আসুন, আমরা ভালো হয়ে যাই! 

শিতাংশু গুহ, নিউইয়র্ক।।

আসুন, আমরা ভালো হয়ে যাই? পুরানো প্রবাদ আছে, ভালো হতে পয়সা লাগেনা। তবু কেউ ভালো হয়না। আশেপাশে লক্ষ্য করুন, সবাই আগের মতই আছে। করোনায় এত মানুষ মারা গেলো, মানুষ ভয় পেলো, ঘরে ঢুকে গেলো। আস্তে আস্তে সবকিছু ঠিক হচ্ছে, চোর-বদমাইশ আবার আগের মত যথাস্থানে ফেরত আসছে। মৃত্যু ভয় অনেকটা কেটে যাচ্ছে, মানুষ আবার অমানুষ হয়ে যাচ্ছে। করোনা কি আমাদের ভালো করেছে? কেউ কি ভালো হয়েছেন? 

রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন:, “সংসার কহিল, মোর নাহি কপটতা। জন্মমৃত্যু, সুখদু:খ, সবই স্পষ্ট কথা। আমি নিত্য কহিতেছি যথাসত্য বাণী, তুমি নিত্য লইতেছ মিথ্যা অর্থখানি।–(স্পষ্ট সত্য)। তিন দশক আগে যিনি ভালো ছিলেন, তিনি এখনো ভালই আছেন; যিনি বাটপার ছিলেন, তিনি এখনো তাই; যিনি জালিয়াত ছিলেন, তিনিও তা-ই আছেন? এজন্যেই হয়তো বলা হয়, ‘অভ্যাস যায়না মরলে—’। নিজের কথা ভাবুন, যেমন ছিলেন তেমনি আছেন, আগের থেকে কি একটুও ভালো হয়েছেন বা ভালো হতে চেষ্টা করেছেন? 

চেষ্টা ব্যতিত কিছুই হয়না, ভালো হতেও চেষ্টার দরকার। সামান্যই! ছোটবেলায় আমরা পড়েছি, ‘সকালে উঠিয়া আমি মনে মনে বলি, সারাদিন আমি যেন ভাল হয়ে চলি–’? সকালে ব্যস্ত থাকেন, অফিস, বাচ্চার স্কুল, কাজকর্ম, সময় কই? আচ্ছা, রাতে শোবার আগে কি কখনো ভেবেছেন, আজ কোন খারাপ কাজ করেছেন কিনা, বা কারো মাথায় বারি দিয়েছেন কিনা? অথবা কারো সাথে অযথা খারাপ আচরণ করেছেন?

ভাবছেন, আপনি ধার্মিক, ধর্মগ্রন্থ পড়ছেন, রীতিনীতি মানছেন, আপনি তো ভালোই? আসলে কি তাই, ধর্মগ্রন্থ পড়লেই কি ভালো মানুষ হওয়া যায়? ভালো হতে চেষ্টা করতে হয়। শ্রীগীতা বলেন, আত্মার উন্নতি সাধনই মানুষের কর্তব্য। কিভাবে তা সম্ভব? আমি ধার্মিক নই। আমি নাস্তিক নই। ধর্মপরায়ণও নই। আমি মানুষ। মানুষ তার আদি জানেনা, অন্ত  জানেনা, জানে শুধু মধ্যভাগ। সেই আদি-অন্তকে জানার ইচ্ছা মানুষকে ভালো রাখতে পারে বটে?  

ধর্মকর্ম মন্দ নয়, তবে যাঁরা এগুলো নাড়াচাড়া করেন তাঁরা খুব সুবিধার লোক তা হয়তো নয়! ধর্মস্থানে  ভালো মানুষ থাকার কথা, তা হয়তো নাই। সবাই খারাপ তা-ও নয়! মিডিয়ায় দেখলাম (১০ই মার্চ ২০২২), ঢাকার রমনা কালীমন্দির কমিটি নিয়ে গন্ডগোল। মন্দিরের সব মানুষ ভালো হলে তো গন্ডগোল থাকার কথা না? পেশোয়ারে এক মসজিদে বোমা হামলায় (৪ঠা মার্চ ২০২২) প্রায় ৭০জন মারা গেছেন। মসজিদের ভেতরে যারা ছিলেন তাঁরা ধার্মিক, হামলাকারীরাও ধর্মের জন্যেই এ হত্যাযজ্ঞ ঘটিয়েছে। তাই, ধার্মিক হলেও সবাই ভালো মানুষ নাও হতে পারেন। ধার্মিক ও ভালো মানুষ এক সূত্রে গ্রথিত নয়?

অধ্যক্ষ সাইদুর রহমান সুপরিচিত ছিলেন। ষাটের দশকে ছাত্র-আন্দোলনে জগন্নাথ কলেজের সুনাম ছিলো। সাইদুর রহমান ছিলেন প্রিন্সিপাল। তাঁর সম্পর্কে অনেক গল্প আছে। স্বাধীনতার পর তিনি ঢাকায় তেজগাঁও মহিলা কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন, তিনি অধ্যক্ষ। ১৯৭৮-র শেষ বা ১৯৭৯ সাল থেকে কিছুকাল তাঁর সাথে আমার কাজ করার সৌভাগ্য হয়েছিলো। তিনি ভালো মানুষ ছিলেন, মোটেও ধার্মিক ছিলেন না। তেজগাঁও রোডে তাঁর বাড়ীর নাম ছিলো ‘সংশয়’! সংশয় মানে, ওপরওয়ালা আছেন কিনা তাতে তাঁর সংশয় ছিলো। তিনি প্রায়শ: (আমায়) বলতেন: ‘মন্দির-মসজিদে পয়সা দিবি না’! হয়তো তাঁর ধারণা ছিলো, ঐসব জায়গায় ভাল মানুষ থাকেনা? অথচ মানুষ ধর্মস্থানেই বেশি পয়সা ঢালে। কারণ কি? পরকালের আশায়! পরকাল কি আছে? আর থাকলেই আপনি তথায় সুখে-শান্তিতে থাকবেন গ্যারান্টি কি? আপনি ধার্মিক? উহুঁ! 

বঙ্গবন্ধু বলেছেন, আমি মানুষ, আমি বাঙ্গালী, আমি মুসলমান। আগে মানুষ হ’ন। মানুষের মত দেখতে হলেও সবাই মানুষ নন! খুব ছোটবেলায় আমাদের জামান স্যার বলতেন, ‘মানুষ হতে হলে ‘মান’ ও ‘হুঁশ’ থাকতে হয়। আসলে ‘মনুষ্যত্ব’ থাকতে হয়। মনুষ্যত্ব বিহীন মানুষ আর পশুতে তেমন তফাৎ নেই। পশু মানে কুকুর, বনের রাজা সিংহ নহে? কাউকে সিংহ বললে তিনি খুশি হ’ন, আর শূয়র বললে রেগে যান? এক ভদ্রলোক এতটাই ভদ্র ছিলেন যে, কেউ কখনো তাঁর মুখে কোন ‘গালি’ শুনেননি। একবার তিনি একজনের প্রতি রাগে লাল হয়ে ‘শূয়োরের বাচ্চা’ গালি দিতে না পেরে ‘বাচ্চা-শূয়োর’ বলে গালি দেন্। 

ক্লাশে শিক্ষক এক ছাত্রকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘বাঘ ও রাখাল বালক’ গল্পটা পড়েছো? ছাত্র, ওই যে এক রাখাল বালক বাঘ এলো, বাঘ এলো বলে মিথ্যা চিৎকার করতো, চাষীরা তাঁর সাহায্যার্থে দৌড়ে এসে দেখতো রাখাল হাসছে? শিক্ষক: হ্যাঁ, এ গল্প থেকে আমরা কি শিক্ষা পাই? ছাত্র: এ গল্প থেকে আমরা শিক্ষা পাই যে, যতদিন তুমি মিথ্যা বলবে ততদিন মানুষ তোমার কথা শুনবে; যেদিন তুমি সত্য বলবে, সেদিন কেউ তোমার সাথে থাকবে না। পাঠক, সত্যি সত্যি যেদিন বাঘ এসেছিলো, রাখাল জীবন-মরণ চিৎকার করলেও কেউ এগিয়ে আসেনি বটে।

ছোটবেলায় পড়েছি, ‘সদা সত্য কথা বলিবে–’। আমরা কি তা বলি? আমাদের সমাজে এমন কিছু মানুষ আছেন, তাঁরা কারণে-অকারণে, প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে অনর্গল মিথ্যা কথা বলেন! লাভ কি? অভ্যাস? আমেরিকা বা উন্নত দেশে মিথ্যা না বললেও চলে, প্রয়োজন পড়েনা, হালাল রুজিতে ভাল থাকা যায়। সবাই তা করেনা। আমরা যখন বাংলাদেশ থেকে প্রবাসে পাড়ি জমাই তখন আমাদের ভালমন্দ, দোষগুন্ সবকিছু সাথে নিয়েই আসি। পক্ষান্তরে আমাদের দ্বিতীয় প্রজন্ম, যাঁরা এদেশে জন্ম বা খুব ছোট থেকে বড় হয়েছে, তাঁরা মিথ্যা বলেনা। আপনি হিন্দুর সমালোচনা করছেন বা কৃষ্ণাঙ্গকে ‘কালুয়া’ বলছেন, ওঁরা আপনাকে ‘রেসিষ্ট’ বলছে। অর্থাৎ এই সমাজ-ব্যবস্থা নাগরিককে মিথ্যা বলতে শেখায় না। কারণ সমাজটি কর্ম-ভিত্তিক। আমাদের সমাজ বা রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা মিথ্যা বলতে শেখায়, সৎ-ভাবে বেঁচে থাকার পথ দেখায় না। কারণ আমাদের সমাজ বহুলাংশে ধর্ম-ভিত্তিক।    

বাংলাদেশের সমাজ-ব্যবস্থায় সৎভাবে-সাধুভাবে বেঁচে থাকা দায়। আপনি ভালো থাকতে চাইলেও তা কঠিন। যাঁরা সৎ থাকার চেষ্টা করছেন, তাঁদের দুর্দশা সবার জানা। মিথ্যা না বললে, চুরি না করলে টেকা দায়? আগে আমাদের দেশে মানুষ মিথ্যা বলতো না পাপ হবে বলে, আর এখন সত্য বলেনা বিপদে পরার ভয়ে। এটাই বাস্তবতা। সত্য-মিথ্যার দ্ধন্দ্ব থাকবে। কথায় বলে ‘চোরের মা’র বড় গলা’। জিরাফ-র গলা অনেক লম্বা, এরমানে এই নয় যে, জিরাফের সন্তানেরা চোর! আমাদের ছেলেবেলায় চোর ধরার অনেক কাহিনী গল্পাকারে শুনেছি। চোর রচনা মুখস্ত করেছি। মনে আছে যে, বাজারে এক চোর ধরা পড়ার পর বেদম মার্ খায়। ভীড়ের মাঝে একটি বাচ্চা মেয়ে বাবা’র কাছে আবদার করে যে সে চোর দেখবে। ভীড় ঠেলে বাবা মেয়েকে চোরের কাছে নিয়ে গেলে মেয়েটি বলে উঠে, ‘চোর কই, এতো মানুষ’। চোরের স্বীকারোক্তি, ‘এত মার্ খাওয়ার পরও চোখে জল আসেনি, কিন্তু মেয়েটি’র ওই সামান্য কথায় দু’চোখ বেয়ে জল ঝরে অঝোরে’। চোরও যে মানুষ, এই শিক্ষা গল্পের শিক্ষণীয় হলেও বাংলাদেশে বড়বড় চোর দেখে মানুষের বুঝতে কোন অসুবিধা হয়না যে চোরগুলোও দেখতে মানুষের মতই।

Leave a Reply

Your email address will not be published.