পালাবদলের পর পশ্চিমবঙ্গ : জনগণের আশা প্রত্যাশা

অরুণ কুমার
বিধানসভা নির্বাচনের পর পশ্চিমবঙ্গে বড় রাজনৈতিক পালাবদল ঘটেছে এবং বিজেপি রাজ্যে সরকার গঠন করেছে। এই নতুন সরকার প্রতিষ্ঠার পর স্বাভাবিকভাবে জনসাধারণের মনে আশা প্রত্যাশা জেগেছে কিন্তু অপরদিকে নতুন সরকারের সামনে রয়েছে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ।
সে বিষয়ে আলোকপাত করার আগে কিছু কথা উল্লেখ না করলেই নয়। এই নির্বাচনে এস আই আর বিজেপিকে নিশ্চয়ই সাহায্য করেছে। কিন্তু রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন বিজেপি শুধু এস আই আর এর কারণে জেতেনি। বিজেপি ক্ষমতার সুযোগ পেয়ে গিয়েছে তৃণমূলের বিরুদ্ধে জনগণের ভোটারের রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে। এটা অন্যতম কারণ বিধান সভা নির্বাচনে বাংলার মানুষ তৃণমূলের বিরুদ্ধে রায় দিয়েছে । বলা যায় এই রায় তৃণমূলের প্রতি ক্ষোভের রায়, বিজেপির প্রতি অনুরাগের রায় নয়।
যদিও রাজনৈতিকভাবে অভিযোগ করা হচ্ছে, এই নির্বাচনে তৎকালীন ক্ষমতাসীন তৃণমূলের মূল লড়াই ছিল নির্বাচন কমিশন ও এস আই আর, বিজেপি নয়। আবার যেমন যেখানে বেশি ভোট ডিলিট, সেখানেই বিজেপি বেশি জিতেছে। এটাও মস্ত বড় একটা প্রশ্ন।
আবার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এই তৃণমূল দীর্ঘদিন ক্ষমতায় ছিল। মানুষও এক সময় সেই ক্ষমতার পাশে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু ক্ষমতা যত পুরনো হয়েছে, তত তার গায়ে দুর্নীতি, স্বজনপোষণ, দাদাগিরি এবং অহংকারের দাগ জমেছে। সাধারণ মানুষ কাজ চেয়েছে। সম্মান চেয়েছে। ন্যায্য পরিষেবা চেয়েছে। কিন্তু বহু জায়গায় তারা পেয়েছে দলীয় দাপট, কাটমানির সংস্কৃতি, চাকরি-দুর্নীতির লজ্জা, প্রশাসনের ওপর অবিশ্বাস এবং নেতাদের চরম ঔদ্ধত্য। এমনকি সাধারণ মানুষের কন্ঠ রোধ করা হয়েছে গণতন্ত্রকে হত্যা করেছে তৃণমূল দল। এটাও কঠিন বাস্তব সত্য।
এই পর্যন্ত পৌনে একশ বছরের পশ্চিমবঙ্গের সাংবিধানিক এবং রাজনৈতিক ইতিহাসে বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর নতুন বিধানসভা কার্যকালের মেয়াদ উত্তীর্ণ হবার আগেই সমস্ত দলের পরাজিত প্রত্যেক মুখ্যমন্ত্রী ইস্তফা দিয়ে সেই সাংবিধানিক গরীমাকে অক্ষুণ্ন রেখেছিলেন।
প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সেই ৭৪ বছরে রাজনৈতিক গরীমাকে ভেঙে দিলেন। অর্থাৎ ৬ই মে, ২০২৬ রাত ১১.৫৯ এর পর রাজ্য বিধানসভা তার কার্যকালের মেয়াদ উত্তীর্ণ করে এবং সংবিধানের স্বাভাবিক নিয়মেই রাজ্য রাষ্ট্রপতির অধীনে চলে যায়। যা এই রাজ্যে প্রথম এবং বিরল। ভারতবর্ষের গণতান্ত্রিক ও সংবিধান পালনের ইতিহাসে এক নজির হয়ে থাকলো এই ঘটনা।
যদিও আমরা দেখলাম মাননীয়া রাষ্ট্রপতি রাজ্যপালকে নতুন সরকার শপথ না নেওয়ার পর্যন্ত এই তিনদিনের জন্য পশ্চিমবঙ্গের দায়িত্ব সামলাতে বলেছেন, নিজের হাতে নেননি। কিন্তু তবুও থ্রেডটা তো কেটে গেল। সেই তো রাষ্ট্রপতির হাত ছুঁয়েই বেরিয়ে এলো।
সংবিধান বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি তিনি ইস্তফা দিতেন, এটাই স্বাভাবিকভাবে রাজ্যপালের দায়িত্বে থাকতো রাজ্য, রাষ্ট্রপতি পর্যন্ত যেত না। আমরা দেখলাম পশ্চিমবঙ্গবাসী এই স্বৈরাচারী শাসককে যেমন ছুঁড়ে ফেলে দিল ভোটে, আর সংবিধান তাকে ক্ষমতাচ্যুত করল রাষ্ট্রপতির হাত দিয়েই। ইতিহাস এই ঘটনাকে মনে রাখবে আগামী দিনে। এরপর থেকেই শুরু হল এই রাজ্যের নতুন অধ্যায় – একসময় বিরোধী দলনেতা আজ রাজ্যের শাসন ক্ষমতার আসনে অধিষ্ঠিত হয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী হয়ে ।রাজ্যে পালাবদলের পরিপ্রেক্ষিতে সরকারের সামনে যে সমস্ত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে আগামী দিনগুলিতে সেগুলো খুব সহজ বলে হয় বলে মনে হয় না। বর্তমান সরকারের সামনে প্রথমই প্রয়োজন হবে কঠোর হাতে আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ ভোটের পরবর্তী সহিংসতা রোধ এবং রাজ্যের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা নতুন সরকারের সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জ। সেই সঙ্গে
আর্থিক সংকটের মোকাবিলা ও প্রশাসনিক পুনর্গঠন জরুরী রাজ্যে। সবথেকে বড় মাথা ব্যথা কারণ ৮ হাজার লক্ষ টাকার দেনা অর্থাৎ আগের সরকারের সময়কার বিপুল এই ঋণের বোঝা সামাল দেওয়া এবং প্রশাসনিক কাঠামোতে বড় ধরণের সংস্কার বা পরিবর্তন আনা অত্যন্ত জরুরি। প্রচুর সম্পদে ভরপুর থাকা সত্ত্বেও এই রাজ্যে উন্নয়ন ও বিনিয়োগ আনা যায় কিভাবে সেটাও নতুন করে ভাবতে হবে বর্তমান সরকারকে।
শিল্প ও বিনিয়োগের অভাব মেটাতে নতুন সরকার দ্রুত পরিবেশ পরিকাঠামো ও অবকাঠামো উন্নয়ন এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে সরকারকে। এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিক বামেদের ৩৫ বছর এবং তৃণমূলের ১৫ বছর অর্থাৎ পাঁচ পাঁচটি দশকের ভেঙে পড়া শিল্প পরিকাঠাম পরিবেশ ফিরিয়ে আনাটা সবচেয়ে বেশি কঠিন কাজ হবে বর্তমানে সরকারের এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই । অতীতে কেন্দ্র-রাজ্য সমন্বয় দীর্ঘদিন ধরে তিক্ততার পাশাপাশি দূরত্ব তৈরি হয়েছিল বর্তমান সরকারের সামনে ।এটাও অন্যতম কাজ হবে কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে নতুন সমন্বয় তৈরি করে কেন্দ্রীয় প্রকল্পগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করা।
আরো যেটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল সেটা হল সীমান্ত নিরাপত্তা। বাংলাদেশ সীমান্তে বেড়া নির্মাণ এবং অবৈধ অনুপ্রবেশ রোধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া অত্যন্ত জরুরী কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের সমন্বয়ে । এই নতুন পরিস্থিতিতে বর্তমান বিরোধী দলের
