ত্রিপুরা বিজেপিতে কোন্দল: মুখ্যমন্ত্রীকে কটাক্ষের জেরে শাস্তি নেমে আসতে পারে সুদীপ বর্মনের ওপর

অরুণ কুমার

যে ত্রিপুরা বিজেপির অন্যতম প্রভাবশালী নেতা সুদীপ রায় বর্মন পুরভোটের  আগে নিজের দলের মুখ্যমন্ত্রীর সমালোচনা করে রাজ্য বিজেপি নেতৃত্ব কে বেকায়দায় ফেলে দিয়েছেন সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। মুখ্যমন্ত্রীকে  কটাক্ষের জেরে শাস্তি নেমে আসতে পারে  সুদীপ বর্মনের ওপর।পুরভোটের দুদিন আগে সাংবাদিক সম্মেলন ডেকে নিজের দলের মুখ্যমন্ত্রীকে রীতিমতো অপদস্থ করলেন ত্রিপুরা বিজেপির হেভিওয়েট নেতা সুদীপ রায় বর্মন।উল্লেখ করা যেতে পারে রাজ্যে ভোট প্রচারের শেষদিন মঙ্গলবার রাজধানী আগরতলায় ‌আয়োজিত এক সাংবাদিক সম্মেলনে সুদীপ রায় বর্মন মুখ্যমন্ত্রী বিপ্লব দেবের নেতৃত্বকে শিশুসুলভ বলে কটাক্ষ করেন । রাজ্য বিজেপির এই হেভিওয়েট নেতা সুদীপের মন্তব্যে স্বভাবতই উল্লসিত তৃণমূল শিবির । সুদীপ বলেন,” যা চলছে তাতে দল‌ ও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বদনাম হচ্ছে।” নির্বাচনকে প্রহসনে পরিণত করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন তিনি। সুদীপ রায় বর্মন মনে করেন, ” শিশু সুলভ নেতৃত্ব আসল শত্রুকে চিনতে পারছে না ।” সিপিএমের আমলের গুন্ডারাই এখন বিজেপিতে ঢুকে সন্ত্রাস চালাচ্ছে আর এদের‌ কারণেই মানুষের কাছে বিজেপির ‌বদনাম‌ হচ্ছে বলে‌ অভিযোগ করেন সুদীপ । এর ফলে রাজ্য বিজেপি নেতৃত্ব এবং কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব যারপরনাই বেকায়দায় পড়েছেন সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।


আগরতলায় সাংবাদিক সম্মেলনে সুদীপ রায় বর্মনের এই মন্তব্য ত্রিপুরায় পুরভোটের মুখে তাঁর এইসব মন্তব্য দলকে বিপদে ‌ফেলবে না ‌বলেই মনে করেন সুদীপ রায় বর্মন। দলের ভালোর জন্যই ‌মুখ খুলেছেন ‌বলে দাবি করেন তিনি। ত্রিপুরার প্রাক্তন মন্ত্রী বলেন, ” বিজেপি ও প্রধানমন্ত্রীর প্রতি মানুষের বিরূপ মনোভাব তাঁর মনকে পীড়া দেয় । মূল শত্রুকে চিনতে ভুল করছে দলীয় নেতৃত্ব। যারা ক্ষোভ , দুঃখে , অভিমানে দল‌ ছেড়ে চলে গেছে, তাদের ‌ফিরিয়ে আনা দরকার। ” কিন্তু তা না করে সেই সব নেতা-কর্মীদের আরও দূরে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন সুদীপ রায় বর্মন। দলের ‌যে নেতাকর্মীদের জোর করে মুখ খুলতে দেওয়া হচ্ছে না , যারা ভয়ে বলার সাহস পাচ্ছেন না , তিনি তাদের হয়ে আওয়াজ তুলেছেন বলে দাবি করেন সুদীপ। তিনি আরও বলেন, ” আমার রাজনৈতিক জীবন ঘেঁটে দেবে এটা তো হতে পারে না। আমি সব সময় মানুষের জন্য কাজ করেছি। অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছি।”এ বিষয়ে রাজনৈতিক ওয়াকিবহাল মহলের ধারণা যে ত্রিপুরা বিজেপির অন্দরে মুখ্যমন্ত্রী বিপ্লব দেবের‌ সঙ্গে সুদীপ রায় বর্মনের ঠান্ডা লড়াই দল‌ ক্ষমতায় আসার আগে থেকেই। বিপ্লব দেব বিজেপির পুরোনো মুখ ।আরো উল্লেখ করার মতো বিষয় হলো এই সংঘ ত্রিপুরা বিজেপির অন্দরে মুখ্যমন্ত্রী বিপ্লব দেবের‌ সঙ্গে সুদীপ রায় বর্মনের ঠান্ডা লড়াই দল‌ ক্ষমতায় আসার আগে থেকেই। বিপ্লব দেব বিজেপির পুরোনো মুখ। সংঘ পরিবারের কাছের মানুষ। অন্যদিকে ত্রিপুরার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী সমীর রঞ্জন রায়বর্মনের ছেলে সুদীপ অনেক দিন ধরেই রাজ্য রাজনীতির অন্যতম জনপ্রিয় মুখ। ২০১৬-য় ছয়জন বিধায়ক সহ কংগ্রেস ছেড়ে তৃণমূলে যোগ দেন তিনি। ত্রিপুরা রাজ্য তৃণমূলের সভাপতি ছিলেন । ২০১৭-য় তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে যোগদান করেন সুদীপ রায় বর্মন। ত্রিপুরায় বিজেপির ভিত শক্তিশালী করার পিছনে সুদীপের অবদান আছে বলে মনে করে রাজনৈতিক মহল। আঠারোর বিধানসভা নির্বাচনে যদিও সংঘ ঘনিষ্ঠ বিপ্লব দেবকেই মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে প্রোজেক্ট করে বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব। সুদীপ রায় বর্মনকে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি দফতরের মন্ত্রী করা হলেও মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে সুদীপের ঠোকাঠুকি বন্ধ না হয়ে আরও বেড়েই চলে । শেষে ২০১৯-এর জুন মাসে বিপ্লব দেবের মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন সুদীপ।পুরভোটের আগে এই বিজেপি হেভিওয়েট নেতা সুদীপ রায় বর্মনের মুখে বিপ্লব বিরোধী মন্তব্যে স্বাভাবিক ভাবেই খুশি তৃণমূল। সুদীপের অভিযোগকে স্বাগত জানিয়েছেন তৃণমূল শীর্ষ নেতৃত্ব। ইতিমধ্যেই সুদীপের মন্তব্যকে হাতিয়ার করে ট্যুইট করেছেন পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য তৃণমূলের সাধারণ সম্পাদক কুণাল ঘোষ। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপিকে পর্যুদস্ত করার পরেই‌ ত্রিপুরা নিয়ে প্রবল উৎসাহী হয়ে ওঠেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ওয়াকিবহাল মহল সূত্রের খবর এই বিজেপি নেতাসুদীপ রায় বর্মনকে ফিরে পেতে তৃণমূল শীর্ষ নেতৃত্ব জোর চেষ্টা করে চলেছে  । সুদীপ রায় বর্মন মুখে এখনও বিজেপির প্রতি আনুগত্য দেখিয়ে চললেও তলে তলে কী চলছে বাইরে থেকে বোঝা মুশকিল।

পুরভোটের আগে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী বিপ্লব দেবকে অপদস্থ করে সুদীপের সাংবাদিক সম্মেলনের পেছনে অনেক হিসেবনিকেশ আছে বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল।তার এই মন্তব্য পুরো ভোটের ফলাফলের ওপর অনেক কিছু নির্ভর করছে বলে আশঙ্কা করছে রাজ্যের ক্ষমতাসীন বিজেপি দল। রাজ্য বিজেপি সূত্রের খবর বিষয়টির উপর নজর রেখে চলেছে তারা। এ বিষয়ে তাঁরা কোনো মন্তব্য না করলেও পুরো ভোটের ফলাফল বেরোনোর পর রাজ্য বিজেপি নেতৃত্ব এই নেতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে না এমন কোথাও জোর দিয়ে কেউ বলতে পারছে না। পুরভোটের নির্বাচনী ফলাফল যদি রাজ্যের শাসকদলের অনুকূলে না যায় তাহলে স্বাভাবিকভাবেই সুদীপ রায় বর্মন এর ওপর বড় ধরনের ব্যবস্থা দল যে নিতে পারে সে বিষয়ে নিশ্চিত রাজ্য তথা কেন্দ্রীয় বিজেপি নেতৃত্ব। একথা প্রকাশ্যে না হলেও অনেকেই স্বীকার করেছেন। এখন সেটা দেখার বিষয় রাজ্যে পৌর নির্বাচনে ফলাফল কি দাঁড়ায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *