ভারত বিরোধিতা ছাড়া বাংলাদেশে আর কোন রাজনীতি নেই

শিতাংশু গুহ, নিউইয়র্ক
ভারত ও হিন্দু বিরোধিতা দেখতে দেখতে বাংলাদেশে বড় হয়েছি, ভাবতাম একদিন তো এর শেষ হবে? কোথায় কি দিনদিন তা বেড়েই চলেছে। বাংলাদেশে খারাপ যাই হোক, সবকিছুর জন্যে ভারত দায়ী, এমনকি সদ্য যে মৃদু ভূমিকম্প হয়েছে সেটার জন্যেও। হাদী নিহত হলেন পরকীয়া ও ৩শ’ কোটি ভাগাভাগির কারণে, ভারত দায়ী। ইংরেজীতে একটি কথা আছে, ‘ডোন্ট ব্লেম আদার্স ফর ইউর ফল্ট’-এটি আমাদের দেশে শেখানো হয়না। ড. ইউনুস রাষ্ট্র পরিচালনায় ব্যর্থ, তিনি ব্লেম দিচ্ছেন স্বৈরাচারকে! কি চমৎকার, তাইনা? ভারত বিরোধিতা ছাড়া বাংলাদেশে এখন আর কোন রাজনীতি নেই! অবশ্য কোন কালেই তা ছিলোনা, কম আর বেশি। এজন্যে দেশটি খুব বেশিদূর এগোতে পারেনি, যেটুকু এগিয়েছে তা শেখ হাসিনা’র সময়, তখন ভারত বিরোধিতা থাকলেও পক্ষে একটি শক্তি কাজ করছিলো। এখন তা নেই, তাই গত ১৭ মাসে উন্নয়ন ‘শূন্য’। চারিদিকে তাকান, শুধু ভারত বিরোধিতা, এতে ভারতের কি ক্ষতি হচ্ছে তা স্পষ্ট নয়, কিন্তু বাংলাদেশ মুখ থুবড়ে পড়ছে।
যখন ছোট ছিলাম, সেটি পাকিস্তান আমলের শেষদিকে, তখন ভাবতাম পাকিস্তান মুসলিম রাষ্ট্র, এটিই স্বাভাবিক। তারপর মুক্তিযুদ্ধকালে ভাবলাম, আমরা সবাই বাঙ্গালী হয়ে গেলাম, আর সমস্যা নাই। এরপর বাংলাদেশ হলো, দেখলাম হিন্দু-মুসলমান সমস্যা একটু একটু করে মাথাচাড়া দিচ্ছে। ভারতীয় সৈন্যদের নিয়ে প্রথম ভারত-বিরোধিতা শুরু হলো, অথচ ওঁরা মাত্র তিনমাস ছিলো। এরপর ২৫-বছরের তথাকথিত ‘গোলামী চুক্তি’? ঐ চুক্তিটি নেই তাও সিকি শতাব্দীর বেশি হয়ে গেছে, কেউ এখনো বললো না যে, ওই চুক্তির কোন ধারাটি গোলামীর ছিলো। এরপর ফারাক্কা সমস্যা। একসময় ভাবতাম, ফারাক্কা চুক্তি হয়ে গেলে হয়তো ভারত বিরোধিতার আর কোন ইস্যু থাকবে না! আব্দুর রাজ্জাকের সফল কূটনীতিতে শেখ হাসিনা ফারাক্কা চুক্তি করলেন। সমস্যা গেল না, থেকেই গেলো। এরপর তিনবিঘা, করিডোর, সমুদ্রসীমা সমস্যা মিটলো এবং প্রতি ক্ষেত্রে বাংলাদেশ জিতেছে, কিন্তু ভারত বিরোধিতা থেকেই গেলো। এরপর তিস্তা চুক্তি। ওটা এখনো সমস্যাই আছে? আমাদের এক বন্ধু বলেন, ভারত কাপড় খুলে দিলেও সমস্যা মিটবে না!
আচ্ছা, সমস্যাটি কি ভারতের না আমাদের? কিছু প্রগতিশীল বন্ধু প্রায়শ: বলতেন, ভারতের চারপাশে কোন প্রতিবেশীর সাথে সু-সম্পর্ক নেই, কথাটা সত্য। বাংলাদেশের চারপাশের প্রতিবেশীদের সাথে কি সু-সম্পর্ক আছে, নাই? গ্রামের বড় বাড়ীটি’র সাথে প্রতিবেশীদের খুব একটা ভাল সম্পর্ক থাকেনা, এটাই স্বাভাবিক। পাকিস্তানের সাথে কি প্রতিবেশীদের ভাল সম্পর্ক আছে? আফগানিস্তান-ভারতের সাথে সম্পর্ক নষ্ট, চীনের সাথে প্রভু-ভৃত্য সম্পর্ক, মার্কিন সেনা ইরানে ঢুকলে পাকিস্তান দিয়েই ঢুকবে! বাংলাদেশে মানুষ ভারত-বিরোধী মূলত: পরিচিতি সংকটের কারণে। বাংলাদেশের মানুষ কি বাঙ্গালী না মুসলমান, না ভারতীয় অথবা আরবীয়? বাংলাদেশের একশ্রণীর মুসলমান নিজেদের আরবীয় ভাবতে পছন্দ করেন? এমনকি শেখ হাসিনা আবিষ্কার করেছিলেন যে, তাদের পূর্ব-পুরুষ আরব থেকে এসেছিলেন। আরবীয় না হোক, অনেকে নিজেদের অন্তত: পাকিস্তানী ডিসেন্ডেন্ট ভাবতে মজা পান। অনেকে নিজেদের মুঘল-পাঠানদের বংশধর ভেবে পুলকিত হন? এগুলো পরিচিতি সংকটের কারণে হয়ে থাকে।
ভারতীয় উপমহাদেশের মানুষ ভারতীয় এটি মানতে মুসলমান প্রবল আপত্তি। তর্কের খাতিরে ধরে নেয়া হোক যে, ভারত মুসলমান দেশ, তখন কিন্তু বাংলাদেশের মানুষের ভারতীয় হতে কোন আপত্তি থাকতো না? তাহলে সমস্যাটি ভারত নয়, সমস্যা হিন্দু গান্ধী – জিন্নাহ’র কথাবার্তা লক্ষ্য করুন: গান্ধী বলছেন, ভারতের মুসলমান হিন্দু থেকে ধর্মান্তরিত, ধর্ম ভিন্ন হলেও ওঁরা ভারতীয়, সংস্কৃতি অভিন্ন।
জিন্নাহ বলছেন, না, হিন্দুদের সংস্কৃতি ভারতীয়, মুসলমানের সংস্কৃতি আরবীয়, হিন্দুদের বহু দেবতা, আমাদের এক আল্লাহ ইত্যাদি। এ ডায়লগ ৪০’র দশকের। আজো এ বিভ্রান্তি আছে। এর কারণ হিন্দু ভারত। সমস্যা ভারত নয়, সমস্যা হিন্দু। উপমহাদেশের মুসলমানের মানতে কষ্ট হয় যে, তারা হিন্দু থেকে ধর্মান্তরিত।ওপরে ওপরে যত তর্কই হোক না কেন, উপমহাদেশের মুসলমান মনের গভীরে একথা জানে যে, তার পূর্ব-পুরুষ ধর্মান্তরিত। এটি মেনে নিতে কষ্ট হয়, অথচ এটিকে স্বাভাবিকভাবে মেনে নিলে সমস্যা কমে যায়। আরবীয় বা পাকিস্তানী শিকড় খোঁজার কারণও একই, পরিচিতি সংকট। এ সংকট কবে কাটবে বলা মুশকিল, বাংলাদেশের মুসলমান আরবীয় মুসলমান নয়, ঠিক যেমনি বাংলাদেশের হিন্দু দক্ষিণ ভারতের হিন্দু নন। এমনকি পশ্চিমবঙ্গের বাঙ্গালী মুসলমানের সাথে বাংলাদেশের মুসলমানের তেমন মিল নেই? অথচ বাংলাদেশে হিন্দ-মুসলমানে ধর্মভিন্ন সবকিছুতেই মিল?
এ তত্ব মেনে না নেয়া পর্যন্ত বাংলাদেশের মুসলমানের ভারত বিদ্বেষ বা হিন্দু-বিদ্বেষ কমবে না। কারণ, হিন্দু বিদ্বেষই ভারত বিদ্বেষ অথবা ভারত বিদ্বেষই হিন্দু বিদ্বেষ। এ তত্ব পাকিস্তান ও ভারতের মুসলমানের জন্যেও প্রযোজ্য। বলছিলাম, ভারত বিরোধিতা ছাড়া বাংলাদেশে আর কোন রাজনীতি নেই! ভারত বিরোধিতা মানে হিন্দু বিরোধিতা। এজন্যে বাংলাদেশে হিন্দু প্রতিনিয়ত মরছে। সামাজিক মাধ্যমে একজন সৈয়দ আজিজুর রহমান লিখেছেন, পুরো বাংলাদেশ এখন হিন্দুদের জন্যে কসাইখানা। দেশজুড়ে হিন্দু নির্যাতন, হিন্দু নিধন চলছে, মিশন দেশকে হিন্দুছাড়া করা।
