আজকের সমাজে নারী 

সীমা ঘোষ

ভয়ংকর এক সামাজিক অবক্ষয ক্রমশ বেড়ে চলেছে, আর আমরা তাতেই গা ভাসিয়ে দিচ্ছি। বিশেষত মহিলাদের প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি যেন আবার সেই মধ্য যুগে ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে আমাদের। তাই নতুন করে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে লাভ জিহাদ। এমনকী ব্যক্তিগত জীবনের পরিসর নিয়েও উঠছে প্রশ্ন।নারীর সামাজিক অধিকার খর্ব করার এক জঘন্য চেষ্টা চলছে।   মহিলাদের মেধা ও মননকে ছাপিয়ে যাচ্ছে তাদের শারীরিক গঠন বা পরিহিত বস্ত্র নিয়ে আলোচনা, যার জেরে চাকরী ছাড়তে বাধ্য হলেন এক বিখ্যাত বিশ্ব বিদ্যালয়ের মহিলা অধ্যাপক। তিনি নিজের ইনস্টাগ্রামে সাঁতারের পোশাকে একটি ছবি আপলোড করেন। সেই স্বাধীনতা তাঁর আছে, রাষ্ট্র তাঁকে সেই স্বাধীনতা দিয়ে থাকে। অথচ তাঁর এক ছাত্রের পরিবার তথা চাকুরী স্হলের কর্তৃপক্ষ তাঁর সেই স্বাধীনতার অধিকার মানতে নারাজ। তারা ঐ শিক্ষিকার জ্ঞানের পরিধি বা বিদ্যা দানের ক্ষমতা বিবেচনা করছেন না, তার ব্যক্তিগত জীবনে খবরদারী করতে চাইছেন এবং এটা যে অন্যায়, সেকথা তারা বুঝতেও পারছেন না। ঐ ছাত্রের অভিভাবক কতখানি বিকৃত মনস্ক, যে তিনি তার সন্তানের শিক্ষিকার ছবি নিয়ে আলোচনা করতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে উপস্থিত হন এবং সেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষ ও আসলে শিক্ষাদান ভিন্ন অন্য ব্যাপারে ব্যস্ত থাকতে বেশি পছন্দ করছেন। এই দুই পক্ষের সম্মিলিত প্রচেষ্টা আমাদের শিক্ষা তথা সমাজকে কতখানি নীচে নামাতে সচেষ্ট হয়েছে, সেই বিপদ সম্পর্কে সচেতন হওয়ার সময় কি আমাদের এখনও আসেনি?   

অথচ কিছু নারী প্রতিবাদ করতে সেই একই পোশাক পরে নেমে পড়েছেন সামাজিক মাধ্যমে। প্রতিবাদ কি শুধুই পোশাকটুকুতেই সীমাবদ্ধ রাখা উচিত, শুধু পোশাক বিপ্লব, জ্ঞান বা মননের নয়! এভাবে তাঁরা কি তাঁদের নারীত্বকে অপমান করছেন না? চিন্তা ভাবনায় আধুনিকতার চিহ্ন কোথায়? নারী  কি কিছু বিশেষ পোশাকে আবৃত একটি শরীর মাত্র!      সামাজিক মাধ্যমে আরও একটি প্রবনতা দেখা যাচ্ছে  চিকিৎসক, বিশেষতঃ মহিলা চিকিৎসকদের নামে কুৎসা করা। প্রকাশ্যেই পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে মহিলা চিকিৎসকের কাছে না গিয়ে পুরুষ চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার জন্য। বিদ্যাসাগর মহাশয়ের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে আজ আমরা মহিলারা জীবনের সব ক্ষেত্রেই পুরুষদের সঙ্গে সমানে সমানে কখনও কখনও তাদের থেকেও এগিয়ে পথ চলেছি। আর কিছু বিকৃতমনা সুযোগ সন্ধানী পরশ্রীকাতর মানুষ মহিলাদের সেই অধিকার ছিনিয়ে নিতে চাইছে। বিনোদন জগতের মহিলাদের অনুকরনে জ্ঞান বিজ্ঞানের কৃতী মহিলাদের শুধুমাত্র শারীরিক গঠন বা বহিরঙ্গ দেখেই লজ্জিত করার চেষ্টা চলছে। এই দূরভিসন্ধিকে সফল হতে দিলে আমাদের সমাজটিই কয়েক শত বর্ষ পিছিয়ে যাবে আর তার জন্য দায়ী থাকব আমরাই।

Leave a Reply

Your email address will not be published.