বাঙালিয়ানার নতুন কান্ডারি, দেশ থেকে দেশান্তরে, “আড্ডা নিউজার্সি”!

সুষ্মিতা রায়চৌধুরী, নিউজার্সি

ফ্রেম বন্দি কলম কবি পুব আকাশে পশ্চিমের রবি বাঙালিয়ানার গ্লোবাল ধারায় প্রস্ফুটিত আড্ডার ছবি।

বাঙালির সমার্থক খুঁজলে  তিনটি শব্দ প্রথমেই মাথায় আসে পেটচুক্তি খাওয়া, রবিঠাকুর আর “আড্ডা”।এহেন পরিস্থিতিতে মার্কিণী মাটিতে বসে একটি সংগঠনের জন্ম দেওয়া যার নাম একেবারে বাঙালির হৃদয়প্রসূত,“আড্ডা নিউজার্সি”,তা যে-সে ব্যপার নয় বইকি।কিন্তু এই আড্ডা নিছক কোনও এসোসিয়েশন নয়।তাহলে কি গুরুগম্ভীর “লিটারেরি গ্রুপ” বা সাহিত্য চর্চার কেন্দ্রবিন্দু?নাহ,বরং আড্ডা সর্ব অর্থে সাহিত্য ও সংস্কৃতির এক নতুন দিগন্ত।ওয়েবসিরিজ কেন্দ্রিক নতুন প্রজন্মকে বেশ রসিয়ে-বসিয়ে গল্পের বইয়ের দিকে ফেরানোর এক ব্যতিক্রমি প্রচেষ্টা।সঙ্গে আছে প্রবীণের অভিজ্ঞতা আর এক অনাবিল ক্ষুরধার কলমকথা।

“আড্ডা নিউজার্সির” বয়স মাত্র এক। কিন্তু এই একবছরে সে অনায়াসে অতিক্রম করেছে দেশ-বিদেশের গন্ডি।নিউ জার্সি সবসময়ই এক ফালি কলকাতা।কখনও পৌষ পার্বণে,কখনও ভাঙা বাংলায় রবীন্দ্র-নজরুলে।এখানে জেন-ওয়াই প্রবল উৎসাহে এগিয়ে আসে বাঙালিয়ানায় সামিল হতে।কিন্তু আড্ডার হাত ধরে তারা এখন শিখছে গল্পের বা গানের অর্থটাও।যদি সত্যি বাঙালিয়ানা শিখতে হয় তাহলে কলকাতাকে আনতেই হবে বৈঠকঘরে।যেমন ভাবা তেমন কাজ।হাতেটানা রিক্সার ঘন্টার শব্দে ,কয়লার ইন্জিনে ধোয়া উঠিয়ে,জাহাজের ভেঁপু বাজিয়ে, আড্ডা পাড়ি দিলো তাই মহানগরী।স্থাপন হলো এক নতুন যোগসুত্র।এমন একটি মিলনস্থল যেখানে কলকাতার নবীনপ্রবীন সাহিত্যিক,সংঙ্গীতজ্ঞ,দিগ্গজ,বুদ্ধিজিবী মহল সখ্য পাতালেন বিদেশের এই শ্রেণীর সাথে।আড্ডার হাত ধরে বাঙালি ঘরকুনো নয় বরং গ্লোবাল।

এই একবছরে প্রত্যেকটি মানুষ আড্ডায় পেয়েছে একটাই উপলব্ধি,যা এইমুহুর্তে সবথেকে প্রয়োজন।সেটা হলো নিজেকে ঘষা-মাজা করা।”সময় নেই”এই কথাটির প্রবেশ নিষেধ আড্ডায়।ভালো থাকার কোনও নির্দিষ্ট সময় হয়না ঠিক তেমন নিজেকে চেনার কোনও শেষ নেই।এখানে সবাই রাজা।কারোর প্রেমের কবিতায় হরিপদ কেরানির বনলতা সেনকে পাওয়ার স্বপ্ন,কারোর তীক্ষ্ন ধারালো কলমে প্রতিবাদের স্ফুলিঙ্গ,কারোর সুর নির্ঝরিনী সুধা ঠালে দৈনন্দিন স্বপ্নবাসরে আবার কারোর ঘুঙুরের ঝংকারে প্রাণ পায় জীবনশৈলি।সময়ের ব্যবধান যেখানে তুচ্ছ।একবছর আগেও পয়লা বৈশাখ বা গল্পবৈঠকে যখন এদেশে ভোর তখন কলকাতার মানুষ আমেজ করে সন্ধ্যার জলসা বসায় দেশের মাটিতে।টেকনোলজি কিছু তো ভালো করুক।অতএব স্কাইপ বা জুম-এ তখন দেশের নাম একটাই “বাঙালির আড্ডা”।কিন্তু হঠাৎ যেনো ওলটপালট হয়ে যায় সারা বিশ্ব।থাবা বসায় মারণরোগ,করোনা ভাইরাস।মানুষ দিশাহারা ভুলে যায় সমস্ত আনন্দ।বাঁচার চিন্তায় তখন পাগলপ্রায় সবাই,আতঙ্কে কাটছে প্রত্যেকটাদিন।এহেন মুহুর্তে সমাধান ছিলো একটাই।চিন্তার গহ্বরে তলিয়ে যাওয়ার আগে মনের সমস্তটুকু জোর নিয়ে এগিয়ে আসে “আড্ডা নিউজার্সি”।ঘরবন্দী দমবন্ধ করা জীবন এবার ভার্চুয়ালি মিলিত সবার সাথে।কলকাতা থেকে নিউজার্সি আড্ডার সব সদস্য হেরে যাবে না এই অঙ্গীকার নেয়।এখানে সবাই এক।লেখাকে ভালোবেসে জন্ম নেয় নতুন কলম।প্রবীণের কলম পড়ে তালিম নেয় নতুন লেখক-লেখিকা।দাদরা,কাহরবা,ভৈরবীতে বেঁচে থাকার রসদ।সবাইকে সক্রিয় রাখতে শুরু হয় ধাঁধার প্রতিযোগীতা এবং কুইজ।পুরস্কার তো থাকেই আবার শাণ দেওয়া হয় ভুলে যাওয়া মগজাস্ত্রকে।শুরু হয় নতুন ধারার গল্পলেখনী।দশ শব্দ থেকে একশো শব্দ তখন রোজ চলছে কলমের কলতান।উঠে আসছে নতুন চিন্তাশৈলি।সবাইকে নিয়ে চলতে গিয়ে দুজনকে তো রাশটা ধরতেই হয়,তাই কর্ণধারের নামভুমিকায় যারা আছেন তারা ভীন্নমুখী অথচ ভীষণ বাঙালি।একজন যদি হন সোদামাটির গন্ধে পল্লীগায়ের সবুজপাতার মতন সজীব আরএকজনের আভিজাত্যে আড়ম্বরে মহানগর।কলম আর কন্ঠের যোগসুত্রে দুদেশের সবাই আড্ডার সারথি।অদিতি ঘোষদস্তিদার এবং সংগ্রামী লাহিড়ী,এরা পথপ্রদর্শক এই একমুঠো বাঙালিয়ানার।বাঙালির আড্ডা মানেই খাওয়া,একটা সময় আড্ডার হেসেল ছিলো অন্নপূর্ণার ভাড়ার।এখন সবটাই ঘরবন্দী।কুছ পরোয়া নেহি।ভার্চুয়াল গল্প মিটিয়ে দেয় তার ক্ষোভ।

সম্প্রতি “আড্ডা নিউজার্সি” ত্রাণ পাঠিয়ে চলেছে বাংলার কোভিড এবং আম্ফানে পর্যুদস্ত মানুষদের জন্য।কিন্তু শুধু তাতেই থেমে থাকে না আড্ডা।অভিনবত্ব যার উৎস্য সেই আড্ডা সম্মান জানায় বাংলা এবং নিউজার্সির সেই সমস্ত ফ্রন্টলাইনারদের যারা অবিরাম কাজ করে চলেছেন মানুষের স্বার্থে।চিকিৎসক,নার্স,ব্যঙ্ককর্মী সবাইকে পাঠানো হয় আড্ডার ধন্যবাদ স্মারক।এর মধ্যেই শুরু হয়েছে নতুন আরেকটি প্রয়াস।আড্ডার নতুন ওয়েবম্যগাজিন,”চলো আড্ডা মারি”।লেখা দিতে পারেন সবাই,শুধু সর্ত একটাই।”অনাবৃত হোক বাঙালিয়ানা“।ফেলুদা,শার্লক্,ব্যোমকেশ পেরিয়ে এখন সুজন দাশগুপ্তের সৃষ্টিতে একেনবাবুও আছেন আপনার সাথে জীবনের রহস্যভেদে।দেখা করতে ঠিকানা আড্ডা।

যখন ইংরেজি আর হিন্দির জাঁতাকলে বাংলাটা অনেকের কাছে ক্লিশে,তখন আত্মমযার্দায় প্রাণবন্ত আড্ডা সগৌরবে ওড়ায় বাংলা সংস্কৃতির ধ্বজা।পিঠেপুলি,পুরাণ,পত্রলেখা,কবির লড়াই,টপ্পা,বায়োস্কোপ,পুঁথির সাথে বাংলা ব্যন্ড,ল্যাদ,রে টু ঘটক,অংবংচং সবকিছুর একমাত্র পিঠস্থান।বাঙালি থেকে বং,ঠিকানা “আড্ডা নিউজার্সি”।

লক্ষ্য একটাই, জীবনকে সতেজ ও প্রাণবন্ত করতে নির্মল আড্ডা হোক। পরিবারের সদস্যদের বন্ধন দৃঢ় করতে এক হোক আড্ডা পরিবার। ভালো মানুষদের আড্ডা সমাজকে পরিশীলন করে। আমাদের তাই আড্ডা অব্যাহত রাখতে হবে। আড্ডার মাধ্যমে সাহিত্য চর্চা, সংস্কৃতি চর্চা, ইতিহাস চর্চা ও মানবিক মূল্যবোধের চর্চা চালিয়ে যেতে হবে। পরিশীলিত নির্মল আড্ডা অব্যাহত থাকলে হাজার বছরের বাঙালি সমাজ কোনোভাবেই ঘুণে গ্রাস করবে না।অতএব চোখ রাখুন “আড্ডা নিউজার্সি”(Adda NJ)র ফেসবুক পেজে।আপনি বাঙালি হওয়ার সঠিক সমার্থক শব্দ আলবাৎ পাবেন।আপনি কলকাতার হন বা ক্যলিফোর্ণিয়া,আপনার গল্প,কবিতা লেখা বা কঠিন গল্পকে সহজ ভাবে বলার নেশাটাকে আরেকটু চাগাড় দিয়ে প্রকাশ করতে কোমড় বেঁধে তৈরি “আড্ডা নিউজার্সি”।।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *