রামকৃষ্ণ ও‌ দূর্গা পূজা

বাংলা ১২৭৭ সন। রানি রাসমণি তখন লোকান্তরিত। পরিবারের কর্তা হয়েছেন জামাতা মথুরমোহন বিশ্বাস। সর্বভাবের মূর্ত বিগ্রহ, এ যুগের অবতার ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণদেব স্বয়ং এসেছেন মথুরবাবুর জানবাজারের বাড়িতে শারদীয়া দুর্গাপুজো উপলক্ষে। সেবার ঠাকুরের উপস্থিতিতে মথুরবাবুর বাড়ি তখন আনন্দস্রোতে প্রবাহিত হয়ে আনন্দধামে পরিণত। তার ওপর মথুরমোহন শ্রীরামকৃষ্ণকে ইষ্ট জ্ঞান করে ‘বাবা’ বলে ডাকতেন। ঠাকুর আর মা সারদামণির প্রতি মথুরবাবু আর তাঁর ভক্তিমতী স্ত্রী জগদম্বাদেবীর শ্রদ্ধা, ভক্তি আর অনুরাগ গঙ্গোত্রী ও যমুনোত্রীর ধারার মতো স্বতঃ উৎসারিত। মথুরনাথের জীবনের ওপর শ্রীরামকৃষ্ণের প্রভাব অবিস্মরণীয়।
ঢাকঢোল, কাঁসি আর সানাই বাজিয়ে রানি নিবাসে শুরু হল দুর্গাপুজোর মহামহোৎসব। ভক্তজন প্রিয় ঠাকুর শ্রীপরমহংসদেবের দিব্য উপস্থিতিতে ঘটা করে শুরু হল সপ্তমী পুজো। মথুরের আননে ফোটে তখন আনন্দের আল্পনা। শ্রীরামকৃষ্ণের ভাবাবেশে শক্তিপুজোর এই প্রাণদীপ্ত মহিমায় গোটা জানবাজার সেদিন স্ফূর্ত ও দীপ্ত। অগণিত ভক্তের সমাবেশে মাতৃ অঙ্গন ভাবগাম্ভীর্যে পরিপূরিত। ঠাকুরের উপস্থিতির ফলে সেবার দুর্গতিহারিণী দেবীমূর্তি যেন বড় হাস্যময়ী, প্রাণময়ী ও আনন্দময়ী। শত শত পুণ্যার্থী সেদিন ভাসতে থাকেন এক অনাস্বাদিত উপলব্ধির অমৃত প্রবাহে। স্বামী সারদানন্দ ‘লীলাপ্রসঙ্গে’ লিখেছেন: ‘… প্রতিমা বাস্তবিকই জীবন্ত জ্যোতির্ময়ী হইয়া যেন হাসিতেছেন। আর ঐ প্রতিমাতে মা-র আবেশ ও ঠাকুরের দেবদুর্লভ শরীর-মনে মা-র আবেশ একত্র সম্মিলিত হওয়ায় পূজার দালানের বায়ুমণ্ডল কি একটা অনির্বচনীয়, অনির্দেশ্য সাত্ত্বিক ভাবপ্রকাশে পূর্ণ বলিয়া অতি জড়মনেরও অনুভূতি হইতেছে। দালান জম জম করিতেছে— উজ্জ্বল হইয়া উঠিয়াছে। আর বাটীর সর্বত্র যেন সেই অদ্ভুত প্রকাশে অপূর্ব শ্রীধারণ করিয়াছে।’
সপ্তমী পূজান্তে মথুরবাবু সস্ত্রীক পদ্ম, কুমুদ, জবা ও বিল্বপত্র দিয়ে মহামাতৃকা মহিষাসুরমর্দিনী ও ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের রাজীব চরণে বারবার পুষ্পাঞ্জলি নিবেদন করে ধন্য হলেন।
দিনের শেষে সন্ধ্যা এল। এবার মায়ের আরতির প্রস্তুতি। মথুরবাবুর দেওয়া সুন্দর গরদের চেলি মেয়েদের মতো করে পরে ঠাকুর বসে আছেন একেবারে অন্দরমহলে। জগন্মাতার সহচরী ভাবে উদ্দীপিত হয়ে দক্ষিণেশ্বরের পূজারী ঠাকুর নিজের পুরুষ শরীরের কথা আক্ষরিক বিস্মৃত হয়ে গেছেন। শ্রীরামকৃষ্ণের সুন্দর প্রশান্ত বদন মণ্ডল, অঙ্গনিঃসৃত অমানুষিক দিব্যপ্রভা, অরুণায়তলোচন, রক্তজবাবিনিন্দিত চরণ যুগল, প্রেমাবেশ ও সাত্ত্বিক বিকার যেই দর্শন করে কেউই আর চোখ ফিরিয়ে নিতে পারে না। সবাই অপার বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকেন। মা দুর্গার আরতি শুরু হয়েছে। মথুরবাবুর পত্নী জগদম্বাদেবী শ্রীরামকৃষ্ণকে রমণী বেশে নিয়ে এলেন পুজোমণ্ডপে। সেখানে ঠাকুর কিছুটা প্রকৃতস্থ হয়ে অন্যান্য মেয়ের সঙ্গে চামর ব্যজন করতে লাগলেন সহর্ষে। সে এক অপূর্ব দৃশ্য। ধূপ, দীপ, ধূনা প্রজ্বলিত হওয়ায় মাতৃমন্দির সৌরভে আমোদিত। সে আরতি দেখতে একদিকে পুরুষরা আর অন্যদিকে মেয়েরা ভক্তিভরে দণ্ডায়মান। হঠাৎ মথুরবাবুর চোখে পড়ল তাঁর স্ত্রীর পাশে দাঁড়িয়ে সুন্দর বস্ত্র পরিহিতা সালঙ্কারা এক অনিন্দ্যকান্তি মহিলা চামর দোলাচ্ছেন, কিন্তু বারবার সেই ভাবময়ীকে দেখেও তিনি চিনতে পারলেন না। আরতির পর মথুরবাবু অন্দরমহলে গিয়ে স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করলেন; ‘আরতির সময় তোমার পাশে দাঁড়িয়ে যে চামর দোলাচ্ছিলেন, তিনি কে?’ জগদম্বা হেসে বললেন: ‘তুমি চিনতে পারলে না? ‘বাবা’ ভাবাবস্থায় এভাবে চামর করছিলেন। মেয়েদের মতো কাপড় পরলে বাবাকে পুরুষ বলে চেনে কার সাধ্য?’
এভাবে উৎসব মুখরিত সপ্তমী, অষ্টমী ও নবমীর দিনগুলিও সার্থক হয়ে ওঠে শ্রীরামকৃষ্ণদেবের দিব্য উপস্থিতিতে। এবার বিজয়া দশমী। বিষাদের ছায়ার মধ্যে বিসর্জনের আয়োজন। সেবার দশমী খুব কম সময় থাকায় নির্দিষ্টকালে দশমীবিহিত পুজো শেষ করে সন্ধ্যার পর হবে দুর্গা প্রতিমা নিরঞ্জন। বিকেলে পুরোহিত মশাই মথুরবাবুর কাছে বলে পাঠালেন, মায়ের বিসর্জন যাত্রার আর দেরি নেই, বাবু যেন নীচে নেমে এসে দুর্গা-বন্দনা ও প্রণাম করে যান। একদিকে দশভুজার মহাপুজোর অনির্বচনীয় আনন্দ, অপরদিকে শ্রীরামকৃষ্ণদেবের কয়েক দিনের উপস্থিতিতে তাঁর সান্নিধ্য লাভ—এই অভাবনীয় আনন্দে বিহ্বল ও আত্মহারা মথুরমোহন সেদিন যে বিজয়ার বিসর্জন সে কথা অবলীলাক্রমে ভুলেই গিয়েছিলেন। পরে যখন বুঝে উঠলেন যে সেদিন বিজয়া দশমী, তখন নিরাশ আর মনোবেদনায় মুহ্যমান মথুরনাথ। তাই তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন মাকে আর বিসর্জন দিয়ে দুঃখ ডেকে আনবেন না। রাজামশাইয়ের দু’চোখ বেয়ে নামে অবিরত অশ্রুর ঢল।
এদিকে বিসর্জনের সময় পেরিয়ে যাচ্ছে দেখে পুরোহিত মশাই বারবার লোক পাঠিয়েও বিফল। তখন মথুরবাবু অসন্তুষ্টিভরা গলায় বলে উঠলেন, ‘আমি মাকে বিসর্জন কিছুতেই দিতে দেব না। যেমন পুজো হচ্ছে তেমনই পুজো চলবে। আমার অননুমোদনে কেউ যদি প্রতিমা বিসর্জন দেয়, তাহলে সাংঘাতিক বিপত্তি দেখা দেবে, খুনোখুনি পর্যন্ত হতে পারে।’ এই বার্তা গিয়ে পৌঁছাল দুর্গা দালানে। বাড়িতে সম্মানীয়রা তখন অনেকেই উপস্থিত ছিলেন, সবাই এসে গৃহকর্তাকে অনেক বোঝালেন। কিন্তু কাকস্য পরিবেদনা। মথুরবাবু নিজের সিদ্ধান্তে অটল থেকে বরং উল্টে বললেন, ‘কেন? আমি মা’র নিত্যপুজো করব। মা’র কৃপায় আমার যখন সে ক্ষমতা আছে, তাহলে বিসর্জনই বা দেব কেন?’ উপায়হীন হয়ে তখন মথুর-গৃহিণী জগদম্বাদেবী শ্রীরামকৃষ্ণের শরণাগত হলেন। ঠাকুর মথুরবাবুর কাছে গিয়ে দেখেন, চোখ লাল করে গম্ভীর মুখে উদাস হয়ে মথুরনাথ ঘরের ভেতর পায়চারি করছেন। শ্রীরামকৃষ্ণ মথুরের বুকে হাত বোলাতে বোলাতে বললেন: ‘ও এই তোমার ভয়। একথা কে বলল যে, মাকে ছেড়ে তোমাকে থাকতে হবে? আর বিসর্জন দিলেও তিনি বা যাবেন কোথায়? মা এই তিনদিন ঠাকুর দালানে বসে তোমার পুজো নিয়েছেন। আজ থেকে তোমার আরও কাছে থেকে সর্বদা হৃদয়ে বসে তোমার পুজো নেবেন।’ অবশেষে ঠাকুরের স্পর্শানুভূতি ও মধুমাখা কথায় মথুরবাবু দমিত হলেন। রাজি হলেন তিনি মাকে বিসর্জন দিতে।
এবার আসি ভক্তবর সুরেন্দ্রনাথ মিত্রের সিমুলিয়ার বাড়িতে দুর্গোৎসব প্রসঙ্গে। ১৮৮৫ সালের আশ্বিন মাস। ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণদেবের শরীর তখন খুবই খারাপ। চিকিৎসার জন্য ভক্তরা তাঁকে দক্ষিণেশ্বর থেকে উত্তর কলকাতার ‘শ্যামপুকুর বাটী’তে এনে রেখেছেন। বিখ্যাত চিকিৎসক মহেন্দ্রলাল সরকার ঠাকুরের চিকিৎসা ও সেবার সব দায়িত্ব নিয়েছেন। ক্রমে দেবীপক্ষে মহামায়ার আগমনগীতি দশ দিক ভরে তুলল। ঠাকুরের একান্ত ভক্ত সুরেন্দ্রনাথ মিত্রের বাড়িতে শুরু হল মহাসমারোহে এক ভাবগম্ভীর পরিবেশে দুর্গাপুজোর আয়োজন। সে সময় খবর এল, অসুস্থ শরীর নিয়ে ঠাকুর আসতে পারবেন না। ভীষণভাবে মুহ্যমান হলেন সুরেনবাবু। তবুও গুরুভ্রাতারা একত্রিত হয়ে সবাই মহানন্দে মুখর হলেন। এদিকে মহাষ্টমীর বিকালে অনেক ভক্ত এলেন শ্যামপুকুরে ঠাকুরের কাছে।
ডাঃ মহেন্দ্রলাল সরকারের আসার কিছুক্ষণ পর নরেন্দ্রনাথ (স্বামী বিবেকানন্দ) তাঁর সুরেলা কণ্ঠে গাইলেন ভক্তিসঙ্গীত। সবাই তখন আনন্দে বিহ্বল। রাত্রি সাড়ে সাতটা বাজতেই ডাক্তারবাবু যখন উঠে দাঁড়ালেন ঠাকুরের কাছ থেকে বিদায় নেওয়ার জন্য, ঠিক সেই সময় শ্রীরামকৃষ্ণ সহাস্যে উঠে দাঁড়িয়ে হঠাৎ আত্মহারা হয়ে গেলেন। সঙ্গে সঙ্গে চোখ দুটি মুদ্রিত করে, দু’হাত ঊর্ধ্বে তুলে তিনি হয়ে পড়লেন গভীরভাবে সমাধিস্থ। ভক্তবৃন্দের কেউ কেউ বলতে থাকলেন, ‘এই সময়টা সন্ধিপুজোর লগ্ন কিনা, তাই এই সন্ধিক্ষণে ঠাকুরের দিব্য ভাব।’ তাঁর শ্রীচরণে রাশি রাশি ফুল ঢেলে অঞ্জলি প্রদানে অনেকে ধন্য হলেন। প্রায় আধঘণ্টা পরে তিনি আবার ভাবাবেশ থেকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এলেন। ভাব তন্ময়তার সময় তিনি যা দেখেছিলেন সেই কথা ভক্তদের বললেন: ‘এখান হইতে সুরেন্দ্রের বাড়ি পর্যন্ত একটা জ্যোতির রাস্তা খুলিয়া গেল। দেখিলাম, তাহার ভক্তিতে প্রতিমায় মা’র আবেশ হইয়াছে। তৃতীয় নয়ন দিয়া জ্যোতি রশ্মি নির্গত হইতেছে। দালানের ভিতর দেবীর সম্মুখে দীপমালা জ্বালিয়ে দেওয়া হইয়াছে, আর উঠানে বসিয়া সুরেন্দ্র ব্যাকুল হৃদয়ে মা মা বলিয়া রোদন করিতেছে। তোমরা সকলে তাহার বাড়িতে এখনই যাও। তোমাদের দেখিলে তাহার প্রাণ শীতল হইবে।’ (শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণলীলা প্রসঙ্গ)।
শ্রীরামকৃষ্ণদেবের নির্দেশ মতো নরেন্দ্রনাথ ও অন্য ভক্তরা ঠাকুরকে প্রণাম করে সুরেন্দ্রবাবুর বাড়িতে গেলেন এবং তাঁকে জিজ্ঞাসা করে জানতে পারলেন, ভাব-সমাধির সময় ঠাকুরের দৃষ্ট ঘটনাগুলি একেবারেই বাস্তবিক ও যথার্থ। তাঁর ভক্ত বৎসল রূপটি এভাবে প্রকট হওয়ায় সকলে সেদিন বিস্ময়ে আনন্দে অভিভূত হয়ে গেলেন। সার্থক হল সুরেন্দ্রনাথের দুর্গোৎসব, ভক্ত-ভগবানের লীলা খেলায়।

 

  • চৈতন্যময় নন্দ

 

Leave a Reply

Your email address will not be published.