দিদি জিন্দাবাদ! 

নিউইয়র্ক।। আশির দশকে একদিন ঢাকা কুর্মিটোলা বিমানবন্দরে একটি জটলা দেখে এগিয়ে যাই, দেখলাম একজন ছোটখাট ভদ্রলোক আরো ছোটখাট ফতুয়া ও ধুতি পরে মাঝখানে দাঁড়ানো, তাঁর চারিদিকে বেশ ক’জন স্যুট-টাই পড়া কেতাদুরস্ত মানুষ খোশগল্প করছেন। বুঝলাম মধ্যমনি ভদ্রলোকটি গুরুত্বপূর্ণ কেউ, একজনকে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি কে? জানালেন, পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষামন্ত্রী। একজন মন্ত্রীর অতি সাদাসিধা পোশাক ও চলাফেরা দেখে সেদিন ভালো লেগেছিলো। আর এই সময়ে ভালো লাগে চটি পায়ে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জীকে! মানুষ ভালোবেসে এজন্যে তাঁকে ‘চটিপিসি’ ডাকে। তাঁর চটি’র রঙ্গে তিনি পুরো পশ্চিমবঙ্গকে রাঙ্গিয়ে দিয়েছেন।

সম্ভবত: সৈয়দ মুজতবা আলী বলেছেন, একজনকে ‘আপনি’ বলে ডাকলে তিনি যা হারান, ‘তুমি’ বলে ডাকলে এরচেয়ে অনেকগুন বেশি পেয়ে থাকেন। ‘তুই’ সম্বোধন সম্পর্কে তিনি কিছু বলেছেন কিনা মনে নেই, তবে ‘তুই’ ভালবেসে যেমন ব্যবহৃত হয়, ‘ইতর’ অর্থেও এর সমধিক ব্যবহার আছে। মমতা দিদি যখন ‘তুই’ বলেন, তখন ছোটরা খুশিতে আটখানা হয়ে পড়ে, কারণ শত-হলেও ‘দিদি’ তো ‘তুই’ বলতেই পারেন! দিদি’র ভালবাসা থেকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও বাদ যান না, মাঝে-মধ্যে তিনি মোদিকেও ‘তুই’ বলে সম্বোধন করেন। নিন্দুকরা এতে সমালোচনা করলেও এতে দোষের কিছু নেই, মহাজ্ঞানী-মহাজন অনেক সময় এমনসব কর্মকান্ড করেন যা সাধারণ মানুষের বোঝার কথা নয়! 

পশ্চিমবঙ্গের ‘বাপের ভাগ্যি’ যে দিদি’র মত একজন মুখ্যমন্ত্রী পেয়েছেন। তিনি ট্রেডমিলে দৌড়াতে দৌড়াতে পশ্চিমবঙ্গের বাজেট তৈরী করে ফেলেন। ড: বিধান রায়, সিদ্ধার্থ শংকর রায়, জ্যোতি বসু বা বুদ্ধদেব ভত্যাচার্য্য এমন কাজ করেছেন বলে কেউ কখনো শুনেনি। দিদি মহান, দিদি’র তুলনা শুধু দিদি-ই? এ রকম বিরল প্রতিভা বাংলার গর্ব। সময়ের অভাবে তিনি হাটতে হাটতে কাজ করেন, ‘জয় শ্রীরাম’ শুনলে গাড়ী বা মঞ্চ থেকে নেমে পড়েন, তিনি কবি, ভাষণে মাঝেমধ্যে ‘হাম্বা হাম্বা রাম্বা রাম্বা’ করেন। আমরা হয়তো সবকিছু বুঝে উঠতে পারিনা, এটি দিদির দোষ নয়, আমাদের অপারগতা। ভ্যান গ্যগা’র শিল্পকর্ম তখনকার আমলের মানুষ বুঝেনি, কারণ তিনি সময়ের চেয়ে এগিয়ে ছিলেন। দিদিও সময়ের চেয়ে এগিয়ে আছেন, তাঁর ‘হাম্বা-রাম্বা’ বোঝার মত বুদ্ধি এ প্রজন্মের মানুষের নেই? 

নিন্দুকেরা প্রায়শ: দিদি কেন বিয়ে করেননি এনিয়ে সমালোচনা করেন। দেখুন, বিষয়টি নিতান্ত ব্যক্তিগত। সঠিকভাবে চিন্তা করলে দেখতে পেতেন হয়তো জনগণের জন্যে খাটতে খাটতে দিদি বিয়ে করার সময় পাননি। নিন্দুকেরা অযথাই বলেন, ‘দিদি বিয়ে করলে একটি সংসার পুড়তো, না করায় একটি রাজ্য পুড়ছে’। দিদি’র এমন অপবাদ অসহ্য। বারবার বলছি, দিদি’র ব্রেইনের কাছে অন্যরা তুচ্ছ! দিদি চাইলে অনেক কিছুই করতে পারেন, ভারতের ‘পদ্মশ্রী’-র আদলে দিদি ‘কন্যাশ্রী’ বানিয়েছেন। ভারতের একটি রাজধানী, দিদি’র চারটি। বাংলাদেশে পহেলা বৈশাখে আজকাল ‘পান্তা-ইলিশ’ খাওয়ার রেওয়াজ হয়েছে। দিদি সেটি আগেই টের পেয়েছিলেন, তাই ‘পান্তাশ্রী’ তৈরী করেছেন। অধুনা দিদি ‘ডিমভাত’ চালু করেছেন। দিদি দিল্লীর কেজরিওয়ালের লাইন ধরেছেন! 

বাংলার প্রতি অকৃত্তিম ভালবাসা দিদি’র, তাই বলেছেন, ঘুম থেকে উঠেই ‘জয়বাংলা’ বলুন! দিদির বাংলায় অনেককিছুই ‘বহিরাগত’, জয়বাংলা বাংলাদেশের জাতীয় শ্লোগান হলেও দিদি ওটা আপন করে নিয়েছেন! সদ্য দিদি বলেছেন, প্রয়োজনে জেলে বসে বঙ্গবন্ধু’র মত ‘জয়বাংলা’র সংগ্রাম চালিয়ে যাবেন। দিদি’র বাংলায় অমিত শাহ বহিরাগত, কিন্তু ভাইপো’র স্ত্রী খাঁটি বাঙ্গালী! তবে দিদি’র মোটর সাইকেল চালানোটা দেখার মত, শুরু করলেন পেছনে বসে, কিন্তু দিদি কি পেছনে থাকার মানুষ (!), তাই একলাফে চলে যান সামনে, এ না হলে দিদি!! দিদির অনেকগুলো বই, সামনে অখন্ড অবসর আসছে, বই পড়ে সময় কাটাতে পারবেন। দিদি জিন্দাবাদ। তবে চিন্তায় আছি, দিদি যখন মুখ্যমন্ত্রী থাকবেন না, রাস্তাঘাটে ছেলেপেলে তাঁকে দেখে ‘জয় শ্রীরাম’ বললে তখন তিনি রেগে যাবেন কিনা?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *