটি আসনে জয়ী হয়েছেন। ভারতীয় নির্বাচন একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। নব্বই কোটি ভোটার; একমাস ব্যাপী নির্বাচন। মমতার পশ্চিমবঙ্গ ব্যাতিত অন্যত্র কোন গোলযোগ শোনা যায়নি। নির্বাচনে গণতন্ত্র জিতেছে। আঞ্চলিক বিভক্ত রাজনীতি পরাজিত হয়েছে। ভারতীয় নির্বাচনী ব্যবস্থা প্রশংসনীয় এবং বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রের উপযোগী। ঐতিহ্যগতভাবে ভারতীয় হিন্দু ধর্মনিরপেক্ষ এবং উদার। তৃণমূল, সিপিএম ও কংগ্রেসের উগ্র ধর্মনিরপেক্ষতা, যা কার্যত: ‘হিন্দু বিদ্বেষ বা মুসলীম তোষণ’, সাধারণ মানুষ পছন্দ করেনি। বিজেপি এবার নির্বাচনে হিন্দুত্ব, রাম মন্দির বা গো-হত্যা ইস্যু সামনে আনেনি। ২০১৪’র নির্বাচনের অনেক প্রতিশ্রুতি মোদী রাখতে পারেননি। তবে তিনি ভোটারদের বোঝাতে সক্ষম হয়েছেন যে, দেশের নিরাপত্তা এবং ইসলামী সন্ত্রাস মোকাবেলায় তিনি একমাত্র যোগ্য প্রার্থী। সর্বভারতীয় রাজনীতিতে এমুহুর্তে মোদীর সমকক্ষ কেউ নেই? ভারতীয় রাজনৈতিক দৃশ্যপট পাল্টাচ্ছে। বাংলার দৃশ্যপট আরো দ্রুত পাল্টাবে। মমতা ব্যানার্জী যে ভাষায় গালাগালি করেছেন, মানুষ তাতে বিগড়ে গেছে। বিজেপি ১৮টি আসন পেয়েছে। বিজেপি নেত্রী রুপা গাঙ্গুলীর ভাষ্যমতে, তৃণমূলের গুন্ডামী না থাকলে বিজেপি ৩০টি আসন পেতো। রাহুল গান্ধীর ‘চৌকিদার চোর হ্যায়’ শ্লোগান বুমেরাং হয়েছে। ভারতীয়রা এটি পছন্দ করেনি। মোদী চোর ভারতবাসী তা বিশ্বাস করেনি। বরং তার স্বচ্ছ ইমেজ গ্রহণযোগ্যতা বাড়িয়েছে।  পশ্চিমবঙ্গে মোদীর ভাবমুর্ক্তি যতটা কাজ করেছে, মমতার কদর্য রাজনীতি ঠিক ততটাই মানুষকে তৃণমূল থেকে বিজেপি’র দিকে ঠেলে দিয়েছে। তৃণমূলের বাংলাদেশী ষ্টাইল ‘মাসল ও সাম্প্রদায়িক’ রাজনীতি ভোটারকে বিজেপিমুখী করেছে। কলকাতার সাবেক মেয়র সিপিএম নেতা বিকাশ রঞ্জন ভট্টাচার্য্য তাই হয়তো বলেছেন, ‘মমতার পিঠে চড়ে বিজেপি রাজ্যে ঢুকেছে’। বিজেপি নেতা সুনীল দেওধর বলেছেন, মমতার অপশাসনের ফলে শুধু বাম নয়, তৃণমূলের একটি অংশ বিজেপি’র দিকে ঝুঁকেছে’।

কেউ কেউ মনে করেন, বাংলাদেশে ক্রমাগত সংখ্যালঘু নির্যাতন পশ্চিমবঙ্গে বিজেপিকে ভালো করতে সাহায্য করেছে। মমতার অতিরিক্ত মুসলিম তোষণে সেখানকার হিন্দুরা ভাবছে তাদের অবস্থা না বাংলাদেশের হিন্দুদের মত হয়? তাই তাঁরা মুক্তির পথ হিসাবে বিজেপিকে বেছে নিয়েছে। থিওরী একেবারে ফেলনা নয়?

ইসলামিক প্রজাতন্ত্র পাকিস্তান বা রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বহাল রেখে বাংলাদেশ চায় ভারত সেক্যুলার থাকুক। আপাতত: মনে হচ্ছে, ভারত আর সেই ফাঁদে পা দিচ্ছে না? ভারতে হিন্দু জাতীয়তাবাদ শক্তিশালী হচ্ছে, এরজন্যে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে সাম্প্রদায়িক ইসলামী শক্তির রমরমা অনেকাংশে দায়ী। পশ্চিমবঙ্গ বাম বলয় ছেড়ে ডানে ঝুঁকছে।   

১৯৭৭-র পর এই প্রথম বাংলায় কোন জাতীয় দল এতটা ভালো করতে সক্ষম হলো। কংগ্রেস ১৯৪৭-৭৭ পশ্চিমবঙ্গে রাজত্ব করেছে। ১৯৭৭-২০১১ বামফ্রন্ট। ২০১১- থেকে তৃণমূল। তৃণমূল ভয় পাচ্ছে, সামনে হয়তো বিজেপি। তৃণমূলের বর্ষীয়ান সম্পাদক চন্দন মিত্র বলেই ফেলেছেন, ‘বিজেপি ইজ এ গভর্নমেন্ট ইন ওয়েটিং’। মমতা ব্যানার্জী ‘জয় শ্রীরাম’ শ্লোগান শুনে যেভাবে ক্ষেপে যাচ্ছেন, তাতে মনে হয় এই শ্লোগানেই তিনি কুপোকাৎ হবেন?

দিল্লীতে বিজেপি’র দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতারোহন উপমহাদেশে ভারসাম্যের তেমন পরিবর্তন ঘটাবে বলে মনে হয়না! মোদীর নেতৃত্বে ভারত আরো শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসাবে আবির্ভুত হবে। মোদীর এই বিজয় বাংলাদেশের সাথে সম্পর্কোন্নয়নের ধারা অব্যাহত থাকবে। মোদী ও শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও রাজনৈতিক কেমেস্ট্রি ভালো। যদিও শেখ হাসিনা দু’দুবার মোদীর শপথ অনুষ্ঠান এড়িয়ে গেছেন বলে কথা উঠেছে।

ভারতীয় স্বার্থে মোদীর বাংলাদেশকে প্রয়োজন আছে। ক্ষমতায় থাকার স্বার্থে শেখ হাসিনার ভারতকে পাশে চাই। চীন প্রশ্নে সামান্য মতানৈক্য বাদে বাংলাদেশ-ভারত তেমন বৃহৎ কোন সমস্যা নেই। একদিকে শত্রূ মায়ানমার, দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর আর বাকিটা ভারত বেষ্টিত বাংলাদেশের পক্ষে নিজেদের স্বার্থেই ভারতের সাথে থাকতে হবে।

কারো কারো ধারণা, এনআরসি প্রশ্নে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে টানাপোড়ন দেখা দিতে পারে। আসামে এনআরসি চলছে। অমিত শাহ বলেছেন, পশ্চিমবঙ্গে এনআরসি হবে। মমতা বলছেন, হবেনা। এনআরসি নিয়ে বাংলাদেশ-ভারত সমস্যা হলে লাভবান হবে চীন। ভারত এ থিওরী বোঝে। তবে এটিও সত্য, অবৈধ নাগরিক বিতারণের অধিকার ভারতের আছে। বাংলাদেশের জন্যে মিলিয়ন ডলার প্রশ্নটি হচ্ছে, তিস্তা কি হবে? guhasb@gmail.com;

——————————————————— শিতাংশু গুহ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *