উপমহাদেশে শান্তির জন্যে শেখ হাসিনা, নরেন্দ্র মোদী, এবং ইমরান খান এক টেবিলে বসলে ক্ষতি কি? বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এনআরসি, সিএএ এবং দিল্লির সহিংসতা

শিতাংশু গুহ, ১০মার্চ ২০২০, নিউইয়র্ক।।

এনআরসি  আসলে কি? বাংলাদেশে ‘জাতীয় পরিচয় পত্র’ দেয়া হয়েছিলো, তা আমরা সবাই জানি। এনআরসি বিষয়টি অনেকটা সেইরকম, ভারত এর সকল নাগরিককে একটি পরিচয়পত্র দিতে চাইছে। তাহলে বিরোধিতা কেন? বলা হচ্ছে, নাগরিকত্ব প্রমান হবে কিভাবে? মুসলমানরা কিভাবে নাগরিকত্ব প্রমান করবেন? বাংলাদেশে  হিন্দুদের নাগরিকত্ব প্রমানে কি অসুবিধা হয়েছে? হয়নি। তেমনি, ভারতের মুসলমানদেরও অসুবিধা হবার কথা নয়। অসুবিধা হবে, যাঁরা অনুপ্রবেশকারী, তাদের। মনে পড়ে কি, বাংলাদেশে জাতীয় পরিচয় পত্র দেয়ার পর এক কোটি ভুয়া ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছিলো? ভারতও এই ভুয়া ভোটারদের বাদ  দিতে চাইছে। এতে আমরা বাংলাদেশিদের কি সমস্যা তা আমি বুঝতে অক্ষম! সিএএ আসলে কি মুসলমানদের বিপক্ষে? এতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান থেকে অত্যাচারিত  সংখ্যালঘুদের ভারত নাগরিকত্ব দেবে। এই তিনটি দেশ থেকে সংখ্যালঘুরা অত্যাচারিত হয়ে ভারতে গেছেন, এতে তো কারো সন্দেহের কারণ নেই? পাকিস্তান এর পুরো সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীকে খেদিয়ে দিয়েছে। বাংলাদেশ অর্ধেক খেদিয়েছে। অথচ মুজিব-ইন্দিরা চুক্তি অনুযায়ী একজন হিন্দুরও দেশত্যাগ  করার কথা ছিলোনা! কিন্তু করেছে, বাধ্য হয়ে করেছে। আফগানিস্তান থেকে কম শরণার্থী এসেছে। ভারত এই লোকগুলোকে নাগরিকত্ব দিলে বাংলাদেশের ক্ষতি কি? আমাদের ক্ষতি হতো, যদি ভারত এদের পুশব্যাক করতো। আমাদের তো সিএএ-কে স্বাগত জানানো উচিত।  এবার দেখা যাক, সিএএ-তে মুসলমানের কি ক্ষতি হচ্ছে। প্রথমত: ভারতের মুসলমানদের কথা তো এখানে নেই?  তারা যেমন আছেন, তেমনি থাকবেন। ভারতের একজন মুসলমান নেতা যথার্থ বলেছেন, ‘আমরা বুঝিনি, বিরোধীরা আমাদের দিয়ে এ আন্দোলন করিয়েছে’। বাংলাদেশের মানুষের  এ নিয়ে মাথাব্যথা কেন? পাকিস্তান বা আফগানিস্তান থেকে সাধারণ মুসলমান খুব একটা ভারতে আসেন না, বাংলাদেশ থেকে যান! এঁরা  অত্যাচারিত হয়ে যাননি, বা শরণার্থী নন, অনুপ্রবেশকারী? এখন বাংলাদেশের অর্থনৌতিক অবস্থা ভালো, আগে তা ছিলোনা, মানুষ তাই গেছে। সীমান্ত অঞ্চলে প্রচুর বাংলাদেশী উভয় দেশের ভোটার। সবই ভোটের খেলা! বলা হচ্ছে, মমতার এক কোটি ভুয়া ভোটার আছে!! ভারত এই ভুয়া ভোটার বাদ দিতে  চাইছে। আমাদের তাতে অসুবিধা কোথায়? সর্বোপরি, সরকার বা আমরা সবাই বলছি, বাংলাদেশ থেকে একজন মুসলমানও ভারত যায়নি। তাই যদি হয়, তাহলে তো আমাদের কথা বলার কোন প্রয়োজনই নেই? এ কথার পরও বলা যায়, ভারতের মুসলমানরা আন্দোলন করতেই পারেন। আমরা তাতে নাক গলাই কেন? দিল্লিতে  আন্দোলনটি যতদিন শান্তিপূর্ণ ছিলো ততদিন এনিয়ে বহির্বিশ্ব তেমন মাথা ঘামায় নি! প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যখন ভারত গেলেন, ঠিক তখনই আন্দোলন হিংসাত্নক হলো কেন? এজন্যে অনেকে মোদিকে দায়ী করছেন। আচ্ছা, বাংলাদেশে যদি ট্রাম্প যেতেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কি চাইতেন তখন হিংসাত্মক

 আন্দোলন হউক? চাইতেন না, কোন রাষ্ট্র বা সরকার প্রধান তা চাননা। ভারত ও তাঁর সরকারের সুনাম রক্ষায় মোদিও তা চাননি। তাহলে এই হিংসাত্মক ঘটনা ঘটিয়েছে কারা? দেশবিরোধী, সরকার বিরোধী শক্তি, এরা মুসলমানদের ব্যবহার করেছে। মনে রাখতে হবে, সিএএ/এনআরসি একজন মানুষের নাগরিকত্ব  কেঁড়ে নেয়নি, কিন্তু শান্তিপূর্ণ আন্দোলন(!) ৪৩টি জীবন কেঁড়ে নিয়েছে। এই দায় কার?   

দিল্লি সহিংসতার ঘটনাটি দু:খজনক। সেখানে ঠিক কি ঘটেছিলো তা অস্পষ্ট,

 তবে ধীরে ধীরে জট খুলছে। প্রশ্ন উঠেছে, দিল্লি সহিংসতার মুলে কি নাগরিকত্ব আইন নাকি সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ? প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যখন ভারতে অবস্থান করছেন, বিশ্ব মিডিয়ার দৃষ্টি যখন দিল্লির দিকে, ঠিক তখনি এই হত্যাযজ্ঞ কি পরিকল্পিত? কারা এর পেছনে? ইন্ডিয়া টুডে বলেছে, এটি আগেভাগে পরিকল্পিত। এতো ইট, কাচের বোতল আমদানি, মলটভ ককটেল, পেট্রোল বোমা প্রমান করে যে ঘটনা স্বত:ফূর্ত নয়? সিসিটিভি ক্যামেরা-ফুটেজ, ব্যাঙ্ক ট্র্যানজেকশন রেকর্ড এবং প্রত্যক্ষদর্শী বিবরণে যা আসছে, তাতে দেশ-বিদেশের ধর্মীয় উগ্রপন্থীদের যোগসূত্র পাওয়া যাচ্ছে।  পুলিশ অফিসার অংকিত শর্মার মৃতদেহ ড্রেন থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। পোষ্টমর্টেমে ডাক্তাররা ঘাবড়ে  যান, তার দেহে ৪০০ ছুরিকাঘাতের চিহ্ন। কতটা জিঘাংসা থাকলে এটি সম্ভব? জিঘাংসাটা কিসের? আমার জন্ম বাংলাদেশে। নিজেকে তাই প্রশ্ন করি, বাংলাদেশে হিন্দুর হাতে যদি দু’জন পুলিশ খুন হতো, তাহলে কি হতো? এই ঘটনায় আপ নেতা তাহির হোসেন’র নাম এসেছে। তিনি  একজন রাজনৈতিক নেতা।  তাঁর ভিডিও ফুটেজ দেখে মনে হয় তিনি একজন সন্ত্রাসী? বিজেপি নেতা সুব্রাহ্মনিয়াম স্বামী অভিযোগ করেছেন, তাহিরের সাথে বাংলাদেশের সন্ত্রাসীদের যোগাযোগ আছে এবং তিনি এদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিতেন। দাঙ্গায় উস্কানি দেয়ায় কংগ্রেস নেত্রী ইসরাত জাহান গ্রেফতার হয়েছেন। এই আন্দোলনে উস্কানি কি আগাগোড়াই ছিলো না? শান্তিপূর্ণ সমাবেশে ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ শ্লোগান  উঠে কি করে? ভারত ভাঙ্গার কথা উচ্চারিত হয়নি? শিলিগুড়ির ‘চিকেন নেক’ বিচ্ছিন্ন করার ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। ওয়াসির পাঠান-র ১৫কোটি মুসলিম ঐক্যবদ্ধ হয়ে ১০০ কোটি হিন্দুকে শিক্ষা দেয়ার ভিডিও কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়? পুলিশের উপর গুলি চালানো কট্টরপন্থী মহম্মদ শাহরুখ কাদের  লোক? দাঙ্গায় মৃতের সংখ্যা কত? এঁরা কারা। কতজন হিন্দু ও শিখ বেশি মরেছেন এ প্রশ্ন কেন? মরেছে, মানুষ। অর্থহীন এই মৃত্যু। কেন? বিহারের এক মোল্লার ভিডিও মোদী-শাহ-কে শিক্ষা দেবো, ভারতের অর্থনীতি বরবাদ করে দেবো, কোন শান্তির কথা নয়! প্রকাশ্যে রামদা হাতে নিয়ে মোদিকে  হত্যার হুমকি উস্কানি বটে! সিএএ ঠিক কোন জায়গাটায় মুসলমানদের বিরুদ্ধে তা কিন্তু স্পষ্ট নয়? অথচ এর নামে দাঙ্গা চললো। বাংলাদেশে  হেফাজতে ইসলাম শাপলা চত্বরে একই কায়দায় আন্দোলন চালিয়েছিল, শেখ হাসিনা সেটি কঠোর হস্তে দমন করেছিলেন। ভারত সেটি না করে ভুল করেছে। করলে এতগুলো প্রাণ যেতোনা। এই আন্দোলনের সুযোগে জমিয়ে মাদ্রাসার ছাত্রের মৃত্যু’র ভুয়া সংবাদ, নাম না জানা অভিনেত্রী স্বরে ভাস্করকে আমদানি  করে ভুয়া তথ্য প্রকাশ, মুর্শিদাবাদ-উলুবেড়িয়ায় ছোটখাট দাঙ্গা ঘটানো, সবই হলো। জনৈক ৫১ বছর বয়সী বিনোদ কুমার উত্তরপূর্ব দিল্লির ব্রহ্মপুরী এলাকায় ২৪ ফেব্রুয়ারি রাতে নিহত হলেন। তাঁর ২৫ বছর বয়সী ছেলে নীতিন কুমার দারুণ আহত অবস্থায় শয্যাশায়ী। তাদের অপরাধ, তাদের হোন্ডায়  লেখা ছিলো, ‘জয় শ্রীরাম’। দিল্লি দাঙ্গায় ভারতে একটি মসজিদের ওপর হামলা হয়েছে। উপমহাদেশে ধর্মীয় উপাসনালয়ে হামলা কি নুতন  ঘটনা? আফগানিস্তানে বহিমিয়ান বৌদ্ধমন্দির ভেঙ্গে তো লঙ্কাকান্ড হয়ে গেছে। মোঘল আমলে মন্দির আক্রমন উৎসব ছিলো। ভারতবর্ষে অধিকাংশ পুরানো মসজিদ ভাঙ্গা মন্দিরের ওপর প্রতিষ্ঠিত! মাটি খুঁড়লেই এর প্রমান মিলে! বাংলাদেশের একটি মন্দিরও খুঁজে পাওয়া যাবেনা, যেটি আক্রান্ত  হয়নি। ঢাকেশ্বরী, রমনা, কান্তজীর মন্দির, কোনটি নয়? মসজিদের মাইকে হিন্দু বাড়ী আক্রমণের আহবানও নুতন কিছু নয়। অথচ এবারকার মসজিদে আক্রমের ঘটনায় বাংলাদেশে মানুষের ঘুম হারাম হয়ে গেছে। আপনি যদি বাংলাদেশে অব্যাহত সংখ্যালঘু নির্যাতন বা মন্দির/মুর্ক্তি ভাঙ্গার প্রতিবাদ  না করে থাকেন, তাহলে আপনি ভারতের সংখ্যালঘু বা মসজিদে হামলার প্রতিবাদ করার কোন অধিকার কি আপনার আছে? একজন আনোয়ারুল করিম খান আনাস একটি চমৎকার পোস্টিং দিয়ে বলেছেন,“খারাপ লাগছেনা? খুউব খারাপ লাগতেছে। একটা হনুমান সেনা মসজিদে আগুন লাগিয়ে মিনারে উঠে

 চাঁদ তারা ভেঙ্গে তাতে হনুমান সেনার পতাকা লাগায়ে দিছে। আমারও খারাপ লাগতেছে। তবে চিন্তার কোনো কারন নাই। ভাঙ্গাভাঙ্গিতে আমাদের বাঁদর সেনারা কম যায়না। তারা দেশ স্বাধীন হবার আগে থেকে মন্দির আর প্রতিমা ভেঙ্গে আসতেছে, তাও পূজোর সময়৷ উই আর উইনিং! বুঝতেছেন এখন? ৯০%

 মুসলমানদের এই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশে হিন্দুরা কি ‘স্বর্গ সুখে’ বাস করে? দিল্লির মুসলিমদের আতংকটা বুঝতেছেন? বাংলাদেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায় এই আতংকের মধ্যে জন্ম নেয়, বড় হয়, জীবন যাপন করে। দিল্লীতে এই সাম্প্রদায়িক নগ্ন হামলার তীব্র নিন্দা জানাই। নিন্দা  জানাই বাংলাদেশের মন্দির ও পুজার সময় মুর্তি ভাঙ্গার উৎসবকেও”। কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছিলেন: “দেখিলাম, আল্লার মসজিদ আল্লাহ আসিয়া রক্ষা করিলেন না, মা-কালীর মন্দির কালী আসিয়া আগলাইলেন না! মন্দিরের চূড়া ভাঙিল, মসজিদের গম্বুজ টুটিল! আল্লার এবং কালীর কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া গেল না। আকাশ হইতে বজ্রাঘাত হইল না মুসলমানদের শিরে, ‘আবাবিলের’ প্রস্তর-বৃষ্টি হইল না হিন্দুদের মাথার উপর। এই গোলমালের মধ্যে কতকগুলি হিন্দু ছেলে আসিয়া  গোঁফ-দাড়ি-কামানো দাঙ্গায় হত খায়রু মিয়াঁকে হিন্দু মনে করিয়া ‘বলো হরি হরিবোল’ বলিয়া শ্মশানে পুড়াইতে লইয়া গেল, এবং কতকগুলি মুসলমান ছেলে গুলি খাইয়া হত দাড়িওয়ালা সদানন্দ বাবুকে মুসলমান ভাবিয়া ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু’ পড়িতে পড়িতে কবর দিতে লইয়া গেল। মন্দির এবং মসজিদ  চিড় খাইয়া উঠিল, মনে হইল যেন উহারা পরস্পরের দিকে চাহিয়া হাসিতেছে!”.হুমায়ূন আজাদ লিখেছেন, ‘মসজিদ ভাঙ্গে ধার্মিকরা, মন্দির ভাঙ্গে ধার্মিকরা, তারপরও তারা দাবি করে আমরা ধার্মিক; আর যারা ভাঙ্গাভাঙ্গিতে নেই তারা অধার্মিক বা নাস্তিক’। সেই অমর কাব্য, ‘হিন্দু না ওরা  মুসলিম? ওই জিজ্ঞাসে কোন জন? কান্ডারী! বল, ডুবিছে মানুষ, সন্তান মোর মার…’।  ভারত ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র। এর কোন রাষ্ট্রধর্ম নেই। সেখানে  ধর্মনিরপেক্ষতা বিদ্যমান। যারা নিজের দেশে ধর্মনিরপেক্ষতাকে ‘কুফরী’ মতবাদ বলে ফতোয়া দেন, তাদের মুখে ভারতের সমালোচনা মানায় কি? যাদের হাত নিজের দেশের সংখ্যালঘুর রক্তে রঞ্জিত, তাঁরা অন্য দেশের সংখ্যালঘু নিয়ে মাথা না ঘামালেও চলবে। ভারত ও পাকিস্তানের মানুষ কট্টর  মুসলমান হলে ভারতের হিন্দুরা স্যেকুলার থাকবেন, সেটি আশা করা সম্ভবত: এখন বিলাসিতা মাত্র। বাংলা ভাষাভাষী অঞ্চলে ১৯৪৬-এ ডাইরেক্ট একশনের নামে হিন্দু নিধন হয়েছে, নোয়াখালী রায়ট, ১৯৫০’র দাঙ্গা, ১৯৬৪’র দাঙ্গা, ১৯৭১’এ টার্গেট করে হিন্দু হত্যা, ১৯৭৫-২০২০ পর্যন্ত অগণিত  ছোটখাট দাঙ্গা, মন্দির-মুর্ক্তি ভাঙ্গা, শত্রূ-সম্পত্তি আইন, রমনা কালীবাড়ি দখল, বসতবাড়ি, ব্যবসা-বাণিজ্য দখল, নাবালিকা অপহরণ, ধর্মান্তর, সবই একপেশে। ভারতের সেক্যুলারিজম এতকাল মুখ্যত ছিলো ‘মুসলিম তোষণ’, ভারতবাসী  এখন এ থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছে। ভারতে উগ্রতা বাড়ছে। এর দায় বাংলাদেশ ও পাকিস্তান এড়াতে পারেনা, কারণ এ দু’টো দেশে উগ্রতা অনেক বেশি, লালিত-পালিত হয়! পাকিস্তান রাষ্ট্রীয়ভাবে হিন্দুশূন্য করা হয়েছে; বাংলাদেশে হিন্দুর সংখ্যা অর্ধেক হয়ে গেছে, ইহাই উগ্রতা। বহুবার লিখেছি,  আবারো লিখছি, প্রায় পঁচিশ বছর আগে এক বিজেপি নেতা আমেরিকায় এলে তাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, একশো কোটি হিন্দুর দেশে তোমাদের হিন্দু হিন্দু করতে হয় কেন? তিনি বলেছিলেন, তোমরা বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে যদি ইসলাম ইসলাম করতে পারো, তবে আমাদের হিন্দু হিন্দু করলে দোষের কি? ইহাই  সত্য। বাংলাদেশে আগে প্রচুর মানুষ ছিলো, এখন সবাই হিন্দু-মুসলিম, বৌদ্ধ, খৃষ্টান।  বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আরো একটি চমৎকার বিষয় হচ্ছে,ভারতে মুসলিমদের বাড়িঘরে হামলাকারীদের পরিচয় হিন্দুত্ববাদী আর বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর  আক্রমণকারীরা দুর্বৃত্ত এবং যারা মুর্ক্তি ভাঙ্গে পুলিশের ভাষায় তাঁরা ‘মানসিক ভারসাম্যহীন’। গুজরাট দাঙ্গার দু:খজনক অধ্যায় মানুষ ভুলেনি। সেখানেও আগে শবরমতি এক্সপ্রেসে আগুন দিয়ে ৫৯জন তীর্থফেরা যাত্রীকে হত্যা করা হয়েছিলো, যাদের মধ্যে ১৫জন শিশু ছিলো। তসলিমা নাসরিন বলেছেন, বাংলাদেশে দুই ধর্মীয় দলে মারামারি হয় না, দাংগা হয় না। বাংলাদেশে  মুসলমান হিন্দুকে  মারে। পাকিস্তানেও তাই। ভারতে দাংগা হয়। হিন্দু যেমন মুসলমানকে মারে, মুসলমানও হিন্দুকে মারে। দু দলই পাথর,পেট্রোল বোমা, পিস্তল হাতে নেয়। দাংগায় দু দলের লোকই মারা যায়। কোথাও কম, কোথাও বেশি। তসলিমা নাসরিন আরো বলেছেন, বাংলাদেশ পাকিস্তানের অত্যাচারিত ভীত সন্ত্রস্ত হিন্দুদের জন্য ভারত  তার উদার দরজা খুলে দিয়েছে। বাংলাদেশ এবং পাকিস্তানেরও উচিত ভারতের অত্যাচারিত ভীত সন্ত্রস্ত মুসলমানের জন্য নিজেদের  দরজা খুলে দেওয়া। ভারতের একজন নেতা ক’দিন আগে বলেছেন, এসব দাঙ্গাহাঙ্গামার কারণ ১৯৪৭-এ যথাযথ ‘জনসংখ্যা বিনিময়’ হয়নি, এখন সেটা হউক। হলে কি হবে? (মতামত লেখকের নিজস্ব-সমপাদক)

 বাংলাদেশ বা পাকিস্তানে যত অ-মুসলমান আছে, সবাই ভারতে চলে যাবে। কিন্তু মুসলমান ভারত ছাড়বে না, কারণ তাঁরা জানে থাকার জন্যে অ-মুসলমান দেশ ভালো। জাতিসংঘের রেকর্ড অনুযায়ী বিশ্বে এখন ৮৬% শরণার্থী মুসলমান, এরা কেউ ৫৭টি মুসলমান দেশে যেতে চায়না বা তারাও নিতে চায়না, এরা থাকতে চায় ইউরোপ, আমেরিকা, কানাডা বা অষ্ট্রেলিয়ায়? ভারতের অধিকাংশ মিডিয়ার ভূমিকা ন্যাক্কারজনক। যুক্তরাষ্ট্রের কিছু রাজনীতিবিদ ‘ইসলামোফোবিয়ার’ ভয়ে উল্টাপাল্টা বকছেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। টরোন্টোর একজন বাঙ্গালী সাংবাদিক সওগত আলী সাগর লিখেছেন, দিল্লীতে কি কেবল অমানবিকতা, পৈশাচিকতাই দেখছি? মানবিকতার, মনুষ্যত্বের বিজয়গাঁথা কি দেখছি না! দিল্লীতে মুসলমানদের হত্যা করতে দেখছি, আবার মুসলমানদের বাঁচাতে জীবনবাজি রেখে দাঁড়িয়ে গেছে হিন্দু ধর্মাবলম্বী- সেই দৃশ্য কি দেখছি না? প্রশ্নটা হলো, আপনি কিভাবে দেখছেন? বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতন আপনি দেখেন না, ভারতে মুসলমান নির্যাতন আপনার দৃষ্টি এড়ায় না? একজন প্রলয় ভট্টাচার্য্য, যিনি আগে বাংলাদেশে  কমিউনিষ্ট পার্টি করতেন, এখন কলকাতায় ডাক্তারী করেন, তিনি লিখেছেন, বাংলাদেশে হিন্দু নির্যাতন হলে ভারতে তার প্রতিক্রিয়া হবে। হ্যাঁ, এতদিন হয়নি, এখন হবে। শিয়া ধর্মগুরু মৌলানা কলবে জাওয়াদ নকভি নাগরিকতা সংশোধন আইন নিয়ে বলেছেন, এটা নিয়ে মুসলিমদের  অন্তরে বিভ্রান্তি ছড়িয়েছে বিরোধীরা এবং এই আন্দোলন থেকে মুসলমানদের উস্কানি দিয়ে বিরোধী দলগুলো সুবিধা নিয়েছে। বলিউড গায়ক আদনান সামি বলেছেন, ‘একজন মুসলিম হিসেবে আমি ভারতে নিজেকে সুরক্ষিত মনে করি।” যদিও নাসিরুদ্দিন শাহ বা আরো কেউ কেউ অন্য কথা বলেছেন, কিন্তু এরা  কেউ পাকিস্তান যাবেন না! সৌদি আরবও না, ইরানও না, তবে ইউরোপ-আমেরিকায় যেতে পারেন। ফেনীর একজন সাব্বির আহমেদ বলেছেন তিনি বাংলাদেশ থেকে মালাউন (হিন্দু) তাড়াবেন এবং তার প্রজেক্টের নাম দিয়েছেন, ‘হিন্দুমুক্ত বাংলাদেশ’।

ড. আনিসুজ্জমান, আবদুল গাফফার চৌধুরী, হাসান আজিজুল হক  প্রমূখ দেশের প্রখ্যাত মানবতাবাতী  বুদ্ধিজীবিগন এ’ বিষয়ে যে অত্যন্ত সময়োচিত, আশাব্যাঞ্জক বক্তব্য রেখেছেন, যাতে তাঁরা জাতির প্রতি বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক সমপ্রীতি রক্ষার জন্য  আহ্বান জানিয়েছেন, আমরা এটিকে স্বাগত জানাই।   উপমহাদেশে সাম্প্রদায়িকতা নুতন কোন বিষয় নয়। ১৯৪৭ সালে মুসলমানরা  বলেছিলো, হিন্দুদের সাথে থাকা যায়না। ১৯৪৭ থেকে ২০২০, এই ৭৩ বছরে দেখা যাচ্ছে, ভারতে মুসলমানরা দিব্যি হিন্দুদের সাথে থাকছেন, তাদের ঘরবাড়ী কেউ কেড়ে নিচ্ছেনা, নারীদের ধর্মান্তরিত করছে না, এবং তাঁরা বাংলাদেশ বা পাকিস্তানেও যাবেন না? পক্ষান্তরে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে  হিন্দু বা অন্য সংখ্যালঘুরা মুসলমানদের সাথে থাকতে চাইলেও থাকতে পারছেন না, গত সাত দশক ধরে ভারতমুখী শরণার্থী কাফেলা বন্ধ হচ্ছেনা? ভারত সুযোগ দিলে এদের কেউ আর ওই দুই দেশে থাকবেন না? তাহলে দেখা যাচ্ছে, মুসলমানদের ১৯৪৭’র দাবিটি ভ্রান্ত ছিলো। বরং উল্টোটি সত্য? বিশ্বের  ৫৭টি মুসলিম দেশ কি এই প্রমান বহন করেনা? মুসলমানরা যেখানে সংখ্যাগুরু, সেখানে কি অন্যরা থাকতে পারে? নাকি অন্যদের কোন অধিকার থাকে? তারপরও বলা যায়, উপমহাদেশে শান্তির জন্যে রাজনৈতিক নেতারা সমন্বিতভাবে চেষ্টা করতে পারেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, নরেন্দ্র মোদী,

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *