এক দেশ – দুই মেরু

দিলীপ চক্রবর্ত্তী

বিগত কিছুদিন ধরেই সারা আমেরিকার বিভিন্ন শহরে “ব্ল্যাক লাইফ ম্যাটার্স” আন্দোলন ও প্রতিবাদের ঝড়ে হাজার হাজার মানুষ সামিল হয়েছে। হাজার হাজার প্রতিবাদী পুলিশের হেফাজতে জর্জ ফ্লয়েডের মৃত্যুর সুবিচার ও পুলিশি অত্যাচারের অবসান চেয়ে প্রতিবাদ জানাচ্ছে। পুলিশ আজ অবিচার ও শক্তির অপব্যবহারের কাঠ গড়ায় দাঁড়িয়েছে।

দুঃর্ভাগ্য বশতঃ এর আগেও এরকম প্রাণহানি হয়েছে। যেমন ২০১২এর রডনি কিং এর মৃত্যুর ঘটনা। পুলিশ মদ্যপ অবস্থায় গাড়ী চালানোর অভিযোগে রডনি কিং কে গ্রেপ্তার করার সময় রডনি কিং ভীষণ বাধা দেয় এবং ফলে পুলিশের সাথে দৈহিক সংঘর্ষে জড়িয়ে রডনি কিং পুলিশ দ্বারা আক্রান্ত হয়ে আহত হয়। তার ফলে লস এঞ্জেলসে বিরাট আন্দোলন হয়, প্রতিবাদীরা অনেকেই দোকানপাট ভাঙচুর ও লুঠ করে। সে সময়ে একদল কৃষ্ণাঙ্গ রেজিনাল্ড হোয়াইট নামে এক শ্বেতাঙ্গ ট্রাক ড্রাইভারকে আক্রমণ করে এবং প্রচন্ড মারধর করে রেজিনাল্ডকে প্রায় মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়। এন্টোয়ন মিলার নামে এক কৃষ্ণাঙ্গ একটি ইট দিয়ে মাথার পিছনে আঘাত করে এবং তার ফলে রেজিনাল্ড প্রায় মৃত্যুমুখে পতিত হয়েছিল। অনিয়ন্ত্রিত ও উন্মত্ত জনগনের দাঙ্গা হাঙ্গামার একটি অভিনব দৃষ্টান্ত তৈরী হয়েছিল সেদিন। লস এঞ্জেলসের মেয়র ও পুলিশ চীফ সমগ্র পুলিশ বাহিনীকে কার্যতঃ নিস্ক্রিয় করে রেখেছিল, তার ফলে অপরাধীরা ছয় দিন ধরে লুঠপাট করে অপরাধের সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছিল। অবশেষে রডনি কিং ৩.৮ মিলিয়ন ক্ষতি পূরণ পেয়েছিল তার প্রতি পুলিশ শারীরিক অত্যাচার করার জন্য আর পুলিশ তার বিরূদ্ধে মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানোর অভিযোগ থাকা সত্বেও তার বিরূদ্ধে কোন অভিযোগ দায়ের করতে পারেনি।

তারপর ২০১২ সনে মার্টিন ট্রেভন নামে এক কিশোর মাইকেল জিমারম্যান নামে এক ব্যক্তির হাতে পিস্তলের গুলিতে প্রাণ হারায় ফ্লোরিডার স্যানফোর্ড নামে একটি শহরে। মার্টিন ট্রেভন সন্দেহজনকভাবে মাইকেল জিমারম্যানের পাড়ায় চুরির উদ্দেশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। স্বেচ্ছাসেবক প্রহরীদলের অধিনায়ক মাইকেল জিমারম্যান মার্টিন ট্রেভনকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে মার্টিন ট্রেভন মাইকেলকে প্রচন্ড মারধর করে মাইকেলের নাক ফাটিয়ে দেয়। তখন আত্মরক্ষার্থে মাইকেল ট্রেভনকে গুলি করে হত্যা করে। তদন্তে জানা যায় মার্টিন বেআইনি বন্দুক ও ড্রাগ ব্যবহারে অভ্যস্ত ছিল। তাকে স্কুল থেকে ১০ দিনের জন্য বহিস্কারও করা হয়েছিল। বেশ কয়েক বছর ধরেই মার্টিন অপরাধ জগতের একজন সদস্য হয়ে গিয়েছিল। মার্টিনের মৃত্যুকে কেন্দ্র করেও “ব্ল্যাক লাইফ ম্যাটারস” এর ব্যানারে জনগণ একনাগাড়ে বেশ কিছুদিন প্রতিবাদ করেছিল এবং বলা বাহুল্য যে বিশৃঙ্খলা ও লুঠপাট এ প্রতিবাদের একটি অংশে পরিণত হয়েছিল। কিন্তু আইনি বিচারে আদালত মাইকেল জিমারম্যানকে নির্দোষ বলে ঘোষণা করে এবং মাইকেল আইনের হাত থেকে অব্যাহতি পেয়ে যায়। ট্রেভনের পিতামাতা ক্ষতি পূরণ স্বরূপ কয়েক মিলিয়ন ডলার পায় কিন্তু অর্থের অংকটি গোপন রাখা হয়।

২০১৪ সালে ফার্গুসন শহরে মাইকেল ব্রাউন নামে এক ব্যক্তি পুলিশের বন্দুক ছিনিয়ে নেওয়ার সময় পুলিশের গুলিতে নিহত হয়। এ মৃত্যুকে কেন্দ্র করেও প্রতিবাদের ঝড় উঠেছিল, কিন্তু সে প্রতিবাদ বেশী দিন বাঁচেনি। তারপরে হল এরিক গারনারের ঘটনা নিউ ইয়র্কের স্ট্যাটেন আইল্যান্ডে। নিউ ইয়র্ক সিটির পুলিশ এরিক গারনারকে ৩০ বার গ্রেপ্তার করেছে ১৯৮০ সালের পর থেকে। এরিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল – resisting arrest, grand larceny, assault, selling unlicensed and untaxed cigarettes ইত্যাদি। এরিক অপরাধ জগতের এক বেপরোয়া সদস্য ছিল বলে অভিযোগ করা হয়। গ্রেপ্তারের সময় পুলিশের সাথে শারীরিক সংঘর্ষে লিপ্ত হয়ে পরে এরিক। পুলিশ বাধ্য হয়ে “চোক হোল্ড” এর সাহায্যে এরিককে আয়ত্তে আনার চেষ্টা করে এবং সে সময় এরিকের মৃত্যু হয় ২০১৭ সালের ৩০ শে ডিসেম্বর। “আমি নিঃশ্বাস নিতে পারছি না” অভিযোগ করা সত্বেও পুলিশ এরিককে “চোক হোল্ড” থেকে ছাড়েনি এবং তার ফলে এরিক গারনার মৃত্যুর কোলে পতিত হয়। এটিও নিঃসন্দেহে একটি অত্যন্ত দুঃখজনক অযাচিত অপমৃত্যুর ঘটনা। এরিকের মৃত্যুকে কেন্দ্র করেও “ব্ল্যাক লাইফ ম্যাটার্স” নিয়ে আন্দোলনের ঝড় উঠেছিল, কিন্তু সে প্রতিবাদও ছিল খুবই ক্ষীণ এবং অতি স্বল্পায়ূ। অভিযুক্ত পুলিশের বিরূদ্ধে হত্যার অভিযোগ দায়ের করা সত্বেও “ফেডারেল গ্র্যান্ড জুরি” সংশ্লিষ্ট পুলিশ অফিসারের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ দায়ের করতে অস্বীকার করে এবং অফিসার ড্যানিয়েলকে সসম্মানে মুক্তি দেয়।

গত মে মাসে জর্জ ফ্লয়েড নামে একজন কৃষ্ণাঙ্গকে ২০ ডলার জাল নোট চালানোর অভিযোগে গ্রেপ্তার করতে গিয়ে পুলিশ ৬ফুট ৬ ইঞ্চি লম্বা জর্জ ফ্লয়েডের সাথে শারীরিক দ্বন্দে জড়িয়ে পরে। এই লম্বা ও শক্তিশালী মানুষটিকে গ্রেপ্তার করা সহজ ছিল না, তাই চারজন পুলিশ “চোক হোল্ডের” সাহায্যে জর্জকে নিজেদের হেফাজতে নিতে পেরেছিল। অপরাধ জগতের সাথে দীর্ঘদিন ধরেই জর্জ ওতপ্রোতভাবেই জড়িয়ে ছিল। পরে জানা গেছে প্রকৃতঃপক্ষে জর্জ ফ্লয়েড ছিল একজন “কেরিয়ার ক্রিমিনাল”।  ১৯৯৭ সন থেকে ২০০৫ সন পর্যন্ত আটবার কারাদন্ডে দন্ডিত হয়। “আর্মড রবারিতে” সাজাপ্রাপ্ত অপরাধ জগতের ভেটারেন জর্জ ফ্লয়েড ২০১৩ সালে প্যারোলে কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে যায়। তারপর জর্জ ২০১৪ সালে মিনেসোটাতে গিয়ে সংসার পাতে ওর মেয়ে বান্ধবীর সাথে। পরে ট্রাক ড্রাইভারের কাজ নেয়, এবং “বাউন্সার হিসেবে” পার্টটাইম কাজ নিয়ে একটি ক্লাবে যোগ দেয়।

আমেরিকায় প্রতিনিয়ত কালো অপরাধীর হাতে প্রাণ হারায় সাদা আমেরিকান, কিন্তু সেটা অপরাধ, তাই সেজন্য কোন আন্দোলন বা প্রতিবাদ হয় না কারণ নিহতরা সাদা, কিন্তু পুলিশের হেফাজতে থাকা কালীন জর্জ ফ্লয়েডের মৃত্যুকে নিয়ে সমগ্র আমেরিকায় প্রতিবাদের সুনামি এসেছে। হাজার হাজার মানুষ ছোট বড় প্রতিটি শহরেই রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ জানিয়েছে এবং এ আন্দোলন ক্রমশঃ শক্তি অর্জন করে কলেবরে বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রতিবাদে সোচ্চার হয়ে মানুষ আজ পথে নেমেছে এবং দাবী করছে “কৃষ্ণাঙ্গ জীবনের মূল্য” আছে। সৃষ্টিকর্ত্তা বিধাতার দান হল মনুষ্য জীবন, সে জীবন কৃষ্ণাঙ্গ, স্বেতাঙ্গ, বাদামী বা যে কোন মানুষেরই হোক না কেন, এ জীবন অত্যন্ত মূল্যবান, কোন মানুষ বা কোন সংস্থা বা কোন আইনরক্ষকের কোন সঠিক ও ন্যায়সঙ্গত যুক্তিই  নেই কোন মানুষকে হত্যা করার। এর একটিই মাত্র ব্যতিক্রম আছে কেবল মাত্র আত্মরক্ষার জন্য। কিন্তু এ ক্ষেত্রে আত্মরক্ষার কোন ব্যাপার ছিল না, কারণ জর্জ ফ্লয়েডকে চারজন পুলিশ নিজেদের শক্তি প্রয়োগ করে ওর গলায় হাঁটু দিয়ে মাটিতে চেপে রেখেছিল, এবং জর্জ শ্বাস নিতে পারছিল না বলেও অভিযোগ করেছিল, কিন্তু পুলিশ ওর কথায় কোন গুরূত্ব দেয় নি, ফলে একটা মানুষ প্রাণ হারাল, আর সে একজন কৃষ্ণাঙ্গ, সুতরাং পুলিশি অত্যাচার নিয়ে সারা আমেরিকার মানুষ আন্দোলনে নামবে – এটা তো অত্যন্ত স্বাভাবিক ঘটনা, কারণ আমেরিকানদের কাছে জীবন অত্যন্ত মূল্যবান। আর জীবনটা যখন একজন কৃষ্ণাঙ্গের তখন সে জীবনের মূল্য আরও তো অনেক বেশী, আমেরিকার সাদা মানুষ কালোদের সাথে দীর্ঘকাল অত্যাচার ও অবিচার করেছে, আজ পূর্বপুরুষদের অন্যায় আচরণের জন্য বর্ত্তমান পুরুষকে তার মূল্য দিতে হবে,কারণ কৃষ্ণাঙ্গদের (১৬১৯ সাল থেকে) প্রায় ২৫০ বছর ধরে ক্রীতদাস করে রাখা হয়েছিল, মানব জাতির ইতিহাসে একজন শ্বেতাঙ্গ অন্য একজন কৃষ্ণাঙ্গ মানুষকে এমনভাবে ক্রীতদাস করে রাখা এবং মানবিকতার অবমাননার দায়ে শ্বেতাঙ্গদের ইতিহাস চিরকাল লজ্জা ও ঘৃণার রক্তাক্ষরে লেখা থাকবে।  আর এসব কারণেই আজকের মানুষ প্রতিবাদে আরও বেশি করে সোচ্চার হয়ে উঠেছ, আর জর্জ একজন দাগী অপরাধী হওয়া সত্বেও একজন শহীদের মর্যাদা পেয়ে গেল। আর বর্ত্তমান কালের শ্বেতাঙ্গ মানব তার পূর্বপুরুষের কৃতকর্মের জন্য প্রায়শ্চিত্ত করতে প্রস্তুত, আর সেজন্যই আজকের প্রতিবাদে কালোদের থেকে সাদারা বেশী প্রতিবাদ জানাচ্ছে। প্রতি ৭ জন প্রতিবাদীর মধ্যে মাত্র একজন কালো প্রতিবাদী ছিল – এটাই পরিসংখ্যায় প্রকাশ পেয়েছে। তা ছাড়া এই প্রতিবাদীদের মধ্যে একটা বড় সংখ্যায় ছিল যারা পেশাদারী প্রতিবাদী, এরা অর্থের বিনিময়ে যে কোন জায়গায় যে কোন কারণে যে কোন সময়ে প্রতিবাদ জানাবে। জর্জ ফ্লয়েডের মৃত্যু নিয়ে যে প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে তার মধ্যে রাজনীতির অনুপ্রবেশ সহজেই অনুভব করা যায়। এ অনুপ্রবেশের অন্যতম কারণ হচ্ছে ২০২০ সালের প্রেসিডেন্টের নির্বাচন। ২০১৫ সালে নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর থেকেই ডেমোক্র্যাটিক পারটি ডোনাল্ড ট্রাম্পকে আইনসঙ্গত ও বৈধ নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট হিসেবে মেনে নিতে পারেনি। প্রেসিডেন্টের কার্যভার গ্রহণের আগেই ডেমোক্র্যাট শিবিরে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে “ ইমপিচ করার” আলোচনা শুরু করে দিয়েছিল এবং পরবর্ত্তীকালে সে চেষ্টাও করেছে। সেজন্য ২০২০ ইলেকশন জেতার জন্য ডেমোক্র্যাটিক পারটি ডোনাল্ড ট্রাম্পকে হেনস্থা করার জন্য জর্জ ফ্লয়েডকে নিয়ে প্রতিবাদের স্ফুলিঙ্গকে বিস্ফোরনে পরিণত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এ প্রতিবাদ এতটাই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে চালিত হয়েছে যে ম্যানহাটানে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাড়ী “ট্রাম্প টাওয়ারের” সামনের রাস্তায় “ব্ল্যাক লাইফ ম্যাটার্স” গ্রাফিটি করেছে। গ্রাফিটি করা আইনত দন্ডনীয় অপরাধ হলেও মেয়র বা পুলিশ কোন আইনী ব্যবস্থা নেয়নি।   পুলিশি অত্যাচারের নাম করে ডেমোক্র্যাট পারটি নিয়ন্ত্রিত প্রতিটি শহরের মেয়র কার্যতঃ পুলিশ বিভাগকে নিষ্ক্রিয় করে দিয়েছে। ফলে আটলান্টা, লস এঞ্জেলেস, সান ফ্রান্সিকো, শিকাগো, প্যাটারসন, নিউ ইয়র্ক সিটি (কত শহরের নাম লিখব) অপরাধ ১০০-২০০% বেড়ে গেছে। ১৩ই জুলাইএ শিকাগো শহরে ৬৪ জন মানুষ গুলিবিদ্ধ হয়েছে, তার মধ্যে ৬ জন ঘটনাস্থলেই নিহত হয়েছে, একই দিনে নিউ ইয়র্ক সিটিতে ১ বছরের শিশু গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হয়। বলা বাহুল্য এসব ঘটনা কৃষ্ণাঙ্গ অধ্যুষিত এলাকাতেই বেশী ঘটছে। সান ফ্রান্সিস্কোতে আট ব্লক এলাকা জুরে “পুলিশ বিহীন” এলাকা ঘোষণা করা হয়েছে, আর মেয়র লন্ডন ব্রীড পুলিশকে কোন পদক্ষেপ নিতে দেয়নি। পুরো এলাকাতেই নজীরবিহীন ভাবেই নৈরাজ্যের সৃষ্টি হয়েছে। এরকম প্রতিবাদের ফলে আর যা-ই হোক না কেন “ব্ল্যাক লাইফ ম্যাটার্সের” কোন নিরাপত্তাতো আসেইনি বরং নৈরাজ্যে ও আইন শৃঙ্খলার অভাবে “ব্ল্যাক লাইফে”র পরিস্থিতি আরও সংকটের সম্মুখীন হয়েছে। আর শুধু ব্ল্যাক লাইফ কেন, “সকল লাইফ”ই অত্যন্ত মূল্যবান। মেয়রদের ঔদাসীন্যে ডেমোক্র্যাট পারটি নিয়ন্ত্রিত শহরগুলির আইন শৃঙ্খলা ভেঙ্গে পরেছে এবং শ্বেতাঙ্গ এবং কৃষ্ণাঙ্গ উভয়ের জীবনই যে কোন সময় অপরাধের শিকার হতে পারে।     

একটু বিশ্লেষণ করলে সহজেই বোঝা যায় যে এরিক গারনার, মারটিন ট্রেভন, মাইকেল ব্রাউন এবং জর্জ ফ্লয়েডের মৃত্যুর সাথে দুটো সাদৃশ্য রয়েছে। প্রথমটা হল এরা সকলেই ছিল অপরাধ জগতের দাগী অপরাধী এবং এরা সকলেই অপরাধকেই জীবিকা হিসেবে গ্রহণ করেছিল। আর দ্বিতীয় সাদৃশ্য হল এরা প্রত্যেকেই পুলিশের কর্তৃত্ত্বকে অস্বীকার করেছে এবং পুলিশের সাথে দৈহিক সংগ্রামে জড়িয়ে পরেছিল। এরা সকলেই কর্তৃপক্ষের আদেশ মান্য করতে চায়নি, অর্থাৎ ওদের সকলের মধ্যেই আদেশ মানার মূল্যবোধ ছিল না। এটা পিতৃহীন পরিবারে বড় হওয়ার একটি মানসিক লক্ষণ। আর এর প্রধান কারন আমেরিকার কালোদের মধ্যে পরিবারহীনতার অস্ত্বিত্ত্ব এতটাই বেশী যে বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই “সিঙ্গল মাদার” পুত্র কন্যাদের প্রতিপালন করে। পিতৃহীন পরিবারে কর্তৃত্বের অভাবে এদের মধ্যে শৃঙ্খলা ও নিয়মানুবর্ত্তিতার প্রতি এক প্রকার অনীহার  সৃষ্টি হয়। পরিবার এবং সমাজ এরিক গারনার বা জর্জ ফ্লয়েডের মত মানুষদের সাথে সুবিচার করেনি, সমাজ ওদেরকে সুস্থ মানসিকতা নিয়ে সুনাগরিক হওয়ার সুযোগ দিতে ব্যর্থ হয়েছে আর তার ফলেই অসময়ে কতগুলি মানুষের প্রাণ চলে গেল। এ ঘটনা পরিবারের লজ্জা, সমাজের লজ্জা এবং দেশেরও লজ্জা। দেশের উচিত কৃষ্ণাঙ্গ পরিবার ও সমাজকে শক্তিশালী তৈরী করতে সর্বোতভাবে সাহায্য করা, তবেই প্রকৃতঃ অর্থে আমেরিকা একটি শক্তিশালী দেশে পরিণত হবে। পৃথিবীর কোন দেশ তার কোন বিশেষ নাগরিক সম্প্রদায়কে পিছনে ফেলে অগ্রগতির জাহাজে উঠতে পারেনি বা পারবেও না। আজকের আমেরিকা তৈরী করতে, আজকের আমেরিকার সাফল্যে ও ঐশ্বর্য সৃষ্টিতে কৃষ্ণাঙ্গদের অবদান কিছু কম ছিল না, বরং তাদের ঘার্মাক্ত ও রক্ত রাঙানো শ্রমেই তৈরী হয়েছে আজকের কাংখিত মহান দেশ আমেরিকা।    

“কৃষ্ণাঙ্গ জীবন মূল্যবান” অথবা “ব্ল্যাক লাইফ ম্যাটার্স” নিয়ে সারা আমেরিকায় গত ২৬শে মে থেকে যে আন্দোলন শুরু হয়েছে তার মূল কিন্তু অন্ততঃ দুশ বছর গভীরে লুকিয়ে রয়েছে। ইউরোপ অথবা আমেরিকায় বর্ণ বৈষম্য ছিল, আছে এবং থাকবে, তবে তার গভীরতার তারতম্য হবে, অবশ্য সময় ও কাল বুঝে। তবে এসব বুঝতে গেলে বর্ত্তমান আমেরিকার জন সংখ্যার পরিসংখ্যান নিয়ে কিছুটা জানা দরকার। বর্তমানে আমেরিকার বিগত আদমসুমারি অনুযায়ী প্রথম স্থানে আছে শ্বেতাঙ্গ (৭৬.৩%), দ্বিতীয়স্থানে আছে কৃষ্ণাঙ্গ (১৩.৪%) বর্ণ হিসেবে, কিন্তু জাতিগত হিসেবে ২য় স্থানে রয়েছে স্প্যানিশ বংশোদ্ভুত (১৮.৫%) মানুষরা যারা মূলতঃ দক্ষিন আমেরিকা থেকে উত্তর আমেরিকায় ­­­অভিবাসন গ্রহণ করেছে। আর  বাকী শতাংশ পূরণে রয়েছে আমেরিকান ইন্ডিয়ান, এশিয়া, ও অন্যান্য জাতি বা উপজাতির মানুষ। ২০০৯ সনের জাস্টিস ডেপারটমেন্টের পরিসংখ্যান অনুযায়ী আমেরিকার কারাগারে দন্ডপ্রাপ্ত সকল আসামীদের মধ্যে রয়েছে কৃষ্ণাঙ্গ ৩৯.৪%, শ্বেতাঙ্গ ৩৪.২% এবং হিসপানিকরা দাঁড়িয়ে রয়েছে ১৮.৫%। এ পরিসংখ্যান দেখলে একটা প্রশ্ন স্বভাবতঃ জেগে উঠবে যে মোট জন সংখ্যার ১৩.৪% মানুষ কি কারণে ৩৯.৪% কারাগারে পৌঁছে গেল। এ প্রশ্নের উত্তরটাও সহজেই উঠে আসে – আর্থ সামাজিক অসাম্য ও শিক্ষার অনগ্রসরতা।

সকল বর্ণের মানুষ যাতে আর্থ সামাজিক সাফল্যের সুফল উপভোগ করতে পারে, কি করে আর্থিক সাফল্যকে অনগ্রসর কৃষ্ণাঙ্গ সমাজের মানুষের মধ্যেও বিস্তার করা যায় এবং কি করে সিভিল ডিসঅর্ডার এড়ান যায় – সে সম্বন্ধে অনুসন্ধান করার জন্য ১৯৬৭ সালে প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট লিন্ডন বি জনসন ১১ মেম্বারের একটি কমিশন গঠন করেছিলেন গভর্নর অটো কার্নারের নেতৃত্বে। ১৯৬৮ সনে কমিশন রিপোর্ট দিয়েছিল – “আমেরিকান জাতি দুই মেরুর সমাজের দিকে এগিয়ে চলেছে, একটি শ্বেতাঙ্গ ও অপরটি কৃষ্ণাঙ্গ, পৃথক এবং অসম সমাজ”। কমিশন আরও সাবধান করে বলেছিল –“এ অসাম্য দূর না করলে দেশ, জাতি এবং দেশের বড় বড় শহরগুলি “বর্ণবাদ পদ্ধতি” বা   “system of apartheid এর’”  শিকার হবে। ১৯৬৮ সালে  রিপোর্ট পেশ করার পর আমেরিকায় বরাক ওবামাকে নিয়ে ৫ রিপাবলিকান ও ৩ জন ডেমোক্র্যাটিক প্রেসিডেন্ট তাঁদের টার্ম শেষ করেছেন কিন্তু অটো কার্নারের রিপোর্ট নিয়ে কেউই কোন কাজ করেন নি, ফলে আজ আমেরিকায় দুটো অসমান ও পৃথক সমাজের সৃষ্টি হয়েছে, একটি শ্বেতাঙ্গ ধনী ও অপরটি কৃষ্ণাঙ্গ দরিদ্র। প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ প্রেসিডেন্ট বরাক ওবামাও আমেরিকার কালো মানুষদের দুঃখ দারিদ্র্য দূর করার জন্য তেমন কিছু করেছেন বলে কোন নজির নেই। ওবামার আমলে এফ্রো আমেরিকানদের বেকারত্বের হার ছিল কমবেশী ৩০% এর উপরে। তারপর ২০১৬ সালে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আসার পর এফ্রো আমেরিকানদের কর্মসংস্থানের অবস্থা অনেক ভালো হয়েছে, বিশেষ করে মহিলা ও এফ্রো আমেরিকানদের জন্য – বেকারত্বের হার গত ৫০ বছরের মধ্যে সব থেকে কম হয়ে গেছে। দেশের মানুষ যদি বর্ত্তমান প্রেসিডেন্টকে সহযোগিতা সহ সুযোগ দেয় তা হলে হয়ত দেশে সকল মানুষের মঙ্গল হবে, কৃষ্ণাঙ্গ ও শ্বেতাঙ্গের আর্থ সামাজিক ব্যবধানের দূরত্ব কমে কাছাকছি চলে আসবে। সামাজিক অবিচার ও ব্যবধানের বিপরীতমুখী দুই মেরু একই কেন্দ্রে এসে দাঁড়াবে যেখানে থাকবে শুধু সাম্য,পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সম্প্রীতি ও হাতে হাত ধরে চলার প্রতিশ্রুতি, তবেই সম্ভব হবে দ্বিধা বিভক্ত দুই সমাজের সার্বিক মিলন ও বিকাশ, থাকবে না কোন দ্বন্দের অবকাশ, থাকবে শুধু দুই বর্ণের প্রেম ও অগ্রগতির দৃঢ় প্রতিশ্রুতি, তবেই হবে জর্জ ফ্লয়েডের মৃত্যুর সুবিচার। এখন চীৎকার বা প্রতিবাদ নয়, সময় এসেছে সকল বর্ণের মানুষকে ন্যায় সঙ্গত আর্থ সামাজিক প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সুযোগ ও পরিবেশ তৈরী করে দেওয়ার, তবেই তৈরী হবে প্রকৃতঃ আমেরিকান “মেল্টিং পট” ও সম্বৃদ্ধশালী ও সফল আমেরিকা। 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *