বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কি ?

শিতাংশু গুহ, ১৩ই এপ্রিল ২০২২, নিউইয়র্ক।।

বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কি? যেকোন দেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে মুখ্যত: অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মকান্ডের ওপর। একটি ব্যতীত অপরটি গুরুত্বহীন। উন্নত দেশগুলোর অর্থনীতি মজবুত, রাজনীতি পরিশীলিত, সামাজিক প্রেক্ষাপট সচেতন ও উন্নত। একটি দেশ ধনী হতে পারে, কিন্তু রাজনৈতিক, ও সামাজিক কারণে সেটি পশ্চাদপর, গুরুত্বহীন বা মানব-কল্যাণকর নাও হতে পারে। যেমন কুয়েত, আরব-আমিরাত বা সৌদি আরব, বা এমনকি প্রায় পুরো আরব বিশ্ব। এ কারণে একজন বাংলাদেশিকে যেকোন আরব দেশ অথবা ইউরোপ-আমেরিকায় স্থায়ীভাবে থাকার সুযোগ দিলে তিনি আরব দেশে যাবেন না, আমেরিকা যাবেন। কারণ সেখানে ‘কোয়ালিটি অফ লাইভ’ উন্নত, রাষ্ট্র কল্যাণমুখী এবং বহুলাংশে বৈষম্যহীন। সুতরাং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত হতে হলে একই সাথে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন হতে হবে। হচ্ছে কি? বা আদৌ হবে কি?

অর্থনৈতিকভাবে বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থা পূর্বের যেকোন সময়ের চেয়ে ভালো। এর মানে এই নয় যে, গরিবের ছেলেটা ‘দুধেভাতে’ বড় হচ্ছে। বাংলাদেশের ক্রেডিট লাইন ভালো, টাকা আসছে। কাঁচা টাকা। ঋণ বাড়ছে। ‘পার ক্যাপিটা ইনকামের সাথে ঋণটা’ মিলালে বিষয়টা বোঝা যেতে পারে। বাংলাদেশের অর্থনীতি সম্ভবত: ঋণের টাকায় ঘি খাওয়ার মত। দক্ষিণ এশিয়ায় দ্রুত অগ্রসরমান দেশ শ্রীলঙ্কা দেউলিয়া হবার পথে। দেশটি ঋণখেলাপি। বাংলাদেশের অবস্থা শ্রীলঙ্কার মত হবেনা তো? মন্ত্রীরা বলেছেন, ‘বাংলাদেশের অবস্থা শ্রীলঙ্কার মত হবেনা, কারণ আমাদের অর্থনীতি শক্ত ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত’। এই ভিত্তিটা কি? বাজেট অনুযায়ী বাংলাদেশের আয়ের মুখ্য উৎস হচ্ছে, গার্মেন্টস, প্রবাসী রেমিট্যান্স ও ঋণ। আমাদের ভারী শিল্প নাই। রফতানী আয় সামান্য। চোর বেড়েছে। ব্যাংক ও রাষ্ট্রীয় খাতে লুটপাট হচ্ছে। সম্পদ বাইরে চলে যাচ্ছে। আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ভিত্তি নড়বড়ে। এসব লক্ষণ ভালো নয়? ভেনিজুয়েলা শুধুমাত্র তেলের পর ভিত্তি করে চক্চকে অর্থনীতির দেশে পরিণত হয়েছিলো, ধপাস করে পড়ে যেতে বেশি সময় নেয়নি। বলা হয়, একটি দেশের বৈদেশিক ঋণ জিডিপি’র ৪০%-র বেশি হলে তা বিপদ্জনক, বাংলাদেশের তা ২২%, এটি সুখবর।   

অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা দরকার, বাংলাদেশে এ মুহূর্তে তা আছে, সেটি রাজনৈতিক বন্ধ্যাত্বের বিনিময়ে। দেশে রাজনীতি নেই। নেতা নেই। মৌলবাদের রমরমা। বঙ্গবন্ধু সরকারের পর জিয়া, এরশাদ, খালেদা জিয়া সরকারের ক্ষমতার উৎস ছিলো সাম্প্রদায়িক শক্তি। ১৯৯৬, ২০০৯-এ আওয়ামী লীগের ক্ষমতার উৎস ছিলো জনগণ ও প্রগতিশীল শক্তি। এখন তা নেই, এখন সেটি সাম্প্রদায়িক শক্তি। আওয়ামী লীগ-বিএনপি’র মধ্যে এখন গুনগত কোন তফাৎ নেই? সুতরাং মৌলবাদ বাড়বে বৈকি। রাজনীতি নাই, শূন্যস্থান পূরণ করবে অপশক্তি। গণতন্ত্র নেই। সংসদ অকেজো। মিডিয়া ভীত-সন্ত্রস্থ। বিচার বিভাগ মুখ থুবড়ে পড়েছে। ব্যাংক লুটপাট চলছে। স্টকমার্কেট অনিশ্চিত। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান বলতে কিছু নেই। নির্বাচনী ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়েছে। দুর্নীতি আকাশ ছোঁয়া। একদা শ্লোগান ছিলো ‘আমরা সব তালেবান, বাংলা হবে আফগান’, দেশ অনেকটা সেইদিকে এগিয়ে যাচ্ছে। প্রশাসন মোটামুটি লক্ষ্যে পৌঁছে গেছে। বাংলাদেশে এখন প্রশাসন সরকারের কথায় চলেনা, সরকার প্রশাসনের কথায় চলে। 

দেশের সামাজিক কাঠামো ভেঙ্গে পড়েছে। সমাজ পরিবর্তনশীল, সেটি হওয়া চাই ইতিবাচক, বাংলাদেশে হচ্ছে নেতিবাচক। ধর্মান্ধতা সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। বাংলাদেশের মানুষ এখন প্রায় সবাই ধর্মের শিক্ষক, সবাই জ্ঞান দিতে চান। এক-দেড় মিনিট বা কখনো-সখনো আরো কম সময় কারো সাথে কথা বললেই ধর্ম এসে যায়! শিক্ষার মান কমতে কমতে কোথায় গিয়ে ঠেঁকছে কেজানে? এখন ছাত্ররা টেপ করে শিক্ষককে ‘ধর্ম অবমাননার’ নামে ফাঁসিয়ে দেয়; সরকার, প্রশাসন, স্কুল কর্তৃপক্ষ সবাই ছাত্রকে বাহবা দেয়? পঞ্চম শ্রেণীর ইসলামী শিক্ষা বইয়ে পড়ানো হয়, ‘বিধর্মীরা পশুর চেয়ে অধম’। মাদ্রাসায় প্রথম শ্রেণীর আদর্শ গণিত শিক্ষা বইয়ে অংক হচ্ছে, এক মুজাহিদ জ্বেহাদী ময়দানে ১ম, ২যা, ৩য় দিনে যথাক্রমে ২৪, ১৮, ১২জন শত্রু মারে, তিনি মোট কতজন শত্রু মারলো? সুস্থ সমাজের কতগুলো মাপকাঠি থাকে, যেমন সততা, চুরি না করা, মিথ্যা না বলা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, কাউকে ব্যথা না দেয়া, বা অপরের ক্ষতি না করা ইত্যাদি। দেশে এখন এসবের বালাই নেই। সমাজে অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত নেই, সবাই স্রোতের অনুকূলে গা-ভাসিয়ে দিয়েছেন, প্রতিকূলে উজান বাইবার মানুষ নেই। শেখ হাসিনা নিজেই বলেছেন, তাকে ছাড়া সবাইকে কেনা যায়। সামাজিক মার্কেটে যদি সবাই বিক্রী হ’ন, তাহলে একটি সমাজের চেহারা যা হওয়ার কথা, সমাজটা এখন তা-ই? 

একটি রাষ্ট্র চলে কতগুলো সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থার মাধ্যমে। বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রাটি-তে সেইসব ব্যবস্থা গুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। সকল ক্ষেত্রে সবাই প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেন, তিনি ছাড়া সবকিছু অচল। রাষ্ট্রটি এখন মধ্যনদীতে মাঝিবিহীন নৌকার মত। না, ঠিক বললাম না, অবস্থা এখনও তা নয়, শেখ হাসিনা যখন থাকবেন না, হয়তো তখন তা-ই হবে? তাই ভাবছিলাম, বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি’র ভবিষ্যৎ কি? ব্যক্তি বিশেষ বা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের এ প্রশ্নের উত্তর ভিন্ন ভিন্ন হবে তা বলা বাহুল্য, তবে একান্তে তাঁরা স্বীকার করেন, দেশের অবস্থা ভালো নয়? দেশে অতি পরিচিত এক ভদ্রলোক ক’বছর আগে নিউইয়র্কে এলে একান্তে তাঁকে এ প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেছিলেন, ‘আমরা বেঁচে আছি ওদের দয়ায়, ওঁরা চাইলে যেকোন সময় আমাদের মেরে ফেলতে পারে’। দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে যেকোন সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষ আতঙ্কিত, এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার রাস্তা কি? আমাকে একজন সুহৃদ সবর্দা বলেন, ক্ষোভ-দু:খ যাই থাকুক দেশটি তো আমাদের, দেশ বাঁচাতে হবে। তা ঠিক, সেই ভাবনা থেকেই এ প্রশ্ন, ‘বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কি’ ? (Pic courtesy North East Today)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *