দেবতার গ্রাসে মিডিয়ার নাম মোডিয়া

দেবারুণ রায়

রবীশের ভালবাসার বাসা ছিল এনডিটিভি। যেদিন মালিক আদানির প্রথম দিন সেদিনই জনশ্রুতিতে জানলেন প্রতিষ্ঠাতা প্রণয় রায়, যে তিনি নিজগৃহে পরবাসী।  এবং প্রায় তৎক্ষণাৎই আদানির আশ্রয় ছাড়লেন রাধিকার সঙ্গেই। সেদিনই রবীশেরও পদত্যাগ, সন্ধে হতে না হতেই। পলাশীতে তবু মীর জাফরের বস ক্লাইভ ক’টা ফাঁকা আওয়াজ করিয়েছিলেন কোম্পানির  কামানের।  কিন্তু নিউ দিল্লি টিভি দখলের নিঃশব্দ বদলে ঘরে বাইরে একটা গাছের পাতাও নড়েনি। শব্দভেদী শেয়ারের বাণ বুলস আই ভেদ করেছে। তুখোড় সাংবাদিক  বা রাজনীতির তাসুড়েরাও তাল পাননি। মানে এখবরের তল খুঁজে পাননি যে, এনডিটিভিতে আর আর পি আর যুগ শেষ।  তাঁরা যে শর্তে ভিসিপিএল সংস্থার কাছ থেকে ঋণ নিয়েছিলেন, সেই সংস্থাটিই অধিগ্রহণ করেছেন আদানি। শর্ত অনুযায়ীই হস্তান্তর। তা নিয়ে বলার জায়গা নেই।  শুধু কিছু কিন্তু রয়ে গেছে।  যেমন যে সংস্থার কাছ থেকে যে টাকা ঋণ নেয় এনডিটিভি,  সেই টাকার চার ভাগের এক ভাগ পুঁজির প্রতিষ্ঠান কীকরে চারগুণ বেশি পুঁজির দেনাদারকে নিতে সক্ষম হল ? যদিও অর্থনৈতিক ঘটনার পরম্পরা কখনোই রাজনৈতিক  ঘনঘটা ছাড়া হয় না, এখানেও হয়নি। “সাম” দিয়ে কাজ না হলে “দাম” দিয়েই কাজ কিনতে হয়। চাণক্যের আপ্তবাক্য তাই।এরপর আছে দুটো অপশন “দণ্ড” আর “ভেদ।” “দাম” অপশনের মধ্যেই এক্ষেত্রে ঢুকে আছে ওই দুটো পর্ব। টিভি চ্যানেলের মালিকানা বদলে দেওয়াটা নিঃসন্দেহে “দণ্ড” বা শাস্তি দেওয়া এবং “ভেদ” বা বিভাজন এনে দেওয়া ভেতরে। যারা পুরনো মালিকদের  সঙ্গে ছেড়ে দিল চ্যানেলের চাকরি তাদের সঙ্গে যারা রয়ে গেল তাদের বিভাজন। তাই রবীশ কুমার তাঁর সতত বেগবান আবেগে মথিত রূপকে  সাজালেন নতুন টুইট।  সেদিনই সন্ধের পর। যাতে লিখলেন, “আমার পাখির বাসাটা বেদখল হয়ে গেছে। আজকের সাঁঝে কুলায় ফিরব কীভাবে। কুলায় তো আর আমার কুলায় নেই। অন্য কারও হয়েছে। এখন আমার ঘরে ফেরার মতো ঘর যখন নেই,  তখনই দেখছি ওড়ার জন্য রয়েছে এই বিপুল বিশাল অন্তবিহীন আকাশ।” এমন নির্ভীক, হতাশাহীন, ক্লান্তিহীন, আপসহীন , সত্যনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনার সংকেত। 

দেশজুড়ে, কালের কলস বহন করে চলা সাংবাদিকদের সারিতে রবীশ প্রথম নন। বৃহৎ পুঁজির লেহনসিক্ত কলম ছেড়ে স্বাধীন জীবিকার খোঁজে বেরিয়েছেন অনেকেই, অনেকটা আগেই। পুণ্যপ্রসূন বাজপেয়ী থেকে অজিত অঞ্জুম। ইউ টিউবের দৌলতে এই যোগ্য ও নিষ্ঠাবান, সাহসী ও আপসহীন সাংবাদিকরা গণমাধ্যমের স্বাধীনতার সাংবিধানিক অধিকার বিসর্জন দিয়ে গদির অনুগ্রহ চাননি। রাজনীতির এই অনুগ্রহ বিতরণের প্রশ্নে মৌলিক কোনও পার্থক্য নেই দলগুলোর মধ্যে।  শুধু ক্ষমতাসীন আর ক্ষমতাকাঙ্খীদের রণনীতি ভিন্ন। এবং দলগুলোর দৃষ্টিতে মিডিয়া ম্যানেজমেন্ট বিভিন্ন রঙে রঙিন। এনডিটিভির সাইনবোর্ড পাল্টে যাওয়ার পর নানা ধরনের ভিডিও ভাইরাল হয়েছে।  কোনওটা আদানির অধিগ্রহণের বীররসে আপ্লুত হয়ে রবীশের মতো অনমনীয় সাংবাদিকের বিরুদ্ধে নানা খেউড়ে মুখর। আর কোনওটা করছে  “গোদি” মিডিয়াকে মোডিয়া বলে সম্ভাষণ। বলছে,” রবীশ কুমার কে এমন হরিদাস, যে ওর ভয়ে প্রেস কনফারেন্স উঠে যাবে ?” আবার বলছে, ” আরে বাবা, আমার তো ভয় হচ্ছে। এতদিন তো একটা চ্যানেলে বসে চিল্লাতো। এখন যে সব জায়গায় ঘুরে ঘুরে ওইসব বলবে। ইউ টিউবের দৌলতে সব করবে। আমার শেরের নামে কী না কী বলবে। ” এই জাতীয় ভিডিও সবই হিন্দিতে। একটি ভিডিও বলছে, এনডিটিভির এক কর্মীর বয়ানে। ” ভাইসাব, রবীশ আউট হওয়ায় এত খুশি হয়েছি যা নিজে চাকরি পাওয়ার সময়ও হইনি। ওর আজেবাজে কথার ভয়ে আমার শের প্রেস কনফারেন্স করতে পারেনি আট বছর। এবার শের প্রেস কনফারেন্স করবে। আর সবার আগে ইন্টারভিউ দেবে এনডিটিভিকে। মজা আ গয়া। তবে ভাই, একটাই আফশোস,  রবীশ যদি নোকরি করত আর শেরের ইন্টারভিউ করতে হত ওকে, কি ভালো হত। রবীশ জিজ্ঞেস করত, আপনি কীভাবে খান ? আপনাকে তো কখনও মানিব্যাগ রাখতে দেখা যায় না।  আপনার চলে কীকরে ? উহ্। যা যা লিখে দেওয়া হত ও সব পড়ত টিভিতে। কিন্তু এদৃশ্য দেখা হল না। ইউটিউবের বিপদ নিয়ে অবিশ্যি টেনসন নেই। কত্তা যখন তার কর্মচারীর কথায় এনডিটিভি কিনে নিয়েছে তখন একদিন ইউটিউবও কিনে নেবে। দেশ যার হাতের তলায়, ইউটিউব তার হাতে আসতে কতক্ষণ।  তখন বাছাধন বুঝবে। আমাদের মুঠো ছেড়ে কোথায় যাবে ? ”

এদিকে,  আন্তর্জাতিক সংস্থার সমীক্ষা অনুযায়ী সাংবাদিক ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতার বিষয়ে ভারতের স্থান ক্রমাগত নিম্নগামী।  মোট ১৮০ টি দেশের মধ্যে সাংবাদিক ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতায় ভারতের স্থান ১৫০ নম্বরে। অর্থাৎ ভারতের মতো বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশের চেয়ে ১৪৯ টি দেশ এগিয়ে আছে সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতায়।  এবং ক্রমশ এই অবস্থা আরও খারাপের দিকে যাচ্ছে। অবশ্যই শুধু কেন্দ্রীয় সরকার নয়, এই বিষয়ে বিরোধীদের অভিযোগের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে কয়েকটি রাজ্যের সরকারও। এই প্রসঙ্গেই আন্তর্জাতিক জুরি ইজরায়েলের নাভাদ লাপিদ কাশ্মীর ফাইলস নিয়ে যে আক্রমণাত্মক মন্তব্য করেছেন তা নিয়ে পাল্টা আক্রমণে সরব হয়েছে সংঘ পরিবারের ও বিজেপির হোয়াটসঅ্যাপ বিশ্ববিদ্যালয়। বিরোধীদের বেসামাল সংগঠনের মোকাবিলায় পারদর্শী সংঘ পরিবার কার্যত অপ্রতিরোধ্য।  কারণ মিডিয়ার সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ সুনিশ্চিত করেছে শাসকরা। রবীশ কুমার বলছেন,  একজন ভীত সন্ত্রস্ত সাংবাদিক মৃত নাগরিকের  জন্ম দেয়। যারা পেশায় আছেন তারা তো আছেন, যারা অনেক টাকা খরচ করে  সাংবাদিকতা পড়ছেন  তাদের ভবিষ্যত কী হবে ? তাদের তো একটাই কাজ। সেটা হল দালালি। বেশিরভাগ ছেলেমেয়েই ভাবে, সাংবাদিকতার চাকরি আর পাঁচটা চাকরির মতোই।  কিন্তু এটাই হল মৃত মানুষ আর মরা নাগরিক সৃষ্টির কারখানা। Pic Courtesy: Scroll.in

Leave a Reply

Your email address will not be published.