২০২৬ এর বঙ্গ সম্মেলন

দিলীপ চক্রবর্তী
২০২৬ এর বঙ্গ সম্মেলন নিয়ে কয়েকটা কথা না বললেই নয়। সত্যি বলতে কি আমার মত সাধারণ মানুষ “বঙ্গ সম্মেলনের” মত অসাধারণ বিষয় নিয়ে কতটুকুই বা বলতে পারব – জানিনা। তবে একটা কথা আমার মনে – বিদ্যাসাগরকে আপনি যে নামেই ডাকুন না কেন – দুটি জিনিস প্রতিভাত হয় – বিদ্যা আর দয়া, কি অপরিসীম শক্তি এ দুটি শব্দের, তাই না? তেমনি উত্তর আমেরিকার “বঙ্গ সম্মেলনকে” আপনি বলতে পারেন “NABC”, “বঙ্গ সম্মেলন”, বাঙালির বৃহত্তম উৎসব, কিন্তু এ শব্দগুলি আপনাকে পৌঁছে দেবে একটা বিশেষ জায়গায় – যার নাম হল “বাঙালির কৃষ্টি, শিক্ষা ও সংস্কৃতির” মহাসাগর, যার ব্যাপ্তি অন্তহীন আর গভীরতা অসীম। আমরা সকলে সাধারণভাবে হৃদয় দিয়ে ভালোবেসে, আদর আড় স্নেহভরা আবেগ দিয়ে ডাকি “বঙ্গ সম্মেলন।“
গত ১৮ই ডিসেম্বর সারা বিশ্ব আন্তর্জাতিক “International Immigration Day” অথবা “আন্তর্জাতিক অভিবাসন দিবস” পালন করল, আমেরিকায় অবশ্য এ দিনটি পালন করা হয় ২৮শে ডিসেম্বর। মা গঙ্গার উৎস যেমন শিবের জটা তেমনি বঙ্গ সম্মেলনের উৎস বলতে গেলে আমেরিকার অভিবাসন নীতিকেই স্বীকৃতি দিতে হয়। কারণ ইমিগ্রেশন না থাকলে আমরা যারা ৭০এর দশকে আমেরিকায় এসেছি, তারা আমেরিকায় অভিবাসনের সু্যগ পেত না, তাহলে হয়ত “বঙ্গ সম্মেলনের “ জন্মও হত না। সেজন্য অভিবাসন নীতির সুযোগ তো আছেই, কিন্তু প্রতিকূলতার সম্ভাবনাও কম নেই। অভিবাসন নীতির সুযোগ নিয়ে এক বিশেষ ধর্মীয় অভিবাসীরা আশ্র্য্যদাতা দেশের সাংবিধানিক নীতির পরিবর্তনের ডাক দিয়েছে, ফলে ইউরোপ, নিউজিল্যান্ড বা অস্ট্রেলিয়ায় সামাজিক পরিকাঠামো বদলের প্রচেষ্টা চলছে, এ ঢেউ আমেরিকার তীরে সুনামির মত এখনও আছড়ে পরেনি, তবে পড়তে হয়ত আর বেশী দেরী নেই। বলতে দ্বিধা নেই ভারতীয় অভিবাসীগণ আমেরিকার আর্থসামাজিক, শিক্ষা ও সংস্কৃতির প্রেক্ষাপটে এক বিরাট পরিবর্তন সৃষ্টি করেছে। অভিবাসনের সুযোগ নিয়ে বাঙালিরা “বঙ্গ সম্মেলন” উপহার দিয়েছে সকল বাঙালি অভিবাসীদের, এর কৃতিত্ব প্রাপ্য সত্তরের দশকে আগত পূর্বসূরী বাঙালীগণ, যেমন রঞ্জিত দত্ত, সত্য সিনহা, বিনোদ ও মীরা দাস, প্রবীর রায়, পরবর্তীকালে প্রণব দাস, দীপক হালদার প্রমূখ ব্যক্তিগণ। আরো অনেকেই ছিলেন তাঁদের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফল হল আমাদের প্রিয় “কালচারাল এসোসিয়েসন অফ বেঙ্গল” বা “বঙ্গ সংস্কৃতি সংঘ।“ আর বঙ্গ সংস্কৃতির হাতধরে আবির্ভাব হল “বঙ্গ সম্মেলন” উত্তর আমেরিকার অভিবাসী বাঙালির মন ও হৃদয় মনোরঞ্জন করতে। বঙ্গ সম্মেলনের যাত্রা শুরু ১৯৮১ সালের জুলাইএর প্রথম সপ্তাহে, আর সে যাত্রা আজও অব্যাহত রয়েছে। তবে ২০২০র কোভিডে বঙ্গ সম্মেলন ভার্চুয়ালি আপনাদের সকলের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল আপনাদের সকলের দুয়ারে, সেটাও আমাদের কাছে এক অভিনব উপহার হয়ে এসেছিল আমাদের সকলের সম্মুখে, ভাবলে আজও আনন্দে মন ভরে উঠে আমাদের অনেকের। এবার আগামী ২০২৬ এর বঙ্গ সম্মেলনের প্রস্তুতি নিয়ে আপনাদের সামনে কিছু কথা তুলে ধরব।
২০২৬ এর বঙ্গ সম্মেলনের প্রস্তুতির উত্তেজনা সকল সেচ্ছাসেবক কর্মীদের মধ্যে বিপুল উৎসাহের সৃষ্টি করেছে। ২০২৬ এর বঙ্গ সম্মেলনের আহ্বায়ক (কনভেনর) মিলন আওন সিএবির একজন অভিজ্ঞ কর্মী, তাঁর উপর ২০২৬এর বঙ্গ সম্মেলন পরিচালনার দায়িত্ব বর্তেছে। তাঁকে সাহায্য করার জন্য পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট একটি স্টিয়ারিং কমিটির উপর দায়িত্ব পরেছে। যে কোন বঙ্গ সম্মেলনেই সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠান দুটির নাম = উদ্বোধনী অনুষ্ঠান (ওপেনিং সেরিমনি) এবং সমাপ্তি অনুষ্ঠান (ক্লোজিং সেরিমনি)। তারপর আছে বিজনেস সেমিনার, মেডিক্যাল সেমিনার, সাহিত্য আলোচনা, ইয়ুথ ফোরাম, নৃত্য, সঙ্গীত, নাটক এবং আরও কত কি, এক কথায় মনমাতানো অনুষ্ঠানের রমরমা। তারপর রবিবারে সমাপ্তি অনুষ্ঠানের পরে শুরু হয়ে যায় বম্বের সঙ্গীত শিল্পীদের গাওয়া হিন্দি গানের ধামাকা। এবার এ ধামাকা সৃষ্টির একচ্ছত্র অধিনায়ক হবেন একমেবদ্বিতীয়ম মুম্বাইএর বাঙালি সঙ্গীত শিল্পী শ্রী কুমার সানু।
২০২৬ এর ৩রা জুলাই বঙ্গ সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান সুরু হবে শতাধিক নৃত্যনৃত্যিকার নৃত্যের তালে তালে, প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের আত্মিক সঙ্গমের চিন্তাধারা নিয়ে সৃষ্টি “একাত্মম” দিয়ে। অনুষ্ঠানের শীর্ষে থেকে পরিচ্চালনা করবেন বহু অভিজ্ঞতার শক্তিতে বলীয়ান কোরিওগ্রাফার শ্রী কুমার শর্মা এবং আমাদের ডালিয়া সেন। নাটকে অংশ নেবেন একদা বহু আলোচিত আন্দোলন সৃষ্টিকারী নাট্যসংস্থার বর্তমান কর্ণধার নাট্য জগতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ তারকা শ্রী পার্থ প্রতিম দেব। নাটকের নাম “সওদাগরের নৌকা”। নাটকে অংশ গ্রহণ করবেন অনেক স্থানীয় অভিনেতা ও অভিনেত্রীবৃন্দ। সিনেমায় থাকছে পুরনো দিনের বহু আলোচিত ও প্রতিষ্ঠিত সিনেমা যেমন ‘চোখের বালি’, পথের পাঁচালি প্রভৃতি সিনামা। সঙ্গীত জগতের উজ্জ্বল তারকাদের উপস্থিতিতে বঙ্গ সম্মেলনের আকাশ আলোকিত হয়ে উঠবে। উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের কিংবদন্তী তারকাবৃন্দ যেমন ওস্তাদ আমজাদ আলি খাঁন, পন্ডিত তন্ময় বসু, বিখ্যাত কম্পোজার ও সঙ্গীত বিশারদ শ্রী শান্তনু মৈত্র প্রমূখদের সাথে আধুনিক, রবীন্দ্রসঙ্গীত, নজরুলগীতি, ভক্তিগীতি ইত্যদির প্রথিতযশা শিল্পীবৃন্দ লাইজা আহমেদ লিসা, অদিতি মুন্সী, অনীক ধর, যোধিনী, জয়শংকর, চন্দ্রিকা, চন্দ্রিমাদের সুরেলা কন্ঠে বঙ্গ সম্মেলনের প্রাঙ্গন মুখোরিত হয়ে উঠবে। এবারের সংযোজন বাচিকশিল্পী মৌসুমী হোসেন। বঙ্গ সম্মেলনে এবার সাহিত্য আলোচনা নয়, হবে সাহিত্য উৎসব। উত্তর আমেরিকার লেখক লেখিকারা দর্শকদের সামনে স্বরচিত কবিতা, গল্প বা প্রবন্ধ পাঠের সুযোগ । বঙ্গ সম্মেলনের সাহিত্য উৎসবে আসছে নতুন সংযোজন ‘বইমেলা’। এছাড়া বিজনেস ফোরাম, মেডিক্যাল ফোরাম ইত্যাদি তো আছেই। প্রতি বছরের মত এ বছরও থাকছে বিভিন্ন কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তনীদের মিলোনোৎসব। এবছরের ক্লোজিং সেরিমনি ( সমাপ্তি অনুষ্ঠান) এর ‘চিন্তন’ হোল ‘ভালোবাসা ও শান্তি”, পরিচালনা করবেন শতাধিক অনুষ্ঠানের শ্রষ্টা কোরিওগ্রফার ও নৃত্যপটিয়সী শ্রিমতী সুনিত্রা কাইন্থ। তাঁকে সঙ্গ দেবেন উত্তর আমেরিকার শতাধিক উজ্জ্বল নৃত্যশিল্পী। ৫ই জুলাই সমাপ্তি উৎসবের পরে শুরু হবে হিন্দি গানের মহোৎসব। বলা বাহুল্য এ অনুষ্ঠানের নায়ক ও শ্রষ্টা আমাদের সকল বাঙালির গর্ব কুমার সানু।
প্রতিটি বঙ্গ সম্মেলনের অন্যতম আকর্ষন হোল – কলকাতা থেকে আগত পণ্যসামগ্রী। বেঙ্গল জুয়েলার্স তো আসছেই, সাথে আরও অনেক অতিথি বিক্রেতা, বলরামের চানাচুর, আদি ঢাকেশ্বরীর বেনারসী শাড়ী ইত্যাদি। আহারাদির জন্য থাকছে কয়েকটি রেস্টুরেন্ট সংস্থা। এ ছাড়া দর্শকদের সুবিধার জন্য থাকবে হোটেল থেকে অনুষ্ঠান অঙ্গন পর্যন্ত বিনামূল্যে পর্যাপ্ত বাস পরিবহনের ব্যবস্থা, না চাইলে আপনাকে ‘ড্রাইভও’ করতে হবে না বঙ্গ সম্মেলনে অংশ গ্রহণ করতে। বঙ্গ সম্মেলনের আয়োজকগণ অক্লান্ত পরিশ্রম করে চলেছেন দর্শকদের একটি নিখুঁত বঙ্গ সম্মেলন উপহার দেওয়ার জন্য। মনে হয় – কর্মকর্তা ও সেচ্ছাসেবকদের অক্লান্ত পরিশ্রম ২০২৬ এর বঙ্গ সম্মেলনকে উপভোগের অন্য মাত্রায় নিয়ে যাবে দর্শকদের।
এ প্রতিবেদনের পাঠকদের প্রতি অনুরোধ রইল – কোনরকম দ্বিধা না করে ২০২৬ এর জুলাইএর ৩,৪,আর ৫ এর বঙ্গ সম্মেলনের টিকেট যত তাড়াতাড়ি সম্ভব কিনুন কারণ তত তাড়াতাড়ি NABC আপনার জন্য হোটেলরুম সংরক্ষন করতে সক্ষম হবে, আপনি কম রেটে রুম পাবেন। বিশ্বকাপ ফুটবলের জন্য ২০২৬এর জুলাই মাসে সকল হোটেল মূল্যবৃদ্ধি করবে বলে ঠিক করেছে। রেজিস্ট্রেসন করতে যত দেরী করবেন হোটেলের জন্য আপনাকে তত বেশী মূল্য দিতে হবে। সুতরাং আর দেরী নয়, আজই বঙ্গ সম্মেলনের জন্য রেজিস্ট্রেসন করুন অন্যথা অহেতুক মূল্যবৃদ্ধির শিকার হতে পারেন। ২০২৬ সালের ৩রা জুলাই আপনাদের সাথে দেখা হবে বঙ্গ সম্মেলনের আনন্দোৎসবের অঙ্গনে । সকলে ভালো থাকুন কামনা করে এ প্রতিবেদন শেষ করছি।

