রমনা কালীবাড়ির রক্তমাখা ভয়ঙ্কর ইতিহাস – ১

শিতাংশু গুহ, নিউইয়র্ক।। 

১৯৭১ সালের  ২৭ শে মার্চ। পাকিস্তান সেনাবাহিনী সেদিন ঢাকার বিখ্যাত রমনা কালীবাড়িটি ধ্বংস করেছিলো। নিহত হয়েছিলো শ’খানেক। সেই দু:খজনক ঘটনা আজ বিস্মৃতপ্রায়, অথচ কয়েকশ’ বছর পুরানো এই মন্দিরের সাথে ঢাকার ইতিহাস জড়িত। রমনা কালী মন্দিরের সুউচ্চ চূড়া বা মঠ ছিলো একটি মাইলষ্টোন। বহুদূর থেকে মঠটি দৃশ্যমান ছিলো, মঠ দেখেই বোঝা যেতো ওটি রমনা কালীবাড়ি। সেই মঠও নেই, নেই সেই ঐতিহ্যবাহী কালী মন্দির এখন যেটি আছে, তা ভগ্নাবশেষ! রমনার পাদদেশে রেসকোর্স ময়দান এখন সোহরাওয়ার্দী উদ্যান। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী’র নামানুসারে এই উদ্যান, যিনি বাংলাদেশে ‘গণতন্ত্রের মানসপুত্র’, অথচ যার হাত ‘দি গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং’-এর রক্তে রঞ্জিত।

ঠিক একই জায়গায় না হলেও রমনা কালী মন্দির ও মা আনন্দময়ী আশ্রম ক্ষুদ্র পরিসরে এখন রমনায় দাঁড়িয়ে আছে।  যেটুকু দাঁড়িয়ে আছে, তা মূলত: অনেকটা জোর করে কেঁড়ে নেয়ার মত। পাকিস্তান আর্মী এটি ধ্বংস করে, বঙ্গবন্ধু’র সরকার মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ বুলডজার দিয়ে পরিষ্কার করে এটি অধিগ্রহণ করে স্থানীয় সরকার ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের হাতে ন্যস্ত করেন। দীর্ঘদিন সেখানে পূজার্চনার কোন সুযোগ ছিলোনা। এরশাদ আমলে আশির দশকে ওয়াইজ ঘাটের ‘ভিআইপি স্যুজ’-র মালিক একজন ‘রতন’ স্বাধীনতার পর প্রথম সেখানে পূজা করেন। পুলিশ বাধা দেয়নি। এ খবরটি তখনকার দৈনিক দেশ পত্রিকায় সবিস্তারে প্রকাশিত হয়েছিলো। রমনা কালীমন্দির নামে এখন যেটুকু আছে, সেটি মূলত: বিএনপি আমলে গয়েশ্বর রায় ফিরিয়ে আনেন। বর্তমানে ভারত সরকারের সহায়তায় মন্দিরটি পুন্:নির্মাণের চেষ্টা চলছে।

উইকিপিডিয়া জানায়, ১৯৭১ সালে পাকিস্তান আর্মী ‘অপারেশন সার্চলাইট’ চলাকালে রমনা কালী মন্দির ও মা আনন্দময়ী আশ্রমটি ধ্বংস করে। ২৭শে মার্চ মিলিটারী মন্দিরে ৮৫জনকে হত্যা করে। পাকিস্তান সেনাবাহিনী ২৬শে মার্চ মন্দিরে প্রবেশ করে, ঘেরাও করে রাখে, কাউকে বের হতে দেয়না। ২৭শে মার্চ রাতে কার্ফু চলাকালীন সময়ে সার্চলাইট জ্বালিয়ে মন্দিরের সবাইকে লাইন ধরে দাঁড় করিয়ে রেখে পাখির মত গুলি করে হত্যা করা হয়? এরমধ্যে মন্দিরের অধ্যক্ষ স্বামী পরমানন্দ গিরি ছিলেন। জানা যায়, মৃত্যু’র আগে তিনি অন্যদের বলে গেছেন, তোমাদের বাঁচাতে পারলাম না, কিন্তু দেশ স্বাধীন হবে। হত্যাযজ্ঞ শেষে বোমা মেরে মন্দির উড়িয়ে দেয়া হয়? শোনা যায়, খাঁজা খয়েরুদ্দিন তখন পাক-সেনাদের সাথে মন্দিরে উপস্থিত ছিলেন?

সেদিন রমনা কালী মন্দির ও মা আনন্দময়ী আশ্রমে যাঁরা নিহত হয়েছেন তাঁদের ক’জনের একটি তালিকা আছে, এঁরা হচ্ছেন, শ্রীমৎ স্বামী পরমানন্দ গিরি, রঘু লাল দাস, বিভূতি চক্রবর্তী, নান্দু লাল, সরোজ, রাজকুমার, গণে মুচি, বলিরাম, সুরত বল্লি, ধীরেণ লাল ঘোষ, শ্রীমতি লক্ষ্মী চৌহান, হীরা লাল পাশী, বাবু লাল, সূর্য, রামগোপাল, সন্তোষ পাল, সুনীল ঘোষ, মোহন দাস, রাম বিলাস দাস, জয়ন্ত চক্রবর্তী, বিরাজ কুমার, ভোলা পাশী, বাবু লাল দাস, গণেশ চন্দ্র দাস, সরষু দাস, বসুন্ত মালী, শৈবল্লি, কিশোরী ঠাকুর, সাংবাদিক শিব সাধন চক্রবর্তী, পুরণ দাস, মানিক দাস, রমেশ ধোপা, বাবু নন্দন, হিরুয়া, বাবুল দাস দ্রুপতি, বাদল চন্দ্র রায়, ত্রিদিব কুমার রায়, রামগতি এবং বারিক লাল ঘোষ। 

উইকিপিডিয়া বলছে, মোঘল আমল থেকে হিন্দু দেবী ‘কালী’র নামানুসারে রমনা কালীবাড়ি। এর আয়তন ছিলো ২.২৫একর। এটি রমনা পার্কের দক্ষিণ ও বাংলা একাডেমির উল্টোদিকে অবস্থিত। পাকিস্তান আর্মি ২৭শে মার্চ এমন্দিরে হত্যাযজ্ঞ চালায়, নিহতদের প্রায় সবাই হিন্দু। নেপালী লোকজ সংস্কৃতি থেকে জানা যায়, হিমালয় থেকে কালীভক্তরা বাংলায় এসে এই মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করেন। যদিও মন্দিরটি বহু শতাব্দী পুরানো, তবে এর মূল উন্নয়ন ঘটে রাজেন্দ্র নারায়ণের স্ত্রী রানী বিলাসময়ী দেবী’র সহযোগিতায় (১৮৮২-১৯১৩), ঐ সময় এটি ঢাকার একটি ল্যান্ডমার্ক ছিলো। সুরজিৎ ভট্টাচার্য্য জানাচ্ছেন, জনশ্রুতি আছে যে, নেপাল থেকে এক হিন্দু কালীভক্ত এসে মন্দিরটি নির্মাণ করেন। পরে ভাওয়ালের রানী বিলাসমনি এটি সংস্কার করেন। মানসিংহ ও বারভূঁইয়ার কেদার রায় আবার নুতন করে মন্দিরটি নির্মাণ করে নাম দেন, ভদ্রকালী বাড়ী। কালক্রমে এটি রমনা কালীবাড়ি হিসাবে পরিচিতি লাভ করে। আশ্রমের পাশে একটি বিরাট দীঘি ছিলো। রানী বিলাসমনি এটি খনন করেন। কারো কারো মতে একজন ইংরেজ মেজিষ্টেট এটি খনন করান। এই দীঘি আশেপাশের সবাই ব্যবহার করতেন এবং এটি ছিল ব্যায়াম ও সাঁতারের জন্যে উন্মুক্ত। 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *