২০২২ বঙ্গ সম্মেলন ও আত্মসমীক্ষা

দিলীপ চক্রবর্তী

কোভিড-১৯ এর দৌরাত্মে সারা পৃথিবীর জীবনযাত্রায় এক অনভিপ্রেতপূর্ণ স্থবির অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল,যেখানে মাস্ক ছিল শেষ কথা, আর সাধারণ সমাবেশ ছিল সম্পুর্ণ নিষিদ্ধ, এমনকি নিকটতম পরিবারের সদস্যরাও অনেক সময় একে অপরের সাথে সময় ব্যপন করা তো দূরের কথা, অনেক সময় স্বল্প দুরত্ব রেখেও দেখা সাক্ষাৎ পর্যন্ত নিষিদ্ধ ছিল। তারপর নিষেধের নির্দেশ উঠে গেল দু’হাজার বাইশের শুরুতে, জন সমাবেশের অনুমোদন দেওয়া শুরু হল, আর তারপরই Los Vegas বা Atlantic City মত শহরগুলির নৈশ জীবন শুরু হয়ে গেল, লস ভেগাসের বিভিন্ন ক্যাসিনো প্রাণ ফিরে পেল,শুরু হয়ে গেল জয় পরাজয়ের দ্যূত, দ্যূতপ্রেমী মানুষের জোয়ারে লস ভেগাসের ক্যাসিনোগুলি নতুন করে প্রাণ ফিরে পেয়েছে। বাঙালির প্রিয় বঙ্গ সম্মেলনও আবার নতুনকরে উজ্জীবিত হল, ঠিক হল ২০২২এর বঙ্গ সম্মেলন হবে লস ভেগাসের প্ল্যানেট হলিউডে। যেমন কথা, তেমন কাজ।

বঙ্গ সম্মেলনের কর্তৃপক্ষ ও শত শত স্বেচ্ছাসেবকদের কঠোর পরিশ্রমে অবশেষে দুবছর প্রতীক্ষার অবসান হল, জুলাইএর ১লা তারিখে প্ল্যানেট হলিউডের “জ্যাপসে” বঙ্গ সম্মেলনের উদ্বোধন হল। কিন্তু প্রথমেই উদ্যোক্তাগণ ও দর্শকরা একটা বড় আকস্মিক সমস্যার সম্মুখীন হলেন হোটেল রেজিস্ট্রেশনের সময়, হঠাৎ হোটেলের কম্পিউটার খারাপ হয়ে গেল, ফলে হোটেলের ঘর পেতে অনেক দেরী হয়ে গেল, তদোপরি হোটেল লবিতে প্রচুর বসার জায়গা না থাকায় অনেককেই দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে, হঠাৎ এমন অবস্থার সৃষ্টি হবে, হোটেল কল্পনা করেনি, বঙ্গ সম্মেলনের কর্তৃপক্ষও এ পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত ছিল না। ফলে যা হওয়ার সেটাই হয়েছে, দর্শকগণ নিদারুণ অসহায় পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছেন। তবে অপেক্ষার বিড়ম্বনাকে সহনযোগ্য করতে বঙ্গ সম্মেলনের স্বেচ্ছাসেবকবৃন্দ সময়ে সময়ে পানীয় জল এবং স্ন্যাকস বিতরণ করেছেন। এ হেন পরিস্থিতে সম্মেলন আয়োজকদের আর কিছু করার ছিল না, হ্যাঁ মাঝে মধ্যেই অবশ্য সম্মেলন এবং হোটেলের প্রতিনিধিরা দুঃখ প্রকাশ করেছেন। এ পরিস্থিতি আরো খারাপ হয়েছিল যখন শাকের উপর বোঝার মত  একটি প্লেন  দেরি করে এল আর এয়ারপোর্ট এক সাথে অনেক দর্শক ও শিল্পীরা হোটেলে পৌঁছে গেল। স্বভাবতঃই পরিস্থিতি প্রায় সহ্যের সীমা অতিক্রম করেছিল। ্কিন্তু সত্যি বলতে কি দর্শকদের ধৈর্য এবং সহযোগিতাকে বঙ্গ সম্মেলন কর্তৃপক্ষ গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতাসহ অভিনন্দন জানাচ্ছে।

বঙ্গ সম্মেলনের অনুষ্ঠানগুলি ভালই চলছিল, কিন্তু একজন সঙ্গীত শিল্পীর অসহযোগিতার জন্য হলের পর্দা বন্ধ করে দিতে হয়েছিল, কারণ অন্য অনুষ্ঠানের সময় উত্তীর্ণ হয়ে যাচ্ছিল। সম্মেলন কর্তৃপক্ষের উচিত – সকল অংশগ্রহণকারীদের দায়িত্ব ও কর্তব্যের সীমারেখা বুঝিয়ে দেওয়া, আশাকরি তা হলে এধরনের ঘটনা আর কখনও ঘটবে না।

বঙ্গ সম্মেলনের কাজকর্মের মধ্যে থাকলে দেখা যায়, অনিচ্ছাসত্বেও কিছু কিছু ঘটনার প্রভাবকে উপেক্ষা করা যায়না, তেমনই একটি গুরূত্বপূর্ণ ঘটনা হল সুনীধি চৌহানের অনুপস্থিতি। বঙ্গ সম্মেলনের দুই তিন দিন আগে তিনি জানালেন তাঁর টেকনিসিয়ানদের ভিসা হয় নি, তাই গান গাইতে পারবেন না। এ ঘটনা হঠাৎ এবং অপ্রত্যাশিতভাবে এসেছে যে বঙ্গ সম্মেলন কর্তৃপক্ষের কাছে কোন বিকল্প ভাবারও সময় ছিল না, দর্শকদের জানানোর সময়ও পাওয়া যায়নি, বাধ্য হয়ে সঙ্গীত  শিল্পী সেলিমভাইদের আমন্ত্রন জানানো হল। এটা দর্শকদের প্রতারণা করার কোন প্রচেষ্টা নয়, নেহাতই একটি আকস্মিক ঘটনার প্রতিক্রিয়া, সুনীধির আমেরিকায় না আসার সিদ্ধান্ত, যার প্রকৃত দায় হচ্ছে ভিসা না পাওয়ার কারণ। শুধু সুনীধির টেকনিসিয়ানদেরই নয় , ভিসা পায়নি আরও পনের ষোলজন ব্যবসায়ী। আসতে পারেননি অনেক দর্শক যারা কোভিডে আক্রান্ত হ’য়েছেন। আর এ রকম আকস্মিক অণুঘটনা অনেক সময় বঙ্গ সম্মেলনের সাফল্য বা বিফলতা নির্ধারণ করে। আগামী দিনের বঙ্গ সম্মেলনে এ ধরণের ঘটনা যাতে না ঘটে সেজন্য কর্তৃপক্ষ কয়েকটি সাব কমিটি তৈরী করে বঙ্গ সম্মেলনের সাফল্যকে যাতে এক অন্য উচ্চ মাত্রায় উন্নীত করা যায় সে জন্য সর্ব প্রকার প্রচেষ্টা করা হবে। বঙ্গ সম্মেলন সফল হয় দর্শকের আশির্বাদে, আর বঙ্গ সম্মেলন বিফল হয় কর্তৃপক্ষের দূরদর্শিতা ও পারদর্শিতার অভাবে। ২০২২এর বঙ্গ সম্মেলনের খামতির দায় কর্তৃপক্ষ তাদের নিজের কাঁধে নিয়ে সকল দর্শকের কাছে ক্ষমাপ্রার্থী।

আগামী ২০২৩এর বঙ্গ সম্মেলন করার দায়িত্ব নিয়েছিল বস্টনের “প্রবাসী’। কোন সুনির্দিষ্ট প্রতিবন্ধকতার জন্য বস্টনের পক্ষে এ দায়িত্ব নেওয়া সম্ভব হয় নি, কিন্তু স্বল্প সময়ের কারণে কোন এসোসিয়েসন রাজী হচ্ছিল না, আর এ সময় স্বেচ্ছায় KPC BHOF(BENGALI HALL OF FAME) ২০২৩র বঙ্গ সম্মেলন করার দায়িত্ব গ্রহণ করতে রাজী হয়ে গেল। তারফলে আগামী বছরের বঙ্গ সম্মেলন হবে Atlantic Cityর John Whelan Board Walking হলে। তবে এ বিষয়ে একটা বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে, কারণ ২০২৫এ কল্লোল ক্লাব Atlantic Cityতেই বঙ্গ সম্মেলন করতে চাইছে, কল্লোলের দাবী – এক বছরের ব্যবধানে একই শহরে বঙ্গ সম্মেলন হলে দর্শকের উপস্থিতি খুব কম হবে, সুতরাং ২০২৩ এর বঙ্গ সম্মেলন অন্য কোন স্থানে করতে হবে। এবং এ ব্যাপারে কল্লোল ক্লাব অত্যন্ত অখুশি। কিন্তু CAB এ বিষয়ে ভিন্ন মত পোষণ করে, বরং সি এ বি বিশ্বাস করে কল্লোল যদি এ হলটি এখনই ২০২৫ এর বঙ্গ সম্মেলনের জন্য বুক করে তবে অনেক কম খরচেই হলটি পেতে পারে এবং যেহেতু পুরানো তথ্য দেখলে এটা সম্পুর্ণ পরিস্কার হয়ে যায় যে যাঁরা বঙ্গ সম্মেলনে যোগ দেন তাদের বেশীরভাগ মানুষই পুনর্দশক, কাজেই  দর্শক সমাগমের কোন সমস্যাই হবে না,তা ছাড়া আরেকটি ব্যপারেও CAB অসহায়,একবার কন্ট্রাক্ট সই করে সি এ বি যখন কোন সংস্থাকে বঙ্গ সম্মেলন করার অধিকার দেয়, তারপর সে সংস্থা কোথায় কি ভাবে বঙ্গ সম্মেলন করবে সেটা তাদের নিজস্ব ব্যাপার, CAB ঐ সংস্থার আভ্যন্তরীন কোন ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করতে চায় না বা করবে না। এখন CAB মনে করে এ ব্যাপারে কল্লোল ও KPC BHOF নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে এ বিতর্কের সমাধান করুক এবং আগামী বঙ্গ সম্মেলনের প্রস্তুতি নিক।

এবার ২০২২ এর বঙ্গ সম্মেলনের কথায় ফিরে আসি। প্রাথমিকস্তরে নানা রকম প্রতিকুল অবস্থা বিদ্যমান থাকা সত্বেও বঙ্গ সম্মেলনের সকল অনুষ্ঠান সমবেত দর্শকদের গভীর আনন্দ প্রদান করেছে এবং সে অর্থে ২০২২র বঙ্গ সম্মেলন আরেকটি সফলতম সম্মেলনের তালিকায় নাম নথিভুক্ত করল – দর্শককূল একবাক্যে এ মতের সামিল হয়েছেন।

পরিশেষে জানাই ২০২২র বঙ্গ সম্মেলনে খামতির দায় কর্তৃপক্ষ সর্বাঙ্গে গ্রহন করে ক্ষমাপ্রার্থী আর সাফল্যের অমৃত উঠে এসেছে আপনাদের সকলের বঙ্গ সম্মেলনের প্রতি গভীর ভালবাসার সমুদ্র মন্থনে, তাই এ কৃতিত্বের ভাগীদার একমাত্র আপনারাই।

বঙ্গ সম্মেলনের কর্তৃপক্ষ করজোড়ে প্রার্থনা করছে ২০২৩ এর বঙ্গ সম্মেলন আপনার উপস্থিতিধন্য হয়ে আগের মতই সফল হয়ে উঠুক। আপনাদের সকলের শুভ ও মঙ্গল কামনা করে আশা প্রকাশ করছি আপনার আশীর্বাদে বঙ্গ সম্মেলন স্বমহিমায় আবার উজ্জ্বল নক্ষত্রের ন্যায় ভাস্বর হয়ে উঠবে। শুভেচ্ছান্তে – বঙ্গ সম্মেলন কর্তৃপক্ষ।  

Leave a Reply

Your email address will not be published.