বলেছিলাম তো, ১০ই ডিসেম্বর কিচ্ছু হবেনা? 

সীতাংশু গুহ 

বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসকে কারাগারে ডিভিশন দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন জানিয়েছেন যে, পল্টন নয়, শনিবার সকালে রাজধানীর গোলাপবাগ মাঠে তাঁদের ‘গণসমাবেশ’ হবে। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, বিএনপির অর্ধেক পরাজয় হয়ে গেছে, তারা পল্টনে সমাবেশ করতে পারেনি। আমার আগের লেখায় বলেছিলাম, ১০ই ডিসেম্বর কিচ্ছু হবেনা; আপাতত: এটি নিশ্চিত এবং মানুষ হাঁফছেড়ে বেঁচেছে। ধারণা করি, এখন বিএনপি’র সমাবেশ হবে শান্তিপূর্ণ। হয়তো এরপর বিএনপি’র নেতারা জেল থেকে মুক্তি পাবেন? 

ইতোপূর্বে পল্টন ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যান নিয়ে উত্তেজনা বাড়ছিলো। ঢাকায় একজন কট্টর আওয়ামী সমর্থক-কে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, বিএনপি পল্টনেই কেন সমাবেশ করতে চাচ্ছে? তিনি বলেছিলেন যে, বিএনপি জানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ভরার মত লোক হবেনা, তাই ‘পল্টন’, কারণ ‘চিপা’ রাস্তায় লোক কম হলেও বড় সমাবেশ মনে হবে। যাঁরা বিএনপি অফিস, মানে পল্টনের ওই’ স্থানটি চেনেন, তাঁরা জানেন, কথাটি সত্য। বললাম, লোক হবেনা কেন, বিএনপি’র সভায় তো এখন প্রচুর মানুষ হচ্ছে। তিনি বললেন, ‘ফখরুল সাহেব-কে রেখে তাঁর কর্মীদের পালিয়ে যাবার দৃশ্যটি দেখেছেন তো? বললাম, হ্যাঁ, দেখেছি। বললেন, এটাই বাস্তবতা। তদুপরি সরকার হার্ডলাইনে। হেফাজতের পরিণতি তো তাঁরা জানে! 

একটি সমাবেশ নিয়ে এত হৈচৈ কেন হয়েছিলো তা বোঝা মুশকিল। জনসভা করে সরকার পতন ঘটানো যায়না, তা পাগলেও বুঝে। অথচ কিছু কিছু বক্তব্য এসেছে, যা উষ্কানীমূলক। দেখেশুনে মনে হচ্ছিলো, বিদেশিরা এরসাথে জড়িয়ে পড়ছে? বিদেশিদের কথাবার্তায় বিএনপি ও বিরোধীরা শক্তি পাচ্ছিলো।  সরকার ‘বড়মুখ’ করে কিছু বলতে পারছিলো-না, কারণ সরকারেরও গলদ আছে, পরপর দু’টি জাতীয় নির্বাচনে সরকারের ‘গণতান্ত্রিক ভাবমুক্তি’ ক্ষুন্ন হয়েছে, ‘বিশ্বাসযোগ্যতা’ কমে গেছে। বিএনপি সর্বদা ঘোলা পানিতে মাছে শিকার করতে চায়, তাই তাঁরা বিদেশীদের কাছে নালিশ করে বেড়াচ্ছিল। পেছনের দরজা দিয়ে ক্ষমতায় আসার স্বপ্ন দেখছিলো। অন্যদিকে, আওয়ামী লীগ ‘ধোয়া তুলসী পাতা’ নয়, তারাও মুখে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলে, সকল মূল্যবোধকে ধ্বংস করে, মৌলবাদের সাথে আপোষ করে, ব্যাংক ডাকাত, চোর, বদমাইশদের বিচার না করে, ক্ষমতায় টিকে থাকতে চাচ্ছে। 

শুক্রবার (৯ই ডিসেম্বর ২০২২) জেনেভা থেকে ওএমসিটি-সহ ১১টি সংগঠন বাংলাদেশকে হত্যা, গুম, নির্যাতন, জেল-জুলুম বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছে। এরআগে জাপানী রাষ্ট্রদূত কথা বলেছেন। ঢাকাস্থ ১৫টি দেশের দূতাবাস একসাথে বিবৃতি দিয়েছেন। চলতি সপ্তাহে মার্কিন রাষ্ট্রদূত কথা বলেছেন, এবং জাতিসংঘের বিশেষ রেপোটিয়ার ক্লেমেন্ট ভউল’র টুইটে যা বলেছেন, তা খুব একটা সুখপ্রদ নয়। এর প্রেক্ষিতে, বিশেষত: যুক্তরাষ্ট্র ও জাতিসংঘের দিকে দৃষ্টি রেখে বিদেশমন্ত্রী ড:মোমেন বলেছেন যে, এজন্যে একজন সাংবাদিক দায়ী, এবং ঐ সাংবাদিকের হোয়াইট হাউস ও জাতিসংঘে ঢোকার অনুমতি রয়েছে। মন্ত্রী আরো কিছু বলেছেন, তা নাইবা লিখলাম, তবে ক’দিন আগে জাপানী রাষ্ট্রদূতের বক্তব্য প্রসঙ্গে তিনি বলেছিলেন যে, রাষ্ট্রদূত ভালো, তাকে কিছু দুষ্ট লোক বিভ্রান্ত করেছে। বাংলাদেশের একজন সাংবাদিক হোয়াইট হাউস কভার করতেই পারেন, জাতিসংঘে তাঁর প্রবেশাধিকার থাকতেই পারে, এমনকি তিনি বিএনপি-পন্থী হতেই পারেন, কিন্তু তিনি একাই যুক্তরাষ্ট্র ও জাতিসংঘকে তাঁর ইচ্ছেমত সরকারের বিরুদ্ধে কাজে লাগাচ্ছেন, এটি একটু বেশি হয়ে গেলোনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী?

বোঝা যায়, বিদেশিরা বাংলাদেশ পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছেন এবং তাঁরা তা প্রকাশ্যেই জানাচ্ছেন। আমাদের কিছু নেতামন্ত্রীর কথাবার্তায় তাতে ‘আগুনে ঘি ঢালা’ হচ্ছে। আচ্ছা, বিদেশিদের সাথে আমাদের ফাইট করার দরকার কি? সরকার একই সাথে ‘বিএনপি ও বিদেশী’ দুই ফ্রন্টে যুদ্ধে নামছেন কেন? কেউ হয়তো বলতে পারেন, বিদেশিরা আমাদের দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলাচ্ছে কেন? এর উত্তর হচ্ছে, আমরাই তাদের সেই সুযোগ করে দিচ্ছি। মনে আছে, বিদেশমন্ত্রী বলেছিলেন যে, ‘দিল্লিকে অনুরোধ করেছি আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় রাখতে’? আপনি অনুরোধ করবেন, অন্যরা করবে না তা কি হয়? এটি তো সত্য, ক্ষমতায় যাওয়ার জন্যে আওয়ালী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি অতীতে বারবার বিদেশের কাছে ধর্ণা দিয়েছে, আজো এর ধারাবাহিকতা চলছে। এর মূল কারণ, রাজনৈতিক দলগুলো জনগণকে পাত্তা দেয়না, দেশে শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তরের কোন গ্রহণযোগ্য, সুষ্ঠূ ব্যবস্থা নেই, আমাদের নির্বাচনী ব্যবস্থা পক্ষপাত দোষে দুষ্ট। সুতরাং, এসব চলতেই থাকবে, যদিনা দেশের রাজনীতিকদের শুভবুদ্ধির উদয় হয়?

Leave a Reply

Your email address will not be published.