বিশ্ব অর্থনীতির গতি-প্রকৃতি এবং ‘আরেক’ বাংলাদেশ

ড. আতিউর রহমান       (লেখক : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু চেয়ার অধ্যাপক,  অর্থনীতিবিদ এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর)

করোনাসংকটে বিশ্ব অর্থনীতি আসলেই যেন দিকহারা হয়ে গেছে। করোনা ভাইরাস নিয়ন্ত্রণে আনতে গিয়ে অনেক দেশেই লকডাউনের ফলে অর্থনীতির চাকা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। কয়েক মাস ধরে বন্ধ থাকার পর ধীরে ধীরে বিশ্ব অর্থনীতির দরজা খুলতে শুরু করেছে। কিন্তু এখনো জোর দিয়ে বলা যাচ্ছে না, বিশ্ব অর্থনীতির ভাগ্যে কী লেখা আছে। কেননা করোনার দাপট সেই অর্থে কমেনি। তাই বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্ব অর্থনীতি এ বছর অন্তত ৫.২ শতাংশ হারে সংকুচিত হবে। কদিন আগে মাদ্রিদে অনুষ্ঠিত এক ডিজিটাল সম্মেলনে বিশ্বব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ কারমেন রেইনহার্ট বলেছেন যে, বিশ্ব অর্থনীতি কোভিড-পূর্ববর্তী অবস্থায় ফিরে আসতে আরো অন্তত পাঁচ বছর লেগে যাবে। ‘লকডাউন’ উঠে যাওয়ার কারণে হয়তো সাময়িকভাবে বিশ্ব অর্থনীতি কিছুটা চাঙ্গা হবে। তবে দীর্ঘমেয়াদি পুনরুদ্ধার নিশ্চিত হতে দীর্ঘ সময় লেগে যাবে। আর পুনরুদ্ধারের এই প্রক্রিয়া একেক দেশে একেক সময়, একেক রকম হতে পারে। তবে যেভাবেই হোক না কেন, ধনী দেশের গরিবদের অবস্থা আরো খারাপ হবে। অর্থনৈতিক বৈষম্যও বাড়বে। গরিব দেশে দারিদ্র্য তাদের বড়ই বেকায়দায় ফেলে দেবে। গত ২০ বছরের মধ্যে এই বছরই প্রথমবারের মতো বিশ্বে দারিদ্র্যের হার আবার বাড়বে। বিশ্বব্যাংকের আরেকটি প্রতিবেদনে মানবিক পুঁজির বিপর্যয়ের কথা বলা হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের ‘মানবিক পুঁজি সূচক-২০২০’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে সর্বত্রই পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। কম আয়ের দেশগুলোতে এই মহামারির আগ পর্যন্ত শিশুদের মানবিক পুঁজির বড় ধরনের উন্নতি হচ্ছিল। পুরো এক দশক ধরে এই সূচকের যে উন্নতি হচ্ছিল তা কোভিডের এক ধাক্কায় বড় ঝুঁকির মধ্যে পড়ে গেছে। বাচ্চারা স্কুলে যেতে পারছে না। স্কুলে ভর্তির হার কমে গেছে। স্কুল থেকে ঝরে পড়ার হার বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি বেড়েছে। অপুষ্টির হার বেড়েছে। নারীর ক্ষমতায়ন থমকে গেছে। গরিব পরিবারের খাদ্যনিরাপত্তা বিঘ্নিত হচ্ছে। আয়-রোজগার কমে যাওয়ার ফলে দারিদ্র্য দ্রুত বাড়ছে। পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়া অন্তর্ভুক্তিমূলক না করা গেলে টেকসই উন্নয়নের ভাবনা দুর্ভাবনায় পরিণত হতে পারে বলে বিশ্বব্যাংক সভাপতি মন্তব্য করেছেন। স্কুলে যেতে না পারা শিশুদের নিয়মিত টিকাও দেওয়া হচ্ছে না। মহামারির আগে নারীর ক্ষমতায়ন হচ্ছিল—এ কথা ঠিক। তা সত্ত্বেও তাদের কর্মসংস্থানের সুযোগ পুরুষদের চেয়ে ২০ শতাংশ কম ছিল। আর মহামারির এই দুঃসময়ে নারীর কাজের সুযোগ আরো কমে গিয়েছে।

বিশ্ব অর্থনীতির মতোই এশিয়ার অর্থনীতিতেও ধস নেমেছে। এশিয়ার তিন-চতুর্থাংশ দেশের প্রবৃদ্ধির সংকোচন হবে এ বছর। চীনের অর্থনীতি ইতিবাচক ধারায় থাকলেও আগের চেয়ে তা অনেক কম হবে। সেই বিচারে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির হার বেশ আশাব্যঞ্জক বলেছে এডিবি। বিশেষ করে, ভারতের নেতিবাচক প্রবৃদ্ধির তুলনায় এ বছর বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির হার ৬.৮ শতাংশ হবে। এ কথা বলছে এশীয় ডেভেলপমেন্ট আউটলুক। বাংলাদেশ নিজে অবশ্য বলছে, এই হার আরো বেশি হবে। বাংলাদেশের অর্থনীতির হালের ম্যাক্রো-অর্থনৈতিক সূচকগুলো বেশ আশা জাগানিয়া। জুলাই মাসের সূচকগুলোর দিকে তাকালে আসলেই মনে হয় এ যেন ‘আরেক’ বাংলাদেশ। কয়েক মাস আগেও বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করেছিলেন যে প্রবৃদ্ধি হলেও তা হবে খুবই সামান্য। তারা বলেছিলেন, রেমিট্যান্সে ধস নামবে; রপ্তানির হার ব্যাপকভাবে সংকুচিত হয়ে যাবে; লেনদেনের ভারসাম্য বড় অঙ্কের ঘাটতির মধ্যে পড়ে যাবে; কিন্তু বাস্তবে জুলাই শেষে যেসব তথ্য মিলছে তা ভিন্নতর। যেমন লেনদেনের ভারসাম্য ঘাটতি কাটিয়ে এরই মধ্যে ইতিবাচক ধারায় ফিরে এসেছে। ২০১৯-এর জুলাই মাসেও এই ভারসাম্য ছিল ৭৭ মিলিয়ন ডলারের ঘাটতিতে। সেই ভারসাম্য এ বছরের জুলাই শেষে ১.১২৭ বিলিয়ন ডলারের উদ্বৃত্তে পৌঁছে গেছে। বলা হচ্ছে, আমদানির হার কমেছে ১৯ শতাংশ এবং প্রবাস আয় বেড়েছে ৬২ শতাংশ (জুলাই টু জুলাই) বলে এটা সম্ভব হয়েছে।

লেনদেনের ভারসাম্যের উদ্বৃত্তের কারণে সার্বিক ভারসাম্যের উদ্বৃত্ত হয়েছে ১.১ বিলিয়ন ডলার। তার মানে বৈদেশিক মুদ্রার মজুত বেড়েছে। তাই সরবরাহ বেশি থাকার কারণে টাকার মূল্যমান বেড়ে যাওয়ার চাপ ছিল বেশ। বিনিময়হার স্থিতিশীল রাখার স্বার্থে বাংলাদেশ ব্যাংককে বাজার থেকে গত অর্থবছরে প্রায় আড়াই বিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক মুদ্রা কিনতে হয়েছে। আর এই পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা কেনা মানেই প্রায় ১৮ হাজার কোটি টাকা ঢুকেছে অর্থবাজারে। ফলে ব্যাংকের তারল্য পরিস্থিতির আরো উন্নতি হয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংক আগেভাগেই মুদ্রানীতিকে নমনীয় করে ফেলেছিল। রেপোরেট, এসএলআর, সিআরআর কমিয়েছে। এডিআর বাড়িয়েছে। রেপোর সময়সীমা বাড়িয়েছে। বিদেশি মুদ্রায় রপ্তানি খাতে ঋণের পরিমাণ বাড়িয়েছে। এসব করে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক মিলে ১ লাখ কোটি টাকারও বেশি প্রণোদনা কর্মসূচি বাজেট ঘোষণার বেশ আগেই ঘোষণা করা হয়েছিল। অনেকগুলো পুনঃ অর্থায়ন কর্মসূচি চালু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সুদে ভর্তুকি দিয়ে তা করা হয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দ্রুত ও বিচক্ষণতার সঙ্গে এসব কর্মসূচি ঘোষণা করায় ব্যবসায়-বাণিজ্যের পরিবেশ উন্নত হয়েছে। তাই ব্যবসায়ে ভরসার পরিবেশ বিরাজ করছে। তাছাড়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হস্তক্ষেপে সরকারি বন্ড ও বিলের সম্ভাব্য আয় কমে এসেছে। ব্যাংকগুলো তাই ব্যক্তি খাতে ঋণ দেওয়া শুরু করেছে। জুলাই মাসে ব্যক্তি খাতের ঋণ দেওয়ার হার বেড়ে ৯.২ শতাংশ হয়েছে। এই হার জানুয়ারি মাসের সমান। এই ধারা ইতিবাচক। যদিও মুদ্রানীতির টার্গেটের (১৪.৮ শতাংশ) চেয়ে ঢের কম, তবুও ঋণ দেওয়ার হার তো বাড়ছে। সরকারি ঋণের হার আরো অনেক বেশি। গেল অর্থ বছরে তা ৫১ শতাংশ বেড়েছে। রাজস্ব কম আদায়ের প্রেক্ষাপটে তা খুবই স্বাভাবিক। বাজেট ঘাটতি হয়তো খানিকটা বাড়ছে। মূল্যস্ফীতির ভয় কম। তাই তা বাড়ছে বাড়ুক। তবে টাকাটা যেন ঠিকঠাক খরচ হয়।

অর্থনীতি যে আড়মোড়া ভেঙে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে তা আরো কয়েকটি সূচক থেকে বোঝা যায়। যেমন এই জুলাই মাসে মোবাইল আর্থিক সেবার পরিমাণ আগের বছরের জুলাই থেকে ৬৮ শতাংশ বেড়েছে। এই জুলাইয়ে মোট লেনদেন হয়েছে ৬২ হাজার ৯৯৯ কোটি টাকা। গত এই জুন থেকে জুলাইয়ে তা বেড়েছে ৪০.৫ শতাংশ। এজেন্ট ব্যাংকিংয়েও অনুরূপ চাঙ্গা ভাব লক্ষণীয়। জুন নাগাদ এ খাতে হিসাবের সংখ্যা হয়েছে ৭৪ লাখের মতো। আগের জুন থেকে তা ১১৫ শতাংশ বেশি। গত জুলাই পর্যন্ত এক বছরে ১০ হাজার ২২০ কোটি টাকার আমানত সংগ্রহ করেছে এজেন্ট ব্যাংকং। এক বছরে বৃদ্ধির হার ৯৩ শতাংশ। ঋণ দিয়েছে ৭২০ কোটি টাকা। বৃদ্ধির হার ২০৩ শতাংশ। ঋণ দেওয়ার প্রবণতা আরো বাড়াতে হবে ব্যাংকগুলোকে। তবে আশার কথা, দূর-দূরান্তের গ্রামীণ অর্থনীতিতে এজেন্টরা (৮৫ শতাংশ) টাকা নিয়ে যাচ্ছে। মোবাইল এবং এজেন্ট ব্যাংকিং মিলে গ্রামীণ অর্থনীতিকে বেশ চাঙ্গা রেখেছে। মনে রাখা চাই, গ্রামীণ অর্থনীতিই আমাদের অর্থনীতির বড় রক্ষাকবচ। নিঃসন্দেহে কৃষি ভালো করছে বলে আমাদের খাদ্যসংকট নেই।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বলিষ্ঠ নেতৃত্বে অর্থনীতির ঘুরে দাঁড়ানোর এই ভঙ্গিটি আসলেই আশা জাগানিয়া। আমরা যদি তার দেওয়া প্রণোদনা কর্মসূচিগুলো সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে পারি, তাহলে আগামী দিনে আমাদের অর্থনীতি আরো জোর কদমে হাঁটবে। এখনো কৃষি ও এসএমই প্রণোদনার মাত্র ২০ শতাংশের মতো বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়েছে। অথচ বড় শিল্প ইউনিটগুলো তাদের প্রাপ্য প্রণোদনার ৭৩ শতাংশ নিয়ে নিয়েছে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংকগুলোর ওপর চাপ বাড়িয়েছে। যারা পারছে না তাদের জন্য বরাদ্দ করা টাকা, যারা পারছে তাদের দেওয়ার কথা ভাবছে। খেয়াল রাখতে হবে, এই টাকা যেন ঠিকঠাক বিনিয়োগে যায়। সেজন্য এই ঋণ ঠিকমতো বিনিয়োগ হলো কি না (এন্ড ইউজ) এবং তার ফলাফল কী হলো তা যাচাই করতে একটি নিরপেক্ষ মূল্যায়ন সমীক্ষা হলে ভালো হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের গবেষণা বিভাগও এটা করতে পারে। সর্বোপরি বাংলাদেশ ব্যাংক, স্থানীয় প্রশাসন, চেম্বার, ব্যাংকসহ সকল অংশীজনকে আরো তত্পর হতে হবে। শুধু প্রণোদনা কর্মসূচিগুলোর বাস্তবায়নের ধারা দেখার জন্য ডিজিটাল প্রযুক্তিনির্ভর ড্যাশ বোর্ড ধাঁচের একটি মনিটরিং পদ্ধতি খুবই জরুরি হয়ে পড়েছে।

এভাবে এগোতে পারলে পুরো পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়াটি জনগণের মনে আরো ভরসার পরিবেশ তৈরি করতে সাহায্য করবে। প্রতিটি সংকটই নয়া সম্ভাবনার সুযোগ সৃষ্টি করে। এই দুঃসময়কে সুসময়ে রূপান্তর করার ক্ষেত্রে আমাদের বিচক্ষণ নেতৃত্বের ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার সংকল্পটি খুবই কাজে দিয়েছে। সেই সঙ্গে সরকারের অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তির কৌশল আমাদের যথেষ্ট সাহস ও সুযোগ তৈরি করতে সাহায্যে করেছে। আমাদের তাই আগামী দিনগুলোতে আধুনিক কৃষি, আইসিটি, সবুজ জ্বালানি, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষতা বৃদ্ধি, সরবরাহ চেইন মজবুত করা ও কর্মসংস্থান বাড়ায় এমন অবকাঠামো নির্মাণে বাড়তি মনোযোগ দিতে হবে। আর তা করা গেলে নিশ্চয় আমাদের অর্থনীতির গতিময়তা আরো বাড়বে। তখন বাংলাদেশের এই সাফল্যের গল্পটি বিশ্ববাসীর নজর বাড়বে। ধ্বংসস্তূপ থেকে উঠে আসা ভিন্নমাত্রার আরেক বাংলাদেশকে দেখে অনেকেই বিস্মিত হবেন। আসুন সবাই মিলে আমরা আমাদের স্বপ্নের বাংলাদেশের অর্থনীতি ও সমাজের গতিময়তাকে আরো গতিশীল করতে সহযোগিতা করি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *