মাহাথির মোহাম্মদ যুগের অবসান!

১৫ সেপ্টেম্বর ২০২০, নিউইয়র্ক ।। এবার কোভিড-১৯’এ বিশ্বে অনেক মানুষ মারা গেছেন। ক্ষমতাসীন নেতাদের মধ্যে মরতে মরতে বেঁচে গেছেন বৃটেনের প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন। আর করোনায় আক্রান্ত না হয়েও বেঁচে থেকে জীবন্মৃত হয়ে আছেন মালয়েশিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ। একদা তিনি ছিলেন হিরো, এখন জিরো। করোনার ঠিক শুরুতে ২৪ফেব্রুয়ারি ২০২০ তিনি পদত্যাগ করেন এবং রাজনৈতিকভাবে নাজেহাল হয়ে বিদায় নেন। তবে প্রথমে হাল ছাড়েননি। চেষ্টা করেছেন কোয়ালিশন করে আবার প্রধানমন্ত্রী হতে, কিন্তু পহেলা মার্চ মহিউদ্দিন ইয়াসিন প্রধানমন্ত্রী হিসাবে শপথ নিলে তিনি ক্ষমতার লড়াইয়ে হেরে যান। এর সাথে সাথে অবসান ঘটে মাহাথির মোহাম্মদ যুগের। 

মাহাথির মোহাম্মদ ২০১৮ সালে ৯২ বয়সে দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে সবাইকে অবাক করে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাক-কে হারিয়ে ক্ষমতাসীন হন। দুই বছরের মাথায় তিনি হারিয়ে গেলেন। মাহাথির বলেছেন, তাঁর দলের প্রেসিডেন্ট মহিউদ্দিন ইয়াসিন তাঁর সাথে বিশ্বাসঘতকতা করেছেন। ২০শে মে ২০১৮-তে মাহাথির মোহাম্মদ পুনরায় প্রধানমন্ত্রী হলে লিখেছিলাম, ক্ষমতার লোভ সামলাতে পারলেন না, একেই বলে বুড়ো বয়সে ভীমরতি। আরো বলেছিলাম, তাঁর বিদায়টি হবে দু:খজনক। তখন অনেকে আমাকে গালমন্দ দিয়েছেন। বিষয়টি হলো, একজন বৃদ্ধ মানুষ যখন ভাবেন, তিনিই পারেন দেশকে উদ্ধার করতে, তখন তাঁর ভাবনাটি যে ‘ভুল’ তা বলার অবকাশ রাখেনা। 

এবার এই পরাজয়ের পেছনে তাঁর পুত্রের স্বেচ্ছাচার অনেকাংশে দায়ী। তা-ই হয়! ২০১৮-তে প্রধানমন্ত্রী হবার পর লিখেছিলাম, এই ক্ষমতা সম্ভবত: ‘বিগিনিং অফ এন্ড অফ মাহাথীর’। আগে বেশ সুনাম কামিয়েছেন, এবার সব হারানোর পালা। আগে বাইশ বছর ক্ষমতায় ছিলেন। তাকে বলা হয়, ‘আধুনিক মালয়েশিয়ার রূপকার’। এরপর রাজনীতি থেকে অবসর। পনের বছর পর আবার ফিরে আসেন! এলেন, দুর্নীতি কমাবেন বলে? অনেকটা সামরিক শাসকরা যেমন বলে থাকেন? মাহাথীর মোহাম্মদ অবশ্য বলেছিলেন, দুই বছর ক্ষমতায় থাকবেন। থাকতে আর পারলেন কই? চলে তো যেতেই হলো! আর গেলেনও তো ঝগড়াঝাটি করে! রাজনীতির দাবার চালে হেরে। 

দুই বছর পূর্তির খুব বেশিদিন বাকি ছিলোনা। তবু যদি বলতেন, ভাই, ক’টা দিন বাকি, তারপর চলে যাচ্ছি। তা তো নয়, পদত্যাগ করেছিলেন, নূতনভাবে কোয়ালিশন করে আবার প্রধানমন্ত্রী হবেন বলে? সেই খায়েস আর মিটলো না? কথামত দুই বছরের মাথায় ক্ষমতা ছাড়ার কোন লক্ষণ তারমধ্যে ছিলোনা। রাজনীতিকরা ওরকম বলে থাকেন। দুইবছর পরে হয়তো বলতেন যে, তার কথা তো হাদিসের কথা না যে পরিবর্তন হবেনা? তাছাড়া জনগণের ভালবাসা আছেনা? ২০১৮-তে তিনি ক্ষমতায় এসেছেন জনতার দোহাই দিয়ে? এসব কথা উঠতো না যদি তিনি নির্বাচনে জিতে ক্ষমতা থেকে দূরে থাকতেন। আহা, ক্ষমতা বলে কথা! কেউ ছাড়েনা! 

২০১৮-তে মাহাথীর জিতেছেন, সবটুকু কৃতিত্ব তার একার নয় ছিলোনা। বরং জেলবন্দী আনোয়ার ইব্রাহীম ও অন্য শরিকরা এই কৃতিত্বের দাবিদার। এই ইব্রাহীম তার ইঙ্গিতেই জেলে গিয়েছিলেন, অপরাধ সমকামিতা। মাহাথির শত্রূ’র সাথে হাত মিলিয়ে জিতেছিলেন। জিতে আনোয়ার ইব্রাহীমকে জেল থেকে মুক্তি দিয়েছেন। তাঁর উত্তরসূরি বানিয়েছেন। তার পত্নী ওয়ান আজিজা ইসমাইল ডেপুটি প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। পেশায় আজিজা ডাক্তার, এবং ইব্রাহীম জেলবন্দী থাকাকালে তিনিই দল সামলেছেন। মাহাথির যখন প্রথমবার সসম্মানে ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়ান, তখন ক্ষমতা দিয়েছিলেন আব্দুল্লাহ বাদাওয়ী-কে। বাদাওয়ী হারিয়ে গেছেন। 

এরপর ক্ষমতায় আসেন মাহাথিরের শিষ্য নাজিব রাজাক। নাজিবকে হারিয়েই ২০১৮-তে মাহাথীর আবার ক্ষমতায় ফিরে আসেন। ২০১৫-তে নাজীবের বিরুদ্ধে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। মাহাথীর বলেছেন, নাজিব চোর, কয়েকশ’ বা কয়েক হাজার ডলার নয়, নাজিব বিলিয়ন ডলার চোর? চোর ধরতেই শত্রূ’র সাথে হাত মিলিয়ে মিত্রকে হারিয়ে তিনি ক্ষমতা নিয়েছেন। এরআগে মাহাথীর ক্ষমতায় ছিলেন ১৯৮১-২০০৩। পেশায় চিকিৎসক। ‘লুক ইষ্ট’ পলিসি নিয়ে তিনি মালয়েশিয়াকে অর্থনীতির ‘ক্ষুদে টাইগার’-এ পরিণত করেন। সামাজিক মাধ্যমে কিছু লোক বলছেন, মাহাথীর নাকি চট্টগ্রামের লোক, মানে তার পূর্ব-পুরুষেরা চট্টগ্রামে ছিলেন?  
মাহাথীর বিরোধী ঘড়যন্ত্রে জড়িত হয়ে আনোয়ার ইব্রাহীম জেলে যান, তিনি অর্থমন্ত্রী ছিলেন। আনোয়ার ইব্রাহীম সবসময় বলেছেন তাকে রাজনৈতিক কারণে জেলে যেতে হয়েছে। মাহাথীর তাকে প্রতিদ্বন্ধি ভাবতেন। মালয়েশিয়ায় সাধারণ নির্বাচন হয় ৯মে ২০১৮। ২২২ সীটের পার্লামেন্টে (দেওয়ান রাকায়েত) মাহাথীরের জোট ‘পাকাতান হারাপান’ ১১৩টি আসন পেয়েছিলো। সাবাহ হেরিটেজ পার্টি নামে একটি দল ৮টি আসন পায় এবং ‘পাকাতান হারাপান’কে সমর্থন দিলে মাহাথীরের পক্ষে মোট ১২১টি আসন হয় এবং তিনি প্রধানমন্ত্রী হ’ন। মাহাথীর ছিলেন বিশ্বের সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ সরকার প্রধান, ক্ষমতা হারান মাত্র ৯৪ বছর বয়সে। (Pic courtesy BBC.com)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *