জীবন-মৃত্যু’র সন্ধিক্ষণে একজন রণবীর বড়ুয়া

১৭ই মে ২০২০, নিউইয়র্ক।।

৬ই মার্চ ২০২০ ফরেষ্ট হিল নর্থ শোর হাসপাতাল। ভোর ৪টা। নার্স রক্ত নিলো কোভিড-১৯ পরীক্ষার জন্যে। ক’ঘন্টা পর ডাক্তার দেখতে এলেন। প্রশ্ন করলাম, ‘আমার কি করোনা হয়েছে’? উত্তর, ‘উই টুক স্যাম্পল, উই উইল লেট্ ইউ নো’। তিনি আমায় রিলিজ করে দিলেন, বললেন, আমার ডাক্তারের সাথে যেন যোগাযোগ রাখি। কাগজপত্র সাইন করে রিসিপশনে এসে বসলাম, ফোন ছাড়া আমার কাছে কিছু নেই, যাবো কি করে? কল দিলাম ভাগ্নে-জামাই প্রাণমেশ-কে, তিনি জানালেন, ডিউটিতে যাচ্ছেন, তবু এসে আমায় নিয়ে গেলেন। বাসায় আসলাম। শরীর ভাল, হার্ট ভাল, শুধু একটু দুর্বল। যথারীতি দৈনন্দিন কাজকর্ম শুরু করলাম। কথাগুলো রণবীর বড়ুয়া’র। তিনি যুক্তরাষ্ট্র ঐক্য পরিষদের একজন সভাপতি। বয়স ৪৮। তিনি আবার বললেন, ১৩ই মার্চ আমার নিয়মিত ডাক্তারের চেম্বারে গেলাম। শরীর দুর্বল, ব্যথা। ডাক্তার এমোক্সিসিলিন দিলেন, সাথে পেইন কিলার। ওষুধ খেতে শুরু করলাম, অবস্থা আগের মতই। পরের দিন ১৪ই মার্চ আবার জ্বর এলো। সন্ধ্যায় ১০৪ ডিগ্রী। চারিদিকে করোনা ভাইরাস বাড়ছে। হাসপাতাল নিয়ে নানান কথা শোনা যাচ্ছে। পরিবার আতঙ্কে। একটু অস্বস্থি লাগলো।  রণবীর বড়ুয়া বলেই যাচ্ছেন, এ সময় আমার ২০০৯’র কথা মনে এলো। আমার ম্যানেঞ্জাইটিস হয়েছিলো, তা ব্যাকটেরিয়াল ইনফেকশন, এবং সম্ভবত: করোনা ভাইরাস থেকে ডেঞ্জারাস। সেই ‘কালরাত’-এর কথা ভোলার নয়! সাধারণত: ম্যানেঞ্জাইটিসে রুগীর রক্তচাপ অনেক বেড়ে যায়, এবং কখনো-সখনো ঘাড়ের ব্লাড-ভেসেল ভেঙ্গে রুগীর মৃত্যু হয়? আমি সারারাত এলমহার্স্ট হাসপাতালে মাথার যন্তনায় শুধু চিৎকার করেছি আর করেছি, সাথে বমি। আমাকে ‘আইসোলেশন’-এ রাখা হয়েছিলো, এবং রোগ নির্ণয় করতে ওঁরা ঘন্টা ৬ সময় নেয়। তিনি ‘এলমহার্স্ট হাসপাতালকে’ ‘মৃত্যুপুরী’ হিসাবে বর্ণনা করেন।  এখন অবশ্য অনেকেই তা করছেন। রণবীর বলেন, এরপর থেকে আমি এলমহার্স্ট হাসপাতাল এড়িয়ে চলি। এরপরও তারমতে চিকিৎসার জন্যে হাসপাতালই উত্তম স্থান। জ্বর ১০৪, হাসপাতাল যেতে হবে? স্ত্রী ভীত, আবার হাসপাতাল? বললাম, রোগের প্রাথমিক অবস্থায় চিকিৎসা হলে আরোগ্য দ্রুত হয়। সন্ধ্যায় এম্বুলেন্স কল দিলাম। ওরা এলো, বললাম, ফরেষ্ট হিলে নিতে। বললো, ওখানে রুগী সংকুলান হচ্ছেনা, তাই অগত্যা এলমহার্স্ট হাসপাতাল? ইমার্জেন্সিতে রেজিষ্টারী হলো। এরপর অপেক্ষা। অপেক্ষার আর যেন শেষ নেই? তিনি বলে চলেছেন, আমার শক্তি ও ধর্য্য কোনটাই ছিলোনা, তাই কল দিলাম প্রাণমেশ-কে। দেখলাম, রিসেপশনের পেছনে  প্লাষ্টিক পর্দা দিয়ে পৃথক করোনা রুগীর বসার স্থান। রুমের অবস্থা ও নার্সদের হাবভাব দেখে মনে হলো, ‘আমার কি রোগ তা জানিনা, তবে এখানে থাকলে নির্ঘাত মৃত্যু’। তাই, পালাও!  প্রাণমেশ এলো, বেরিয়ে গেলাম। শরীরে প্রচন্ড জ্বর ও ব্যাথা। তখনো করোনা সনাক্ত হয়নি। আবার ফরেষ্ট হিল হাসপাতালে এলাম। ইমার্জেন্সিতে ভর্তি করিয়ে নিলো। রাত কাটলো। সকালে, ১৫ই এপ্রিল ব্লাড নিলো, স্যালাইন, টাইলিনল চললো। জ্বর ১০০ ডিগ্রিতে নেমে এলো। ডাক্তার এলেন, টাইলিনল খাওয়ার পরামর্শ দিয়ে রিলিজ করে দিলেন। বাসায় আসলাম। আবার স্বাভাবিক জীবন। পরদিন বাজারে গেলাম। পরিবার নিয়ে বেড়িয়ে আসলাম। ১৭ই মার্চ আবার জ্বর। টাইলিনল, এমকক্সিসিলিন চলছিলো, তবু অবস্থার উন্নতি হচ্ছিলো না। গিন্নী কবিরাজি ওষুধ দিলো; এলাচি, লং, আদা, রসুন সিদ্ধ জলপান, কফ সিরাপ সবকিছু চললো। ১৮ই মার্চ শুরু হলো শুকনো কাঁশি। গিন্নি মালিশ করলো। কোন উন্নতি নেই? সেই রাতে ৩টি কম্বল গায়ে দিলাম, তবু শীত আর যাচ্ছিলো না? শরীর কাঁপছিলো। আবোল-তাবোল বকছিলাম। পরে বুঝেছি, করোনায় আক্রান্তদের দিনের বেলাটা ভালোই যায়, তান্ডব শুরু হয় রাতে। ১৯ই মার্চ।  বিকাল ৫টা’র দিকে প্রচন্ড কাঁশি। কাঁশি যেন থামতেই চায়না, একটানা ১৫-২০ মিনিট, একটু বিরতি, আবার কাঁশি। কাশির সঙ্গে পেট, হৃদপিন্ড, ফুসফুস মুচড়ে ওঠা, প্রচন্ড ব্যথা, সাথে বমিবমি ভাব। মনে হতো খাদ্যনালী, শ্বাসনালী ছিঁড়ে যাচ্ছে। আর পারছিলাম না, ঘন্টা দেড়েক পর আবার এম্বুলেন্স কল দিই। এম্বুলেন্স এলো, বললাম ফরেষ্ট হিল হাসপাতাল। ওঁরা আমার অনুরোধ রাখলো। ইমার্জেন্সিতে গেলাম, ওঁরা ভর্তি নিলো। ফরেষ্ট হিল হাসপাতালে তখন মিনিটে মিনিটে করোনা রুগী আসছিলো। যাদের অবস্থা একটু ভালো, তাঁদের বাড়ি পাঠিয়ে দেয়া হচ্ছিলো। বেশি অসুস্থদের ভর্তি নিচ্ছিলো। ইমার্জেন্সিতে পর্দা ঘেরা কক্ষে দু’জন করে রুগী। আমার পাশে ডায়ালাইসিস কমপ্লেক্সের এক বৃদ্ধ রুগী। তিনি অভিযোগ করলেন, সেই সকালে এসেছেন, এখনো কোন খাবার দেয়া হয়নি। নার্স সংকট, ১৫-২০ হলো, কেউ খোঁজখবর নিচ্ছেনা। গলা শুকিয়ে মরুভুমি, কাঁশতে কাঁশতে বুকের পাঁজর ভেঙ্গে যাবার উপক্রম। চিৎকার করে বললাম, ‘নার্স, এই নীড হেল্প’, ‘আই নীড ওয়াটার’। নার্স জল নিয়ে এলো, তাকে বললাম, আমার আরো দুই গ্লাস লাগবে। বিছানায় শুয়ে আছি, আর কাঁশছি, চেষ্টা করেও হাসপাতালের নীরবতা মানতে পারছি না? কেঁশে যাচ্ছি অনর্গল। আরো ১০/১৫মিনিট পর নার্স এসে স্যালাইন লাগিয়ে দিলো। জিজ্ঞাসা করলাম, স্যালাইন কেন? বললেন, এতে এজিথ্রোমাইসিন এন্টিবায়োটিক আছে। অনুরোধ করলাম, কাঁশি ও ঘুমের জন্যে। বললো, ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করে আসি। ফিরে এলেন কফ সিরাপ নিয়ে। বললাম, আমার জন্যে এটি নাথিং, ষ্ট্রং কিছু দিতে বলুন। দিলেন, এরপর ঘুমিয়ে পড়লাম।

ত ১০টায় ঘুম ভাঙ্গলে দেখি হাসপাতালের সর্বত্র রুগী আর রুগী।  আবার জল পিপাসা, হাতে সিরিঞ্জ লাগানো। অপেক্ষায় আছি কখন নার্স আসে। আমাদের যেই পাশে রাখা হয়েছিল, সেদিকে ডাক্তার-নার্সদের তেমন একটা যাতায়াত নেই, ভাবটা এমন যে বেঁচে থাকলে পরে চিকিৎসা হবে। উপায় নেই? ভাগ্য ভালো এরমধ্যে নার্স এলো স্যালাইন চেক করতে! বললাম, বাথরুমে  যাবো, স্যালাইন খুলতে। বাথরুম থেকে এসে বললাম, কিছু খাবার হবে? বললো, সম্ভব হবেনা, ‘উই আর ওভারক্রাউডেড, এভরিথিং ইজ শর্ট’। বললাম, ২/৩ গ্লাস পানি, দিলো। কিছুক্ষন পর স্যালাইন শেষ হলো। ডাক্তার ও নার্স একত্রে এলো। জানালো, আমায় রুমে শিফট করা হবে, তবে কতক্ষন লাগবে তা তাঁরা জানেনা না। বিছানায় পড়ে থাকলাম। কাঁশি, ব্যথা, পানির তৃষ্ণা। উঠলাম, কন্ট্রোল সেন্টারের দিকে হেঁটে গেলাম। পানির ডিস্পেন্সার পেলাম। গ্লাস নেই? ষ্টাফকে অনুরোধ করলাম। এক প্যাকেট, প্রায় ৪০/৫০টি কাপ নিয়ে এলেন। পানি খেলাম, সাথে আরো দুই গ্লাস নিয়ে এলাম। রাত কেটে গেলো। পরদিন ২০শে মার্চ সকালে বেডে নিয়ে গেলো। আবার স্যালাইন, দু’টি এন্টিবায়টিক,  সাথে কাশির ওষুধ। রুমে তিনটি বেড, সিট্ নাম্বার ৪১২, পাশের সীট, মানে ৪১৩-তে এক ২৮ বছরের যুবক। স্প্যানিশ। তাঁর বাসা করোনা এভিনিউতে। জিজ্ঞাসা করলাম, এখানে কিভাবে? বললো, এলমহার্স্টে গিয়ে মরবো নাকি? ইমার্জেন্সি রুমে বেশিরভাগ স্প্যানিশ রুগী। আমার পাশের রুগী, বয়স   কম, আমার থেকে অনেক শক্ত। যতক্ষন শুয়ে থাকি একটু স্বস্তিতে থাকি। ১০ ফুট দূরে বাথরুম, ওটুক যেতে অনেক শ্বাসকষ্ট হতো, কোনরকমে বাথরুম সেরে এসে বিছানায় শুয়ে পড়তাম। তারপর লম্বা নি:শ্বাস নিতাম, কষ্ট হতো, ভাবতাম এই বুঝি গেলাম! দুপুরে লাঞ্চ দিলো, খুব একটা খেতে পারলাম   না। প্রোটিন দুধ, জুস্, ফল ও সামান্য সলিড ফুড খেলাম। খাবারের কোন টেষ্ট পেলাম না, বেঁচে থাকতে হবে, সেটাই ছিলো তখনকার মত লক্ষ্য। একটার পর একটা স্যালাইন দিচ্ছে, নড়াচড়া তেমন করতে পারছিনা, পিঠে ব্যথা, ঘুম নেই, মনে হতো যেন পাথরের ওপর শুয়ে আছি! দুপুরের পর ডাক্তার   এলেন। অনুরোধ করলাম, কাঁশি ও ঘুমের ওষুধ দেয়ার জন্যে। ডাক্তার প্রেস্ক্রাইব করলেন, হাইড্রোকোডন বাইটারট্রেট ও মিথ্যাল ব্রোমাইড ওরাল সলিউশন ৫মিলিগ্রাম। নার্স ওষুধ দিলো, সাথে নাকে অক্সিজেন পাইপ। একটু ভালো লাগলো, ঘুমালাম ঘন্টা দেড়েক। ণবীর বলে চলেছেন, এরমধ্যে ডায়রিয়া হতো, দিনে ২/৩বার বাথরুমে যেতে হতো। কষ্ট হতো। মাঝে মধ্যে বমি আসতো, বাথরুমে যেতাম, কষ্ট হতো। কিন্তু যখন বমি আসতো, মনে হতো মুখ দিয়ে প্রাণবায়ু বেরিয়ে যাবে। তারপর ডাকলেও নার্সের কোন খবর নাই? আমাকে উপরোক্ত এন্টিবায়োটিকের পাশাপাশি হাইড্রোক্লোরোকুন ২০০এমজি, বেজানাইট ক্যাপসুল ২০০ এমজি দেয়া হয়েছিলো। তবে অক্সিজেন খুবই উপকারে লাগে, ওটা না থাকেলই কাঁশি শুরু হতো। আমার দিনরাত্রি একাকার হয়ে গেলো। পরদিন স্প্যানিশ যুবককে রিলিজ দিলো, ১৪দিন কোয়ারিন্টিনে থাকার পরামর্শ দিলো। তিনি জানালেন, তাঁর এক বেড রুমের বাসা (২রুম) দুই সন্তান ও স্ত্রী, শুনে ডাক্তার বললেন, ‘ম্যানেজ ইট’। ৪টার  দিকে তিনি গেলেন, একঘণ্টা পর এলেন আমার থেকে সামান্য ছোট নাদুস-নুদুস  স্প্যানিশ ভদ্রলোক, ৪৪; করোনা রুগী, জানালো তারও এক বেড রুমের বাসা, দুই সন্তান ও স্ত্রী। মনে হলো, স্প্যানিশদের সবারই স্বাস্থ্যের গড়ন ভালো, শক্ত-সামর্থ্য। সন্ধ্যার দিকে এলো তৃতীয় করোনা রুগী, বয়স ৬৫? নাম মিষ্টার পেরেজ। প্রচন্ড কাঁশছেন। ভয় পেলাম। তারজন্যে প্রার্থনা করলাম, হে ঈশ্বর, ওকে ভালো  করে দাও। 

এমনি করে শারীরিক, মানসিক কষ্টে দিন কাটছে। আমি হাসপাতালে ভর্তি হই, ১৯ মার্চ , পরদিন আমার স্ত্রী অসুস্থ হয়ে পড়লো। আমাদের ১০ বছরের কন্যা, তাকে নিয়ে বিপাকে পরে তাঁর মা। আমার মা, ৮৯ বছর জানতে পারে,তিনি স্ত্রী  ঊর্মি ও কন্যা সৃষ্টি-কে নিতে ভাগ্নে রনি ও সানিকে পাঠান। ওরা উডসাইডে বড় বোনের বাসায় গিয়ে ওঠে। ভাগ্য  ভালো, আমার স্ত্রী’র উপসর্গ আমার মত সিরিয়াস ছিলোনা। হোম কোয়ারিন্টিনে ছিলো। ধন্যবাদ দিতে হয়, ডাক্তার মোহাম্মদ রহমান-কে, তিনি সময়মত আমার স্ত্রী’র জন্যে এন্টিবায়োটিক ও প্রয়োজনীয় ওষুধ প্রেস্ক্রাইব করেছিলেন। রণবীর বলছেন, হাসপাতালের খাবার খেতে পারতাম না, মুখে টেষ্ট ছিলোনা। তবে প্রোটিন জাতীয় খাবারগুলো যেমন, দুধ, ডিম্, দই, জুস্ খেতাম। দু’দিন পর ভাগ্নে রনি/সানি রোজ বাইরে থেকে খাবার নিয়ে আসতো। ওঁরা ডেইরি, স্মুদি, ফল, স্যান্ডুইচ ও স্যুপ আনতো। ভেতরে ঢোকার অনুমতি ছিলোনা, অফিসে রেখে দিতো, কর্তৃপক্ষ পৌঁছে দিতো, ওদের ধন্যবাদ।

এভাবে ৯দিন কাটলো। হাসপাতালে থেকে শিখলাম, অক্সিজেন লেভেল ৯০% নিচে নেমে গেলে বিপদ, দু’চার পা হাঁটলেই হাঁপিয়ে উঠতে হয়? হয়তো এজন্যেই আমি হাপিয়ে উঠতাম। ২৭ শে মার্চ বিকালে হাসপাতাল থেকে ছুটি। হাসপাতাল ডিসএবল ক্যাব রাইড দিয়ে বাসায় পৌঁছে দেয়। বাসা ফাঁকা। স্ত্রী, কন্যা ভগ্নিপতি দিলীপ বড়ুয়া’র বাসায়।  ১লা মে পর্যন্ত হোম কোয়ারিন্টিনে থাকলাম। তারমতে ১৪ দিন কোয়ারিন্টিন থিওরি ভুয়া। এরমধ্যে ২৫শে মার্চ বিদ্যুৎ দাস’র একটি টেক্সট পেলাম। মেসেজটি হুবহু এ রকম: Text Message Wed, Mar 25, 11:31 AM, Bidyut das:- Dear friends and relatives, it’s very sad news for me and for my family. I have been tested positive yesterday. In ccu now. Please stay by our side, ask God’s help for us. Hope to recover soon. Akash, Kuhu Keka are devastated. In my absence give your unconditional  love for these love of my life. Doctors are positive. Treatment Started. Won’t be able to talk any further for now. এই কথাটি মনে রেখ আমে যে গান গেয়ে ছিলাম। সবাই কে আমার নমস্কার। সাবধানে থাকবেন।

টেক্সট দেখে অবাক হলাম। রিপ্লাই করলাম, ‘মেইক শিউর, পুট অক্সিজেন, ইত্যাদি।  ডঃ দ্বিজেন ভট্টাচার্য্য জানতে চাইলেন, আমি কোথায়? জানালাম, ‘৭দিন ধরে হাসপাতালে’। রণবীর বড়ুয়া বললেন, একটি ঘটনা না বলে শান্তি পাচ্ছিনা। হয়তো এ জীবনে তা আর ভোলা যাবে না? হাসপাতালে আমার রুমমেট মিষ্টার পেরেজ। ২৩শে মার্চ পেরেজ’র লক্ষ্মণ তেমন ভাল ঠেকছিলো না, ভদ্রলোকের কাঁশি অতি প্রকট, বিশাল আওয়াজ করে পুরো বেড ঝাঁকিয়ে, শরীর এদিক-ওদিক করে ভয়ানকভাবে কাঁশতেন। নির্মম কাঁশি, আমি নিজেই তো ভুক্তভুগী? নিষ্ঠূর করোনা এতটাই নির্মম।  তাঁর কষ্ট দেখে আমি নিজের কষ্টের কথা ভুলে গেছি। ওর জন্যে সারারাত ঘুম হয়নি। এরমধ্যে ২/৩ বার নার্স ডেকে তাঁর অক্সিজেন রিপ্লেসমেন্ট করিয়ে দিয়েছি। ভোর হলো। ব্রেকফাষ্ট এলো। একটু বাদে নার্স এলো। এশিয়ান নার্স, ইয়াং। মিষ্টার পেরেজ নার্সকে তাঁর অক্সিজেন পাইপ ঠিক করে   দেয়ার জন্যে বললেন। নার্সের কর্কশ উত্তর, ‘ইউ ক্যান ফিক্স ইট ইয়োরসেলভ’। মিঃ পেরেজ বললেন, ‘আই ডোন্ট ওয়ান্ট টু ডাই, আই জাষ্ট রিটায়ার্ড, আই ডোন্ট ওয়ান্ট টু ডাই’। নার্স যেতে যেতে চেঁচিয়ে উত্তর দিলো, ‘ইউ মাষ্ট টেক কেয়ার ইয়রসেলভ’। নার্স আমাকে হাইড্রোকোডন দিয়েছিলো,

 তাই আমি ঘুমিয়ে পড়ি। হটাৎ শব্দে জেগে দেখি, ৪/৫জন নার্স পেরেজ’র বেডের চারপাশে পর্দা টেনে দিলো। প্রথমে ঠিক বুঝতে পারিনি। আবার শুয়ে পড়লাম। আবার শব্দ, জিপার ক্লোজ করার শব্দ। বুঝলাম, মি: পেরেজ’র দেহ বডিব্যাগে। তিনি নাই? জীবনে এই প্রথম একজন মৃতের সাথে ঘণ্টা চারেক    কাটালাম। সারাজীবন হয়তো আমার কানে বাজবে, ‘আই  ডোন্ট ওয়ান্ট টু ডাই, আই জাষ্ট রিটায়ার’..। মি: পেরেজ’র দেহ নিয়ে যায় বিকাল  ৪টার দিকে। ক্লিনিং ষ্টাফ এসে সবকিছু পরিষ্কার করে সুন্দর করে নুতন বিছানা পেতে দিয়ে যায়। সন্ধ্যা ৭টায় ওই বিছানায় নুতন রুগী আসে। ভাবলাম, আমি যেই বেডে শুয়ে আছি, সেই বেডে না জানি কত রুগী মরেছে? দেশে কেউ মারা গেলে আমরা সবকিছু ফেলে দেই, এখানে শুধু পরিবর্তন, ধুয়ে-মুছে

 ফেলা? মনে ভাবনা এলো, মি: পেরেজ-কে মাস্ক দিলে কি তিনি বাঁচতেন? তাঁকে মাস্ক দেয়া হয়নি, আমার কেন জানি মনে হয়েছে, ‘অবহেলা’। গভর্নর এন্ড্রু ক্যুমো-কে গালাগাল দিতে চেয়েছি।  করোনা ব্যাপারটা নিয়ে আমার স্ত্রী এখনো ট্রমাটাইজড। আমি অসুস্থ হয়েছি। আমার স্ত্রী  আক্রান্ত হয়েছে। আমার সেবা করতে আসা প্রণমেশ ও তাঁর পরিবারের ৬জন অসুস্থ হয়েছে। আমার দুই নাতি পীযুষ ও আয়ুষ তেমন গুরুতর অসুস্থ ছিলোনা। বাকি ৪জনের অসুখ যথেষ্ট উদ্বিগ্নকর ছিলো। বিশেষত: ৬৩ বছরের ভগ্নিপতি দীপক বড়ুয়া ১০দিন লং আইল্যান্ড জুইস হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হয়েছে।   তাঁর অক্সিজেন লেভেল বিপজ্জ্বনক পর্যায়ে নেমে গিয়েছিলো। তবে দুই ভাগ্নে রনি/সানি অসুস্থ হয়নি। অবাক কান্ড, আমার স্ত্রী যেই বাড়িতে ছিলো, আমার মা সেখানে ছিলেন, সেই বাড়ির কেউ অসুস্থ হয়নি। সবশেষে রণবীর বড়ুয়া সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জানিয়ে বলেছেন, প্রাথমিক চিকিৎসায়  যদি অসুখ ভালো না হয়, তাহলে দ্রুত হাসপাতাল যাওয়াই শ্রেয়। জিজ্ঞাসা করলাম, আপনাকে কখন বলা হয়েছে যে,  আপনার কোভিড-১৯ হয়েছে? জানালেন, প্রথমবার যখন রক্ত দেই, তখনই কোভিড-১৯ পজিটিভ ছিলো, ১৯শে মার্চ ফরেষ্ট হিল হাসপাতাল আবার কনফার্ম করে। 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *