GeneralNewsSambad Matamat

মসজিদ অগ্রগতির বিরুদ্ধে নয়

দিলীপ চক্রবর্ত্তী

“গৌরীপুর জামে মসজিদ” স্থাপিত হয়েছিল ১৮৯০ খ্রীষ্টাব্দে। এ মসজিদটি “বাঁকড়া মসজিদ” নামেও পরিচিত। তারপর ১৯২৪ সালে এ মসজিদের স্বল্প ব্যবধানে দমদম এরড্রোম স্থাপন করা হয়। যে হেতু মসজিদ আগে স্থাপিত হয়েছে সে জন্য এখন অবশ্য মুসলিমরা দাবী করতে পারে যে মসজিদের জায়গায় বিমানবন্দর স্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু এ যুক্তি মোটেও ধোপে টেকে না কারণ বিমানবন্দর সরকারী জমিতে স্থাপ করা হয়েছে। নতুন অবস্থায় বিমানবন্দরের ব্যবহার কম ছিল। কিন্তূ আজ শতাধিকবর্ষ পরে এ বিমানবন্দর থেকে দৈনিক প্রায় তিনশত থেকে চারশত উড়ান চলাচল করে থাকে। প্রায় ২৭টি বিমানপরিবহন সংস্থা পৃথিবীর প্রায় ৭০টি গন্তব্যস্থানে যাত্রীদের পৌঁছে দেয়। এ বিমানবন্দরে যাত্রীসংখ্যা বহুগুণ বেড়েছে, গন্তব্যস্থানের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে, বিমান কোম্পানির সংখ্যা অনেক বেড়েছে, বিমান পরিষেবার কলেবর বৃদ্ধি পেয়েছে, বিমান আধুনিক হয়েছে কিন্তু সুষ্টুভাবে বিমান উড়ানের জন্য রানওয়ের দৈর্ঘ বৃদ্ধি পায়নি, ফলে যাত্রীসাধারণ আধুনিক বিমান পরিষেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। আর এ জন্য আধুনিক বিমান চলাচলের জন্য দীর্ঘতর রানওয়ের প্রয়োজন এবং এ রানওয়ে দীর্ঘকরণের বাধা স্বরূপ দাঁড়িয়ে আছে এ গৌরীপুর মসজিদটি। রানওয়ে দীর্ঘ করতে হলে মসজিদটির অপসারন অত্যন্ত প্রয়োজন এবং অপরিহার্য হয়ে পরেছে। আর দ্বিধা নয়, বরং লক্ষ্য স্থির হয়ে গেছে, এখনই কাজ শুরু করা উচিত।

আর এ পরিস্থিতি নিয়েই শুরু হয়ে যায় মসজিদের বিতর্ক। তারপর জল বহুদূর গড়িয়েছে, কিন্তু গত পঞ্চাশ বছরে না বামফ্রন্ট, না তৃণমূল সরকার মসজিদটি অপসারন করে এ সম্প্রসারনের সাহস দেখিয়েছে। বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ বহু আবেদন করেও পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কাছে মসজিদ ভাঙার অনুমতি পায়নি। কারণ একটাই – মুসলিমতোষণ পরোক্ষে ভোটব্যাঙ্কের সংরক্ষন নিশ্চিতভাবে অক্ষত রাখা। এ দু সরকারের ভয় – মসজিদ তুলে দিলে মুসলিমরা সরকারেরে বিপক্ষে চলে যাবে এবং সরকারের বিরুদ্ধে ভোট দেবে। কিন্তু সত্যিই কি মুসলিমরা এতই অন্ধকারে যে বিমানবন্দরের উন্নতির বিপক্ষে রায় দিত? একটি ধর্মীয় সমাজকে এতটা নিম্নমানের বলে ধরে নেওয়া কখনই সমীচীন নয়, কিন্তু দুঃখের বিষয় ইসলাম ধর্মাবলম্বী মানুষরাও কখনও এ ব্যবস্থার প্রতিবাদও করেনি। আর মুসলমানরা মমতার দুধেল গাই হয়েই থাকতে পছন্দ করেছে।              

বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের বহু আবেদন নিবেদন শেষ হয়েছে নিরুত্তর ফাইলবন্দীর লজ্জাজনক নীরবতার ঘরে। বিগত দু সরকারের ভয় ছিল – মসজিদ তুলে দিলে মুসলিমরা সরকারেরে বিপক্ষে চলে যাবে এবং সরকারের বিরুদ্ধে ভোট দেবে। এজন্য পূর্বতন দুই সরকারই সমস্যার সমাধান ভিন্ন নীরব থাকাই সমীচীন মনে করেছে।   কিন্তু সত্যিই কি মুসলিমরা বিমানবন্দরের উন্নতির বিপক্ষে রায় দিত? এ প্রশ্নের সম্ভাব্য উত্তরদাতা মুসলিমরা কখনও এ প্রশ্নের সম্মুখীন হননি। বিগত দুটো সরকার ধরেই নিয়েছিল যে মুসলমানরা বিমানবন্দরের উন্নতির বিপক্ষে গিয়ে মসজিদ রক্ষার নিদান দেবে। 

আজও এ মসজিদ “নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু আন্তর্জাতিক” বিমান বন্দরের প্রসারন ও উন্নতির পরিপন্থী হয়ে দাঁড়িয়েছে। মসজিদ স্থাপন কালে বিমান বন্দরের কথা কেঊ কল্পনাও করেনি, আবার ১৯২৪ সালে যখন বিমানবন্দরটি স্থাপিত হয় তখন ভবিষ্যতে এর সম্প্রসারনের প্রয়োজন হতে পারে এ কথাও বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ ভাবেন নি। সময় ও অগ্রগতি কখনও থেমে থাকে না, সর্বদা এগিয়ে চলে। তাই সময় প্রগতির সাথে তাল মিলিয়ে বিমানবন্দরের রানওয়ের দীর্ঘায়ণ অতিশীঘ্র সম্পন্ন করা উচিত।

বর্তমান জগতে স্থবির হলে জীবনের অগ্রগতি ব্যহত হবে, তাই ভারতের হিন্দু মুসলমান সকলকেই হাতে হাত ধরে অগ্রগতির পথে এগিয়ে যেতে হবে। আর মুসলমান সমাজ যদি বিজ্ঞানের অগ্রগতিকে অভ্যর্থনা না করে যদি কুসংস্কারকে বেছে নেয় তবুও দেশোন্নতির জন্য বর্তমান বিজেপি সরকারকে বিমানবন্দরের সম্প্রসারনকেই বেছে নিতে হবে। কারণ উন্নতির চাকা স্থবির হয়ে থাকে না। শিক্ষিত ইসলামিক সমাজ এতদিনে নিশ্চয় বুঝতে পেরেছে – দেশ আর ধর্ম সমান্তারাল পথে চলে, এরা কখনও মিলিত হয় না। এটাও বুঝতে পেরেছে দেশের উন্নতি হলে মুসলমানদেরও সার্বিক ও সামাজিক অবস্থার উন্নতি হবে। হিন্দু বা মুসলমান উভয়েরই বোঝা উচিত যে দেশের গরিষ্ঠ সংখ্যক মানুষের জন্য ধর্ম অপেক্ষা উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। এটা বুঝতে হবে যে ধর্ম পরিবার বা একটি ধর্মীয় সমাজ পরিচালনা করতে পারে কিন্তু দেশ না থাকলে ধর্ম বিপন্ন হতে বেশী সময় লাগে না। সেজন্য হিন্দু বা মুসলমানের প্রতি অনুরোধ – দেশকে অগ্রাধিকার দিন, পরে ধর্মের আশ্রয় নিন। আর যে মুসলিম নাগরিক ভারতে থেকে ভারতের অগ্রগতিকে সমর্থন করে না সে তো দেশের সাথে বিশ্বাস ঘাতকতা করছে, তারা ভারতমাতার অযোগ্য সন্তান, বাঁকড়া মসজিদ নিয়ে তারা কি বলছে কিচ্ছু যায় আসে না, একজন সাচ্চা মুসলমান ভারতমাতার উন্নয়ন কামনা করবে, এবং সেটাই স্বাভাবিক, আর সরকারের উচিত যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সম্প্রসারনের কাজ শুরু করা।

ইতিমধ্যেই বিপক্ষ রাজনৈতিক দলের নেতাদের বিরোধিতার কিচিরমিচির শুরু হয়ে গেছে – আলোচনা করে নিতে হবে মুসলমান সমাজের মতামত। প্রশ্ন হল, মুসলিমরা যদি মসজিদ সরাতে রাজী না হন, তা হলে কি উন্নয়নের কাজ হবে না? না কী মুসলিমদের মতামত যা-ই হোক না কেন বিমানবন্দরের উন্নয়নের কাজ শুরু হবেই। সুতরাং যদি সেটাই হয় তা হলে অযথা অমূল্য সময় অপচয় করার কোন অর্থই হয় না। এ প্রসঙ্গে একটা কথা না বললেই নয় – মসজিদের জায়গায় যদি একটা মন্দির হত তাহলেও কি বিপক্ষ রাজনৈতিক নেতাদের কুম্ভীরাশ্রু বর্ষন হোত, না কি তারা চুপ থাকাটাই সমর্থন করতেন?

বিপক্ষ রাজনৈতিক দল বা বিজেপিকে বুঝতে হবে যে গত নির্বাচনে বিজেপির জয় মানেই সরকারের মালিকানা পায়নি বরং জনসাধারণ বিজেপিকে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করে জনগণের জীবনযাত্রার মান উন্নত করার দায়িত্ব বা ‘ইজারা’ দিয়েছে। আর এখানেই এসে যায় বিমানবন্দরের রানওয়ে উন্নয়নের ঔচিত্য ও দায়িত্ব। হিন্দু মুসলমান নির্বিশেষে সকল নাগরিকের উচিত উন্নয়নের পথে মূখ্যমন্ত্রীকে সাহায্য করে বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিকমানের উচ্চতায় উন্নীত করে দেওয়া। এরকম যে কোন উন্নয়ন চিন্তন ও বিজ্ঞানের উপর নির্ভরশীল, ধর্ম ও বিজ্ঞান একে অপরের বিরুদ্ধে নয় বরং সমান্তরালভাবে ধর্ম ও বিজ্ঞানের প্রভাবে মানব জীবনের উন্নতি ও অগ্রগতি হয়ে থাকে। বিমানবন্দরের রানওয়ে দীর্ঘ করতে গিয়ে মসজিদ বা মন্দির সরিয়ে অন্যত্র উপস্থাপনের অর্থ জীবন থেকে ধর্মকে বিচ্ছিন্ন করা নয় বরং জীবনকে আধুনিক সরঞ্জামে সুসজ্জিত করা। ধর্ম ও উন্নয়নকে বিপরীতমুখী না ভেবে বরং জীবনের পরিপূরক ভাবলেই এ সমস্যার সমাধান পেতে একটুও সময় লাগবে না। মসজিদকে হৃদয়ে রেখে আধুনিকতার বলয়ে বিমানবন্দরকে সুসজ্জিত করতে সাহায্য করাই এখন হিন্দু বা মুসলমান সকল নাগরিকের পবিত্র কর্তব্য। সময় ও অগ্রগতি কখনও থেমে থাকে না, সর্বদা এগিয়ে চলে। তাই সময় ও প্রগতির সাথে তাল মিলিয়ে বিমানবন্দরের রানওয়ের দীর্ঘায়ণ অবিলম্বে সম্পন্ন করা হোক।

Leave a Reply

Your email address will not be published.