ভালো থাকুন আপনি

সীমা ঘোষ

আমরা ভালো নেই। এটা আপনি নিশ্চয়ই জানেন। আমরা উন্নয়নশীল দেশের মানুষেরা খুব সচ্ছল হয়তো কখনও ছিলাম না, তবু স্বস্তিতে ছিলাম। তারপর গনতান্ত্রিক পদ্ধতিতে আমরা আপনার হাতে আমাদের প্রশাসনের ভার তুলে দিলাম। মনে রাখবেন, আরও প্রার্থী ছিলেন, কিন্তু আমরা আপনাকে নির্বাচন করেছিলাম, আপনাকে বিশ্বাস করেছিলাম, আশা করেছিলাম আপনি আমাদের স্বপ্নের আচ্ছে দিন এনে দেবেন। আমরা নেতা নয়, একজন দক্ষ অভিনেতাকে বেছে নিয়েছিলাম। আপনি ক্ষমতা হাতে পেয়ে আমাদের আত্মনির্ভর স্বচ্ছ ভারতের স্বপ্ন দেখালেন। ডিমনিটাইজেশনের নামে আম জনতাকে অবর্ননীয কষ্ট দিয়ে ব্যাঙ্ক, এটিএমের সামনে লম্বা লাইনে দাঁড় করিয়ে দিলেন। তবু আমরা চেয়েছি, আপনি, আপনারা ভালো থাকুন।

আমরা তবু ভরসা হারাই নি। আমরা আবারও আপনাকেই বেছে নিলাম। আপনি এবার এন আর সি, সি এ এ র সাহায্যে আমাদের দেশ থেকেই উৎখাত করার চেষ্টা করলেন। আমরা তবুও আপনাকেই ভরসা করেছি। আপনাকে অবসর নিতে আমরা বলি নি।আপনার মন কী বাতেঁ আমরা মন দিয়েই শুনেছি।      

করোনার শুরুতেই আপনি আমাদের থালা বাটি বাজাতে বললেন, আমরা বাজিয়েছি, মোমবাতি জ্বালিয়ে আপনাকে সমর্থন করে গেছি। অপরিকল্পিত ভাবে কোনও প্রস্তুতির সুযোগ না দিয়ে আপনি লক ডাউন করলেন, আমরা নিজেদের ঘরবন্দী করেছি।খাদ্য, ওষুধের অভাবে কষ্ট পেয়েছি, অমানবিক আচরন ও করেছি কখনও কখনও। লাখে লাখে মানুষ যারা বাড়ি ছেড়ে নিজের দেশেই বিভিন্ন রাজ্যে কর্মরত ছিলেন, তাদের পরিযায়ী আখ্যা দিয়ে আশ্রয় হীন করে রাস্তায় নামিয়ে দিলেন।তারা নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার জন্য কোনও পরিবহনের ব্যবস্থা করতে পারে নি বলে অনেকেরই আর বাড়ি ফেরা হলো না, জীবন থেকেই বিদায় নিতে বাধ্য হলো। আমরা তবুও চুপ করেই থেকেছি। করোনার ভ্যাকসিন আপনি প্রথমেই সবাইকে দেওয়ার কথা ভাবলেন না, শুধুই ষাটোর্ধ্বদের জন্য, আমরা মেনে নিলাম। তারপরে আপনি ভাবলেন পযতাল্লিশ বা তার বেশী বযসীদের ভ্যাকসিন দেবেন। আমরা দুঃখিত হয়েছি, চিন্তিত হয়েছি আমাদের সন্তানদের জন্য। তবু আপনার আদেশ নিয়ে আমরা প্রশ্ন করি নি। আপনি জানতেন দেশে কোভিডের দ্বিতীয় ঢেউ আছড়ে পড় সম্ভাবনা আছে, তবু আপনি পশ্চিমবঙ্গের বিধান সভা নির্বাচন প্রক্রিয়া আট দফায় করালেন। রাজ্যের বাইরে থেকে কেন্দ্রীয় বাহিনী আনলেন, আপনি নিজে আঠারো বার এ রাজ্যে এলেন। মিটিং মিছিল, রোড শো, মানে যা কিছু প্রয়োজন ভোটের আগে সব করলেন। আপনি আমাদের বলেছেন সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে, আমরা রেখেছি। কিন্তু আপনি, আপনারা নির্বাচনী জনসভা, ধর্মীয় জমায়েত – সব করলেন। আর লাখে লাখে মারা গেলাম আমরা। আমরা আমাদের আত্মীয় পরিজনদের দেখতেও যেতে পারি না, তারা অসুস্থ হলেও সাহায্য করতে পারি না, অথচ আপনারা এই জমায়েতগুলো একটাও এড়াতে চান না। তবু আমরা আপনার বশংবদ, কোনও প্রশ্ন করি না। আপনাকে,  আপনাদের ভালো রাখার চেষ্টা করেই গেছি।  

আজ শ্মশানে মৃত মানুষেরা ন্যূনতম মর্যাদাটুকুও পাচ্ছেন না। আমরা জানতাম জীবিত মানুষের খাদ্য বস্ত্র বাসস্থান প্রয়োজন হয়, চাহিদার তুলনায় যোগান অল্প, তাই তার অভাব ও হয়। কিন্তু শ্মশানে জায়গার অভাব!!! সত্যি বলছি, একথা আমরা অতি ভয়ংকর দুঃস্বপ্নেও ভাবি নি। আপনাকে ধন্যবাদ, এমন পরিস্থিতির অভিজ্ঞতাও আমরা লাভ করলাম আপনার সৌজন্যে।

এখন আবার আমরা এক সার্বিক নেই রাজ্যের বাসিন্দা। ভ্যাকসিন নেই, অক্সিজেন নেই, ওষুধ নেই, বেড নেই, নদীতে ভেসে যাচ্ছে শব দেহ। কিন্তু আমাদের বিশ্বে প্রদর্শন করার মত মূর্তি আছে, সেন্ট্রাল ভিস্তা তৈরী হচ্ছে। বিশ্বে আপনার ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে হবে তো, আমরা তাই আপনার ছাপ্পান্ন ইঞ্চি ছাতির আড়ালে চুপ করে দাঁড়িয়ে আছি হাততালি দেওয়ার জন্য।বিদেশ থেকে সাহায্য এলেও আমরা তা হাতে পাই না, কারন আগে তো শুল্কের হিসাব মিলিয়ে নিতে হবে, আপনার ভান্ডার তো ভরে রাখতেই হবে। আপনার মর্জি মত আপনি যখন যতটুকু কৃপা বর্ষন করেন, আমরা তাতেই খুশি। আমরা ভুলেই গেছি, আমাদের দেওয়া ট্যাক্স, দেশের বিভিন্ন দুর্যোগে আমাদের দানেই ভরে উঠেছে আপনার ভান্ডার। কিন্তু সেসব আমাদের দুর্যোগে ব্যবহার্য নয়। আমরা এত অকৃতজ্ঞ, আপনার এত কঠোর পরিশ্রম এবং অনুশাসনের পরেও আমরা পঙ্গপালের মত অসংখ্য মানুষ বেঁচে বর্তে আছি এবং দেশের জিডিপি কমে গেল বলে চিন্তিত হচ্ছি। আপনার আর কী বা করার ছিল। গনহত্যা করার মত স্বৈরাচারী তো আপনি নন, কিন্তু এত বিপুল সংখ্যক দরিদ্র বা মধ্যবিত্ত মানুষ নিয়ে তো আপনার আত্ম নির্ভর ভারতের স্বপ্ন সফল হওয়া সম্ভব নয়। আমাদের ভুল, আপনার আগে আমরা ভুল নেতাদের নির্বাচন করেছিলাম। তারা এসে বিভিন্ন রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প, ব্যাঙ্ক ইত্যাদি স্হাপন করেছিলেন, কিন্তু সে ভুল আপনি শুধরে দিয়েছেন, সেসব অধিকাংশ বিক্রি করে। এখন এই বিপুল জনসংখ্যা কমাতে হলে, বিপুল সংখ্যক মানুষকে মরতেই হবে, যাতে শেষ পর্যন্ত যে সব নির্বাচিত মানুষ বেঁচে থাকবে, তারা যেন ভীষন ভালো ভাবে বাঁচতে পারে।তাই করোনার এই আবহেও আমরা বাচ্চা এবং তরুণ প্রজন্মের জন্য ভ্যাকসিন দেওয়ার কথা ভাবব না, যদি এই অগ্নিপরীক্ষার পরেও তারা বেঁচে থাকে, তাহলে তখন দেখা যাবে। সবাইকে ভ্যাকসিন বিনামূল্যে বা স্বল্পমূল্যে দিলে ভ্যাকসিন প্রস্তুতকারক সংস্থাগুলির লভ্যাংশ কমে যাবে যে। আপনি তো শুধু দেশের দরিদ্র অংশের প্রধানমন্ত্রী নন, আপনি তো ব্যবসায়ীদের ও প্রধানমন্ত্রী, তাদের স্বার্থ রক্ষা ও করতে হবে বৈকি। এই পরিস্থিতিতে এই মৃত্যু মিছিলকে দেশের অগ্নি পরীক্ষা বলা যেতে পারে। দেশ জোড়া নেই এর মধ্যেও কত জন বেঁচে থাকতে পারে তার পরীক্ষা চলছে, তবেই তো বোঝা যাবে, শেষ পর্যন্ত দেশ গড়ার কাজে আপনি কত জন সুস্থ শ্রমিক পাবেন। আপনি, আপনারা ভালো থাকলেই তো সেই স্বপ্নের ভারত তৈরী হবে, নইলে নেতৃত্ব কে দেবে!  

আপনি ভ্যাকসিন পেয়ে গেছেন, আমরা তাতেই সুখী।আমাদের ভ্যাকসিন দ্বিতীয় ডোজ চার সপ্তাহের জায়গায় বারো সপ্তাহ পরে দিলেও চলবে। আপনি থাকলে তবেই তো এক জনবিরল উন্নত দেশ হিসেবে ভারত স্বীকৃতি পাবে বিশ্বে, আমরা সেই দেশের ভূতপুর্ব নাগরিকদের পক্ষ থেকে অগ্রিম ধন্যবাদ জানাচ্ছি। আমরা দলে দলে মরি, কোনও ক্ষতি নেই। এই ভয়ংকর অতিমারীর পরেও নূন্যতম স্বাস্থ্য পরিষেবা নিয়ে যারা জীবিত থাকবেন, তাদের জন্য অভিনন্দন এবং শুভেচ্ছা জানিয়ে রাখি এখনই। শুধু আপনি, আপনারা সুস্থ থাকুন, তা নাহলে দেশের প্রভূত ক্ষতি। জয় ভারত।

আপনি ভ্যাকসিন পেয়ে গেছেন, আমরা তাতেই সুখী।আমাদের ভ্যাকসিন দ্বিতীয় ডোজ চার সপ্তাহের জায়গায় বারো সপ্তাহ পরে দিলেও চলবে। আপনি থাকলে তবেই তো এক জনবিরল উন্নত দেশ হিসেবে ভারত স্বীকৃতি পাবে বিশ্বে, আমরা সেই দেশের ভূতপুর্ব নাগরিকদের পক্ষ থেকে অগ্রিম ধন্যবাদ জানাচ্ছি। আমরা দলে দলে মরি, কোনও ক্ষতি নেই। এই ভয়ংকর অতিমারীর পরেও নূন্যতম স্বাস্থ্য পরিষেবা নিয়ে যারা জীবিত থাকবেন, তাদের জন্য অভিনন্দন এবং শুভেচ্ছা জানিয়ে রাখি এখনই। শুধু আপনি, আপনারা সুস্থ থাকুন, তা নাহলে দেশের প্রভূত ক্ষতি। জয় ভারত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *