GeneralNewsSambad Matamat

রাঢ় বাংলার বৃদ্ধাশ্রম ‘বাদশা’ প্রাঙ্গনে কয়েক দিন

অরুন কুমার। 

মানুষের জীবনের শেষ দিনগুলি যেখানে কাটে অর্থাৎ এক বৃদ্ধাশ্রম  প্রাঙ্গনে  থাকার সুযোগ হয়েছিল সম্প্রতি।এখানে বেশ কয়েকদিন থাকার সুবাদে  স্থানীয় আবাসিকদের  পাশাপাশি ম্যানেজার থেকে আরম্ভ করে যারা যারা ছিলেন তাদের সাথে কথা বলে অভিজ্ঞতা কিছু জানার সুযোগ হয়েছিল। সেগুলোকে একত্র করে গেঁথে একটি মালার রূপ দেওয়ার চেষ্টা করছি এখানে। এদিকে অধিকাংশ ষাটোর্ধ্ব ও আশি বছরের মধ্যে যারা বয়স্ক তারা এখানে রয়েছেন তাদের জীবনযাত্রা কিভাবে কাটছে সেটা দেখার সুযোগ হয়েছিল। অনেক খোলা মনে তাদের কথা হয়েছে নিজের কথা ব্যক্ত  করেছেন আবার অনেকেই কোন কথা বলেননি। বলেননি মার বলতে চাননি তা নয় তারা বলার মত অবস্থায় ছিলেন না মানসিকভাবে তারা সুস্থ ছিলেন না যারা এখানে বসবাস করছেন।তবে এটুকু বলা যায় অধিকাংশই নিজে নিজেও মতামত পোষণ করেছেন। 

এদের সকলের সাথে কথা বলে যেটুকু আমার মনে হয়েছে সেটা হল এই জীবনে চলার পথে অনেক অভিজ্ঞতার ভান্ডার সঞ্চিত হয়। একটু আগে বলেছি অনেক বলা, না বলা কথা সবগুলোকে গেঁথে একটি মালা রূপ দিয়ে তুলে ধরার চেষ্টা আমার থাকে। এখানেও আমি তাই করতে চলেছি। সেভাবেই সেভাবেই চলতে চলতে পৌঁছে গিয়েছিলাম  রাঢ় বাংলার অন্যতম রারবাংলার অন্যতম  এক বৃদ্ধাশ্রম বৃদ্ধাশ্রম যার নাম বাদশা । এই বাদশা প্রাঙ্গণ যেন নানান গাছ-গাছালি ফুলের বাগান দিয়ে এক অপরূপ প্রাঙ্গণ। প্রবীণদের জীবনে একাকীত্ব দূর করে এবং একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বাঁচার প্রেরণা যোগাতে পারে। এখানে কাটানো সময়গুলো যেমন মানসিক শান্তি দেয় , তেমনি জীবনকে নতুন করে উপলব্ধি করার সুযোগ করে দেয়।

এখানে সকাল হয় নানান ধরনের পাখিদের আওয়াজে মুখরিত হয়ে ওঠে কোকিলের মিষ্টি মধুর শব্দে। গাছের ডালে ফেলা করে কাঠবিড়ালির দল। এসবের মাঝে যারা এখানে রয়েছেন আবাসিক রূপে তাদের   মানসিক শান্তি ও একাকীত্ব  থেকে মুক্তি, পরিবার থেকে দূরে বয়স্কদের জন্য বৃদ্ধাশ্রমের পরিবেশ একঘেয়েমি কাটাতে সাহায্য করে। সমবয়সীদের সাথে আড্ডা, গল্প, এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক-সামাজিক কার্যকলাপে অংশগ্রহণ করে সময়টা বেশ উপভোগ্য হয়ে ওঠে । এখানে থেকে যেটা দেখতে পেলাম সেটা হল  নতুন রুটিন ও শৃঙ্খলা। এটা এখানে মেনে চলা হয় এবং প্রতিদিন নিয়ম মিলে বিভিন্ন কর্মসূচি অনুসারে তাদের জীবনযাত্রা চালিত হয়। 

প্রতিদিন  দেখতে পেলাম সেটা হল এই -এখানে  নির্দিষ্ট নিয়মের মধ্যে কাটে—যেমন সকালে প্রার্থনা, সময়মতো পুষ্টিকর খাবার, হালকা ব্যায়াম এবং চিকিৎসকদের দ্বারা নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা। এই সুশৃঙ্খল জীবনধারা শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা বজায় রাখতে সাহায্য করে। অবসর সময়ে তারা ফুলের গাছে জল দেওয়ার পাশাপাশি খবরের কাগজ পড়েন দেশববিদেশের নানান বিষয় নিয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করেন নিয়মিত খবর দেখেন রাজ্য রাজনীতি থেকে আরম্ভ করে খেলাধুলা স্বাস্থ্য চর্চা সচেতনতা সিনেমা জগতের কথা এসবের মধ্যেই নিজেদেরকে ব্যস্ত রাখেন মহিলা আবাসিক রা। উল্লেখ করা যেতে পারে যে এখানে মহিলা আবাসিকের সংখ্যা বেশি পুরুষ আছে তবে কম।।

এদের অনেকেই তারা তাদের ছেড়ে আসা জীবনের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে তুলে ধরলেন নিজের নিজের জীবনের নতুন উপলব্ধি এই বাদশা বৃদ্ধাশ্রমের প্রাঙ্গণে বসে চারপাশের প্রবীণাদের জীবনসংগ্রাম ও অভিজ্ঞতা শোনার সুযোগ হয়েছিল। তাঁদের হাসি-কান্না, জীবনের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি এবং অভিজ্ঞতার গল্পগুলো জীবনের প্রতি আমাদের নিজস্ব চিন্তাভাবনাকে অনেক বেশি সমৃদ্ধ ও পরিণত করে। এদের ভাবনা চিন্তা এক একটা গঠনমূলক সৃজনশীল চিন্তাভাবনার বহিঃপ্রকাশ ও বলা যেতে পারে। তাদের মনে দুঃখ থাকলেও যন্ত্রণা থাকলেও সেটা তারা প্রকাশ করে না এটাই আমার মনে হয়েছে। এই জীবন তাদের কাছে উপভোগ্য হয়ে উঠেছে এখানকার পরিবেশের প্রেক্ষাপটে। তারা খুশি। 

বাদশা বৃদ্ধাশ্রমে যারা রয়েছেন আবাসিক গ্রুপে তাদের স্বাস্থ্যের প্রতি খাদ্যের প্রতি যথেষ্ট নজর কর্তৃপক্ষের সেই সঙ্গে তাদের জীবনচর্চা শরীর চর্চা যোগব্যায়াম চর্চা এখানে নিয়মিত হয়ে থাকে তাদের শারীরিক সক্ষমতাকে ঠিকঠাক রাখার জন্য। এটা একটা খুব ভালো দিক। এই কেন্দ্রের অন্যতম কর্ণধার সাংবাদিক ও সমাজকর্মী সুকুমার রায়ের প্রচেষ্টায় করে গড়ে উঠেছিল এই আবাস বৃদ্ধাশ্রম। 

 দুর্গাপুরের বাদশা বৃদ্ধাশ্রমের ঠিকানা হলো: B-II/51, নেতাজি সুভাষ অ্যাভিনিউ, এ-জোন (A-Zone), দুর্গাপুর – 713204 পশ্চিম বর্ধমান, পশ্চিমবঙ্গ। এখানে পৌঁছাতে হলে দুর্গাপুর রেলস্টেশন বা বাসস্ট্যান্ড থেকে এ-জোন A-Zone গামী যেকোনো বাসে উঠলেই পৌঁছে যাওয়া যাবে নির্দিষ্ট ঠিকানায় কিংবা ইসকন মন্দিরগামী বাসের কথা বললেই এখানে পৌঁছে যাওয়া যাবে খুব সহজ পথ সময় লাগবে কুড়ি থেকে ত্রিশ মিনিটের মতো। সবুজ গাছালিতে ঘেরা এই জায়গায় এলে আপনার মন সমৃদ্ধ হয়ে উঠবে প্রকৃতির মাঝে। এক আলাদা অনুভূতি হবে এখানে এলে।

উল্লেখ করতে হয় যে, এই বৃদ্ধাশ্রমটি ‘বর্ধমান ডেভলপমেন্ট সোসাইটি ফর হিউম্যান অ্যাক্টিভিটিজ’ বা BADSHA নামক সংস্থার অধীনে পরিচালিত হয়। এদের মূল উদ্দেশ্য সম্পর্কে যা জানা গিয়েছে তা হল প্রথমত, সুবিধা এবং পরিষেবা। প্রবীণদের দৈনন্দিন জীবনযাপনে সহায়তার পাশাপাশি স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পরিষেবা এবং মানসম্মত খাদ্য প্রধান এবং অপরদিকে এই আবাসন ভালো পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখার বিষয়টি গুরুত্ব দেওয়া হয় প্রতিদিন। এ ছাড়াও আবাসিকদের জন্য প্রতিদিন সময় তাদের জন্য বিনোদন ও সামাজিক কার্যক্রম যেমন- যোগব্যায়াম, খেলাধুলা, মেডিটেশন ইত্যাদি এসব রয়েছে। সম্পূর্ণভাবে বেসরকারি সাহায্যে এই বৃদ্ধাশ্রম পরিচালিত হয়ে আসছে প্রায় দুই দশক ধরে। 

বৃদ্ধাশ্রমের অধিকাংশ মহিলা আবাসিকদের মতে, এখানকার ম্যানেজমেন্ট বেশ সহযোগিতাপূর্ণ। তারা বৃদ্ধদের প্রয়োজন শোনেন এবং তাঁদের বাড়ির মতো পরিবেশ দেওয়ার চেষ্টা করেন। এই বাদশা আবাসিক বৃদ্ধাশ্রমে যেটি খুব উল্লেখযোগ্য বিষয় দেখার মত ছিল সেটা হচ্ছে এখানকার খাদ্য পরিষেবা। সকালে আপনাকে চা দেওয়া হবে তারপর শরবত  প্রাতরাশ বা ব্রেকফাস্ট দুপুরে মধ্যাহ্নভোজন বিকেলে  এক চা এক এবং রাতে পাহাড় ও সঙ্গে থাকবে গরম দুধ। রান্নার কাজে সব থেকে বেশি নিপুণতা দেখা যায় রীনা দাসের হাতের তৈরি বিভিন্ন পদের রান্না আমিষ নিরামিষ উভয়ই। সকালে চা দেয় মীরা, ঘর পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখে শর্মিলা এবং অফিস থেকে আরম্ভ করে সংস্কৃতি কিছু দেখাশোনার ভার করে থাকে রিংকী ঘোষ এরা প্রত্যেকেই এক একটা মন প্রাণ দিয়ে যেন আবাসিকদের সেবা করে চলেছে দিনের পর দিন। এদের ব্যবহারে খুশি আবাসিকদের অধিকাংশ। যদিও এখানে আবাসিকদের নিজে নিজেও অ্যাটেনডেন্ট বা সহায়িকা রয়েছে নিজের মত করে তারা পরিষেবা পেয়ে থাকেন। নিজের নিজের ঘরে নিজস্ব টুকটাক খাওয়া-দাওয়া ফল শরবত জুস এসব তারা নিজেরা খেয়ে নিজেদেরকে ঠিক রাখেন। 

বৃদ্ধাশ্রমে সকাল সকাল খবরের কাগজ  পৌঁছে যায় ।তারা পড়ে দেশ-বিদেশের খবর জানতে পারেন ।টিভিতে খবর দেখেন এভাবেই তাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার একটা ভালো দিক এখানে দেখতে পাওয়া যায়। অসংখ্য গাছ ফুল গাছ রয়েছে এই বাদশা বৃদ্ধাশ্রম জুড়ে। সকাল সকাল ঘুম ভাঙ্গে আবাসিকদের বিভিন্ন পাখিদের ডাকে। চারপাশে সবুজ গাছগাছালি এবং গাছপালা যেন সমৃদ্ধ করে রেখেছে এই বাদশা বৃদ্ধাশ্রমকে। 

শীতকালে প্রচন্ড শীত পড়লেও এখানে সৌর পদ্ধতিতে জল গরমের ব্যবস্থা রয়েছে। আর গরমকালে রয়েছে কুলারের ব্যবস্থা। আগামী দিনে ভাবনা চিন্তা রয়েছে এখানে কিচেন গার্ডেন কারা সে বিষয়ে ভাবনাচিতে চলেছে।  বাদশা বৃদ্ধাশ্রমে নিয়মিত যত্ন ও দেখভালের কারণে প্রবীণদের জন্য এটি একটি নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক আশ্রয়স্থল হিসেবে বিবেচিত হয়। কর্তৃপক্ষের ভাবনা চিন্তার মধ্যে রয়েছে আরও কিভাবে এখানকার পরিষেবা কে উন্নত করা যায় সে বিষয়ে।

এখানকার পরিচালন ব্যবস্থা মান ভালো ভাদুড়ি বাবু নিয়মিত খোঁজখবর নেন, সুশীলা সিং যিনি পেশায় একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন অ্যাথলিট হওয়ায় সকাল সকাল মাঠ পরিদর্শন করার পাশাপাশি বৃদ্ধাশ্রমে আসেন প্রত্যেকটা ঘরে গিয়ে সব ঠিকঠাক আছে কিনা কোন অসুবিধা হচ্ছে কিনা আশিকদের খোঁজখবর নেন এবং সেগুলোর সমাধানের চেষ্টা করেন সকলের সাথে আলোচনা করে। এরপর এভাবেই দিনের চলা শুরু থেকে আরম্ভ করে বর্তমান সময়কাল পর্যন্ত এখানে যারা যারা রয়েছেন এবং তাদের সাথে কথা বলে যেটুকু মনে হয়েছে সেটা হল এটা বৃদ্ধাশ্রম নয় – এই বাদশা বৃদ্ধাশ্রম ‌এ যেন এক বাড়ি থেকে দূরে একটি বাড়ি।

এক্ষেত্রে আপনার যদি মনে হয় এই সংস্থায় অনুদান প্রদান করতে ইচ্ছুক, তবে তা ভারতীয় এবং বিদেশী উভয় অনুদানকারী (FCRA এবং 80G ট্যাক্স ছাড়ের সুবিধা সহ) হিসেবে প্রদান করার সুযোগ রয়েছে। বিস্তারিত ও অ্যাকাউন্ট সংক্রান্ত তথ্যের জন্য Badsha Old Age Home Donation Information পেজে ভিজিট করতে পারেন। এই সুযোগ-সুবিধা কি এখানে রয়েছে। পারলে আপনি আপনার উদার মনে এখানে দান করতে পারেন। রাঢ় বাংলার মাঝে এক সুন্দর পরিবেশে বাদশা বৃদ্ধাশ্রম এগিয়ে  চলেছে আপন গতিতে আপন মহিমায় সকলের শুভেচ্ছা কে পাথেয় করে। Pic courtesy : From BADSHAH archive

Leave a Reply

Your email address will not be published.