কোভিড-১৯’র বিরুদ্ধে স্বীকৃতি বড়ুয়া’র যুদ্ধজয়

১০ এপ্রিল ২০২০, নিউইয়র্ক।। রীতিমত যুদ্ধ। এ যুদ্ধ কোভিড-১৯’র বিরুদ্ধে এক দম্পতি’র। তাঁদের পারস্পরিক ভালবাসা, সহমর্মিতা, প্রিয়জনের আঁকুতি এই জয়ের নেপথ্য। সহায়ক হচ্ছেন, ডাক্তার, সাথে সাহস ও ওষুধ। কাহিনী লম্বা, তবে উপকারী, অন্যকে পথ দেখাবে। সবচেয়ে বড়কথা, করোনা থেকে মুক্তি’র কিছুটা বাস্তব দিক-নির্দেশণা এতে আছে। ঘটনা নিউইয়র্কের এবং একজন পরিচিত মুখ, সংগ্রামী বন্ধু’র। নাম স্বীকৃতি বড়ুয়া। তিনি ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি’ নিউইয়র্ক চ্যাপ্টারের সাধারণ সম্পাদক। স্ত্রী লাভলী বড়ুয়া, পুত্র শ্রাবন। স্বামীস্ত্রী দু’জনই করোনায় আক্রান্ত হয়েছিলেন। স্বীকৃতি বড়ুয়া সংগ্রামী মানুষ, করোনার বিরুদ্ধে ফাইটে তাঁরা জয়ী হয়েছেন। এই দম্পতিকে অভিনন্দন।

স্বীকৃতি নিজেই লিখেছেন, ‘আমাদের বড় পরিবার, নিউইয়র্কের জ্যামাইকায় বসবাস। মার্চ মাসের একেবারে শুরু থেকেই করোনা পরিস্থিতিতে দু:শ্চিন্তায় পরে যাই। তদুপরি এক রিপোর্টে দেখি, আমার জিপকোডে ৮০% মানুষ করোনায় আক্রান্ত? পরিবারের সাথে পরামর্শ করলাম, ভাবলাম, নিউইয়র্ক ছেড়ে পালাই? না, সেই উপায় নাই! এভাবে মার্চ কেটে গেলো। ৩রা এপ্রিল শুক্রবার একটু একটু জ্বর বোধ করলাম। আগের শনিবার, অর্থাৎ ২৮ মার্চ ফ্লোরাল পার্কের ‘প্যাটেল ব্রাদার্স’-এ বাজার করি। সেখানে কাউকে ৬ফুট সামাজিক দায়িত্ব পালন করতে দেখিনি। আমি মানতে চেষ্টা করেছি। এর ৩/৪দিন আগে আমার ফ্ল্যাটের উল্টোদিকের বাসিন্দা এক স্প্যানিশ ক্লিনার’র সাথে বিল্ডিং সমস্যা নিয়ে অনেকক্ষন কথা হয়। এর ২/৩ দিন পর আমার চোখের এক কোন লাল হয়ে যায়। 

স্বীকৃতি বড়ুয়া বলছেন, ৩রা এপ্রিল রাতে জ্বর অনুভব করলে স্ত্রীকে জানালাম। মট্রিন খেয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম। পরদিন আবার জ্বর। দুর্বলতা। ভয় পেলাম। আবার মট্রিন খেলাম। রোববার, ৫ই এপ্রিল সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত প্রচন্ড মাথা ঘুরানো। দাঁড়াতে পারছিলাম না। রাতে অফিসকে জানালাম। ৬ই এপ্রিল সোমবার একই অবস্থা। সাথে নুতন উপসর্গ, ‘মাঝে মধ্যে ‘কাঁপুনি’। স্ত্রী গরম জল ও লেবু চা দিলো, তাই খেতে থাকলাম। ডাক্তারকে ফোন দিলাম, বললেন, এগুলো করোনা’র উপসর্গ। হাসপাতালের ফোন নাম্বার দিলেন, যাতে টেষ্ট করিয়ে নেই। লাভলী চাইলো না যে, আমি হাসপাতালে যাই। আমার দুই বেড রুমের বাসা। আমি এক রুমে নিজেকে কোয়ারিন্টিন করলাম। ৬ বছরের পুত্র ও স্ত্রী অন্যরুমে। সপ্তাহ খানেক আগে নিরাপত্তার কথা ভেবে মা-কে ভাই’র বাসা থেকে এনেছিলাম। ভাইকে কল দিলাম, ভাই এসে আবার নিরাপত্তার খাতিরেই মা-কে নিয়ে গেলো। 

স্বীকৃতির ভাষায়, অসুস্থতা বাড়তে থাকলো। রাতে পেটের নীচে, বুকে কেমন যেন অস্থির অস্থির লাগতো। জ্বর ও কাঁপুনি তো ছিলই। পত্নীর ঘুম নেই, মাঝে মাঝে ডেকে জিজ্ঞাসা করছে, কেমন আছি? ৭ই এপ্রিল মঙ্গলবার সকালে বিছানা থেকে উঠতেই পারছিলাম না। প্রচন্ড ক্লান্তি, অবসাদ, শক্তি পাচ্ছিলাম না। কোনরকমে উঠে হাতমুখ ধুয়ে ব্রেকফাস্ট খেতে চেষ্টা করলাম। খেতে ইচ্ছে করছিলো না, মুখে স্বাদ, গন্ধ পাচ্ছিলাম না। বমি বমি লাগছিলো। স্ত্রী’র পীড়াপীড়িতে তবু কিছু গিলতে হলো। স্ত্রী বললো, গরম জলের ‘ভাপ’ নিতে হবে। আমার হাত-পা অবশ হয়ে আসছিলো, চোখ বন্ধ হয়ে আসছিলো। আমি শুয়ে পড়লাম। স্ত্রী রান্নাঘরে, তাঁকে ডাকার শক্তি পাচ্ছিলাম না। ঘুম আসছিলো, হটাৎ মনে হলো, ঘুমিয়ে পড়লে বিপদ হতে পারে, তাই জোর করে উঠে বসলাম। আধশোয়া অবস্থায় মাথা কয়েকবার ঝাঁকুনি দিলাম। কোনরকমে উঠে বিছানার পাশে দাড়িয়ে হাত-পা নাড়াবার চেষ্টা করলাম। 

মনে প্রচণ্ড ভয় ঢুকে গেলো। লাভলীকে কিছু বললাম না, বললে আরো চিন্তিত হয়ে পরবে। আবার বসলাম, ছোট ভাইকে ই-মেইল করলাম। কিছু জরুরি ব্যক্তিগত বিষয় জানালাম। লিখলাম, আমি খুবই চিন্তিত, ভয় লাগছে, বাবাকে স্বপ্ন দেখেছি, যদি কিছু হয় এই ই-মেইলটি যেন সাথে রাখে এবং আমার স্ত্রী-পুত্রকে সাহায্য করে। এরপর থেকে দিনেও চোখ বন্ধ করতে ভয় লাগতো। নির্মূল কমিটি নিউইয়র্কের সভাপতি ফাহিম রেজা নূরকে জানালাম। বললাম আপাতত যেন কাউকে না জানায়, কারণ আমি চাই না সবাই জেনে ফেসবুকে ছবি দিয়ে একাকার করে ফেলুক। যোগাযোগ করলাম কবি হাসান আল আবদুল্লাহর  সাথে। তিনি মট্রিন না খেয়ে আমায় টাইলিনল খেতে পরামর্শ দিলেন। শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম করতে বললেন। ভাগ্যিস বাসায় টাইলেনল ছিল, ছয় ঘণ্টা পর পর টাইলেনল খাওয়া শুরু করলাম। বাসায় মিউসিনেক্স ছিল, ১২ঘন্টা পর পর তা খেতে শুরু করলাম যাতে রাতে কাশির সমস্যা না হয়। 

“নিজেকে ফেসবুক থেকে গুটিয়ে নিলাম, কারণ ফেইসবুকে এত মৃত্যুর, এত শোক, এত হতাশার সংবাদ আর নিতে পারছিলাম না। কোভিড-১৯ থেকে কত শতাংশ মানুষ সুস্থ হচ্ছে তা জানতে মিডিয়া ঘাটলাম, তেমন তথ্য পেলাম না? শেষে সংবাদ পড়া বা দেখা থেকেও নিজেকে গুটিয়ে নিলাম। এভাবে প্রথম সপ্তাহ কাটলো। রাতে ভালো ঘুম হয়না। ঘামে কাপড় ভিজে যায়। প্রতি রাতে ২/৩ বার কাপড় পাল্টাতে হয়। ঘরে ৭৬ ডিগ্রি তাপমাত্রা, আমার শীত আর যায় না। পেটে, তলপেটে, বুকে প্রতিনিয়ত কিছু একটা হচ্ছে বলে অনুভব করছিলম্। মাঝে মধ্যে অজানা আশঙ্কায় হৃদয় কেঁপে উঠছিলো। ডাইরিয়ার সমস্যা হচ্ছিলো। জলের সাথে সামান্য এপেল সাইডার ভিনেগার মিশিয়ে খেলাম, তাতে ‘লুজ মোশান’ কমলো। তবু সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত বিছানা থেকে ওঠার শক্তি ছিলোনা। আমার স্ত্রী গরম জল, চা, সুপ, খাবার, একটার পর একটা আনছে, আমি খেতে পারছিলাম না, গিলতে পারছিলাম না, স্বাদ নেই, বমি আসে, গলা ব্যাথা”।

স্বীকৃতি বড়ুয়া লিখেছেন, সারাদিন মনে মনে প্রার্থনা করছি। আমি ও আমার স্ত্রী’র ফোনে দিনরাত ধর্মীয় প্রার্থনা হচ্ছিলো। ফাহিম রেজা নূর টেক্সট করে জানালেন, এই রোগের প্রধান ঔষুধ মনে সাহস রাখা, ইতিবাচক চিন্তা করা। আমি তাই করার চেষ্টা করি, কিন্তু শরীর মানে না। কবি হাসান আল আবদুল্লাহ ঘনঘন খোঁজখবর নিচ্ছেন। বুধবার, ৮এপ্রিল তিনি আমায় বললেন, আমার হয়তো এন্টিবায়টিক লাগবে। আমি আমার ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করতে পারছিলাম না। রাতে তিনি ডাক্তার বর্ণালি হাসানের অফিসের সাথে যোগাযোগ করিয়ে দিলেন। পরদিন ডাক্তার বর্ণালি হাসান আমায় ভিটামিন-সি ও ডি; কাশির সিরাপ, গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ দিলেন এবং প্রেসক্রিপশন সিভিএস-এ পাঠিয়ে দিলেন। এন্টিবায়োটিক দিলেন না, কারণ আমার জ্বর ১০০’র সামান্য বেশি। 

“সিভিএস-এ বার বার ফোন দিচ্ছি, কেউ ধরছেন না? ওদের ওয়েবসাইটে আমার প্রেসক্রিপশন দেখলাম না? এদিকে আমার মা, ভাই, বোন সবাই চিন্তিত। সবাই প্রার্থনা করছে, ফোন দিচ্ছে, খবর নিচ্ছে। বাংলাদেশ থেকে আমার স্ত্রী’র পরিবার প্রতিদিন ফোন দিচ্ছেন। কখনো কখনো ফোন উঠাতে পারছিলম্ না, কথা বলার শক্তি ছিলো না। আমার স্ত্রী নীরবে কান্না করছে। ছেলে বারবার বাবার কাছে আসতে চাচ্ছে, সোহাগ চাইছে, খেলতে চাইছে, কিন্তু সেটা সম্ভব ছিলোনা। করোনা এমন এক অসুখ যা প্রিয়জনকে দূরে সরিয়ে দেয়। আমি সাধ্যমত চেষ্টা করছি গরম জল খাওয়ার; ভাপ নেবার; শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম করার। এরমধ্যে এক ডাক্তারের ভিডিও দেখলাম, তিনি দুই হাত মুষ্টি করে পুরো বুকে আস্তে আস্তে আঘাত দিচ্ছেন, আমিও তা করলাম। এটি হার্ট ও ফুসফুসে রক্ত চলাচলে সহায়তা করে। কিছুক্ষন করার পর অনুভব করলাম, বুকে রক্ত সঞ্চালন হচ্ছে”। 

উৎকণ্ঠা, স্বামীর জন্যে ভাবনা, রাত জাগা, এবং সর্বক্ষণ খাটুনির পর আমার স্ত্রী’র শরীর কাহিল, মুখে ক্লান্তি ও চিন্তার ছাপ, তবু মনের জোরে একবার স্বামীকে, আর একবার সন্তানকে সামলাচ্ছে। আমি নিজের মনে সাহস আনার চেষ্টা করলাম, শরীর সায় দিচ্ছিলো না, তবুও স্ত্রীকে বললাম আমাদের ছেলে ছোট, এই যুদ্ধে জিততেই হবে। অন্য কোন অপশন নেই। এদিকে সিবিএস’র ওষুধের কোন খবর পাচ্ছিলাম না। বাসায় থাকা টাইলিনল, মিউসিনেক্স, আর আমার ভাই’র দেয়া ভিটামিন-সি খেয়ে যাচ্ছিলাম। সামাজিক মাধ্যমে আমার নিষ্ক্রিয়তায় অনেকে চিন্তিত হয়ে পড়েন, তাঁরা ফোন ও টেক্সট মেসেজ পাঠাতে থাকেন। বিশেষ করে নিউইয়র্ক ষ্টেট আওয়ামী লীগের সভাপতি মুজিবুর রহমান মিয়াঁ ও সাধারণ সম্পাদক শাহিন আজমল অনেকবার ফোন দিয়েছেন। ধরিনি, উপায় ছিলোনা। করোনা আক্রান্ত পরিচিত ক’জনের সাথে আলাপ করলাম, তারা যা যা করছেন, আমি কি কি করছি, তা আদান-প্রদান হলো, তাদের সাহস দিলাম, তারা আমায় সাহস দিলেন।  

স্বীকৃতি বলছেন, তবু আমার শরীর ভালো হচ্ছিলো না, বরং অবস্থা খারাপ। ১৪দিনের কথা শুনেছিলাম, দিন গুনছিলাম কবে তা পার হবে! সবে মাত্র এক সপ্তাহ, ১৪ দিন বহুৎ দূর। লংআইল্যান্ডের আমাদের এক পূজনীয় বৌদ্ধভিক্ষু গরম জলের ‘ভাপ’ নেয়ার একটি ভিডিও পাঠালেন। সেই অনুযায়ী জলে আদা, লেবু, রসুন দিয়ে সিদ্ধ করে, সরিষার তেল দিয়ে সেই ভাপ নিতে থাকলাম। এতে নাকে ও গলায় ভালো অনুভব করলাম, দিনে ৩/৪ বার করলাম। বিপদের মধ্যে আবার বিপদ, ১২ এপ্রিল রবিবার, ছেলের গায়ে জ্বর। সারাদিন খেলাধুলা করা ছেলে ঘরে শুয়ে আছে। চিন্তা বেড়ে গেলো। সন্তানের মা ঘাবড়ে গেল। ছেলের ডাক্তারকে ফোন দিলাম, তাঁর এসিট্যান্ট জানালেন, ডাক্তার কোভিড-১৯ আক্রান্ত, কোয়ারিন্টিনে, তবে ভালোর দিকে। প্রেসক্রিপশন পাঠিয়ে দিলেন। ছোট ভাই দীর্ঘ লাইনে দাড়িয়ে ওষুধ এনে দিলো। তাঁকে নিষেধ করা হয়েছিলো বিল্ডিংয়ে না ঢুকতে, কারণ আমাদের ভবনে বেশ ক’জন আক্রান্ত। ৭তলা থেকে হালকা সুতা/দড়ি ফেললাম, ভাই ওষুধের প্যাকেট তাতে বেঁধে দিলো, আমরা টেনে উপরে তুললাম। ওষুধ তিতা, ছেলে খেতে পারছিলো না, বমি করে দিচ্ছিলো। ডাক্তারের সহকারীকে টেক্সট করলাম, জানালাম, মধু দিয়েও ওষুধ খাওয়ানো যাচ্ছে না। তিনি চিলড্রেন টাইলিনল খাওয়ার পরামর্শ দিলেন। আমার আরেক ভাই তাঁর বাসা থেকে চিলড্রেন টাইলিনল এনে দিল, একই  ভাবে রশি টেনে উপরে উঠালাম। 

সন্ধ্যায় ফাহিম রেজা নূরকে ফোন দিলাম, বললাম, আর পারছি না, তিনি যেন কোন ডাক্তারকে বলে আমার জন্যে এন্টিবায়োটিকের ব্যবস্থা করেন। তিনি পেনসিলভানিয়ার ডাক্তার জিয়াউদ্দিন আহমেদ’র সাথে  যোগাযোগ করেন। একটু পরে ডাক্তার জিয়াউদ্দিনের ফোন পেলাম। প্রচুর পানি খেতে বললেন, মনে সাহস রাখার পরামর্শ দিলেন, আশ্বাস দিলেন, যেহেতু শ্বাস-প্রশ্বাসের সমস্য নেই, তাই কিছুদিন ভোগার পর ভালো হয়ে যাবেন। সব শুনে বললেন, যেহেতু আমাদের একটি বাথরুম, তাই সেটি ব্যবহারের পর যেন ঢাকনি দিয়ে ফ্ল্যাশ করি, কারণ চর্ম চোখে দেখা না গেলেও ফ্ল্যাশ করার সময় ভাইরাসযুক্ত পানি উড়তে পারে। তিনি বাথরুম ব্যবহারের পর ক্লোরক্সযুক্ত পানি দিয়ে যেন টয়লেট সিট, সিঙ্ক মুছে ফেলি। বাথরুম জানালা না থাকায় সর্বদা যেন ভেন্ট খুলে রাখি। তিনি আরো অনেক পরামর্শ দিলেন। মনে সাহস পেলাম। 

রাতে আবার কবি হাসান আব্দুল্লাহ ডাক্তার বর্ণালী হাসান’র স্বামীর সাথে যোগাযোগ করিয়ে দিলেন। তিনি সবকিছু শুনে জানালেন যে, এন্টিবায়োটিক দেওয়া হয়েছে। বললাম, সিবিএস নয়, এস্টেট ফার্মেসীতে দিন। তাঁরা তাই করলেন। সোমবার ১৩ এপ্রিল, দিন গুনছি ১৪দিন কবে পার হবে, এক একটি দিন যেন পাঁচ দিনের মত  লম্বা মনে হচ্ছে। ছেলের জ্বর আসে, যায়।  এস্টেট ফার্মেসীতে ফোন করি, কেউ ধরেনা। বাইরে বেরুনো নিরাপদ নয়, তবু অনিচ্ছাসত্বে ছোট ভাইকে ফোন করে বললাম, আমার এন্টিবায়োটিক এনে দিতে। লম্বা লাইন শেষে ফার্মেসী জানালো, আমার ইন্সুরেন্স আপডেট নেই, কার্ডের ছবি তুলে পাঠালাম। ফার্মেসী পরদিন যেতে বললো। ইতিমধ্যে খবর পেলাম, শ্রদ্ধেয় মুক্তিযোদ্ধা মনির হোসেন, যিনি আমার বিল্ডিংয়ে থাকেন, তাঁর স্ত্রী করোনা যুদ্ধে এলআইজে হাসপাতালে মারা গেছেন। আমি ও আমার স্ত্রী খুব দু:খ পেলাম। মাত্র সেদিনও তিনি আমাদের পিঠা বানিয়ে খাইয়েছেন। অথচ আমরা তাঁর এপার্টমেন্টেও যেতে পারছিনা। 

ভাবীর মৃত্যু সংবাদ শুনে শাহিন আজমল ফোন করলেন, ফোন ধরলাম, লাইনে মুজিবুর রহমান মিয়াঁ ছিলেন, আমার কথা বলার শক্তি ছিলো না। তাঁরাও আমার গলার স্বর শুনে তা বুঝলেন। আমার স্ত্রী পরামর্শ দিলেন বৌদ্ধ ভিক্ষুকে যেন বলি প্রতিদিন সন্ধ্যায় একটু ভিডিও’র মাধ্যমে প্রার্থনা করতে। আমি কল দিলাম, ভান্তে সানন্দে রাজি হলেন, এবং এরপর থেকে তাই হতো। মঙ্গলবার ১৪ এপ্রিল অন্য ভাইকে এস্টেট ফার্মেসিতে পাঠালাম, দীর্ঘক্ষন লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে তিনি চাকরিতে চলে গেলেন। আবার ছোট ভাইকে পাঠালাম। এস্টেট ফার্মেসী জানালো, ‘নো প্রেসক্রিপশন’। তড়িঘড়ি সিভিএস ওয়েবসাইটে দেখলাম, আমার এন্টিবায়োটিক আছে। অনলাইনে পে-করে, ছবি তুলে ভাইকে অর্ডার নম্বর পাঠিয়ে দিলাম। ভাই আবার সিভিএস-এ গেল। অনেকেক্ষন লাইনে দাড়িয়ে থাকার পর তাঁরা আমার অর্ডার খুঁজে পেলোনা।  

অবাক কান্ড। ফার্মেসী আবার কিছুক্ষণ পরে ফোন দিয়ে জানালো যে, তাঁরা নতুন অর্ডার বানিয়ে দিচ্ছে। পরিশেষে এন্টিবায়োটিক ‘ইরেথ্রোমাইসিন’ পেলাম। সাথে সাথে খাওয়া শুরু করলাম। বিকালে আবার শরীর খারাপ করতে শুরু করে, হাত-পা কাঁপছিলো, মাথার পেছনটা অবশ হয়ে আসছিলো, প্রচন্ড ঘাম হচ্ছিলো। বিছানা ছেড়ে চেয়ারে বসলাম। স্ত্রীকে ডাকলাম। তিনি এলেন, কথা শুনে কান্নাকাটি শুরু করে দিলো। বললাম, আর পারছিনা, মনে হয় এম্বুলেন্স ডাকতে হবে। তিনি রাজি হলেন না। স্ত্রী তোয়ালে ভিজিয়ে আনল, আমি ভিজা তোয়ালে দিয়ে মাথা মুখ মুছতে লাগলাম। স্ত্রী মধু মিশ্রিত গরম জল নিয়ে এলো, খেলাম। একটু পর ধীরলয়ে স্বাভাবিক হলাম, অন্য উপসর্গ চলে গেলো, তবে প্রচণ্ড ক্লান্তি লাগছিলো। নিউজার্সি থেকে ড. নুরুন নবী ফোন দিলেন আমার খোজ খবর নিতে। তিনি জানতেন না আমি অসুস্থ। তাকে সব জানালাম। শুনে অবাক হলেন, এবং তাঁর ছেলের অভিজ্ঞতার আলোকে বেশকিছু পরামর্শ দিলেন (তার ছেলের কোভিড হয়েছিলো)। এরপর থেকে কবি হাসান আবদুল্লাহ, ফাহিম রেজা নূর, শাহীন আজমল নিয়মিত খোঁজখবর নিয়েছেন। 

আমি প্রতিদিন ৩বার টাইলিনল, ১বার এন্টিবায়োটিক, ২বার ভিটামিন সি, ও ডি, মাঝেমাঝে কফ সিরাপ খেয়ে চলেছি। এত ওষুধ আমি জীবনে খাইনি। মনে হচ্ছিলো, শরীর নামক যন্ত্রটি’র বারোটা বেজে গেছে। কিছু খেলেই গ্যাস হচ্ছে, বুকে চাপ অনুভব করছিলাম, গ্যাস্ট্রিক আমার আগে ছিলোনা। মা গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ পাঠিয়েছেন, সেটাও খাচ্ছি। মাঝেমধ্যে পানিমিশ্রিত আপেল সাইডার ভিনেগার। এভাবে দিন কাটছিলো। দুর্বলতার কারণে সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত বিছানায়, মাঝে মাঝে উঠে হাটার চেষ্টা। দুপুরের পর একটু ভালো অনুভব করতাম। মনকে ভালো করার জন্য ম্যুভি দেখা শুরু করি। পুরনো দিনের সাদা কালো ম্যুভি, ‘চকোরী’, ‘মুখ ও মুখোশ‘, ‘আসিয়া’ দেখলাম। খবর পেয়ে সুব্রত বিশ্বাস কল দেন। ১৮ই এপ্রিল শনিবার, এন্টিবায়োটিক ডোজ শেষ, মন বলছে কাল থেকে ভালো অনুভব করব। কিন্তু আমার স্ত্রী’র অসুস্থ লাগছে, গায়ে জ্বর জ্বর, মেপে দেখলাম  ১০০-এর কাছা কাছি, সকাল থেকে তার খুব দুর্বল লাগছে, গলা ব্যাথা, আবার দুচ্ছিন্তায় পরে গেলাম। 

লাভলীর চেহারায় দুর্বলতার ছাপ। আমি যা করেছি, তাকে সব করতে বললাম। গরম পানির ভাপ, লবণ পানির গরগরা, টাইলিনল, ভিটামিন, সব দেয়া শুরু হলো। অসুস্থ হলেও মহিলাদের ঘরের সব কাজ করতে হয়, তিনি তাই করলেন, স্বামীপুত্রকে দেখাশোনা করলেন। দুপুরে শুনি আমার সাথে যে স্প্যানিশ লোকটি কথা বলেছিলো, তিনি হাসপাতালে, এবং মারা গেছেন। মনটা ভেঙ্গে গেলো, খবরটি আমার স্ত্রীকে জানাইনি। সন্ধ্যায় লোকটি’র স্ত্রী আমার দরজায় টোকা দিয়ে তার স্বামীর মৃত্যু-সংবাদ জানালো, দরজা না খুলেই তাঁর প্রতি সমবেদনা জানাই। আমার স্ত্রী জেনে গেলো, সারারাত লাভলী দু;শ্চিন্তায় ঘুমাতে পারলোনা। রোববার ১৯ এপ্রিল, দুর্বলতা কম, তবে ডাইরিয়ার সমস্যা হচ্ছে। আমার স্ত্রী খুব অসুস্থ হয়ে পড়ছে, কথা বলতে পারছেনা। তবু সকালে ব্রেকফাস্ট বানালো। জানালো, তাঁর খুব খারাপ লাগছে। তাঁকে সাহস দিলাম, বললাম, তাঁর সেবায় আমি ভালো হচ্ছি, তিনিও ভালো হয়ে যাবেন। একঘন্টা পরপর তাকে গরম জলের ভাপ আর গার্গলিং করতে বললাম। ডাক্তার বর্ণালী হাসানের সাথে যোগাযোগ করলে তিনি একই ওষুধ ফার্মেসীতে পাঠালেন, আমার বিল্ডিংয়ের সুপার ওষুধ এনে দিলেন। এবার আর তেমন অসুবিধা হয়নি। আমার মতই তাঁর এন্টিবায়োটিক ও অন্যান্য ওষুধ চলতে থাকলো। 

২০ এপ্রিল সোমবার, সকালে ঘুম থেকে উঠে পেট মোচড় দিয়ে বাথরুম এলো, বাথরুম শেষে মনে হলো, সকল করোনা বেরিয়ে গেছে। আমি মুক্ত। সারাদিন ভাল অনুভব করলাম। শুনলাম আমার মেজ বোন অসুস্থ হয়ে পরেছে, তিনি বয়সে আমার অনেক বড়। চিন্তায় পড়লাম, তাকে ফোন দিলাম। তার জ্বর,  সাথে অনেক কাশি। বললাম, কাশি কমাতে হবে। তাঁকে এন্টিবায়টিক ও আমার চিকিৎসা ব্যবস্থার কথা জানালাম। বুধবার, ২২ এপ্রিল, আমি ভালো। যাঁরা আমার খোঁজখবর নিয়েছেন, তাঁদের ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানালাম।  ২৪এপ্রিল শুক্রবার, আমার স্ত্রী’র  এন্টিবায়োটিক শেষ। ইতিমধ্যে তার গলা ব্যাথা কমেছে, তবে দুর্বল। আশ্বস্থ করলাম, তিনি ভালো হচ্ছেন। ২৭ এপ্রিল সোমবার, আমরা দু’জনেই ভালো, দুর্বলতা, মাঝেমধ্যে মাথা ঘুরানো আছে। ছেলে ভালো আছে। ভাবলাম, এবারকার মত বেঁচে গেছি। কিন্তু কমিউনিটি’র অনেকের দু:সংবাদ শুনে খারাপ লাগলো। অনেকেই আমার মত সৌভাগবান ছিলেন না, তাদের প্রতি সমবেদনা রইলো।  

(স্বীকৃতিবড়ুয়া নিজেই তাঁর করোনা বিজয়ের কথা, কষ্টের কথা, ব্যাথার কথা লিখেছেন। তাঁর সংগ্রামের কাহিনী ছাপা হয়েছে, সাপ্তাহিক বাঙ্গালীর ইন্টারনেট সংস্করণে, যদিও আমার দেখা সুযোগ হয়নি। আমার অনুরোধে স্বীকৃতি আমাকে তাঁর লেখাটা দিয়েছেন। আমি আমার মত করে তা সাজাতে চেষ্টা করেছি। এই আলেখ্যে সব কথা স্বীকৃতি বড়ুয়ার, আমি সামান্য এদিক-ওদিক করেছি মাত্র। এই দম্পতি’র জীবনমরণ সংগ্রামে আসুন আমরাও সাথী হই, তাদের জানাই ‘স্যালুট’।) guhasb@gmail.com;

কোভিড-১৯’র বিরুদ্ধে স্বীকৃতি বড়ুয়া’র যুদ্ধজয় 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *