বিসর্জন কালে হড়পা বানে বিপর্যয়।গাফিলতির দায় কার?

অরুণ কুমার:

প্রতিমা বিসর্জন কালে রাজ্যের উত্তরের অন্যতম জলপাইগুড়ি জেলার মাল নদীতে হড়পা বানে বিপর্যয় এলে প্রশাসন কি গাফিলতির দায় এড়াতে পারে? এই প্রশ্ন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এদিকে জেলার সমগ্র ডুয়ার্স জুড়ে বিষাদে ভারাক্রান্ত বিজয়া। যা ছড়িয়ে পড়েছে সমগ্র উত্তরবঙ্গে।কোথাও যেন আর কোনও আনন্দের ছিঁটেফোঁটা‌ও নেই। বুধবার রাতে ভাসানের অনুষ্ঠানের সময়, মাল নদীতে হড়পা বানে মৃত এখনও পর্যন্ত আটজন। নিখোঁজের সংখ্যা ঠিক কত, প্রশাসনের কাছেও তার কোনও সঠিক হিসেব নেই। যারা বানে ভেসে গেছেন, তাদের‌ও চরম পরিণতিই হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। প্রশাসন মনে করছে এদের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা ক্ষীন।
রাজ্যের উত্তরে হিমালয় শানুদেশে অবস্থিত অন্যতম জেলা জলপাইগুড়ির এই মহকুমা শহর সংলগ্ন মাল
নদীতে বিসর্জন চলা কালীন মর্মান্তিক বিপর্যয়ের ঘটনায়
ইতিমধ্যেই প্রশাসনের দিকে গাফিলতির আঙুল উঠতে শুরু করেছে।
উল্লেখ করা যেতে পারে যে এই জেলার উপর দিয়ে প্রায় শতাধিক নদী ছোট বড় ঝোড়া ও নদী প্রবাহিত হয়েছে যার উৎস বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকাসহ জলাভূমি আর জঙ্গলমহল।
বিভিন্ন নদী বিশেষজ্ঞদের মতে, পাহাড় থেকে নেমে আসা ডুয়ার্সের নদীগুলি হড়পা বান প্রবণ। মাত্র দু সপ্তাহ আগে এই মাল নদীতে হড়পা বানে ভেসে গিয়েছিল আস্ত একটি ট্রাক। আবহাওয়া দপ্তর থেকেও সতর্ক বার্তা ছিল ভারী বৃষ্টিপাতের। সিকিম, দার্জিলিং পাহাড় এবং হিমালয় সংলগ্ন উত্তরবঙ্গে মাঝারি থেকে ভারী বর্ষণের পূর্বাভাস ছিল‌ই।প্রাক পূর্বাভাস থাকা সত্ত্বেও এবার বিসর্জনের আগে কেন সতর্কতা মূলক ব্যবস্থা নিল না প্রশাসন?
এই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
মালবাজার মহকুমা শহরের আশেপাশে চা বাগান ও অন্যান্য জায়গার দুর্গা পূজার প্রতিমা এই মাল শহর
সংলগ্ন মাল নদীতে প্রত্যেক বছর ৭০-৭৫ টি প্রতিমা নিরঞ্জন হয়। করোনা মহামারী পরবর্তী সময়ে এটাই ছিল উৎসাহ উদ্দীপনার মধ্যে দিয়ে বড় ধরনের প্রতিমা বিসর্জনের আয়োজন। স্বাভাবিকভাবেই বিসর্জনের অনুষ্ঠানে ভিড় ছিল যথেষ্টই। নদীর মাঝখানে মঞ্চ করা হয়েছিল। অসংখ্য মানুষ নদীর চড়ায় দাঁড়িয়ে বিসর্জন দেখছিলেন। অথচ ভিড় ও বিপর্যয় সামাল দেওয়ার মতো তেমন কোনও ব্যবস্থাই সেখানে ছিল না বলে অভিযোগ। রাত সাড়ে আটটা নাগাদ এই হড়পা বান নামে। তার আগে থেকেই মাল নদীতে জল বাড়ছিল। দুর্ঘটনার সময় বিসর্জনস্থলে মাত্র আটজন সিভিল ডিফেন্স কর্মী মোতায়েন ছিলেন। প্রশাসনের তরফে উপযুক্ত সরঞ্জাম ও লোকবল না থাকায় উদ্ধার কাজ শুরু করতে বিলম্ব হয় বলে স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ।

ডুয়ার্সের নদীতে হড়পা বান এই বিপর্যয়ের ফলে
ইতিমধ্যেই প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে আরম্ভ করেছে। অধিকাংশই প্রশ্ন তুলেছে নিরাপত্তা নিয়েও। ডুয়ার্সের নদীগুলিতে হড়পা বান আগেও এসেছে। এদিকে অভিযোগ, বিসর্জনের সময় নদীর ধারে সিভিল ডিফেন্সের মাত্র আটজন কর্মী ছিলেন। সঙ্গে তাঁদের শুধু দড়ি ছিল। আর কোনও কিছুই ছিল না। সিভিল ডিফেন্স
এক ভারপ্রাপ্ত আধিকারিক এ প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘আমাদের কাছে সিভিল ডিফেন্স ভলান্টিয়ার কম ছিল। ৮ জনকে পাঠানো হয় মাল মহকুমার জন্য।’
এমন পরিস্থিতিতে কিভাবে বিপর্যয় মোকাবিলা করা সম্ভব এই প্রশ্ন উঠেছে স্বাভাবিকভাবেই।

এদিকে আরো জানা গিয়েছে,মাল নদীতে বিসর্জনের
ব্যবস্থাপনায় যে গাফিলতি ছিল, সেই খবর
দ্রুততার সঙ্গে পৌঁছে যায় প্রধানমন্ত্রীর কানেও। মর্মান্তিক ঘটনার কিছুক্ষণ পরেই ট্যুইট করেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। প্রধানমন্ত্রী ট্যুইটারে লেখেন- ” পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়িতে প্রতিমা নিরঞ্জনের সময় দুর্ঘটনার জেরে আমি ক্ষুব্ধ। দুর্ঘটনায় যাঁরা প্রিয়জনদের হারিয়েছেন, তাঁদের প্রতি গভীর শোকপ্রকাশ করছি।” বৃহস্পতিবার সকালে আরও একটি ট্যুইট করে মাল নদীতে দুর্ঘটনায় নিহতদের পরিবার পিছু দুই লক্ষ টাকা এবং আহতদের চিকিৎসার খরচ বাবদ ৫০ হাজার করে টাকা দেওয়ার কথা ঘোষণা করেন প্রধানমন্ত্রী মোদী। অপরদিকে, মাল বাজারের ঘটনায় মৃতদের পরিবার ও আহতদের চিকিৎসায় আর্থিক সহায়তা প্রদানের কথা ঘোষণা করেছে রাজ্য সরকার‌ও। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ট্যুইট করে জানিয়েছেন, নিহতদের পরিবার পিছু দুই লক্ষ টাকা ও আহতদের ৫০ হাজার টাকা সাহায্য দেওয়া হবে।
সেইসঙ্গে এই ঘটনায় আর কেউ নিখোঁজ নেই বলে ট্যুইটারে ইতিমধ্যেই দাবি করে বসেছেন মুখ্যমন্ত্রী।
মুখ্যমন্ত্রী কীসের ভিত্তিতে এই দাবি করলেন, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে বিরোধীরা।

এদিকে মাল নদীতে বিসর্জনের সময় দুর্ঘটনার
পরিপ্রেক্ষিতে রাজনৈতিক তর্জ্জা ক্রমশঃ উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। জেলা প্রশাসনের চরম অদূরদর্শিতা ও দক্ষতার অভাব এই ঘটনার জন্য দায়ী বলে রাজ্যের প্রধান বিরোধী দল বিজেপি।উত্তরবঙ্গ থেকে নির্বাচিত সাংসদ ও কেন্দ্রীয় সরকারের সংখ্যালঘু কল্যাণ মন্ত্রকের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্র মন্ত্রী জন বার্লা এই অভিযোগ করে বলেছেন, নদীর গতিপথ পরিবর্তন করা হয়েছে অপরিকল্পিতভাবে এর পিছনে বালি মাফিয়াদের সুবিধা করে দেওয়ার একটা চক্র কাজ করছে বলে তিনি অভিযোগ করার পাশাপাশি আরো বলেছেন পর্যাপ্ত পুলিশি ও সিভিল ডিফেন্স এর ব্যবস্থা ছিল না যা কিনা অন্যান্য নেতাদের আগমনের ক্ষেত্রে ব্যবস্থা করা হয়ে থাকে এক্ষেত্রে যৎস সামান্য পুলিশী নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল বলে তিনি দাবি করেছেন। সেই সঙ্গে অপরএক বিজেপি বিধায়ক ডঃ শংকর ঘোষের মতে, সরকারের জেলা পুলিশ প্রশাসন সম্পূর্ণ অদক্ষতার পরিচয় দিয়েছে। যে পরিমাণ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন ছিল তা পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে নেওয়া হয়নি। পাশাপাশি দুর্ঘটনা মোকাবিলায় আরো সিভিল ডিফেন্স ও পর্যাপ্ত পুলিশি ব্যবস্থা ছিল না প্রতিমা নিরঞ্জনের সময়। এর উত্তরে রাজ্য সরকারের দুই মন্ত্রী উদয়ন গুহ ও বুলুচিক বড়াইক বিরোধীদের অভিযোগকে
খারিজ করে দিয়ে বলেছেন, কেন্দ্রীয় মন্ত্রী মৃত ব্যক্তিদের নিয়ে রাজনীতি করছেন। সরকার ও প্রশাসন তাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করে চলেছেন। বিজেপির অভিযোগ ঠিক নয়। নদীপথ পরিবর্তনের যে অভিযোগ তুলেছে বিজেপি সেই তত্ত্ব রাজ্য সরকারের মন্ত্রী খারিজ করে দিয়েছেন।
অর্থাৎ মাল বাজারের প্রতিমা বিসর্জন কে কেন্দ্র করে মৃত্যুর ঘটনা পরিপ্রেক্ষিতে রাজ্যের রাজনীতি আবার সরগরম হয়ে উঠতে আরম্ভ করেছে।
রাজ্যের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী এবং ওই দলের একটি সাত সদস্যের প্রতিনিধি দল শুক্রবার দিন ঘটনাস্থল পরিদর্শনের পাশাপাশি নিহত ও আহতদের পরিবারের সঙ্গে মিলিত হবেন বলে সূত্রের খবর।
পরিস্থিতি ক্রমশ উত্তপ্ত হয়ে উঠতে আরম্ভ করেছে রাজনৈতিকভাবে জেলা তথা রাজ্যের এমনটাই মনে করছে রাজনৈতিক ওয়াকিবহাল মহল।

এমতাবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে রাজ্য সরকার ও জলপাইগুড়িতে জেলা প্রশাসন বিসর্জন কার্নিভাল
কর্মসূচি বাতিল করার কথা ঘোষণা করেছে।
জেলা প্রশাসন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে ইতিমধ্যেই সর্বজনীন পুজো কমিটির উদ্যোক্তাদের বিষয়টি জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। বুধবার বিসর্জনের রাতে মাল নদীতে দুর্ঘটনায় আটজনের মৃত্যুর পর থেকেই জলপাইগুড়ি জেলা জুড়ে বিষাদের ছায়া। মানুষের মন থেকে উধাও উৎসবের আনন্দ। এই শোকাবহ পরিস্থিতিতে বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই কার্নিভাল বাতিলের দাবি ওঠে জেলার নাগরিক মহলে। সর্বজনীন ক্লাবগুলির তরফ থেকেও প্রশাসনের কাছে কার্নিভাল বাতিলের দাবি জানানো হয়। প্রথম দিকে কার্নিভাল নিয়ে যথেষ্ট‌ই অনমনীয় মনোভাব দেখায় প্রশাসন। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে কার্নিভাল হবে বলেও জানিয়ে দেন জেলার পুলিশ সুপার দেবর্ষি দত্ত।
জেলায় ভয়াবহ বিপর্যয়ে বহু পরিবারে উৎসবের আনন্দ ম্লান হয়ে যাওয়ার পরেও প্রশাসন কীভাবে জাঁকিয়ে কার্নিভাল করে- সামাজিক মাধ্যমে এই প্রশ্ন তুলতে শুরু করেন নেটিজেনরা। এরপরেও কার্নিভাল করলে মানুষের কাছে ভুল বার্তা যাবে- সম্ভবত এটা বুঝতে পেরেই আগের অবস্থান থেকে সরে আসে প্রশাসন। জেলাবাসীর ভাবাবেগের কথা মাথায় রেখেই যে কার্নিভালের কর্মসূচি রদ করার সিদ্ধান্ত ক্লাবগুলির কাছে প্রেরিত বার্তায় তা স্পষ্ট করে দিয়েছেন জেলা শাসক। জলপাইগুড়ির জেলা শাসক মৌমিতা গোদারা বসু বিকেলে সাংবাদিকদের জানান, “মানুষ যখন চাইছেন না, তখন এই রকম একটা অনুষ্ঠান করার কোন‌ও মানে হয় না। পুজো কার্নিভাল তাই বাতিল করা হল।”

মালবাজারের মাল নদীতে প্রতিমা বিসর্জন ঘাটে হরপা বানে শিশু সহ আট জনের মৃত্যুর ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে কার্নিভাল বাতিলের দাবিতে সরব হয়ে ওঠে নেটিজেন দুনিয়ার একটা বড় অংশ।এই ঘটনায় সমবেদনা জানিয়ে কার্নিভাল থেকে সরে আসার কথা জানিযে দেয় জলপাইগুড়ির একাধিক বড় দূর্গা পুজো কমিটি।
শোকের পরিবেশ বিরাজ করছে সমগ্র জেলা জুড়ে।
সোশ্যাল মিডিয়ায় এই মর্মান্তিক ঘটনায় নিহত এবং আহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে শুক্রবার জেলা প্রশাসন দ্বারা আয়োজিত কার্নিভালে অংশগ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত জানিয়েছে।
উল্লেখ করা যেতে পারি যে, বৃহস্পতিবার
জেলা শাসকের কার্যালয়ে শহরের দূর্গাপুজো কমিটিগুলোকে নিয়ে একটি বিশেষ বৈঠক ডাকা হয়েছিল ।যদিও তার আগেই জেলা তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তর এবং থানার পক্ষ থেকে ফোন করে পুজোর উদ্যোক্তাদের জানিয়ে দেওয়া হয়, মাল নদীতে মর্মান্তিক দুর্ঘটনার কারণে জলপাইগুড়ি শহরের কার্নিভাল বাতিল করার কথা।
এই প্রসঙ্গে জলপাইগুড়ি পুরসভার চেয়ারপার্সন
পাপিয়া পাল জানিয়েছেন, মালবাজারের মর্মান্তিক দুর্ঘটনার জন্য আগামীকাল ঘোষিত কার্নিভাল অনুষ্ঠান বাতিল করেছে প্রশাসন। অপরদিকে প্রশাসনের বিভিন্ন স্তর থেকে ফোন করে কার্নিভাল বাতিলের কথা সংশ্লিষ্ট পূজা কমিটি গুলিকেও জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।
উত্তরের পাহাড়ী নদীর হরপা বানের স্রোতে এতগুলো প্রাণ চলে যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশ ও প্রশাসন কি ব্যবস্থা গ্রহণ করে বিশেষ করে আগামী দিনে কালীপূজা ছট পূজার মতো প্রতিমা বিসর্জনের অনুষ্ঠানগুলি রয়েছে। সেটাই এখন দেখার বিষয়।সেই সঙ্গে দেখার বিষয় আরো যে, প্রতিমা বিসর্জন কালে বিপর্যয় এলে প্রশাসন কি গাফিলতির দায় এড়াতে পারে? এই প্রশ্নও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সরকারি সূত্রের খবর, দশমীতে প্রতিমা নিরঞ্জনের সময় মাল নদীতে হড়পা বানে এখনও পর্যন্ত মৃত্যু হয়েছে ৮ জনের। এই ঘটনার পরই নড়েচড়ে বসেছে নবান্ন। বিশেষ সতর্কতা নেওয়া হয়েছে রাজ্য সরকারের তরফে। বিসর্জনকে কেন্দ্র করে সমস্ত ঘাটগুলিতে বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা জারির নির্দেশ দিয়েছে প্রশাসন। কোনওরকম অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে প্রত্যেক জেলাশাসককে নির্দেশ দিয়েছেন মুখ্যসচিব। একাদশী, দ্বাদশী সহ এখনও তিনদিন প্রতিমা নিরঞ্জন চলবে প্রত্যেক জেলায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published.