শিশু সাহিত্য পুরস্কার ২০২১

পার্থ রায়

গতকাল (৩০ জুলাই ২০২২) বিকেল পাঁচটায় জাতীয় গ্রন্থাগারের ভাষা ভবন প্রেক্ষাগৃহে (বেলভেডেয়র, আলিপুর, কলকাতা) সাহিত্য অকাদেমি আয়োজিত বাল সাহিত্য পুরস্কার ২০২১ অর্পণ সমারোহে ২২টি ভারতীয় ভাষার বিশিষ্ট সাহিত্যিকদের পুরস্কৃত করা হয়। এরপরে আজ (৩১ জুলাই ২০২২) সকাল সাড়ে দশটায় সাহিত্য অকাদেমি প্রেক্ষাগৃহে (৪, দেবেন্দ্রলাল খান রোড, কলকাতা) আয়োজিত পুরস্কার প্রাপক সম্মেলনে পুরস্কার প্রাপকেরা নিজেদের সৃজনাত্মক অভিজ্ঞতার কথা বলেন।

স্বাগত ভাষণ প্রদান করেন সাহিত্য অকাদেমির সচিব ড. কে. শ্রীনিবাসরাও। শুরুতেই তিনি সকল উপস্থিত বিদ্বজ্জন, পুরস্কার প্রাপক এবং অতিথি-অভ্যাগতদের সাদর সম্ভাষণ জানিয়ে আজকের অনুষ্ঠানের সুচনা করেন। সম্মেলনের সভাপতিত্ব করেন সাহিত্য অকাদেমির উপ-সভাপতি শ্রী মাধব কৌশিক। তিনি জানান যে লেখার সময়ে লেখকেরা যে অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যান তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এই পুরস্কার প্রাপক সম্মেলনে সরাসরি লেখকদের মুখ থেকে সেকথা শোনার দুর্লভ সুযোগ পাওয়া যায়। ড. মৃণাল চন্দ্র কলিতা (অসমীয়া) তাঁর বক্তব্যে জানান যে উপন্যাসের পাঠকসমাজ ছোটগল্পের পাঠকসমাজের তুলনায় অনেকটাই বড়। অনেক বিষয় ও কাহিনী রয়েছে যার বিন্যাস ছোটগল্পের সীমিত পরিসরে অসম্ভব। তাঁর মতে সমাজকে যে বিষয়গুলি নিরন্তর অসুবিধার মধ্যে ফেলছে সর্বত্র সেগুলিকে নিয়ে আলোচনার প্রয়োজন আছে, যাতে করে বিবেকবান জনগণের মধ্যে হওয়া এই চর্চা আমাদের আলোর পথ দেখাতে পারে। কীভাবে বাংলা শিশুসাহিত্যের অসামান্য সম্ভারের প্রভাবে নিজের লেখালিখি শুরু করেন তাই ফুটে ওঠে শ্রী সুনির্মল চক্রবর্তীর (বাংলা) ভাষণে। তিনি তাঁর বক্তব্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী, সুকুমার রায় এবং লীলা মজুমদারের মতো শিশুসাহিত্যিকদের অসামান্য লেখনীর কথা তুলে ধরেন। শ্রী রত্নেশ্বর নারজারি (বোড়ো) তাঁর ভাষণে নিজের জীবন ও সাহিত্যের কথা বলেন। তাঁর মতে তাঁদের সমাজের লোকসাহিত্যকে আগামী প্রজন্মের স্বার্থেই টিকিয়ে রাখার প্রয়োজন আছে এবং এই তাগিদ থেকেই তাঁর লেখা শুরু। শ্রী নরসিং দেব জামোয়াল (ডোগরী) তাঁর বক্তব্যে ডোগরী শিশুসাহিত্যের গোড়ার কথা তুলে ধরেন। এই প্রসঙ্গেই আসে লোকসাহিত্য এবং সাংস্কৃতিক পরম্পরার কথা। তাঁর নিজের লেখার সুচনা এবং ক্রমবিকাশ নিয়েও বলেন তিনি। শ্রীমতী অনিতা বচ্চারজনীর (ইংরেজি) মতে শিশু যেমন গ্রামের কোলে বিকশিত হয় ঠিক তেমনই সমাজই গড়ে তোলে লেখককে। কোনও লেখকের ক্ষেত্রে তাঁর পরিবার পরিজনের প্রভাব খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। একইসাথে ভারতীয় ভাষাগুলির বহুমাত্রিকতার ভূয়সী প্রশংসা করেন তিনি। শ্রী দেবেন্দ্র মেওয়ারি (হিন্দী) তাঁর নিজের লেখালিখির বিষয়বস্তু নিয়ে বক্তব্য রাখেন। তাঁর মতে শিশুদের দেখা আর না-দেখা জগত সৃষ্টিই শিশুসাহিত্যিকের লক্ষ, যাতে করে ওইসব লেখার মাধ্যমে জগতের সৌন্দর্য এবং রহস্য শিশুর সামনে প্রস্ফুটিত হয়ে থাকে। এই কারণেই তাঁর লেখায় প্রকৃতির বিবিধ রূপের ডালি উপচে পড়ে। ড. বাসু বেভিনাগিদাদ (কন্নড়) জানান যে প্রাপ্তবয়স্কের জন্যে লেখার থেকে শিশুর জন্যে লেখা অনেক কঠিন। শিশুর দৃষ্টিভঙ্গী থেকে সরে শিশুসাহিত্য সৃষ্টি অসম্ভব। শিশুর দৃষ্টি থাকা চাই — যে দৃষ্টিতে জগত স্বয়ংসম্পূর্ণ। তাতে নানা স্তরের সমাহার – কাল্পনিক থেকে বাস্তব – অদ্ভুতুড়ে থেকে শিক্ষণমূলক কাহিনী – বোধগম্য থেকে দুর্বোধ্য। তিনি এও জানান যে শুধুমাত্র নীতিকথা, উপদেশ এবং মজা দিয়েই শিশুসাহিত্যকে ঠেসে দেওয়া উচিত নয়। শিশুসাহিত্যের উদ্দেশ্য শিশুর মনে মানবিক ও দয়ার অনুভূতি জাগিয়ে তোলা – সময়ের সাথে তার মধ্যে মানবিক মূল্যবোধের বিকাশ ঘটানো। শ্রী মজিদ মাজাজি (কাশ্মিরী) সংক্ষেপে কাশ্মিরী সাহিত্যের কথা জানান। শিশুদের নির্মল, সীমাহীন বিদ্বেষহীন জগতের কথা তুলে ধরেন তিনি। এ জগত নিষ্পাপ বিশুদ্ধ। ছোটদের প্রতি তাঁর ভালোবাসা থেকেই তাঁর লেখার জন্ম। শ্রীমতী সুমেধা কামাত দেশাই (কোঙ্কনী) জানান যে তিনি চেয়েছিলেন লেখার মাধ্যমে তাঁর দৈনন্দিন লড়াইয়ের কথা তুলে ধরতে। শিশুদের জন্য লেখায় চাই সহজ সরল ভাষা, সংক্ষিপ্ত বাক্য, আকর্ষণীয় ঘটনাপ্রবাহ এবং পশু-পাখি-মানুষের চিত্রানুগ বর্ণনা। শিশুদের কল্পনার জগতকে মূর্ত করে তোলাই সবচাইতে কঠিন কাজ। সৎ ও সরল শিশুরা মিথ্যার জগতে খাপ খাওয়াতে পারে না। তাদের কৌতূহলী মনই তাঁকে শিশুদের জন্য কলম ধরতে উদ্বুদ্ধ করে। মৈথিলী সাহিত্য পত্রিকাগুলি ড. আনমোল ঝার (মৈথিলী) লেখালিখির উন্মেষ ঘটাতে যে ভূমিকা নিয়েছিল তা পরিস্ফুট হয় তাঁর বক্তব্যে। বর্তমান আধুনিক জগতের ব্যস্ততা কীভাবে শিশুদের মনের ওপরে খারাপ প্রভাব ফেলছে তা ফুটে ওঠে তাঁর ভাষণে। শ্রী রঘুনাথ পালেরি (মলয়ালম) তাঁর ভাষণে তাঁর পিতামাতার কথা বলেন যাঁদের প্রভাবেই তাঁর লেখনীর পথ চলা শুরু। শ্রী নিংগমবম যদুমণি সিং (মণিপুরী) তাঁর বক্তব্যে শিশুদের খেলাধুলা, নাটক এবং পারিবারিক পরম্পরা কীভাবে তাদের বিকাশে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে সেই কথা তুলে ধরেন। আজকের শিশুদের দ্রুত-পরিবর্তনশীল জগতের কথাও আসে তাঁর ভাষণে। শ্রী সঞ্জয় ওয়াগ (মরাঠী) কীভাবে লেখার জগতে পদার্পণ করেন সেই কথাই ফুটে ওঠে তাঁর ভাষণে। শিশুদের ওপরে আধুনিক ব্যাস্ত জীবনের নেতিবাচক প্রভাব নিয়েও তিনি কথা বলেন। এর ফলে পূর্বতন বৃহৎ পরিবার কীভাবে ভাঙছে এবং শিশুরা চিরপরিচিত পারিবারিক স্নিগ্ধ ঘেরাটোপ থেকে অসময়ে বেরিয়ে আসতে বাধ্য হচ্ছে সেই কথা উঠে আসে তাঁর ভাষণে। সাধারণ জীবনযাত্রার ওপরে অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং গ্রামীণ সমস্যার প্রভাব নিয়েও কথা বলেন তিনি। শ্রী সুদর্শন অম্বাতে (নেপালী) তাঁর ভাষণে জানান যে অন্যান্য প্রভাবশালী ভারতীয় ভাষার তুলনায় নেপালী সাহিত্যে শিশুসাহিত্যের সম্ভার বেশ কিছুটা কমই। নেপালী সাহিত্যের প্রকাশনা জগতের সমস্যা নিয়েও কথা বলেন তিনি। ড. দিগরাজ ব্রহ্ম (ওড়িয়া) অনুপস্থিত থাকায় তাঁর পুরস্কার প্রাপ্তি প্রতিভাষণ পড়ে শোনান তাঁর পত্নী শ্রীমতী জ্যোৎস্নারানী ব্রহ্ম। এই ভাষণে শ্রী ব্রহ্মের জীবন ও সাহিত্যের কথা উঠে আসে। শ্রীমতী কীর্তি শর্মার (রাজস্থানী) বাল্যকালে যেসকল সাহিত্য পত্রিকা এবং সাহিত্যকীর্তি তাঁর ওপরে প্রভাব ফেলেছিল সেগুলির কথা তাঁর ভাষণে উঠে আসে। তিনি রাজস্থানের সাহিত্য পরম্পরার কথাও বলেন। শ্রীমতী আশা আগরওয়াল (সংস্কৃত) তাঁর ভাষণে তিনি কীভাবে লেখালিখির জগতে আসেন সেই কথা বলার পাশাপাশি তাঁর ওপরে ঋষি অরবিন্দ এবং শ্রীমার প্রভাবের কথাও বলেন। শ্রীমতী শোভা হাঁসদা (সাঁওতালী) তাঁর ভাষণে তাঁর নিজের জীবন ও সাহিত্যের কথা বলার পাশাপাশি সাঁওতালী শিশুসাহিত্যর গুরুত্বের কথাও বলেন। তামিল শিশুসাহিত্যের উৎস ও বিকাশের কথা উঠে আসে শ্রী এম. মুরুগেশের (তামিল) ভাষণে। তিনি শিশুদের গল্প শুনিয়ে তাঁদের মতামত নিয়ে থাকেন। গল্প যদি তাদের ভালো না লাগে তাহলে সেই গল্প নিয়ে তিনি আর এগোন না। তাঁর মতে, শিশুর বয়সের ওপরে তার জন্য লেখা গল্পের ভাষা নির্ভর করে। ড. দেবরাজু মহারাজু (তেলুগু) তাঁর ভাষণে “আমি” ধারণাটির ব্যাপকতা ও তার বিভিন্ন ব্যাখ্যা নিয়ে কথা বলেন। পুরস্কার প্রাপকদের মধ্যে ড. দিগরাজ ব্রহ্ম, শ্রী কিশিন খুবচন্দানি “রঞ্জায়াল” এবং শ্রী কৌসর সিদ্দিকী শারীরিক অসুবিধার কারণে অনুষ্ঠানে অনুপস্থিত ছিলেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *