কারামুক্ত নওলাখা সিপিএম অফিসে গৃহবন্দি জামিনদার রূপোলি পর্দার অভিনেত্রী

দেবারুণ রায়

নভি মুম্বইয়ের বেলাপুরে সিপিএম অফিস কাম লাইব্রেরির বাড়িটা এখন ছোটখাটো দুর্গ। সশস্ত্র পুলিশ, প্রহরী আর এনআইয়ের গোয়েন্দা অফিসাররা পৌঁছে গিয়েছেন নওলাখাকে নিয়ে যাওয়ার অনেকটা আগেই। গিয়ে বেশিরভাগ দরজা লক করে চারদিকে নিরাপত্তার নিশ্ছিদ্র ঘেরাটোপে ঘিরে, মৃল দরজায় বডি স্ক্যানার বসিয়ে নজরদারি চলছে। সিসিটিভি তো বসেছেই।শনিবার সুপ্রিম কোর্টের হুঁশিয়ারির  মুখে সাময়িক মুক্তির আলো দেখলেন যখন  তাজোলা জেলের বাইরে এলেন ৭০বছরের অসুস্থ সমাজকর্মী গৌতম নওলাখা। তারপর তাঁকে এসইউভিতে চাপিয়ে সোজা ওই আগ্রোলি গ্রামের দুর্গের সামনে গিয়ে থামল সশস্ত্র দেহরক্ষী ও কারাপ্রহরী পরিবৃত কনভয়। দীর্ঘদিন ওই বিটিআর স্মৃতি ট্রাস্টের ম্যানেজার নওলাখা পুরনো বাড়িটাকে চিনবেন তার জো নেই। অথচ এই বাড়িতেই দলের বড় নেতাদের আনাগোনা চিরকালই। মধ্যমণি তিনিই। সীতারাম,  কারাট, বৃন্দা সবাই মুম্বই গেলে ওই বাড়িতেই যান।

১০ তারিখ সুপ্রিম কোর্ট বলেছিল, ৪৮ ঘন্টার মধ্যে জেল থেকে ছেড়ে হাউস অ্যারেস্ট কার্যকর করতে একমাসের জন্য। কিন্তু কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার আবেদনে তোলা হল নানা সমস্যার কথা। সুপ্রিম কোর্ট এর জবাবে আরও কড়া নির্দেশ দিয়েছেন। আদালতের নির্দেশে বলা হল, তাঁদের নির্দেশ পালন না করে নানা কথা বলা হচ্ছে। এর পর আদালত আরও গুরুতর পদক্ষেপ করবে। চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যেই জেল থেকে ছাড়তে হবে নওলাখাকে এবং গৃহবন্দি করে রাখতে হবে একমাস। শুক্রবার এই কড়া নির্দেশ দেওয়ার পর শনিবার আর কিছু বলার ছিল না সরকারি তদন্তকারীদের। সিপিএমের অফিসে কীভাবে গৃহবন্দি করে রাখা যায় এ নিয়ে সরকারের কৌঁশুলি প্রশ্ন তুললে বেঞ্চ তাঁদের কড়া নির্দেশ জারি করেন। নওলাখার বোন অসুস্থ দাদার সঙ্গে গৃহবন্দি থাকার সময় থাকতে চেয়েছিলেন। কিন্তু নওলাখার ৭১ বছর বয়সী পার্টনার সাহবা হুসেনকে থাকার অনুমতি দেওয়া হয়।

সমাজকর্মী গৌতম নওলাখাকে গৃহবন্দি রাখার পক্ষে সর্বোচ্চ আদালত রাজি হলেও এন আই এ ওঁর নিরাপত্তার প্রশ্ন তুলেছিল। বলেছিল, থানেতে উনি যে বাড়িতে থাকবেন বলে প্রশাসনকে জানিয়েছেন, সেই বাড়ি ওর থাকার পক্ষে মোটেই নিরাপদ নয়। বাড়িটি হল মহারাষ্ট্রের প্রয়াত সিপিএম নেতা বিটি রণদিভের স্মৃতি  ট্রাস্ট। বাড়িটিতে নীচের তলায় পাবলিক লাইব্রেরি। দোতলার ঘরে থাকার কথা গৌতম নওলাখার। কিন্তু  এন আই  এ বলে, ওই বাড়িতে বেরনোর দরজা তিনটি আর ঢোকার পথ দুটো। তার মধ্যে নীচে ওই জনাকীর্ণ বাড়িতে তাঁর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাবে কতটুকু ? তাঁর ওপর নজর  রাখাই কঠিন হবে। বাড়িটিতে ঢোকা বা বেরনোর পয়েন্টে সিসিটিভি নেই। আছে শুধু বাড়ির সামনে। গত বুধবার আদালতের নির্দেশ আসে। শারীরিক নানা সমস্যা উল্লেখ করে নওলাখাকে জেল থেকে একমাসের জন্য গৃহবন্দি রাখার কথা বলে আদালত। সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি কে.এম. জোসেফ ও বিচারপতি হৃষীকেশ রায়ের বেঞ্চের নির্দেশে বলা হয়, গৌতম নওলাখাকার আপিলের সমর্থনে যে মেডিক্যাল রিপোর্ট আদালতে পেশ করা হয়েছে তাতে অবিশ্বাস্য কিছু নেই। আপাতগ্রাহ্য কারণ হিসেবে ডাক্তারি রিপোর্ট মেনে নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের সংশ্লিষ্ট বেঞ্চ গৌতম নওলাখাকে একমাসের জন্য গৃহবন্দি রাখতে বলে। সেই সঙ্গে বিচারপতিরা বলেন, এই নির্দেশ যেন ৪৮ ঘন্টার মধ্যেই কার্যকর করা হয়।

কিন্তু নিরাপত্তার যুক্তিতে আদালতের নির্দেশ কার্যকরী  হয়নি প্রথমে। এলগার পরিষদ কনক্লেভ, মাওবাদী সংযোগের মামলায় ২০২০ এপ্রিলে গৌতম নওলাখাকে গ্রেপ্তার করা হয়। মামলাটি ২০১৭ র ৩১ ডিসেম্বরের ঘটনাকে কেন্দ্র করে। নওলাখাকে গ্রেপ্তার করা হয় ওই সময় ওঁর দেওয়া একটি ভাষণের বিষয়বস্তুর ভিত্তিতে। সেদিন পুনের এলগার পরিষদ কনক্লেভে অত্যন্ত জ্বালাময়ী ভাষণ দিয়েছিলেন নওলাখা। তার পরদিনই কোরেগাঁও ভীমা হিংসাত্মক ঘটনা ঘটে। পুলিশের মতে এলগার পরিষদের কনক্লেভ আয়োজনের অংশীদার ছিল মাওবাদীরা। এবং সেদিন নওলাখা ও অন্যদের ভাষণ কোরেগাঁও ভীমা ওয়ার মেমোরিয়ালের  ঘটনায় হিংসায় প্ররোচনার কাজ করেছিল। মাওবাদীদের সঙ্গে সংযোগের এই মামলায় বারোরোজনের বেশি অ্যাক্টভিস্ট ও শিক্ষাবিদকে গ্রেপ্তার করা হয়।

বিরোধীরা সারাদেশে এই গ্রেপ্তারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত এই মামলায় নাটকীয় মোড় আসে। প্রবীণা অভিনেত্রী সুহাসিনী মুলে এন আই এর বিশেষ আদালতে দাঁড়িয়ে বলেন, গৌতম নওলাখাকে গৃহবন্দি করে রাখা হলে আমি তাঁর জামিনদার থাকব। অর্থাৎ, গৃহবন্দি থাকা অবস্থায় উনি প্রশাসন ও বিচারব্যবস্থার নির্দেশমত হাজিরা দিতে দায়বদ্ধ থাকবেন।  এর অন্যথা হলে আমি তার জবাবদিহি করতে বাধ্য থাকব। মৃণাল সেনের বিখ্যাত ছবি ভুবন সোমের নায়িকা হিসেবে খ্যাতির শীর্ষে উঠেছেন সুহাসিনী। এছাড়া জন অরণ্য ছবিতে তিনি পরিচালক সত্যজিৎ রায়ের সহযোগী হিসেবে কাজ করেন। হু তু তু ছবিও তাঁর  কেরিয়ারের অন্যতম মাইলফলক। সুহাসিনী গৌতমের মতোই প্রগতিশীল সামাজিক প্রবাহের সঙ্গে জড়িত। তিনি জানান, গৌতম নওলাখাকে তিনি চেনেন গত তিরিশ বছর ধরে। এবং তাঁরা একই শহরের বাসিন্দা ছিলেন।  শহরের নাম দিল্লি। সুহাসিনী আদালতকে জানান, তিনি জীবনে কখনও কারও জামিন হননি। এই প্রথম হলেন। তার কারণ, গৌতম নওলাখাকে গৃহবন্দি করে রাখার পিছনে যেসব যুক্তি উপস্থাপন করা হয়েছে সেগুলো সত্য ও যথার্থ। ওঁর অনেকগুলো শারীরিক সমস্যা। এ নিয়ে জেলে থাকা খুবই মর্মান্তিক। সুহাসিনীর এই বক্তব্যের ফলে আদালতে তুলে ধরা কারামুক্তির যৌক্তিকতা অনেকটাই গ্রহণযোগ্য হয় ।

সুপ্রিম কোর্ট অবশ্য তাঁর গৃহবন্দিত্বের দরুন পুলিশি প্রহরা জোগানোর জন্য তাঁকে ২.৪ লাখ টাকা জমা দিতে বলে। এর আগে গত দুবছর একের পর এক নির্দেশ দিয়েছে প্রশাসন। মহারাষ্ট্র সরকার তাঁর ফোন ব্যবহার নিয়েও নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। আর গৃহবন্দি থাকার সময় তিনি কমপিউটারে হাত দিতে পারবেন না। ইন্টারনেটেও যাওয়া যাবে না। আদালতের নির্দেশে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.