বর্ধমানের “বিধান রায়” এর হাত ধরেই এসেছে “ডাক্তার পাড়া” র ভারত জোড়া নাম

আমিনুর রহমান, পূর্ব বর্ধমান

শুরু হয়েছিলো ৬০ এর দশকে। তখন বর্ধমানের “বিধান রায়”বলতে লোকে জানতেন ডা: শৈলেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় এর নাম। চিকিৎসার জন্য গুটিকয়েক ডাক্তার বাবু ছিলেন তখন শহর বর্ধমানে।আর শৈলেন ডাক্তার তাদের মধ্যে অন্যতম। শুধু মাত্র অন্যতম বললেই শেষ হবে না, একেবারে ধনন্তরী ও গরিব দরদী একজন চিকিৎসক ছিলেন।যিনি আজকের ডাক্তারদের মতো একটি রোগের বিশেষজ্ঞ নন, একসঙ্গে সমস্ত রোগের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক হিসাবে তার ক্ষ্যাতি ছিল।যার জন্য তার আলাদা পরিচয় ছিল বর্ধমানের বিধান রায়। গরিব রোগীদের কাছে তিনি ছিলেন সাক্ষাৎ ভগবান। চোখ,হাড়,হার্ট,পেটের রোগ, গাইনি,শল্য সবেতেই তিনি সিদ্ধহস্ত।তার বাড়ি ছিল শহরের খোসবাগানে।যার নাম আর বি ঘোষ রোড।যে খোসবাগান আজকে “ডাক্তার পাড়া” হিসাবে সারা ভারতে পরিচিতি পেয়েছে তার জন্য অবশ্যই শৈলেন ডাক্তার এর নাম আসবেই। শুধুমাত্র পশ্চিমবঙ্গ বা ভারতবর্ষ নয় এশিয়াতে একটি ছোট্ট এলাকায় এত বড়ো ধরনের চিকিৎসা পরিষেবা আর কোথাও নেই বলে জানা গেছে। এখানে একসাথে বহু চিকিৎসক,প্যাথলজি সেন্টার,নাসিং হোম, ওষুধের দোকান আর কোথাও মিলবে না। একমাত্র ইউরোপের একটি জায়য়াতে নাকি খোসবাগানের মতো একটি লেনে সব সুযোগ-সুবিধা মেলে।

যে সময়ের কথা বলা হচ্ছে তখন খোসবাগান এলাকায় হাতে গোনা কয়েকজন চিকিৎসক ছিলেন। ছিলো না এত বড়ো হাসপাতাল।এখন খোসবাগানের প্রায় পঞ্চাশ গজ দূরত্বের মধ্যে যে মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল সেটা তখন ছিল সাবডিভিশনাল হাসপাতাল।এখন অবশ্য ডাক্তার পাড়ার সঙ্গে বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সংযুক্তিটা ওতপ্রোতভাবে যুক্ত।যে হাসপাতালে খোসবাগানে আসা রোগীদের জন্য তো বটেই প্রায় ৬ টি জেলা এবং দুটি রাজ্যের রোগীদের চিকিৎসার একমাত্র ভরসা। জানা গেছে বড়ো হাসপাতাল গড়ে উঠার পেছনে তৎকালীন রাজ্যের মন্ত্রী ভোলানাথ সেন,প্রদীপ ভট্টাচার্য্য এর সহযোগিতা ছিল।আর ওই হাসপাতাল কে কেন্দ্র করেই খোসবাগানের সিং দরজা পর্যন্ত একটি লেনে বাড়তে থাকে নাম করা চিকিৎসক দের সংখ্যা। কিন্তু ১৯৭২ সালে জেলা হাসপাতাল হবার আগে গুটিকয়েক ডাক্তার বাবু এখানে বসতেন। তাদের মধ্যে মধ্যমণি ছিলেন বিধান রায় খ্যাত ডা: শৈলেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়। আরো স্বনাম ধন্য ডাক্তার বাবুদের মধ্যে ছিলেন কালীপদ ঘোষ,অরিন গুপ্ত,শক্তিপদ পবি,অরবিন্দ সেন, নিরঞ্জন সাহা সিকদার,রুদ্রনারায়ন ঘোষ সহ অনেকেই।ঠিক তারপরেই কিছু কিছু বিশেষজ্ঞ ডাক্তার বাবুরা খোসবাগানে আসতে শুরু করেন।তখন এমন হয় যে শহরের আশে পাশে বা জেলার অন্যত্র প্রসার ঘটানোর ক্ষেত্রে খোসবাগানের তকমাটা ডাক্তার বাবু দের খুবই প্রয়োজন হয়ে পড়ে। এভাবেই বাড়তে শুরু করে ডাক্তার বাবুদের সংখ্যা।আর তার সঙ্গে সঙ্গে চাহিদা অনুযায়ী ওষুধের দোকান,নাসিং হোম,প্যাথলজির সংখ্যাটাও বাড়তে থাকে। সেই সময়কার একটি মাত্র নাসিং হোম ছিল।যা ডাক্তার শৈলেন মুখার্জির।

মোটামুটিভাবে বলা যায় ৮০ এর দশকে খোসবাগানের ডাক্তারপাড়ার এলাকা থেকে জনবসতি কমতে থাকে।তার জায়গা করে নিয়েছে  চিকিৎসক দের চেম্বার,আর অনান্য স্বাস্হ্য পরিষেবার সেন্টার গুলি রয়েছে।আজ কয়েক শো সেন্টার আনাচে কানাচে। কলকাতা সহ দেশের বিভিন্ন রাজ্যের চিকিৎসক দের আনাগোনা অনেকটাই বেড়েছে বর্ধমানে।প্রায় শতাধিক নাসিং হোমে দিনরাত রোগীদের চিকিৎসা চলছে।২৪ ঘন্টা খোসবাগানে শুধু রোগী,ডাক্তার বাবু,অ্যম্বুলেন্স এসব ছাড়া অন্য কিছু চোখে পড়বে না। যুদ্ধকালীন তৎপরতায় চলছে সবকিছু। সব সময় বর্ধমান, বীরভূম, বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, নদীয়া, মুর্শিদাবাদ জেলার তো বটেই প্রতিবেশী ঝাড়খন্ড, বিহার এমনকি প্রতিবেশী বাংলাদেশ থেকেও রোগীদের আনা হয় খোসবাগানে।যতদিন যাচ্ছে নাসিং হোম গুলিতে ঝাঁ চকচকে পরিষেবা মিলছে। তবে নাসিং হোম গুলির বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ ও আছে।বর্তমানে চিকিৎসা পরিষেবা যত বেড়েছে ততই যেন সংকুচিত হয়ে গেছে খোসবাগান।গড়ে উঠেছে একাধিক ক্লিনিক।এক একটি ক্লিনিকে ১০ -১২জন করে ডাক্তার বাবু চিকিৎসা করেন।তাতেও চাহিদা পূরণ হচ্ছে না।আছে দালাল চক্র।ডায়গোনেস্টিক সেন্টার গুলি র বিরুদ্ধে বিস্তর অভিযোগ। তবুও খোসবাগান এখন বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকার মানুষের কাছে একমাত্র ভরসা।

Leave a Reply

Your email address will not be published.