নুতন বছরে ধর্ষিতার পোশাক নিয়ে টানাটানি বন্ধ হোক!

শিতাংশু গুহ, ২ জানুয়ারি ২০২২, নিউইয়র্ক।।

‘দি ডেইলি ষ্টার’ পত্রিকায় সম্পাদকীয় পাতায় সাংবাদিক মোহাম্মদ বদরুল আহসান লিখেছিলেন, ‘নাকফুল হারানো রাত্রি’, সেটা শুক্রবার ১৬ই নভেম্বর ২০০১। তিনি বর্ণনা করেছিলেন, একরাত্রে দুইশ’ নারীর সম্ভ্রম হারানোর করুন কাহিনী। ঘটনা ভোলার চরফ্যাশনের, বিএনপি-জামাত নির্বাচনে জয়ের পর। ‘৮বছরের শিশু, মধ্যবয়সী পা-হারানো নারী ও ৭০বছরের বৃদ্ধা কেউই বাদ যায়নি। ধানক্ষেত, ঝোপ-ঝড়, নদীর পার, খোলা মাঠ বা ঘরবাড়ীতে ধর্ষণ চলে। এক বর্বরতম ঘটনা ঘটেছে, এবং মুসলমান পুরুষেরা হিন্দু নারীদের ধর্ষণ করেছে’।

গল্প নয় সত্যি। দৈনিক জনকণ্ঠ ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০০২ লিখেছিলো, ৯৮.৬৮% ধর্ষিতা মহিলারা সংখ্যালঘু, এবং ধর্ষক সরকারি দলের সদস্য, মুখ্যত: বিএনপি ক্যাডারস। লন্ডনের ‘দি গার্ডিয়ান’ পত্রিকা ২১শে জুলাই ২০০৩-এ হেডিং করেছিলো, ‘রেপ এন্ড টর্চার এম্পটিজ দি ভিলেজ’ (ধর্ষণ ও অত্যাচারে গ্রাম শূন্য)। ২০০৯ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিউইয়র্কে এলে আমরা তাঁকে একটি কমিশন গঠনের অনুরোধ করি, তিনি তা করেন। বিচারপতি শাহাবুদ্দিন কমিশন প্রায় ১৮হাজার কেইস চিহ্নিত করে সুনির্দিষ্টভাবে  ৫হাজার কেইসের মামলার সুপারিশ করেছিল। কেউ কিছু করেনি? 

২০০১-এ ভোলা ছিলো মৃত্যুপুরী। বহুদিন ধরে ভোলার এমপি তোফায়েল আহমদ। একটা সময় ছিলো যখন আমরা আব্দুল কুদ্দুস মাখন, আব্দুর রাজ্জাক, তোফায়েল আহমদ ও আমির হোসেন আমুকে নেতা মানতাম। ২০০১-এর পর দুই দশক অতিক্রান্ত, তোফায়েল আহমদ কিচ্ছু করেননি? তাঁর মুখ থেকে জাতি তেমন কিছু শুনেনি। এতবড় একজন নেতা এলাকাবাসীর চাপা কান্না শুনতে পেলেন না, ভাবতে দু:খ হয়? সরকাররের সদিচ্ছা হয়তো নেই, তিনিও উচ্চবাচ্য করেননি, অথচ সংখ্যালঘু ভোট পেয়েছেন ১০০%। তোফায়েল আহমদ এখন বয়োবৃদ্ধ, রাজনীতিতে অনেকটা অবহেলিত। 

বছরের শেষদিনে ৩১শে ডিসেম্বর ২০২১ দৈনিক ভোরের কাগজ হেডিং করেছে, ২০২১ সালে ধর্ষণের শিকার ৭৭৪ শিশু, যৌন হয়রানি ১৮৫ এবং নিহত ৫৯৬। আইন ও সালিস কেন্দ্রের বরাত দিয়ে পত্রিকাটি জানায়, ৭৮ শিশু বলাৎকারের শিকার হয়েছে। এতো গেলো শুধু শিশু? এ সংগঠন তাদের জানুয়ারি-জুন বুলেটিনে বলেছে, ঐ ৬মাসে ধর্ষিতা নারীর সংখ্যা ৮১৮, ধর্ষণের চেষ্টা হয়েছিলো ১৮৩, ধর্ষণের পরে মৃত্যু ৩১, ধর্ষণের পর আত্মহত্যা ৮। অংকের হিসাবে পুরো বছরে সবকিছু প্রায় দুইগুণ  হবার কথা? আইন ও সালিশ কেন্দ্র বলেনি, কতগুলো ধর্ষণের বিচার হয়েছে। 

নুতন বছরে (২০২২) ‘বিচার চাহিয়া’ কাউকে লজ্জা দেয়ার দরকার নেই? এরচেয়ে বরং ধর্ষিতার দোষ ধরুন, পোশাকের সমালোচনা করুন? ধর্ষণ আমাদের দেশে এখনো তেমন মারাত্মক অপরাধ বলে গণ্য হয়না। জজ কামরুন্নাহার-র কথা মাত্র সেদিনের? বনানীর রেইনট্রি হোটেলের ধর্ষণের মামলার রায় গেছে ধর্ষিতার বিপক্ষে। সেইসাথে জজ কামরুন্নাহার পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছেন যে, ধর্ষণের পর ৭২ঘন্টা পার হলে যেন ভিকটিমের মামলা নেয়া না হয়? সত্যি সেলুকাস, কি বিচিত্র এ দেশ। নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে আমরা গর্ব করি, এবং ধর্ষিতার পোশাক নিয়ে টানাটানি করি? 

পূর্ণিমা রানী শীল’র মা বলেছিলো, ‘আমার মেয়েটি ছোট, তোমরা একজন একজন করে যাও’। ছোট্ট পূজার কথা আমরা ভুলেই গেছি, বিচারের কোন নিউজ দেখিনি। ভারতে আসিফা ধর্ষণের পর পুরো জাতি, বুদ্ধিজীবীরা  রাস্তায় নেমে এসেছিলো, আসিফা ন্যায়বিচার পেয়েছিলো। বাংলাদেশে ‘পাশে দাঁড়ানো-র ক্ষত্রে দৈন্যতা আছে, আমরা আগে ধর্ম দেখি? সন্ত্রাসের যদি কোন ধর্ম না থাকে, ধর্ষকেরও ধর্ম থাকা উচিত নয়? পাপ বাপকেও ছাড়েনা, ধর্ষণ হলে রাস্তায় নামুন, বিচার করুন, ২০২২-তে ‘ধর্ষকের দেশ’ বাংলাদেশ শুনতে চাইনা। Pic courtesy: Global Voices

2 thoughts on “নুতন বছরে ধর্ষিতার পোশাক নিয়ে টানাটানি বন্ধ হোক!

  • January 4, 2022 at 5:32 am
    Permalink

    কি ভয়ানক ।ভাবতেই শিউরে উঠি। ” মেয়েরা” মানুষ বলে আজও গণ্য নয়।এ’ কোন সভ্যতা! একজন মহিলা সিংহাসনে আসীন, তা-ও!
    আর কত মহিলাকে ইচ্ছের বিরুদ্ধে free তে শরীর দিলে এই বর্বরতা ,নৃশংসতা বন্ধ হবে– নেতৃত্ব জানাবেন?
    বাংলাদেশের মৃতপ্রায় ,দূর্বলেরা প্রতিরোধ ,প্রতিবাদে নামুন ।এমনিই তো মরে আছেন, আবার নাহয় মরলেন!/ মরবেন!

    Reply
  • January 4, 2022 at 5:35 am
    Permalink

    comment তো লিখেইছি।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published.