দুইটি বিশ্বযুদ্ধের উৎসস্থল বার্লিন যান

Image result for pictures of berlin germany

শিতাংশু গুহ, নিউইয়র্ক।। জার্মানী আগে কখনো যাইনি। দু’ই দু’ইটি মহাযুদ্ধের উৎসস্থল জার্মান যাওয়ার সুপ্ত একটি বাসনা হয়তো মনে ছিলো, তাই সেবার সিদ্ধান্ত নিলাম, যাবো। সেটা ২০১০, এক দশক আগের কথা। এখন ফেব্রূয়ারি ২০২০। পহেলা সেপ্টেম্বর বার্লিনের টেগেল এয়ারপোর্টে আমরা যখন পৌঁছলাম, সকাল তখন এগারোটা পেরিয়ে গেছে। কোন তাড়াহুড়ো ছিলোনা। লন্ডন থেকে বৃটিশ এয়ারওয়েজের দেড় ঘন্টার কম সময়ের ফ্লাইটে আতিথিয়তার কোন কমতি ছিলোনা। প্লেনে আমাদের চেহারার অন্য কোন যাত্রী দেখিনি। যথানিয়মে ইমিগ্রেশনে গেলে দু’একটি সাদামাটা প্রশ্ন করে পাসপোর্টে সীল মেরে ছেড়ে দেয়। লাগেজ নিয়ে বেরিয়ে যেতে যেতে কোন কাষ্টমস চোখে পড়লো না। সাকুল্যে পনের-বিশ মিনিটে সব সেরে বাইরে বেরিয়ে এলাম। এমনকি লন্ডনেও ইমিগ্রেশন এটা-ওটা প্রশ্ন করেছে। বলেছি, ঘুরতে এসেছি, আগেও ক’বার এসেছি। তারপরও কোথায় থাকবো, ক’দিন থাকবো ইত্যাকার প্রশ্ন করতে থাকলে পাশ থেকে আমার চৌদ্দ বছরের পুত্র ‘অর্জুন’ বলে, ‘হোয়াই সী ইজ আস্কিং সো মেনি কোশ্চেন’? আমি উত্তর দেয়ার আগেই মহিলা উত্তর দেয়, ‘ইট ইজ মাই জব’, সাথে আরো যোগ দেয়, ‘বিলিভ মী, ইন আমেরিকা দে আস্ক আস মোর কোশ্চেন’। এরপর আর দেরি হয়নি। আবার বার্লিন থেকে প্যারিসে নামলে দেখলাম, কোন ইমিগ্রেশন, কাষ্টমস কিচ্ছু নেই! বন্ধুরা জানালো, ওটা বার্লিন এয়ারপোর্টে হয়ে গেছে। জানলাম, ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোতে এরকমই।  

এরআগেও (২০০৩) জেনেভায় দেখেছি দূর থেকে পাসপোর্ট দেখালেই হতো। আমি ট্রেনে জেনেভা থেকে প্যারিস যাচ্ছিলাম। কোন চেকিং, কাষ্টম্স নেই? প্যারিসে নেমেও একই অবস্থা। বন্ধুরা আমায় ট্রেনের কামরা থেকে রিসিভ করে। ভাবলাম, ৯/১১ না হলে দুনিয়াটা আরো সহজ হতো। মনে পড়ে ২০০৫-এ প্যারিস থেকে নিউইয়র্ক আসার পথে প্লেনের দরজায় পা দেয়ার ঠিক পূর্বমুহূর্তে আমায় থামানো হয়, আমার জামাকাপড় খোলা ছাড়া প্রায় সবকিছু তল্লাশি  চালায়। অসংখ্য প্রশ্নবানে অতিষ্ঠ হয়ে তখন ওদের বলেছিলাম, ‘আই এম নট এ মুসলিম’। এরপর কেন জানি, সব থামে। রাগে-লজ্জায় তখন ইসলামী মৌলবাদীদের গালি দিতে দিতে প্লেনে উঠি, এই ব্যাটাদের জন্যে আমাদের এই বেইজ্জতি। এবার স্ত্রীকন্যা সাথে থাকায় তেমন ঝামেলা পোহাতে হয়নি। তবু আমার পুত্রকন্যা এতটুকুও সইতে রাজি নয়? মনে মনে ভাবলাম, বাংলাদেশের ইমিগ্রেশন ও কাষ্টমস এরা দেখেনি। আমার বড়পুত্র ‘পাপাই’ একবার দেশে গিয়ে এয়ারপোর্টে মাল নিয়ে টানাটানি ও ফকিরের রাজত্ব দেখে কাঁদো কাঁদো হয়ে যায়! সেটা অনেকদিন আগের কথা। যাহোক, টেগেল এয়ারপোর্টটি সুন্দর, ছিমছাম, গোছানো। টেলিফোন করতে   চাইলাম, দেখলাম লন্ডনের ‘সিমকার্ড’ অচল। বুথ থেকে হোটেলে টেলিফোন করতে চাইলাম। বেশ ক’বার চেষ্টা করলাম। বেশ কয়েক ইউরো খরচ হলো। কাজ হলোনা। ছেলেও তেমন সুবিধা করতে পারলো না। কারণ ‘নো ইংলিশ’। পুরো এয়ারপোর্টে ইংরেজী বলার লোক পেলাম না? দু’একজন দাবি করলেন, তারা কিঞ্চিৎ  ইংরেজী জানেন, কিন্তু তাঁদের ইংরেজী বোঝার ক্ষমতা আমাদের ছিলোনা। এয়ারপোর্টে ফ্রী কম্পিউটারাইজেড টেলিফোন ছিলো, কিন্তু সময় মাত্র এক মিনিট। বার কয়েক এক মিনিট এক মিনিট করে কথা বলে যা বুঝলাম, এয়ারপোর্টের বাইরে বাসষ্টপে হোটেলের শ্যাটল অপেক্ষা করছে। প্রায় একই সময়ে  কোন এক এয়ারলাইনসের এক মহিলা ‘এয়ারহোস্টেস, পেলাম, তিনি মোটামুটি ইংরেজি জানেন, আমাদের দেখিয়ে দিলেন, কোথা দিয়ে যেতে হবে। মহিলাকে ধন্যবাদ দিয়ে, বাইরে এসে দেখি ‘শ্যাটল’ দাঁড়িয়ে। দশ-বারো মিনিটে হোটেল পৌঁছলাম। লোকজন ইংরেজি জানে, ও বলছে।  রুমে ঢুকে হাতমুখ ধুঁয়ে তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে বের হয়ে যাই. বার্লিন

 দেখতে। হোটেল থেকে গ্রূপ টিকেট কিনে এবং ম্যাপ নিয়ে পৌঁছে যাই, ‘জ্যুলজিকেল গার্টেন’-এ, অর্থাৎ আমাদের গুলিস্তানে! সুশৃঙ্খল, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন বার্লিন শহর বেশ সুন্দর। আমরা খাবার জন্যে নানান দোকানে যাচ্ছিলাম। বড়বড় সাজানো, গোছানো দোকান, চমৎকার খাবাদ সাজানো, তবু

 খেতে মন চাইছিলো না, কারণ মাছি! হয়তো মিষ্টির দোকানের মত মাছি, কিন্তু আগের দিন তো আর নাই যে, সবকিছু খাওয়া যায়, আর ছেলেমেয়েরা তো খাবেই না! ডানকিন ডোনাড’র পিজা খেলাম, দাম বড্ড বেশি। কোন কোন দোকানে ইংরেজী বলা লোক পাওয়া গেলো। অবাক হলাম, একজন বাঙ্গালী পেলাম না? বার্লিনে  তখন শীতের আমেজ। মাঝেমধ্যে ঝিরঝির বৃষ্টি। মানুষগুলোকে যথেষ্ট ভদ্র মনে হলো. আমাদের দেশে যেমন বাটপার-ধান্ধাবাজের খপ্পরে পড়ার চান্স থাকে, এখানে তা নেই। মনে কোন শঙ্কা ছিলোনা। এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়ালাম। শহরের কেন্দ্রস্থলে এক বিশাল গীর্জা, একজন জানালেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের  সময় এর চূড়ায় বোমা পড়েছিলো, ওটা মেরামত হয়েছে। গীর্জাটি এখন মিউজিয়াম, পাশেই ওঁরা আর একটি বড় গীর্জা বানিয়েছে, সেটাও দেখার মত। মাত্র কয়েক বছর? ১৯৪৫’র ধ্বংসস্তূপ থেকে ওঁরা আবার উঠে দাঁড়িয়েছে,  ওরা উন্নত। সর্বত্র পরিচ্ছন্ন, ছিমছাম। বোঝাই যায় না যে, এই বার্লিন শহর মাত্র ক’দিন আগেও দুই ভাগে বিভক্ত ছিলো। পূর্ব ও পশ্চিম বার্লিন। বাসে যেতে যেতে এক বুড়ি জানালো, এটা আগে পূর্ব-জার্মান ছিলো, ওটা পশ্চিম জার্মান, ইত্যাদি। ভাবছিলাম, এটা কি করে সম্ভব হয়েছিলো?  একটি শহরকে মধ্যখান দিয়ে দেয়াল দিয়ে দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছিলো। অবস্থা এ রকম যে, ঢাকা শহরকে ফার্মগেট বরাবর পূর্ব-পশ্চিমে বিভক্ত করলে যা হবে, তাই! এখন আর দেয়াল নেই, বোঝাও যায়না, কোথায় দেয়াল ছিলো। তবে স্মৃতি হিসাবে দেয়ালের কিছুটা অংশ এখনো রেখে দেয়া হয়েছে। ওই দেয়ালের  লেখা পড়লে বোঝা যায়, জার্মানরা কতটা দেয়ালের বিরুদ্ধে ছিলো। তাই দেয়াল ভাঙ্গতে ওদের বেশি সময় লাগেনি। শুধু যে ইটের দেয়াল ভেঙ্গেছে তা নয়, জার্মানদের মনে দেয়ালও ভেঙ্গেছে। দুই জার্মান এখন এক। চীনের দেয়াল দেখি নাই। তাই জার্মানীর ভাঙ্গা দেয়াল দেখতে আমরা  অর্ধেক দিন ব্যয় করি। দেয়ালের পাশে দাঁড়িয়ে মনে হয়েছে, কোন জাতিকে কি দেয়াল দিয়ে বেঁধে রাখা যায়? প্রথম দিন হোটেলে গিয়ে হামিদুল-কে কল দেই? চমৎকার মানুষ। তাকে আমি চিনতাম না, পার্থদা, মানে পার্থ প্রতিম মজুমদার তাঁর ফোন নাম্বার দিয়ে বলেছিলেন, কল করবেন, দেখবেন অন্য  মানুষ। তাই দেখলাম। কথা বলে ভালো লাগলো। জার্মান বউ, কিন্তু বঙ্গচর্চা থেমে নেই। বন্ধুবান্ধব ছাড়া জার্মানীতে আরো একজনকে কল দিয়েছিলাম, তিনি হলেন ‘দাউদ হায়দার’। বঙ্গবন্ধু’র আমলে কৃষ্ণ ও মুহম্মদকে একই সাথে গালি দিয়ে কবিতা লিখে দাউদ হায়দার দেশ ছাড়তে বাধ্য হ’ন। তারপর  তসলিমা নাসরিন। আমার মতে দাউদ হায়দার এবং তসলিমা নাসরিন’কে দেশ থেকে বহিস্কার বাংলাদেশে ইসলামী মৌলবাদ চাঙ্গা করতে সহায়ক হয়েছে।তাই দাউদ হায়দারের সাথে দেখা করার ইচ্ছে ছিলো। হয়নি। কারণ দাউদ  হায়দার হয়তো চাননি দেখা করতে। অথবা আমার মনে হয়েছে, দাউদ হায়দারের মধ্যে ‘অহমিকা’ আছে! তখন ভেবেছিলাম, দাউদ হায়দার কি আল-মাহমুদ হয়ে যাচ্ছেন? আমার এক বন্ধু জিজ্ঞাসা করেছেন, ‘আচ্ছা বোরখা পড়া গৃহবধূ তসলিমা’ কি চিন্তা করা যায়? তিনি নিজেই উত্তর দেন, ‘সবই সম্ভব’। ক’বছর  পর মুক্তধারার বইমেলায় দাউদ হায়দার নিউইয়র্কে এসেছিলেন, দেখা হয়েছে, ‘হাই-হ্যালো হয়েছে, জার্মানীতে কথা বলার যে উৎসাহ ছিলো, তা হারিয়ে গেছে, সুতরাং কথা হয়নি। তসলিমা নাসরিনের সাথে ২০১৯-এ দেখা হয়েছে, কথা হয়েছে। ২০২০’এ দাঁড়িয়ে বলা যায়, দাউদ হায়দার এখনো আল-মাহমুদ হ’ননি।  তসলিমা নাসরিন আগের মতই স্বাধীন আছেন। সেবার জার্মানীতে দাউদ হায়দারের সাথে আমার ১৫/২০ মিনিট কথা হয়েছে।  টেলিফোনে। বেশির ভাগ সময় কথা আমি বলেছি, এবং তার সাথে দেখা করার একটা সময়-নির্ঘন্ট ঠিক করি। পরদিন যথাস্থানে পৌঁছে কল দেই, তবে অচেনা জায়গায় যথা সময়ে পৌঁছতে পারিনি, ঘন্টা খানেকের একটু কম সময় দেরি হয়ে যায়! তিনি কল ধরেন। বললাম, আমি পৌঁছেছি, আপনি কোথায়? তিনি বললেন,  ‘স্যরি, আপনি লেট্ করেছেন, আমি অন্য এপয়েন্টমেন্ট চলে এসেছি। কি আর করা, দেখা হলোনা। এই দেখা না হওয়ার জন্যে নি:সন্দেহে আমি দায়ী, তবু কেন জানি মনে হয়েছে, তাঁর অনীহা ছিলো! আমি পর্যটক নই, ভ্রমণ বৃত্তান্ত লেখাও আমার উদ্দেশ্য নয়। এটিকে পথ চলতে চলতে কিছু ঘটনা, কিছু  স্মৃতি চারণ বলা যেতে পারে। ইহুদী মিউজিয়াম বা গণকবর দেখে মনটা ব্যথিত হয়েছিলো, আজো সেই স্মৃতি বেদনা দায়ক। মাটির ওপর সারি সারি সিমেন্টের কবর নাৎসি বীভৎসতার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়! আর ব্যাটা ইরানের আহমদনীযান সেটা অস্বীকার করে? আহমদনীযান কি এ যুগের হিটলার? আমার ছেলেমেয়েদের অভ্যাস হচ্ছে, যে দেশে যাবে সেই দেশের খাবার  খাবে। আমার তো পকেটের দিকে নজর রেখে কাজ করতে হয়! ভরসা যে পকেটে প্লাষ্টিক থাকে, ক্যাশের কোন বালাই নেই! শহরের ব্যস্ত এলাকায় একটি ভালো রেস্তোরায় খেলাম। ভুরিভোজ, ভালোই। জার্মান বিয়ার বিখ্যাত, প্রতিদিন খেতে ভুল হয়নি, আর গাড়ি তো আমাকে চালাতে হয়নি, সমস্যা কি! মজার  ব্যাপার হলো, ডিনারের পর বিল আর দেয়না। ভাবলাম, বিণে পয়সায় খাওয়ালো নাকি? কন্যা ‘পিঙ্কি’ বিল চাইলো, ওয়েট্রেস বিল দিলো। বিলে সার্ভিস চার্জ নেই, কত দেয়া যায়? ছেলেমেয়ে বললো, পনের শতাংশ। তাই দিলাম। ওয়েট্রেসের মুখ দেখে মনে হলো, খুশি, হয়তো এতটা কেউ দেয়না? হয়তো টিপসই  দেয়না, কে জানে? একই দৃশ্য প্যারিসেও। আমরা এক দোকানে কফি খাচ্ছিলাম। একটি মেয়ে  জিজ্ঞাসা করলো, এখানে কত পার্সেন্ট টিপস দিতে হয়? আমার গিন্নী ‘আলপনা’ কথা বললো। জানলাম, ওঁরা দুই বান্ধবী প্যারিস ঘুরতে এসেছে, টিপস নিয়ে সমস্যা হচ্ছে! বললাম, আমাদেরও হচ্ছে, তবে এভারেজ দশ শতাংশ দিয়ে দিও। মেয়ে দু’টো নিউইয়র্কের। একথা জেনে তো আমার গিন্নী দেশি ভাই  মনে করে ওদের কত ধরণের উপদেশ দিয়ে দিলো। প্যারিসে বাঙ্গালী ভরা। তাছাড়া পার্থদা ছিলেন। কোন ঝামেলা হয়নি। বরং পার্থদা’র সান্নিধ্যে সবাই স্বাচ্ছন্দে ছিলো। হাসতে হাসতে পার্থদা সবার পেটে খিল ধরিয়ে দিয়েছিলো। পার্থদা আমাদের পারিবারিক বন্ধু, তিনি টেলিফোন করা মানে ‘হাসতে  আপনাকে হবেই’। সেই গল্প নাহয় পরে? আমাদের দেশে মানুষ লন্ডন-প্যারিস যেতে ভালোবাসে। এতদিন আমি বিনে পয়সায় পরামর্শ দিতাম, ‘বার্লিন যান’। ২০১৯-এ দুই সপ্তাহ ইতালি ছিলাম, এখন বলি, ভেনিস যান, বা সুযোগ থাকলে ডিজনি ওয়াল্ড যান। আসলে শহর ছেড়ে বেরিয়ে পড়ুন, যেখানে যান, সেখানেই  ভালো লাগবে। ১০ই ফেব্রূয়ারি ২০২০। 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *