সরকার ইউনিফর্ম সিভিল কোড চালু করতে পারেন

শিতাংশু গুহ, ২৬ জুন ২০২১, নিউইয়র্ক।।

জানা যায়, হিন্দু পারিবারিক আইন, বিবাহ-বিচ্ছেদ বা বহু-বিবাহ সংক্রান্ত আইন প্রণয়নের সুপারিশ চূড়ান্ত হয়েছে। সরকার হটাৎ হিন্দু পারিবারিক আইন পরিবর্তন করতে উঠে-পড়ে লেগেছেন কেন? সরকার কি মুসলিম পারিবারিক আইন পরিবর্তন করতে পারবেন? যদি না পারেন, তবে হিন্দু পারিবারিক আইনে হাত দেয়ার দরকার কি? এরচেয়ে বরং সরকার যেগুলো আশু করা দরকার, যেমন, ‘সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইন’, ‘সংখ্যালঘু কমিশন’, বা ‘হেইট-ক্রাইম বিল’, অথবা হিন্দু ফাউন্ডেশন বা সংখ্যালঘু মন্ত্রণালয় নিয়ে ভাবুন, পারিবারিক আইনের চেয়েও এগুলো বেশি দরকার। 

সরকার হিন্দু বা মুসলিম পারিবারিক আইনে হাত না দিয়ে ধর্ম-নির্বিশেষে সমগ্র বাংলাদেশের জন্যে ‘ইউনিফর্ম সিভিল কোড’ চালু করতে পারেন। অর্থাৎ এক দেশ, এক আইন; এক ব্যক্তি, এক বিয়ে; দুই সন্তান, স্ত্রী-পুত্র-কন্যার সম্পত্তিতে সমান অধিকার- চালু করতে পারেন। সরকার শুধু হিন্দুদের ভালো চাচ্ছেন বলে অনেকে সন্দিহান, আসল উদ্দেশ্য কি? গত পঞ্চাশ বছরে বাংলাদেশে হিন্দুদের শুধু একটি দাবি মানা হয়েছে। শত্রু-সম্পত্তি আইন বাতিল হয়েছে, যদিও হিন্দুরা এই আইনে কমবেশি ত্রিশ লক্ষ একর সম্পত্তি হারিয়েছে। এর সুফল কোন হিন্দু’র ঘরে পৌঁছেনি, বা হিন্দু সম্পত্তি ফেরত অথবা ক্ষতিপূরণ পাননি। 

হিন্দুদের উদ্বেগের কারণ হিসাবে একটি দৃষ্টান্ত দেয়া যায়? সদ্য প্রধানমন্ত্রী ৫০টি মডেল মসজিদ উদ্বোধন করেছেন। জনসংখ্যা অনুযায়ী ৬টি মন্দির, প্যাগোডা বা চার্চ থাকা উচিত ছিলো, তা নেই। বিষয়টি তাও নয়, বিধি অনুযায়ী এই মসজিদগুলোর সভাপতি হবেন ইউএনও (উপজেলা নির্বাহী অফিসার)। সরকার নিজেই আইন ভঙ্গ করেছেন চাঁদপুরের কচুয়া উপজেলায়, কারণ তথাকার ইউএনও একজন হিন্দু! সেখানে একজন মুসলিম মৎস কর্মকর্তা সভাপতি হয়েছেন। 

অথচ হিন্দু কল্যাণ ট্রাষ্ট্রের ১০জন কর্মকর্তা ও কর্মচারীর মধ্যে ৩জন মুসলমান। চেয়ারম্যান ধর্মমন্ত্রী, এবং ধর্মমন্ত্রী সর্বদা একটি ধর্মের! সুতরাং—-। পক্ষান্তরে ইসলামিক ফাউন্ডেশনে কোন সংখ্যালঘু কর্মচারী নেই! প্রধান কার্যালয়ে ১৩৬জন; ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগে ১৩জন করে, রাজশাহী ও রংপুরে ৯জন করে, খুলনায় ১১জন, বরিশালে ৬জন, সিলেট ও ময়মনসিংহে ৪জন করে কর্মকর্তার সবাই মুসলমান। বোর্ড অফ গভর্নরসের ১২জনই মুসলমান। এ পর্যন্ত ৩০জন মহাপরিচালক এসেছেন-গেছেন, সবাই মুসলমান। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এমত অসংখ্য দৃষ্টান্ত আছে বটে!  

অনেকে বলতে পছন্দ করেন যে, বাংলাদেশে হিন্দুরা নাকি সকল উচ্চপদ দখল করে আছেন, তাঁদের জ্ঞাতার্থে বলা যায়, দেখুন, ৫০টি উপজেলায় মাত্র ১জন হিন্দু ইউএনও! এটাই বাস্তবতা। বাংলাদেশে সরকারি চাকুরীতে মাত্র ৩% হিন্দু? সেনাবাহিনী বা পররাষ্ট্র দফতরের প্রসঙ্গ না তোলাই ভালো? বাংলাদেশে হিন্দুরা ভালো নেই। এবারকার বাজেটে সংখ্যালঘুদের জন্যে ‘ভিক্ষুককে ভিক্ষা দেয়ার মত’ অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়েছে। আমার কথা বিশ্বাস করার দরকার নেই, খোঁজখবর নিয়ে দেখুন! পররাষ্ট্র দফতরে একজন হিন্দু হিন্দু রাষ্ট্রদূত খুঁজে বের করুন! সেনাবাহিনীতে একজন ব্রিগেডিয়ার!! হিন্দুদের অভিযোগ, হিন্দু পারিবারিক আইন পরিবর্তনের জন্যে ওপর তলার হিন্দু যাঁরা কাজ করছেন, তাদের নাম হিন্দু হলেও অনেকেই আসলে হিন্দু নন, অথবা অতীতে তাঁদেরকে কখনো হিন্দুদের পক্ষে সোচ্চার হতে দেখা যায়নি, অথবা এঁরা সুবিধাভোগী মহল। দু’একজন মন্ত্রী যাঁরা এজন্যে কাজ করছেন, তাঁদের অতীত বা ব্যক্তিগত জীবন অপরিচ্ছন্ন, সংখ্যালঘু স্বার্থে এদের কোন ভূমিকা কখনোই ছিলোনা। এমনিতে গত একযুগে সংখ্যালঘু নির্যাতনে হিন্দুরা বিরক্ত এবং নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন, তদুপুরি ‘হিন্দু পারিবারিক আইন’- পরিবর্তন হলে হিন্দুদের অসন্তোষ আরো বেড়ে যাবার সম্ভবনা থাকবে। তাই কি দরকার এই পরিবর্তনের, সরকার সাহসী হলে ‘ইউনিফরম সিভিল কোড’ চালু করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *