অভিশংসন বিচার শেষ, ট্রাম্প খালাস, মুক্ত

নিউইয়র্ক।। সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড জে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ইম্পিচমেন্ট ট্রায়াল শনিবার ১৩ই ফেব্রুয়ারী বিকালে সিনেটে ভোটাভুটির মধ্যে দিয়ে শেষ হয়েছে। ট্রাম্প খালাস পেয়েছেন। ইম্পিচমেন্ট বা অভিশংসনের পক্ষে ভোট পড়েছে ৫৭টি, বিপক্ষে ৪৩। ৭জন রিপাবলিকান ট্রাম্পের বিপক্ষে ভোট দেন। ডোনাল্ড ট্রাম্প একমাত্র মার্কিন প্রেসিডেন্ট যিনি দুইবার অভিশংসিত হয়েছেন। এরআগে প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিন্টন ১৯৯৮-এ ও এন্ড্রু জ্যাকসন ১৮৬৮ সালে ইম্পিচড হ’ন, তবে আজ পর্যন্ত কোন প্রেসিডেন্ট দণ্ডিত হ’ননি বা অভিশংসিত হয়ে ক্ষমতা হারাননি। ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারির জন্যে প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন অভিশংসিত হবার আগেই পদত্যাগ করেন।

দ্বিতীয় দফা অভিশংসন প্রক্রিয়ায় ট্রাম্প দণ্ডিত হবেন না তা প্রায় নিশ্চিত ছিলো। একজন প্রেসিডেন্টকে দণ্ডিত করতে হলে সিনেটে দুই-তৃতীয়াংশ ভোট দরকার। ১শ’ সদস্যের সিনেটে ৫০:৫০ ডেমোক্রেট ও রিপাবলিকান। ট্রাম্পকে দণ্ডিত করতে ৬৭টি ভোট দরকার, যা পাওয়ার কোন সম্ভবনা ছিলোনা, তাই তিনি খালাস পেয়েছেন। ওয়াশিংটন ক্যাপিটল হিলে ৬ই জানুয়ারী ট্রাম্প সমর্থকদের দাঙ্গার জন্যে ট্রাম্পকে অভিযুক্ত করা হয়, বলা হয় তিনি এদের উস্কে দিয়েছেন। স্পীকার ন্যান্সী পেলোসি তড়িঘড়ি ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ইম্পিচমেন্ট অভিযোগ উত্থাপন করেন, এবং সংখ্যাগরিষ্টতার জোরে কংগ্রেসে পাশ করিয়ে নেন, সেটি ১৩ই জানুয়ারী, ট্রাম্পের হোয়াইট হাউস ছাড়ার মাত্র ৭দিন আগে? 

কংগ্রেস কিন্তু ইম্পিচমেন্ট দলিল সাথে সাথে হাউসে পাঠায়নি, কারণ তখন রিপাবলিকানরা সংখ্যাগরিষ্ট ছিলেন। বাইডেন ক্ষমতা নেয়ার পরই কেবল সেটি সিনেটে পাঠানো হয়। ৯ই ফেব্রুয়ারী সিনেটে বিচারকার্য শুরু হয়, উভয় পক্ষ ত্বরিৎ তা শেষ করতে সচেষ্ট ছিলেন। সিনেটে সংখ্যালঘু নেতা রিপাবলিকান মিচ ম্যাককলেন শনিবার তাঁর সহকর্মীদের জানিয়ে দেন যে, তিনি ট্রাম্পকে ‘নির্দোষ’ এর পক্ষে ভোট দেবেন। ফলে ডেমক্রেটদের আশা-ভরসা শেষ হয়ে যায়? পূর্বাহ্নে ডেমক্রেটরা সিনেটে সাক্ষী ডাকার পক্ষে সিদ্ধান্ত নেন, কিন্তু সিনেট মাইনরিটি নেতার অবস্থান পরিষ্কার হবার পর তাঁরা রণে ভঙ্গ দেন, এবং ত্বরিৎ সাক্ষী ডাকার সিদ্ধান্ত বাতিল করেন। ফলে ভোট গ্রহণ অনিবার্য হয়ে পরে। তবে ট্রাম্পকে ত্বরিৎ গতিতে অভিশংসিত করা হয়েছে বলে প্রচলিত ধারণাটি ঠিক নহে! এরআগে ১৮৬৮ সালে প্রেসিডেন্ট এন্ড্রু জনসন তাঁর যুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী এডুইন এম. স্ট্যান্টন-কে বরখাস্ত করার মাত্র ৩দিনের মাথায় অভিশংসিত হ’ন। ট্রাম্পের ক্ষেত্রে লেগেছে পুরো এক সপ্তাহ। 

সিনেটে বিচার শুরুতে ডেমোক্রেট হাউস ম্যানেজাররা তাঁদের ১৬ঘন্টা যুক্তিতর্কে বলতে চেয়েছেন, ট্রাম্পকে দণ্ডিত করার অর্থ হচ্ছে, ভবিষ্যতে আর একটি ৬ই জানুয়ারী ঘটতে না দেয়া। তাঁরা যুক্তি দিয়েছেন, এটি পূর্ব-পরিকল্পিত এবং ট্রাম্প ইচ্ছাকৃতভাবে এটি উস্কে দিয়েছেন। পক্ষান্তরে ট্রাম্পের এটর্নীরা তাদের ষোলঘন্টা যুক্তিতর্কে বলেছেন, ইম্পিচমেন্টের লক্ষ্য হচ্ছে একজন প্রেসিডেন্টকে ক্ষমতা থেকে অপসারণ, ট্রাম্প ক্ষমতায় নেই, তাই এটি অসাংবিধানিক। তারা যুক্তি দেন যে, ৬ই জানুয়ারি ঘটনা হয়তো পূর্ব-পরিকল্পিত, কিন্তু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাতে সংশ্লিষ্ট নন, এবং ট্রাম্প তখন যে সব কথাবার্তা বলেছেন, সংবিধানের ১নং অনুচ্ছেদ অনুযায়ী তা তিনি বলার অধিকার রাখেন। তাঁরা স্পষ্টটি: বলেছেন, ট্রাম্পকে অভিশংসন প্রক্রিয়া একটি ভয়ঙ্কর মিথ্যাচার এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার বাসনা মাত্র।   

৬ই জানুয়ারি একদল ট্রাম্প সমর্থক ওয়াশিংটনে ক্যাপিটাল হিলে আক্রমন চালায়, এতে ৫জন নিহত হ’ন। এবারকার ট্রাম্প ইম্পিচমেন্ট প্রক্রিয়া মূলত: সেই ঘটনা থেকে উৎসারিত। এমনিতে স্পীকার নেন্সি পেলোসি এবং ট্রাম্পের মধ্যেকার সম্পর্ক যথেষ্ট তিক্ত ছিলো। ১১ই জানুয়ারি ট্রাম্পের বিরুদ্ধে তাঁর সমর্থকদের উস্কে দেয়ার অভিযোগে একটি মাত্র ‘ইম্পিচমেন্ট অনুচ্ছেদ’ কংগ্রেসে উত্থাপিত হয়। ১২ই জানুয়ারী হাউস ভাইস-প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্সকে সংবিধানের ২৫তম সংশোধনী উত্থাপন করে ট্রাম্পকে অপসারণের পক্ষে একটি প্রস্তাব পাশ করে। ভাইস-প্রেসিডেন্ট তা করবেন না বলে জানিয়ে দেন। ১৩জানুয়ারি কংগ্রেস ২৩২-১৯৭ ভোটে ‘আর্টিক্যাল অফ ইম্পিচমেন্ট’ পাশ করে। ৪জন ভোট দেননি, ১০জন রিপাবলিকান প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেন। ২০শে জানুয়ারি ট্রাম্পের মেয়াদ শেষ এবং জো বাইডেন প্রেসিডেন্ট হিসাবে শপথ নেন। 

২৫শে জানুয়ারি হাউস থেকে ‘আর্টিক্যাল অফ ইম্পিচমেন্ট’ সিনেটে পাঠানো হয়। পরদিন ২৬জানুয়ারি ভারমন্টের সিনেটর প্যাট্রিক জে. লেহি বিচারকার্যের জন্যে সভাপতি নির্বাচিত হন এবং ১০০জন সিনেটর জুড়ি হিসাবে শপথ নেন। একই দিন রিপাবলিকানরা ‘অভিশংসন প্রক্রিয়া অসাংবিধানিক’ দাবি করে একটি প্রস্তাব উত্থাপন করেন এবং সিনেটে তা ৪৫-৫৫ ভোটে নাকচ হয়ে যায়। ৫জন রিপাবলিকান এ সময় ডেমক্রেটদের পক্ষ নেন। একই দিন সিনেট সাবেক প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে ২রা ফেব্রুয়ারির মধ্যে ইম্পিচমেন্ট অভিযোগের জবাব দেয়ার ‘সমন’ দেয়। ৩১শে জানুয়ারি ট্রাম্প তাঁর পুরাতন এটর্নীদের বাদ দিয়ে নুতন দু’জন ডিফেন্স এটর্নি নিয়োগ দেন। ২রা ফেব্রুয়ারী ডেমোক্রেট হাউস ম্যানেজাররা ৮০-পাতার একটি দলিলে ক্যাপিটাল হিল দাঙ্গার জন্যে ট্রাম্পকে এককভাবে দায়ী করেন এবং তাঁকে দণ্ডিত করে ভবিষ্যতে সকল নির্বাচনের জন্যে অযোগ্য ঘোষণার দাবি করেন। ট্রাম্পের আইনজীবীগণ একই দিন ১৪-পাতার একটি প্রত্যুত্তর জমা দেন, যাতে তিনি তাঁর বিরুদ্ধে আনীত সকল অভিযোগ অস্বীকার করেন এবং একজন সাবেক প্রেসিডেন্টকে বিচার করার ক্ষমতা সিনেটের নেই বলে দাবি করেন। 

৪ঠা ফেব্রুয়ারি হাউস ম্যানেজারগন ট্রাম্পকে ‘শপথ নিয়ে’ সাক্ষ্য দেয়ার অনুরোধ করেন। ট্রাম্প দ্রুত সেই অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেন। ৮ই ফেব্রুয়ারী ট্রাম্প পক্ষ ৭৮-পাতার একটি জবানবন্দী জমা দেন যাতে সিনেট ট্রায়ালকে ‘পার্টিজান ও রাজনৈতিক থিয়েটার’ বলে বর্ণনা করেন। হাউস ম্যানেজাররা একটি মেমো দিয়ে অভিযোগ খণ্ডন করেন।  ৯ ফেব্রুয়ারি সিনেট বিচারিক কার্যের ‘নিয়ম ও প্রক্রিয়া’ সংক্রান্ত প্রস্তাব পাশ করে এবং আনুষ্ঠানিক বিচার কাজ শুরু হয়। শুরুতে উভয় পক্ষ যুক্তিতর্কে জড়িয়ে পড়েন যে, একজন সাবেক প্রেসিডেন্টকে সিনেট বিচার করতে পারেন কিনা? বলা হয়, ১৮৭৬ সালে সিনেট একজন সাবেক যুদ্ধমন্ত্রী উইলিয়াম বেলকন্যাপ-র বিচার করে। সিনেট ৫৬-৪৪ ভোটে বিচার কার্য চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে প্রস্তাব পাশ করে, ৬জন রিপাবলিকান এতে সায় দেন। ১০-১২ ফেব্রুয়ারি হাউস ম্যানেজার ও ট্রাম্প এটর্নিগন ১৬ঘন্টা করে তাঁদের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন। ১২ই ফেব্রুয়ারি সিনেটরগন কয়েক ঘন্টার জন্যে বিভিন্ন প্রশ্ন করেন। ১৩ ফেব্রুয়ারি সিনেট প্রথমে সাক্ষী ডাকার পক্ষে প্রস্তাব পাশ করে, পরে আবার তা বাতিল করে। একই দিন ৫৭-৪৩ ভোটাভুটিতে ট্রাম্প খালাস পান।

সাবেক প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এখন মুক্ত। ২০শে জানুয়ারীর পর থেকে তিনি মুখ খুলেননি, এখন হয়তো খুলবেন? এবারকার অভিশংসন প্রক্রিয়ার ভাল দিক হচ্ছে, এটি দ্রুত শেষ হয়েছে। খারাপ দিক হচ্ছে, এটি আদৌ হওয়া প্রয়োজন ছিলোনা। ইম্পিচমেন্টের লক্ষ্য হচ্ছে, প্রেসিডেন্টকে ক্ষমতা থেকে অপসারণ। ট্রাম্প নির্বাচনে হেরে এমনিতেই চলে যাচ্ছিলেন, এ অবস্থায় তাঁকে ইম্পিচ করা যৌক্তিক ছিলোনা। ডেমক্রেটরা চাইছিলো ট্রাম্পকে ‘দোষী’ সাব্যস্ত করা গেলে, তাঁকে ভবিষ্যতে সকল নির্বাচনে ‘অযোগ্য’ করার সুযোগ হতো, সেটি হচ্ছেনা। শুধু ডেমক্রেটরা নন, কিছু রিপাবলিকানও চান না যে ট্রাম্প ফিরে আসুক। কিন্তু সেই সম্ভবনা থেকেই গেলো, ২০২৪-এ তিনি আবার ফিরে আসতে পারেন? গত নির্বাচনে তিনি প্রায় ৭কোটি ৩০লক্ষ ভোট পেয়েছেন, যা কোন পরাজিত প্রার্থীর জন্যে রেকর্ড। অর্থাৎ তৃণমূল পর্যায়ে তাঁর ব্যাপক সমর্থন রয়েছে। ট্রাম্প ক্ষমতায় নেই, কিন্তু ট্রাম্পিজম আছে, থাকবে। (pic courtesy: Times of India)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *