‘সেম অঁন ইউ’ ইমরান খাঁন!

শিতাংশু গুহ, ৫ডিসেম্বর ২০২১, নিউইয়র্ক।।

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান এক টুইট বলেছেন, “শিয়ালকোটের ফ্যাক্টরীতে লোমহর্ষক আক্রমন এবং একজন শ্রীলঙ্কান ম্যানেজারকে জীবন্ত পুড়িয়ে মারার ঘটনা পাকিস্তানের জন্যে লজ্জাজনক। আমি নিজে এই ঘটনার তদন্ত তদারকি করছি, এবং অপরাধীরা আইনের সর্বোচ্চ সাজা পাবে তাতে কারো সংশয় থাকা অনুচিত”। তাঁকে উত্তর দিয়েছি, ‘এই নারকীয় ঘটনার পরও কি আপনি দাবি করতে পারেন যে, পাকিস্তান একটি সভ্য জাতি? শ্রীলঙ্কা মাত্র ক’দিন আগে পাকিস্তানকে কুঁড়ি হাজার কর্নিয়া (চোখ) দান করেছে, এরপরও আপনারা ‘চোখ থেকেও অন্ধ’, ধর্মান্ধতা আপনাদের অন্ধ করে রেখেছে। ‘সেম অঁন ইউ’’।

টুইটার একটি চমৎকার মাধ্যম, আপনি সাধারণ হয়েও রাজা-বাদশাদের কাছে আপনার বক্তব্য পেশ করতে পারেন। তাঁরা সেটি দেখেন কিনা তা ভিন্ন ব্যাপার। মাঝে-মধ্যেই আমি বাইডেন, মোদী, পিটিআই বা নিউইয়র্ক টাইমসকে টুইট করি, কেজানে, যদি ‘লাইগ্যা যায়’? আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা’র টুইট একাউন্ট খুঁজেছি, পাইনি? পেলে সংখ্যালঘু নির্যাতন নিয়ে তাঁর কাছেও লিখতাম। বাংলাদেশে যাঁরা ফেইসবুক নিয়ে আতঙ্কে থাকেন, কখন সেটি হ্যাক হয়ে ‘ইসলাম অবমাননার’ অভিযোগ উঠে, তাঁরা অপেক্ষাকৃত নিরাপদ ‘টুইটার’ ব্যবহার করতে পারেন। 

মিডিয়া জানায়: শিয়ালকোটে একটি ফ্যাক্টরী ম্যানেজার ছিলেন শ্রীলঙ্কার নাগরিক প্রিয়ান্থা কুমার। ফ্যাক্টরীর দেয়ালে কিছু আরবী লেখা পোষ্টার তিনি নিজ হাতে সরিয়ে দেন্, তিনি জানতেনও না পোষ্টারে কি লেখা আছে? পুলিশ পরে জানিয়েছে, পোষ্টারে কোরানের আয়াত ছিলো। এই অপরাধে ফ্যাক্টরীর শ্রমিকরাই তাঁকে পিটিয়ে মারে, পরে শ্রমিক-জনতা মিলে তাঁর শরীরে আগুন ধরিয়ে দেয়। ঘটনা এখনো পুরোপুরি পরিষ্কার নয়, তবে ধর্মান্ধ জনতার নির্মমতা আরো স্পষ্ট হয়, যখন তাঁরা সানন্দে আগুনের শিখার সাথে সেলফি তুলে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দিতে কুন্ঠা বোধ করেন না?

বাংলাদেশে কি এমন দুঃখজনক ঘটনা ঘটতে পারে, বা ইতিমধ্যে ঘটেনি? আমাদের প্রতিক্রিয়া তখন কি ছিলো? আমরা কি শুধু পাকিস্তানকে গালিগালাজ করে আমাদের দায়িত্ব শেষ করবো, নাকি এমন ঘটনা যেন না ঘটে এর প্রতিরোধে সচেষ্ট হবো? পাকিস্তানের পুলিশ বলেছে, তাঁরা ঠিক সময়ে ব্যবস্থা নিতে পারেনি, তাই প্রিয়ান্থা কুমারকে বাঁচানো যায়নি? আমাদের পুলিশও কিন্তু যথাযথ ব্যবস্থা নিতে পারে নাই বলেই অক্টবরে কুমিল্লায় দুর্গাপূজার সময় হিন্দুদের ওপর তান্ডব চলে, যা পরে অন্যত্র ছড়িয়ে পরে? রামু, নন্দীরহাট, সাতক্ষীরা, কুমিল্লা, রংপুর, নাসিরনগর সর্বত্র আমরা কি একই চিত্র দেখতে পাইনা? 

কুমিল্লার নানুয়ার দীঘিতে সেদিন লাইভ করা হয়েছিলো, সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস উৎসবে পরিণত হয়েছিলো? কারা তা করেছিলেন? শিয়ালকোটে শ্রীলঙ্কার প্রিয়ান্থা কুমার ‘ধর্মীয় অনুভূতিতে’ অজান্তে আঘাত দিয়ে মর্মান্তিকভাবে নিহত হয়েছেন। এই ‘অনুভূতি’-র আগুনে এ সময়ে বাংলাদেশ জ্বলছে, ইতিমধ্যে অনেকগুলো ঘটনা ঘটেছে। ২০০১-এ রাঙ্গুনিয়ার শীল বাড়িতে বাইরে থেকে দরজা আটকিয়ে শিশু-নববধূসহ ১১জনকে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয়েছিলো, বিচার কিন্তু আজো হয়নি, একমাত্র জীবিত স্বপন শীল বিচারের দাবিতে আজো দ্বারে-দ্বারে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। 
শিয়ালকোটের ঘটনায় পুলিশের ব্যর্থতা হয়তো শুধরানো সম্ভব, কিন্তু যেই মানুষগুলো ধর্মের নামে এই বর্বরতায় মেতে উঠলো, যাঁরা দাউ দাউ আগুনের সামনে দাঁড়িয়ে সেলফি তুললো, এদের শুধরানো কি আদৌ সম্ভব? এমত জঘন্য ঘটনার পর অপরাধবোধ না থাকার কারণেই তাঁরা সেলফি তুলতে পারে? ধর্মের নামে এই পৈচাশিক উল্লাস, মনুষ্যত্বের এমন বিপর্যয়, আর যাই হোক ধর্ম নয়! আর কতকাল এসব চলবে কে জানে? তবে এই ঘটনার পর শ্রীলঙ্কা-পাকিস্তান সম্পর্ক কনদিকে মোড় নেয় তা এখন দেখার বিষয়? Pic Courtesy: Khaleej Times

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *