আমি হতে চাই মানুষের মেয়র

সুকন্যা পাল, দুর্গাপুর

সে প্রায় বছর পঞ্চান্ন আগেকার কথা। ডিপিএলের আইএনটিইউসির দায়িত্বপ্রাপ্ত এক নেতা প্রাক্তন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি আনন্দগোপাল মুখোপাধ্যায়কে কিছুটা অনুনয়ের সুরে বলেছিলেন, “আপনি যাঁদের জন্য ডিপিএলে নিয়োগের বিষয়ে চেষ্টা করেছেন, তাঁরা তো আইএনটিইউসিতে যোগ না দিয়ে সিটু করছে।” আনন্দগোপালবাবু সেই শ্রমিক নেতাকে উত্তরে বলেন, “নিয়োগের বিষয়টা আমি সিটু ও আইএনটিইউসির দৃষ্টিকোন থেকে দেখতে চাই না। আমার রাজ্যের সাধারণ মানুষ যাতে রাজ্যের কোনও কারখানায় কর্মসংস্থানের সুযোগ পায়, আমি তাই চেষ্টা করে চলেছি মাত্র। আপনি আইএনটিইউসি নেতা হয়ে ডিপিএল কর্মীদের আপনার শ্রমিক সংগঠনমুখী না করতে পারলে সেই ব্যর্থতা আপনার, আমার নয়।”

আর আজ গুটি গুটি পায়ে সাড়ে পাঁচ দশক পরে, এই শিল্পশহর দুর্গাপুরের পৌর প্রশাসনের সর্বোচ্চ পদ মেয়রের আসনে আসীন এই আনন্দগোপালবাবুর পুত্রবধূ অনিন্দিতা মুখোপাধ্যায়। এক একান্ত আলাপচারিতায় অনিন্দিতাদেবী বলেই ফেললেন আচমকা, “আমি যখন দুর্গাপুরের মহানাগরিক তখন আমি শুধু তৃণমূল কর্মীর মেয়র নই। আমি স্থানীয় তৃণমূল, বিজেপি, সিপিএম, কংগ্রেসের নেতা কর্মী সহ আপামর দুর্গাপুর পুর এলাকার সমস্ত নাগরিকের মেয়র। দলমত নির্বিশেষে পুর পরিষেবা আমি তাই সামগ্রিক ভাবে দুর্গাপুরের সব বাসিন্দার কাছেই পৌঁছে দিতে দায়বদ্ধ।”

আসলে আজকের রাজনীতির ক্ষুদ্র চক্রবাকে অনিন্দিতাদেবীর মুখে এমন অপরূপ গণ-রাজনীতির কথা আমাদের অবাক করে দেয় বৈকি। আসলে উনার কথায়, “রাজনীতির এই উদারীকরণের প্রথম শিক্ষাটা পাই আমার শ্বশুরমশাইয়ের কাছ থেকে। একসময়ের স্থানীয় বিধায়ক ও এই শহরের প্রাক্তন মেয়র তথা আমার স্বামী অপূর্ব মুখোপাধ্যায় আমাকে সুস্থ ঘরাণার রাজনীতির অআকখ শিখিয়েছেন হাত ধরে। এছাড়া মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আশীর্বাদ আমাকে প্রেরণা জোগায় সবসময়।”

হ্যাঁ এই শিল্পনগরীর রাজনৈতিক রকমারি ক্লাসটারে সাড়ে পঞ্চদশক বছরের মাঝের অনেকখানি সময় সেতুবন্ধনের কাজ করেছেন প্রাক্তন কংগ্রেস সাংসদ আনন্দগোপালবাবুর একমাত্র পুত্র অপূর্ব মুখোপাধ্যায়। সৎ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং পরিচ্ছন্ন পুর প্রশাসক হিসেবে তিনি এই রূঢ় অঞ্চলের বাস্তবিকই বিরল দৃষ্টান্তের। আসলে আনন্দগোপালবাবু থেকে শুরু করে অপূর্ববাবু এবং বর্তমানে অনিন্দিতাদেবীর যাত্রাপথ যেন একটা আলাদা উপকরণের রাজনীতি। যে উপকরণে রয়ে গেছে মাটির মানুষ হয়েও অনৈতিক কাদা ছোড়াছুড়ি থেকে দূরে থাকা, সংকীর্ণ রাজনৈতিক কালচার যেন এই উপকরণের উল্টো মেরুর সমাজ, এছাড়া উপকরণের সবচেয়ে বড় জনসংযোগ হল এই পরিবারের আধুনিক মনস্ক ব্যাপক গণ-গ্রহণযোগ্যতা।

লন্ডনের সাউথওয়েসে ১৯৬০ সালে অনিন্দিতাদেবীর জন্ম। তাঁর পিতা ছিলেন তদানীন্তন কালের প্রথিতযশা দরদী চিকিৎসক। পারিবারিক সূত্রে লন্ডন ও পুরুলিয়ায় কাটে অবিবাহিত জীবন। বর্ধিষ্ণু পরিবারের মধ্যে তাঁর সঙ্গীতচর্চা ছিল এক অনন্য নিয়মিত প্রানময় আঙ্গিক। রাজনীতি ও পরিবারের সবকিছু সামলে তাই তিনি আজও ফার্স্ট চয়েজ হিসেবে সঙ্গীতের রেওয়াজকেই হৃদয়ে স্থান দিয়েছেন। বিয়ের পরেও তিনি বহু বছর ধরেই রয়ে গিয়েছিলেন পরিপূর্ণ ঘরোয়া গৃহবধূ। বাম আমলের লাল আস্ফালনের বিরুদ্ধে স্বামীর সহযোগী হয়ে ২০০১ সালে রাজনীতিতে প্রথম পদার্পন। ধীরে ধীরে তিনি এই শিল্পশহরে তৃণমূলের জনপ্রিয় জননেত্রী হয়ে ওঠেন তাঁর নিজস্ব মধুময় নম্র ব্যবহারকে মূলধন করে। দীর্ঘদিন তিনি শহরের ডেপুটি মেয়রের পদেও থেকেছেন যোগ্যতার সঙ্গেই। অবশেষে ২০২১ সালের ২৪ ডিসেম্বর শপথ নেন মেয়রের চেয়ারের উদ্দেশ্য। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকের ধারণা, রাজ্যের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রীর গুডবুকে বরাবরই এই পরিবার অগ্রাধিকারে থেকেছে নিজস্ব স্বকীয়তার পটভূমিতে।

দুর্গাপুরের বিভিন্ন শিল্পতালুকে নানান চিমনির ধোঁয়ায় যেন আরও বেশি সংখ্যায় কর্মসংস্থান তৈরি হয় এই স্বপ্নটা আমি বরাবরই দেখতে ভালবাসি, এমন কথা জানিয়ে দুর্গাপুরের মেয়র মন্তব্য করেন, “এই এলাকায় একটা রবীন্দ্রভবণ ও একটি আর্ট গ্যালারি নির্মাণ করার খুব ইচ্ছে। সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রীর প্রয়াসের বিভিন্ন সামাজিক ও পুর প্রকল্পগুলি যাতে নগরবাসীর মধ্যে সঠিক পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়া যায়, সেটাই এখন আমার পাখির চোখ।”

এমনই কাজল নয়না পাখির চোখ বলেই হয়তো অনিন্দিতাদেবী বলতে পেরেছেন, “আমার রাজনীতির বীজমন্ত্র হোক–বল দাও মোরে বল দাও, প্রাণে দাও মোর শক্তি সকল হৃদয় লুটায়ে তোমারে করিতে প্রণতি।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *