করোনা, ইমিউনিটি ও টিকে থাকার লড়াই – একটি ভাবনা

 ডাঃ  দেবাশিস বক্সী 

এম.বি.বি.এস. (কল), আকুপাংচার বিশেষজ্ঞ(চীন)

ইন্ডিয়ান রিসার্চ ইনস্টিটিউট ফর ইন্টিগ্রেটেড মেডিসিন(ইরিম), মৌরিগ্রাম, হাওড়া

আকাশ এখন ঝকঝকে নীল, বাতাসে তেল ধোঁযার গন্ধ নেইI এরকম গ্রামাঞ্চলে কিছুটা থাকলেও শহরে নগরে কখনই দেখা যায় নিI চার তলা ফ্ল্যাটবাড়ির ছাদে সকাল পৌনে সাতটায় হাঁটতে গিয়ে দেখতাম আশেপাশের বাড়ীগুলো যেন হাল্কা ধোঁয়ার আবরণে ঢাকাI গায়ে রোদ লাগাবো বলে হাল্কা রোদ উঠতেই ছাদে চলে যেতামI কারণ কাজে যাওয়ার তাড়ায় এরপর আর দেরী করা যেত নাI সময়টা মার্চ এপ্রিল মাস, তাতেও রোদ পেতে এত দেরীI কিন্তু দিন দশেক হলো চিত্রটা বদলে গেছেI যবে থেকে লকডাউন শুরু হলো সকাল ছ’টা বাজতেই রোদের দেখা, আর সাড়ে ছ’টায় চারিদিক রোদে ঝলমল করছে, কি তার তেজI আশেপাশের বাড়ীগুলো সব পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে, কোন ধোঁয়ার আবরণ নেইI কথাগুলো বলছিল সুতপা, থাকে কলকাতা শহরেI পাঠক পাঠিকারা ভাববেন এই সব কথার সঙ্গে অভ্যন্তরীণ প্রতিরোধ ক্ষমতা বা ইমিউনিটির কি সম্পর্ক আর টিকে থাকার লড়াই কোথায় হলো? হ্যাঁ সম্পর্ক আছে, লড়াইও হচ্ছেI 

‘ইমিউনিটি’, ‘লকডাউন’ এগুলো ইংরাজী শব্দ হলেও সাম্প্রতিক ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বারংবার ব্যবহারে আর বাংলা মানে করে বোঝাতে লাগে না| করোনা ভাইরাসের আক্রমনে সারা দেশ লকডাউন বা তালাবন্ধ, পৃথিবীও| কারণ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এই রোগকে বিশ্বমহামারী ঘোষনা করেছে| এর আগেও সার্স, মার্স, বার্ড ফ্লু, সোয়াইন ফ্লু ইত্যাদি ভাইরাসের আক্রমন হয়েছে, বহু প্রাণ শেষ হয়ে গেছে| আর এখন করোনা ভাইরাসের আক্রমনে সারা পৃথিবী জুড়ে হাজার হাজার মানুষ মারা যাচ্ছে| আশা করা যায়, কিছুদিন পর এই তান্ডব থেমে যাবে| মানুষ আবার স্বাভাবিক ছন্দে ফিরে আসবে| কিন্তু মানব সভ্যতা ঠিক এইভাবেই চললে ভবিষ্যতে যে আবার কোন ভয়ঙ্কর ভাইরাসের মহামারী আক্রমন হবে না তা কেউ বা কোন সংস্থা নিশ্চিত করে বলতে পারে না| তার মানে আবার মৃত্যুমিছিল, মহামারী, লকডাউন অর্থাত্ এখন যা ঘটছে তার পুনরাবৃত্তি হতেই পারে| 

আর এই বিপদগ্রস্ত অবস্থার মধ্য দিয়ে সমগ্র পৃথিবী চলছে| একজন মানুষের নিজের যেমন সার্বিক ভারসাম্য নষ্ট হলে অসুখ হয়, তেমনই পৃথিবীর ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে বরং বলা ভালো আমরাই যুগ যুগ ধরে এই ক্ষতি করে চলেছি| দিনের পর দিন লকডাউন চলছে, সারা পৃথিবী তালাবন্ধ, আমরা কেউ জানিনা আরও কত দিন এই বন্ধ দশা চলবে| সুতরাং এই পুনরাবৃত্তি না হওয়ার লড়াইযে যে জিতবে সেই বেঁচে যাবে, টিকে থাকবে|

কিন্তু এই টিকে থাকার লড়াই তো একদিনের নয় বা নির্দিষ্ট কিছুদিনেরও নয়| এই লড়াই হ’ল সবারই সুস্থভাবে বেঁচে থাকার লড়াই| তার জন্য প্রতিদিন কিছু সুস্থ অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে| অর্থাত নিজেকে সুস্থ রাখার জন্য বা যতদিন বাঁচব ততদিন দৈহিক, মানসিক ও সামাজিক সবরকমের সুঅভ্যাস চর্চা করতে হবে, তা যেমন প্রতিটি ব্যক্তির তেমনি সামাজিক|

তাই টিকে থাকার লড়াইয়ে কেবল নিজেকে বা নিজের পরিবারকে নিয়ে ভাবলে হবে না, প্রকৃতিকেও টিকিয়ে রাখতে হবে| প্রকৃতি আমাদের থাকতে দিয়েছে, সুতরাং ধ্বংস করে নয়, বরং তাকে সুরক্ষিত রেখে, ভারসাম্য বজায় রেখে তারই সম্পদ যেমন সূর্যের আলো, বাতাস, জল, মাটি ব্যবহার করে আমরা সুস্থ থাকতে পারি|

আসুন কয়েকটা অতি সাধারণ কাজ আজই শুরু করি যেমন: 

সকালে গায়ে হাল্কা রোদ লাগিয়ে আধঘন্টা হাঁটা বিশেষ উপকারী| এতে শরীরে ভিটামিন ডি তৈরী হয়, যা হাড়গুলোকে মজবুত করে| এটা অনেকেই জানে এমনকি ছোটরাও বায়োলজি বা শরীর বিজ্ঞানের বইতে পড়ে| কিন্তু বইপড়া জ্ঞানকে বাস্তবে নিজের জীবনে কাজে না লাগালে কী লাভ হ’ল| আধুনিক জীবনে এইসব অভ্যাস তো নেই বললেই চলে| হাঁটা, ব্যায়াম, যোগাসন, মাঠে খেলাধুলা বা দৌড়ঝাঁপ, স্কিপিং, সাঁতার কাটা ইত্যাদি প্রতিদিনের রুটিনে আনতে হবে| আর এই শরীর চর্চা ছোট বয়স থেকেই শুরু করতে হবে| বেশীরভাগ মা বাবা সন্তানদের এই দিকটায় কোন গুরুত্বই দেন না, তাদের কেরিয়ার গঠনের জন্যই মনোনিবেশ করেন| ফলে তাদের ইমিউনিটি বা রোগ প্রতিরোধী ক্ষমতা উপযুক্তভাবে গড়ে ওঠে না| তাই ঋতু পরিবর্তন বা পরিবেশে ঠান্ডা গরমের সামান্য তারতম্যে সর্দি কাশি জ্বর হয়, আসলে প্রথম আঘাতটাই আসে শ্বাসতন্ত্রের ওপর কারণ শ্বাসপ্রশ্বাসের মাধ্যমে সরাসরি পরিবেশ থেকে বাতাস নেওয়া ছাড়ার কাজ চলে| তাই নিয়মিত শরীর চর্চা ও প্রাণায়াম বা শ্বাসের ব্যায়াম করতে পারলে শ্বাসতন্ত্র ও তার প্রধান অঙ্গ ফুসফুস শক্তিশালী হবে| বর্তমান পরিস্থিতিতে এই করোনা ভাইরাস প্রথমে কিন্তু শ্বাসতন্ত্রের ওপরের অংশেই আক্রমন করে| সুতরাং এই আক্রমনের বিরুদ্ধে লড়াই করে জিততে হলে শ্বাসতন্ত্রকে বেশ শক্তিশালী হতে হবে| ভবিষ্যতে চরিত্র বদল করে আরও নতুন নতুন ভাইরাস আক্রমন ঘটাতেই পারে, তার বিরুদ্ধে নিজেকে প্রস্তুত রাখতে হলে এই সমস্ত অভ্যাসগুলো নিয়মিত চর্চা করতেই হবে| এটাই হ’ল টিকে থাকার লড়াই| আর এই সচেতনতা বোধ বড়দের মধ্যে প্রথমে জাগরিত হওয়া দরকার, তবেই ছোটরা শিখবে| এতক্ষণে নিশ্চয়ই লেখার শুরুতেই সুতপার কথাগুলোর সঙ্গে লেখার টাইটেল বা হেডিং এর সম্পর্ক বোঝা গেছে|

এবারে আসি রোজকার খাওয়া দাওয়ার অভ্যাসে| জাঙ্ক ফুড ও ফাস্ট ফুড নিয়ে বিস্তারিত বলছি না| কারণ ছোট বয়স থেকেই এইসব খাওয়ার অভ্যাস আছে বলে সকলেই এই বিষয়ে খুব ভালো জানেন| মানুষ বোঝেন নেশার বস্তু কত ক্ষতি করে, তাও তো নেশা করেন| এই জাঙ্ক ফুড  ফাস্ট ফুডও তাই, এক নেশার বস্তু| সুতরাং না সচেতন হলে তার ক্ষতিকর ফল ভোগ করতেই হবে| বরং ইতিবাচক দিকটায় আলোকপাত করাই ভালো| এই ‘করোনা’ পর্বে বিভিন্ন আলোচনায় শুনছি পুষ্টিকর খাবার খেতে হবে, ইমিউনিটি বাড়ানোর খাবার খেতে হবে| হ্যাঁ, কথাটা ঠিক, কিন্তু তা তো রাতারাতি হবে না| ইমিউনিটি একদিনে বা কয়েকটা দিনে তৈরী হয়না| এটা একটা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে চলে| অর্থাত আবার সেই প্রতিদিনকার খাদ্য তালিকার রুটিনে উপকারী বা পুষ্টিকর ইমিউনিটি বৃদ্ধিকারী খাবারগুলোর জায়গা দিতে হবে| কিছু উদাহরণ দিই, যেমন এক টুকরো কাঁচা হলুদ, একমুঠো অঙ্কুরিত গোটামুগ বা ছোলা, ছাতুর সরবত, সময়ের ফল ও শাক সব্জী, ভৌগোলিক ক্ষেত্রবিশেষে উপকারী শস্যদানা যেমন চিঁড়ে, মুড়ি, ডালিয়া, মিলেট, ওট ইত্যাদি|   ভাত, আটার রুটি, ডাল, আমিষ নিরামিষ প্রোটিন জাতীয় খাবারের নিয়মিত তালিকায় এইগুলোর সংযোজন করা দরকার| যত বেশি প্রাকৃতিক, সম্ভবহলে জৈব পদ্ধতিতে উত্পন্ন, খাবার খাওয়া যায় ততই স্বাস্থ্যের পক্ষে উত্তম, আর ক্ষতিকর খাবারগুলো যতটা সম্ভব বর্জন করাই ভালো| প্রাণীজ প্রোটিন বেশি বেশি করে খাওয়াও (বিশেষ করে অর্ধ সিদ্ধ বা অর্ধ পুড়িয়ে) আজকের সভ্যতার একটা ঝোঁক- তাতেও উপকার থেকে অপকার বেশি|   

আগেই বলেছি নিজেকে সুস্থ রাখতে হলে পরিবেশকেও নিরাপদে রাখতে হবে| যত বেশি আমরা পরিবেশের দুষণ করব, ততই নিজেদের বিপদ ডেকে আনবো| সুতরাং জীবনধারণের ন্যূনতম চাহিদা বা প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো নিয়ে অল্পতেই সন্তুষ্ট থাকাই ভালো| এখানে নিজের মনকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, তাতে মন ভালই থাকবে, আর মন ভালো থাকলে তো শরীরও ভালো থাকবে| প্রতিটি বিষয় পারস্পরিক সম্পর্কযুক্ত, কোনোটিই একক ভাবে স্বয়ংসম্পুর্ণ নয়| 

সুস্থতা বজায় রাখার জন্য আরো কিছু উপায়: 

ওষুধবিহীন রোগ প্রতিরোধমূলক চিকিত্সাপদ্ধতি অবলম্বন করা যায় যেমন, শরীরে নির্দিষ্ট কিছু জায়গায় যেগুলো আকু বিন্দু বলে পরিচিত সেগুলোতে নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে চাপ দেওয়া বা এক ধরনের ভেষজ (যা মক্সা নামে পরিচিত)-এর মাধ্যমে তাপ প্রয়োগ করা ইত্যাদি| এগুলো হ’ল পার্শ্ব প্রতিক্রিয়াহীন, খুবই সামান্য খরচে সহজে শিক্ষনীয় চিকিত্সাপদ্ধতি| এগুলো শিখে নিয়ে নির্দিষ্ট নিয়মে করতে পারলে রোগ প্রতিরোধী ক্ষমতা তথা ইমিউনিটি বাড়বে, ফলে টিকে থাকার লড়াইয়ে ধাপে ধাপে এগোনো যাবে| আকুপাংচার চিকিত্সা শাস্ত্রে রোগ প্রতিরোধমূলক চিকিত্সার বহু উল্লেখ আছে যা ইতিমধ্যে বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমানিত এবং সাম্প্রতিককালে বিশেষভাবে আলোচিত| 

এই প্রসঙ্গে দুটো উদাহরণের কথা বলি| যুবক বয়সে একজন টিউবারকিউলোসিস রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন, উপসর্গহীন থাকায় প্রথমে ধরা পড়েনি, পরে কাশির সঙ্গে রক্ত পড়ায় উপযুক্ত পরীক্ষায় রোগ নির্ণয় হয়| বুকের এক্সরেতে ফুসফুসে ক্ষত দেখা যায়| টি.বি.-এর ওষুধপত্রের সঙ্গে আকুপাংচার চিকিত্সা শুরু হয়| ওষুধের কাজের নির্দিষ্ট সময়সীমার আগেই উনি দ্রুত সেরে ওঠেন| পুনরায় এক্সরেতে দেখা যায় ফুসফুসে ক্ষত মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ভালো হয়ে গেছে| 

এক মাঝবয়সী ভদ্রমহিলার ব্রেস্ট ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার পর অপারেশনের পরে রুটিনমাফিক কেমোথেরাপি ও রেডিয়েশন চিকিত্সা হয়| প্রথম থেকেই এর পাশাপাশি আকুপাংচার ও অন্যান্য প্রকৃতিমুখী চিকিত্সাও শুরু করে দেওয়া হয়| কোন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছাড়াই সব কটি চিকিত্সার সম্পূর্ণ কোর্স নিতে তিনি সক্ষম হ’ন|

উভয়ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, ইমিউনিটি বাড়ার পরে রোগ নিরাময় দ্রুত হয়েছে, ওষুধ ভিত্তিক চিকিতসার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া প্রায় হয়নি, পুনরাক্রমন হয়নি|

এইরকম আরও অনেক রকম রোগে আকুপাংচার সহ অন্যান্য প্রকৃতিমুখী চিকিতসার উপকারিতা তথা রোগ প্রতিরোধী ও সারিয়ে তলার ক্ষমতা কার্যক্ষেত্রে প্রচুর দেখেছি| 

করোনা ভাইরাসের মহামারী আক্রমণ দিয়ে প্রকৃতি আমাদের সতর্ক করলো, বুঝিয়ে দিল তার ভারসাম্য নষ্ট করে তাকে অসুস্থ করে তুললে আরও ভয়ানক বিপদ ঘনিয়ে আসবে|  সুতরাং অসুস্থ প্রতিযোগিতা, মারামারি হানাহানি না করে প্রকৃতি ও পরিবেশকে ভালোবেসে মিলেমিশে সহাবস্থান করাই শ্রেয়| এতে সামগ্রিক ভারসাম্য বজায় থাকবে আর মানবজাতিও টিকে থাকার লড়াইয়ে অস্তিত্ব বজায় রাখবে|

2 thoughts on “করোনা, ইমিউনিটি ও টিকে থাকার লড়াই – একটি ভাবনা

  • April 15, 2020 at 12:48 pm
    Permalink

    Thank you and congratulations for the article “Corona Immunity and fight to exist” – on 12th April 2020.
    It is so appropriate for the good and interest of humanity with a resolve to fight for survival. Please keep it up.

    Reply
  • April 29, 2020 at 3:44 pm
    Permalink

    আমি নিজে মাত্র তিনদিন যেতে পেরেছি, তাতেই ভীষণই উপকৃত । আশা রাখি, বন্দীদশা কাটলেই আবার গিয়ে পুরো কোর্সের treatment হবে।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published.