অর্থাৎ তৃণমূল কংগ্রেস তরফ থেকে আইনি ও রাজনৈতিক চাপের সম্মুখীন হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। তেমনি অপরদিকে বিরোধী বিরোধীদলের নিজস্ব কোন হোমওয়ার্ক সেল নেই যারা ইসুভিত্তিক বিষয়গুলিকে নিয়ে আগামী দিনে জনগণের সামনে উপযুক্ত ব্যাখ্যা সহ আন্দোলনের রূপ দিতে পারে তার সবচেয়ে বড় কারণ বিশ্বাসযোগ্যতা নৈতিকতা বিষয়টি ধাক্কা খেয়েছে বিগত ১৫ বছরের শাসনকাল এবং তৎকালীন সরকারের কর্ণধারের ভূমিকা।
বিজেপির কাছে পরাজিত হওয়ার পর রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তাড়াহুড়ো করে বেশ কিছু বক্তব্য রাজ্যের মানুষের কাছে নতুন কোনো বার্তা বহন করেনি। একসময় যাঁদের বিরুদ্ধে তাঁর নেতৃত্বে প্রতিদিন বিষোদ্গার, কুৎসা, হামলা আর রাজনৈতিক প্রতি হিংসার রাজনীতি চালানো হয়েছিল, আজ সেই বামপন্থীদের কাছেই কার্যত সাহায্যের আবেদন জানাতে হয়েছে তাঁকে। দীর্ঘদিনের অহংকার, একনায়কতন্ত্র, বিরোধী দমন আর ভোট লুটের রাজনীতির মাধ্যমে রাজ্যে নিজের আধিপত্য বজায় রাখার চেষ্টা করেছে তৃণমূল । বিগত শাসনকালে বামপন্থীদের অস্তিত্ব শেষ করে দেওয়ার হুঙ্কারের মধ্যে দিয়ে।অথচ আজ বিজেপির উত্থান ও জনরোষের মুখে পড়ে দলনেত্রী বুঝতে পারছেন, আদর্শহীন রাজনীতি দিয়ে দীর্ঘদিন টিকে থাকা যায় না । যাদের একসময় “অপ্রাসঙ্গিক” বলা হয়েছিল । যাঁদের শেষ করতে চেয়েছিলেন, আজ তাঁদের কাছেই আশ্রয় খুঁজছেন ।
রাজ্যে পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে পরাজিত দলনেত্রীকে আজ তাঁদের সঙ্গেই ঐক্যের বার্তা দিতে হচ্ছে । কারণ মানুষ বুঝে গিয়েছে দুর্নীতি, কাটমানি, সিন্ডিকেট আর তোষণের রাজনীতি বাংলাকে কোথায় এনে দাঁড় করিয়েছে । রাজনৈতিক অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদেই এখন বামেদের দরজায় কড়া নাড়তে হচ্ছে তৃণমূলকে ।
অপরদিকে বিজেপির নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, আমরা বদলা নয়, বদলের নীতিতে বিশ্বাস। খুব ভালো বয়ান। যেখানে মেজরিটি নেই, সেখানে সরকার ভেঙে দিয়ে সরকার তৈরি করেছে। এটা কি বদলের রাজনীতি? বিজেপি বিরোধী দলের অফিস সমর্থকদের বাড়ি আক্রমণ ঘটনা ঘটে চলেছে। যেগুলো তেমনভাবে প্রকাশ্যে আসছে না। কিন্তু ঘটনা ঘটে চলেছে।
রাজ্যের রাজনৈতিক মহলের ধারণা, এই অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে অনেকেই বলছেন, আগামী দিনের লড়াই শুধু ভোটের হবে না, মানুষের আস্থা জেতারও হবে। কারণ এখনকার মানুষ শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, বাস্তব কাজও দেখতে চান। তাই রাজনৈতিক দলগুলোকেও নিজেদের অবস্থান আরও পরিষ্কারভাবে তুলে ধরতে হচ্ছে। এদিকে এই রাজনৈতিক মহলের একাংশ মনে করছে, সামনে আরও বড় চমক অপেক্ষা করছে। কারণ রাজ্যের পরিস্থিতি নিয়ে দিল্লি থেকে কলকাতা পর্যন্ত নানা স্তরে আলোচনা চলছে বলেই খবর।
রাজ্যে ক্ষমতা পালাবদলের পর রাজনীতির এই টানাপোড়েনের মাঝেও সাধারণ মানুষের আশা একটাই, বাংলা যেন শান্ত থাকে, উন্নয়নের গতি যেন থেমে না যায়। কারণ শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক লড়াইয়ের প্রভাব গিয়ে পড়ে সাধারণ মানুষের জীবনেই।
এখন দেখার বিষয়, আগামী দিনে বাংলার রাজনৈতিক সমীকরণ কোন দিকে মোড় নেয়। তবে এই মুহূর্তে একটা কথা বলাই যায়, বাংলার রাজনীতি আবারও দেশের নজরের কেন্দ্রে উঠে এসেছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় কেউ সমর্থন করছেন, কেউ আবার বিরোধিতা করছেন। কিন্তু একটা জিনিস পরিষ্কার, বাংলার মানুষ রাজনীতিকে এখনও ভীষণ গুরুত্ব দিয়ে দেখেন।
আরো উল্লেখ করার মতো বিষয় হলো যে এই রাজ্যে পালাবদল হয়েছে ঠিকই বিধানসভায় 205 টি আসন নিয়ে কেন্দ্রের ক্ষমতাশীল দল এ রাজ্যে অধিষ্ঠিত হয়েছে এবং আগের ক্ষমতাসীন দল তৃণমূল দুই অঙ্কের মধ্যে সীমিত থেকেছে। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন যে বেদনাদায়ক চিত্রটা বড় আকার নিয়েছে সেটা হল- রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তের অসংখ্য মেধাবী ছাত্রছাত্রী উন্নত শিক্ষার আশায় অন্য রাজ্যে পাড়ি দিচ্ছে। রাজ্যের মানুষের আশা এখানে এমন এক শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে উঠুক যেখানে বাংলার ছেলেমেয়েরা নিজেদের রাজ্যে, নিজেদের পরিবারের কাছেই থেকে বিশ্বমানের উচ্চশিক্ষা অর্জনের সুযোগ পাবে। শিক্ষা হোক আত্মবিশ্বাসের, সংস্কৃতির এবং মানবিকতার ভিত্তি।
বর্তমান সরকারের কাছে জনগণের আশা পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষা ক্ষেত্রকে দলীয় রাজনীতির প্রভাব থেকে যতটা সম্ভব দূরে রেখে এক স্বচ্ছ, আধুনিক ও মেধাভিত্তিক শিক্ষার পরিবেশ গড়ে তোলার উদ্যোগ গ্রহণ । কারণ শিক্ষা কোনো রাজনৈতিক মঞ্চ নয়; শিক্ষা হলো সমাজ গঠনের সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি।
পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাস, সংস্কৃতি, নবজাগরণ, স্বাধীনতা আন্দোলনে বাংলার অবদান এবং বাংলার মনীষীদের আদর্শকে নতুন প্রজন্মের সামনে সঠিকভাবে তুলে ধরার জন্য বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থার সিলেবাসে যুগোপযোগী পরিবর্তন অত্যন্ত প্রয়োজন।
রাজ্যের শিক্ষিত সচেতন মানুষ বিশ্বাস করে, আগামী দিনে এই রাজ্য আবারও তার হারানো শিক্ষাগত গৌরব ফিরে পাবে। রাজ্যে পালাবদল হয়েছে এটা যেমন ঠিক তেমনি অপরদিকে ক্ষমতার মসনদে বসে আগামী দিনের পথ চলা নতুন সরকারের কাছে চ্যালেঞ্জ তো থাকবেই পাশাপাশি বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন থেকে গেল । যেমন যেখানে বেশি ভোট ডিলিট, সেখানেই বিজেপি জিতেছে বেশি। এটাই মস্ত বড় একটা প্রশ্ন। Pic courtesy: Facebook
