রবীন্দ্রনাথ: নোবেল পুরস্কার

১৯১২ সালের মার্চ মাসে রবীন্দ্রনাথ তৃতীয়বার বিলাত যাত্রার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলেন। যাত্রার ঠিক পূর্বরাত্রে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ায় বিদেশযাত্রা স্থগিত রেখে কবি বিশ্রাম নিতে চলে গেলেন শিলাইদহে। এই সময়ে তিনি তাঁর গীতাঞ্জলি ও অন্যান্য কাব্যের ইংরেজি অনুবাদে হাত দিয়েছিলেন।অবশেষে সুস্থ হয়ে যখন তিনি মে মাসে জাহাজে করে রওনা হলেন, তখন অনুবাদের খাতাটি ছিল তাঁর পকেটে। জাহাজে যেতে যেতে খাতাটি ভরে যাওয়ায় দ্বিতীয় খাতা শুরু হলো। ১৬ জুন, ১৯১২ যখন তিনি ইংলন্ডে পৌঁছলেন তখন তিনি প্রথম খাতাটি উইলিয়াম রোটেনস্টাইনের হাতে তুলে দিলেন।রোটেনস্টাইন এই খাতার তিনটি টাইপ কপি  তৎকালীন তিন বিখ্যাত মনীষী ডব্লিউ বি ইয়েটস, স্টপফোর্ড ব্রুক ও এন্ডরু ব্র্যাডলিকে পাঠালেন। তিনজনেই রবীন্দ্রনাথের কবিতাগুলি পড়ে তাঁদের উচ্ছ্বাস ব্যক্ত করেন। ব্র্যাডলি রোটেনস্টাইনকে পত্রযোগে জানান “It looks as though we have at last a great poet among us again”. ব্রুক লেখেন “I wish I were worthy of them”. ইয়েটস, ১০ জুলাইয়ের এক প্রশস্তি ভাষণে বলেন “I know of no man in my time who has done anything in the English language to equal these lyrics.”৩০শে জুন, রোটেনস্টাইনের গৃহে, এক বিশিষ্ট শ্রোতৃমন্ডলীর সামনে ইয়েটস এই কবিতাগুলির কয়েকটি পাঠ করে শোনান। ইংলন্ডের বিদ্বজ্জন সমাজে রবীন্দ্রনাথের সেই প্রথম আত্মপ্রকাশ। বিভিন্ন সূত্র থেকে শ্রোতাদের আনন্দ, উচ্ছ্বাস ও বিস্ময়ের কথা আমরা জানতে পারি। শ্রদ্ধার্ঘ্য প্রদান, সংবর্ধনা ও অভিনন্দন চলতে থাকে। পরবর্তী উথ্থান ধূমকেতুর চেয়েও দ্রুত। ১লা নভেম্বর, ১৯১২, ইংরেজি গীতাঞ্জলির – Gitanjali, (Song Offerings) – সীমিত সংস্করণ প্রকাশ করে লন্ডনের ইন্ডিয়া সোসাইটি। ১লা মার্চ, ১৯১৩, ম্যাকমিলান বার করে ইংরেজি গীতাঞ্জলির সুলভ সংস্করণ।  ১২ নভেম্বর, ১৯১৩, স্টকহম থেকে আসে নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তি সংবাদ। ৩০ জুন, ১৯১২ থেকে ১২ নভেম্বর, ১৯১৩, সতেরো মাসেরও কম একটি সময়ের পরিসরে, প্রতীচ্যের কাছে অপরিচিত এক ভারতীয় বাঙালী কবি জিতে নিয়ে গেলেন পৃথিবীর সর্বোচ্চ পুরস্কার। মানবজাতির ইতিহাসে এর তুলনা বিরল। আর সেইসঙ্গে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে বরাবরের জন্য এক সম্মানের আসনে বসিয়ে গেলেন, যদিও তাঁর পুরস্কারটি ছিল একটি ইংরাজি কাব্যগ্রন্থের জন্য।এই ঘটনাকে মনে রেখে Tagore Research Institute বহু বছর ধরে ৩০ জুন দিনটিকে “আন্তর্জাতিক রবীন্দ্রকাব্যপাঠ দিবস” হিসেবে পালন করে আসছে। আমরা আপনাদের অনুরোধ করি এই দিনটিতে আপনারা নিজের মতন করে, সে গৃহে হোক বা কর্মক্ষেত্রে, রবীন্দ্রনাথের একটি (বা একাধিক) কবিতা পাঠ করুন। যে ঘটনা বাংলা ভাষাকে পৃথিবীর কাছে পরিচিত করাল, সম্মানের আসন প্রদান করল, বছরে একদিন অন্তত আমরা তাকে স্মরণ করি। (এই বক্তব্যের তথ্য সবই সংগৃহীত হয়েছে শ্রী সৌরীন্দ্র মিত্রের “খ্যাতি অখ্যাতির নেপথ্যে” গ্রন্থের থেকে, যার প্রকাশকাল ১৯৭৭। পরবর্তীকালে কোন কোন গবেষক বলেছেন রোটেনস্টাইনের গৃহে কাব্যপাঠের তারিখ ৩০ জুন, ১৯১২ না হয়ে, ৭ জুলাই, ১৯১২ ও হতে পারে। আমরা তারিখ বিতর্কে যাচ্ছিনা, আমরা ঘটনাটিকেই স্মরণ করতে চাই, এবং ৩০ জুন দিনটিকেই আমরা আন্তর্জাতিক রবীন্দ্রকাব্যপাঠ দিবস হিসেবে ধার্য করেছি।)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *