তালেবানের সঙ্গে আমেরিকার একটা ডিল আছে?

শিতাংশু গুহ, ২১শে আগষ্ট ২০২১, নিউইয়র্ক।।

তালেবানের সঙ্গে আমেরিকার একটা ডিল আছে? মার্কিন সেনা পুরোপুরি প্রত্যাহার না করা পর্যন্ত তালেবানরা কিছুই করবে না। চারজন মার্কিন প্রেসিডেন্ট, কুঁড়ি বছর আফগানিস্তানে অবস্থান, ২৪৪২ আমেরিকান নিহত, ২.২৬ট্রিলিয়ন ডলার খরচ করে আমেরিকা সাফল্যের সাথে আফগানিস্তানে এক তালিবানদের সরিয়ে আর এক তালিবানকে ক্ষমতায় বসিয়েছে। আমেরিকা কি এতই পাগল? যুক্তরাষ্ট্রের আফগানিস্তান ছাড়ার পরিকল্পনাটি ট্রাম্পের, বাইডেন তা বাস্তবায়ন করছেন। তবে সঠিক পরিকল্পনা না করেই বাইডেন আফগানিস্তান ছাড়ার কাজটি করেছেন। এজন্যে জো বাইডেন সমালোচিত হচ্ছেন, তবে তেমন জোরালো ভাবে সমালোচিত হচ্ছেন না, ট্রাম্প থাকলে মিডিয়া তাঁর চামড়া ছিঁড়ে ফেলতো। যেমন ভারতীয় মিডিয়া করছে মোদির বিরুদ্ধে! 

আফগানিস্তান একটি মুসলিম দেশ, এর জনসংখ্যার ৯০% সুন্নী মুসলমান, বাকিরা শিয়া ও অন্যান্য। ওয়ার্ল্ড ফ্যাক্টবুক অনুসারে সুন্নী ৮২.৭-৮৯.৭%; শিয়া ১০-১৭%, অন্যান্য ০.৩%। জাতিসংঘ শনিবার ১৩ ফেব্রুয়ারী ২০২১’র হিসাব অনুযায়ী আফগানিস্তানের জনসংখ্যা প্রায় ৪কোটি (৩৯,৪৬৫,৬৭৯)। এর পশ্চিম সীমান্তে ইরান, পূর্ব ও দক্ষিণে পাকিস্তান, উত্তরে তুর্কমেনিস্তান, উজবেকিস্তান, ও তাজাকিস্থান এবং পাকিস্তানের উত্তর-পূর্ব বরাবর একটি সরু ভুখন্ড, যা ওয়াখান বা ভ্যাকান নাম পরিচিত দিয়ে চীনের উইঘুর প্রদেশের সাথে যুক্ত। ভারতের সাথে আফগানিস্তানের সীমান্ত আছে কিনা এনিয়ে বিতর্ক আছে। তবে তথ্যসূত্র কোয়ারা জানায়, ওয়াখান বা ভ্যাকান দিয়ে ভারতের সাথে আফগানিস্তানের ১০৬ কিলোমিটার সীমান্ত আছে। 

সীমান্ত থাকুক বা না থাকুক, কাবুলে তালেবানরা ক্ষমতাসীন হওয়ায় আশেপাশে সবগুলো দেশ তটস্থ। তালেবানদের উত্থান ভারত এবং দক্ষিণ এশিয়ায় শান্তির প্রেক্ষাপট নিয়ে নুতন করে চিন্তাভাবনা শুরু হতে পারে। বাংলাদেশ বা ভারতে যাঁরা আফগানিস্তানে তালেবান’র উত্থানে আনন্দিত, তাঁরা আসলে বিকারগ্রস্থ, স্বাধীনতা বিরোধী ও কমবেশি মৌলবাদী। কারণ কোন সুস্থ মানুষের পক্ষে তালেবানি তান্ডব সহ্য করা অসম্ভব। আফগানিস্তানে এতদিন ক্ষমতায় ছিলেন ‘ইসলামপন্থীরা’; এখন যাঁরা ক্ষমতায় এসেছেন তারাও ‘ইসলামপন্থী’। তাহলে আফগান মুসলমানরা ভীত-সন্ত্রস্ত্র হয়ে দেশ ছেড়ে পালাতে চাচ্ছেন কেন? তসলিমা নাসরিন বলেছেন, তাঁরা আফগান ছাড়ছে ‘শরিয়ার ভয়ে’। বাংলাদেশে বা ভারতের তালেবান সমর্থকদের বুঝতে হবে, ‘শরিয়া’ তাদের জন্যেও সুফল বয়ে আনবে না, শরীয়াভুক্ত কোন দেশই বিশ্বাসযোগ্য নয়? 

১৯৭৫’র পর বাংলাদেশে মৌলবাদ যাত্রা শুরু করলেও আওয়ামী লীগ আমলে এঁরা সরকারের আশ্রয়ে-প্রশ্রয়ে শক্তি সঞ্চয় করে মহীরুহে পরিণত হয়েছে, এখন সরকারকেই এদের ঠেকাতে হবে, নইলে কে জানে আসিফ নজরুলের কথাই না ঠিক হয়ে যায়! বলা হচ্ছে, তালেবানের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের ডিল আছে, বাংলাদেশেও সরকারের সাথে হেফাজতের ডিল ছিলো? যুক্তরাষ্ট্র কি তালেবানদের সাথে বেইমানি করেছে? কেউ কেউ বলছেন, শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, সারা বিশ্বই আফগানদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। কোনটা সত্য, তা ভবিষ্যৎ বলবে। তবে বাংলাদেশে ইসলামী মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে সরকারকে এখনই শক্ত অবস্থান নিতে হবে, নইলে ‘আমরা সব তালিবান, বাংলা হবে আফগান’ শ্লোগানটি সত্য হয়ে যেতে পারে। বঙ্গবন্ধু’র বাংলাদেশ সন্ত্রাসের চারণভূমি আফগানিস্তান হউক তা কেউ চায়না। 

মহাভারতের ‘গান্ধার’ রাষ্ট্রটি এখন আফগানিস্তান। কথিত আছে, গান্ধারের রাজকুমারী গান্ধারী যিনি অন্ধ রাজা ধৃতরাষ্ট্রের পত্নী এবং একশত পুত্রের মা, কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে তাঁর সকল পুত্র নিহত হলে, পুত্রশোকে গান্ধার রাজ্ শকুনীকে অভিশাপ দিয়েছিলেন যে, তোমার রাজ্যে কখনো শান্তি থাকবে না। কেউ কেউ বলছেন, এরপর থেকে গান্ধার বা আফগানিস্তানে কখনো শান্তি ছিলোনা, আপাতত: শান্তির কোন লক্ষণ দেখা যাচ্ছেনা। তালেবানরা রাজধানী কাবুল দখল করলেও ‘গোকুলে’ বিদ্রোহীরা একত্রিত হচ্ছে। তালেবান বিরোধী আহমদ শাহ মাসুদ-র পুত্র মাসুদ জুনিয়র তাঁর সমর্থকদের ‘পানশি’ উপত্যকায় চলে আসার আহবান জানিয়েছেন। পানশি কখনো তালেবানের অধীনে যায়নি, এখনো নয়, এঁরা হয়তো বিদ্রোহী গ্রূপ হিসাবে তালেবানের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম অব্যাহত রাখবে। অন্যদিকে আফগানিস্তানের প্রাক্তন উপরাষ্ট্রপতি আমরুল্লা শেখ, যিনি ১৫ই অগস্ট দেশ ছেড়েছিলেন, তিনি নিজেকে আফগানিস্তানের কেয়ার টেকার রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করেছেন। অনুমান করা হচ্ছে তিনি সম্ভবত পঞ্জশিল উপত্যকায় রয়েছেন। অর্থাৎ আফগানিস্তানে তৃণমূল কংগ্রেসের ‘নুতন খেলা’ শুরু হচ্ছে। তালেবান নৃশংসতার মধ্যেও মানুষ, বিশেষত: মহিলারা প্রতিবাদ করছেন। 

একদা চীনের চেয়ারম্যান মাও সে-তুং বলেছিলেন, ‘বন্দুকের নলই ক্ষমতার উৎস’, আফগানিস্তানে তালেবানরা এ উক্তি প্রমান করেছে। আগে যাঁরা বলতেন, ‘চীনের চেয়ারম্যান আমাদের চেয়ারম্যান’, তাঁরা কি এখন তালেবানদের সমর্থন করবেন? বাংলাদেশ কিছু সংখ্যক আফগানকে স্বল্পকালীন আশ্রয় দেয়ার মার্কিন প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে। এটি ভালো। ভারত বেশি উদারতা দেখিয়ে আফগান শরণাথী নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এটি বুমেরাং হতে পারে। অর্ধশত মুসলিম দেশ যখন আফগান শরণার্থীদের নিতে অস্বীকার করছে, তখন ভারত না উন্নত বিশ্ব নিজের পায়ে ‘কুঠার’ মারছে না তো? শরণার্থীদের অবশ্যই মানবিক সাহায্য-সহযোগিতা দিতে হবে, তবে সেটি নিজের ঘরে বিপদ ডেকে নয়? এমনিতে এখন অনেকেই মন্তব্য করছেন যে, বাংলাদেশ বা পশ্চিমবঙ্গের রোহিঙ্গারা এতদাঞ্চলের ভবিষ্যৎ তালিবান। 

এতসব দু:সংবাদের মধ্যে ব্যতিক্রমী সংবাদ হচ্ছে, কাবুলের একটি হিন্দু মন্দিরের একমাত্র পূজারী মেরে ফেললেও মন্দির ছেঁড়ে চলে যেতে রাজি নন। তালেবানরা তাদের দেশে ধর্মের নামে ৭০হাজার মানুষ খুন করেছে। এই পূজারীর ভাগ্যে কি আছে তা দেখার জন্যে আমাদের আরো অপেক্ষা করতে হবে। তালেবানরা যেকোন অমুসলিমের বিরুদ্ধে, তাই ভারতের সাথে তাদের সম্পর্ক ‘মধুময়’ হবার বোধগম্য কোন কারন নেই? তালিবানদের ভাঁড়ারে অনেক যুদ্ধাস্ত্র আছে, বারুদ আছে, কিন্তু ভাত নাই। তালিবানি রাজত্বে অনাহারের মুখে দেড়কোটি আফগান। যুক্তরাষ্ট্র আফগান সেন্ট্রাল ব্যাংকের ৯শ’ কোটি ডলার জব্দ করেছে। মার্কিন রাজস্ব দফতরে ‘তালেবান’ নিষিদ্ধ, তাই কোন অর্থ যাবেনা। মধ্যখান থেকে ভুগবে আফগান জনগণ, ভুলে গেলে চলবে না, এই আফগান জনগণ কিন্তু তালেবানকে সাহায্য-সমর্থন দিয়ে বাঁচিয়ে রেখেছিলো। সুতরাং । Pic courtesy Financial Express

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *