পাল্টা মেরুকরণের পথে : তৃতীয় দফায় বাংলায় যাত্রা রাহুলের

দেবারুণ রায়

ভারত জোড়ো যাত্রার মর্মবাণী যদি কিছু থাকে তা অবশ্যই হবে , “ভেদাভেদ ভারত ছোড়ো।” এই বাক্য নিয়ে তো কোনও বিরোধের প্রশ্ন আসে না। যদি কেউ বিরোধের বিষ পুষে রাখে তা অবশ্যই ভারতের জাতীয়তা, জাতীয় সংগীত ও সংবিধান বিরোধী মস্তিষ্কের মলাট। এবং দেশের ললাটলিখন বলছে, ভেদাভেদ বা বিভাজনের সংস্কৃতি কদাচ জাতীয়তাবাদের সঙ্গে যায় না। জাতির কষ্টিপাথর স্বাধীনতার লগ্নেই বিভাজনকে বাতিল করেছে ভারতীয়ত্বের সমস্ত শরীর ও মন দিয়ে। যখন হিন্দুস্তান ও পাকিস্তানের মধ্যে খোদাই করা বিভাজনরেখা দেশমাতৃকার হৃদয়ের দুটি অলিন্দকে আলাদা  করে দিয়েছিল। বিতাড়িত বিদেশী শাসকের সৃষ্টি করা ওই বিভেদের সংকীর্ণ সংকীর্তন আজও ধ্বনিত সারা দেশে। মন্দির মসজিদের নামে মানুষ যখন মসনদের রাজনীতিতে নামে তখন তা আর ধর্ম নয়। মোহন্ত আর মৌলভীর লড়াইয়ের মঞ্চ। তখন প্রগতির কাঁটা ঘুরতে থাকে অধোগতির দিকে। বাম থেকে ডানদিকে। ভারতের রাজনীতি যেভাবে পঁচাত্তর বছরে পট পরিবর্তন করেছে।  জাতীয়তাবাদী স্বাধীনতা আন্দোলনের ডাক দিয়ে জাতির জনক দেশের খণ্ডিত আত্মাকে জুড়েছিলেন। “একই সূত্রে বাঁধিয়াছি সহস্রটি মন, /একই কার্যে সঁপিয়াছি সহস্র জীবন।” এই লক্ষ্যেই “বন্দে মাতরম” মন্ত্র। সশস্ত্র সংগ্রাম বা অহিংস সত্যাগ্রহ এই দুই পথের স্বাধীনতা সৈনিকের মুখেই এক মন্ত্র। বিসমিল বা আসফাকুল্লাহ দুজনেরই আরাধ্যা দেবী হলেন ভারতমাতা। ধর্মবিশ্বাস যাতে লড়াইয়ের ঐক্য নষ্ট করতে না পারে তাই এই দেশপ্রেমের মন্ত্র।

রাজনৈতিক স্বাধীনতা এসেছিল সংহত দেশ ও সুসংহত সংবিধান রচনার পথে। দেশের ঐক্য,  সংহতি ছিল স্বাধীন দেশের প্রথম ও মূল প্রাপ্তি। কালক্রমে মসনদের টানে মরিয়া রাজনীতি সেই স্বাধীনতার দো ফসলা শস্যশ্যামলা জমিতে বিষবৃক্ষের বীজ ছড়াচ্ছে। নতুন করে শুরু হয়েছে বিদেশী শাসকদের রেখে যাওয়া বিভাজনের চাষবাস। উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, সমৃদ্ধি, প্রগতি, শান্তি ও শৃঙ্খলা জাতীয় কর্মসূচির চেয়ে দেশে মূল আলোকপাত বিভাজনের ওপর। ধর্মের নামে,সম্প্রদায়ের সুড়সুড়ি দিয়ে বিভেদ সৃষ্টি করাই যখন মূল কাজ তখন মানুষের ন্যূনতম প্রয়োজন গৌণ। ফলে রাজনীতির লোকেদের তো মসনদ পেতে বা তা দখলে রাখতে কোনও অসুবিধে নেই। ধর্মের নামে বিভাজনের মন্ত্র পড়লেই তো ভোটের বৈতরণী পেরনো নিশ্চিত। বেকারদের চাকরি দিতে হবে না. জিনিসপত্রের আগুনদাম কমাতে হবে না, না কমলে মানুষের কাছে কৈফিয়ৎ দিতে হবে না, অচ্ছে দিন না এলেও রাম-রহিমের কূটকচালির কথা বলেই ভোটের মাঠে গোল দেওয়া যাবে। অন্তত তিন দশক ধরে দেশের এই নির্বাচনী মোড় ঘোড়ানোর খেলায়  সবচেয়ে বেশি ধাক্কা খেয়েছে তারা, যারা ধর্মীয় মেরুকরণ বা জাতপাত সম্প্রদায়ের রাজনীতিতে কাঁচা। নানা রঙের কারবারি কংগ্রেসের মাঠ পুরোপুরি দখল করেছে বিজেপি। তাই মৌলবাদের মোকাবিলায় জাতীয় আন্দোলনের মৌল  সংগ্রহে পথে নেমেছে কংগ্রেস। এই পথে নামাটাই রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বে “ভারত জোড়ো যাত্রা।”

যাত্রাশুরুর সময় থেকেই বিরোধ সঙ্গ নিয়েছে কংগ্রেসের নেতার। কিন্তু আবার প্রশমিতও হয়েছে যাত্রার ও যাত্রীদের রং রূপ ও সংহতির সংস্কৃতির নতুন সংস্করণ দেখে। কেরলে যেভাবে বিরোধ বাধল কমিউনিস্টদের সঙ্গে তার ভেতরে কোনও শ্লাঘা বা ব্যক্তিগত আক্রমণের কাদা ছিল না। সিপিএম কেরলের মূল প্রতিপক্ষের মিছিলে উজান দেখে উদ্বিগ্ন হয়েছে। দলের ভেতরে অন্য মত তিক্ততার রাশ টেনে ধরার চেষ্টা করেও পারেনি।কারণ রাহুলও হুল ফুটিয়েছেন। যদিও অনেক পরে ডিসেম্বরের শেষে কলকাতায় সিপিএমের কট্টর কংগ্রেস বিরোধী নেতা প্রকাশ কারাট কিন্তু যা বললেন তাতে বিবেচনা স্পষ্ট।  বললেন, যেখানে কংগ্রেসের সংগঠনের ধারা শীর্ণ সেখানেই তো যাওয়া দরকার ছিল। তবে এতে যদি দলটা চাঙ্গা হয়ে থাকে তাহলে ভাল। একটু শ্লেষ দিয়েও জরুরি সংকেত : আসলে কংগ্রেসটাকে জোড়া দেওয়া বেশি দরকার। কংগ্রেস জোড়োটাই জোরালো হোক। অনেকটাই বাঁহাতে বামনেতার ফুল। কোনও উষ্মা নেই। উষ্ণ প্রতিক্রিয়া। কংগ্রেসের প্রভাবিত রাজ্যগুলো স্বস্থানে ফিরলেই বিজেপির আসন  অনেকটা কমবে। বিরোধী ঐক্যের কথা ভাবছেন না কারাট। ভাবছেন, যেখানে যে বিজেপি-বিরোধী দল শক্তিশালী তারাই জিতুক। মুখে না বললেও মনে মনে নির্বাচনোত্তর জোটের সরকার ধরে এগনোটাই বাস্তবতা। না হলে অকারণে অসম্ভব ঐক্যকে সম্ভব করতে গিয়ে শক্তিক্ষয়। তাতে শাসকদলের পোয়াবারো। তাছাড়া এখন তো নির্বাচনোত্তর জোড়তোড়ের কথাও সবাইকে ভাবতে হয়। কারণ সেই লক্ষ্যে জোরদার পুঁজির খেলা চলতে থাকে। ভোটতাত্ত্বিক এজেন্সির কারুকাজ একটা বিশেষ ব্যাপার। বাণিজ্যিক লেনদেন। পলিটিকো বিজনেস ডিল। জিও পলিটিক্যাল বা ভূ রাজনৈতিক পরিস্থিতি বলতে সবটাই স্বচ্ছ। তবে কংগ্রেসের যাত্রা নিয়ে বাম অবাম ধর্মনিরপেক্ষ বিরোধীদের কোনও গাত্রদাহ নেই। বাংলায় আসেনি রাহুলের যাত্রা। সুতরাং তৃণমূলের কোনও তাপ বা চাপ নেই। কংগ্রেসের  রাজ্য নেতারা রাহুলের যাত্রায় কোথাও কোথাও গেছেন, রাজ্যে সাগর থেকে পাহাড় করেছেন অধীর চৌধুরি।  শুভংকর সরকারকে ধরা গেল ফোনে যখন,  উনি তখন জলন্ধরের যাত্রায়। জলপাইগুড়ি থেকে জঙ্গলমহল কিংবা জলন্ধরের যেকোনও কর্মসূচিতে সতত চলমান কংগ্রেসের নেতারা। এই উৎসারিত উৎসাহের পিছনে তো কোনও জোরালো নৈতিক প্রবণতা বা মতাদর্শের তাগিদ নিশ্চয়ই আছে। যাদের নেই তারা এদল থেকে সেদলে। এবং তারাই সতত কোন্দলে।

রাহুল যখন কেরলপথে তখন কমিউনিস্টদের খোঁচা খেয়েও জয়রাম রমেশরা রে রে করে ওঠেননি। আরেক রমেশ ( চেন্নিথালা ) তেড়েফুঁড়ে উঠতে গেলেও টেনে ধরেছেন রাহুল। তাঁর গালে ততদিনে কার্ল মার্ক্স এর দাড়ি ক্যাপিটাল কার্লিং হয়েছে। আর ২০২৩ য়ে তো  ওয়েবসাইট ইউনিভার্সিটির ত্রিশূলও দেখা গেল রাহুলের হাতে। দক্ষিণে বাঙ্কারের জীবন নিয়ে বলেছেন। দিল্লিতে ফিরে “মেরে পাস মা হ্যায়” ধাঁচের ডায়লগহীন আদর মা সনিয়াকে। সনিয়া সস্নেহ প্রশ্রয়ে উজ্জ্বলা। তারপরই মোদী মাতৃহারা হয়ে শতায়ু মায়ের শবদেহের বাহক খালিপদে। দেশের সর্বোচ্চ পদের অধিকারীর সম্ভ্রান্ত খালি পায়ের ওপর আনত হাজারো ক্যামেরার আলো। সোশ্যাল মিডিয়ার মথিত মহিমা যখন প্রধান সেবকের মাতৃবিয়োগে ভারাক্রান্ত সম্ভবত তখনই  ভারত জোড়োর ঝোড়ো হাওয়ার ঝাপটায় সব চোখ স্থির। উদ্ভ্রান্ত উদ্ভট কিছু নয়। সে আমার ছোট বোন। এটা আনন্দসূচক উচ্ছ্বাসে ছোট্ট বোনকে বড় হতে না দেওয়ার দাবি। প্রিয়াঙ্কার লাজুকলতা মুখে আত্মভোলা দাদার প্রতি পরিণত রমণীর মানা। দাদা বারংবার বোনের গালে চুমো দিয়ে বলছেন, জোড়ো এখান থেকেই। সংসার থেকে সমাজের সমস্ত প্রকোষ্ঠে ছড়িয়ে যাক ভালবাসার বন্ধনী।যেন এই বাঁধুনি কোনও কুটিল কুচক্রী খুলতে না পারে। যেন বিভাজন ব্যর্থ হয় অনর্গল আলিঙ্গনের কাছে। এ বার্তাকে কেউ খেলো করে দিতে পারে ? এতটাই বেরসিক হতে পারে মন্দির মসজিদ আর মসনদি  মেজাজ ? রাহুলের এই যাত্রায় ফিল্মি দুনিয়ার যাঁরা গেলেন, আবালবৃদ্ধবনিতা যেভাবে মিশে গেলেন পদব্রজে রাহুলের সঙ্গে তাতে কঠিন উত্তাপ ও ততোধিক কঠিন পরীক্ষায় পড়ল সংঘ পরিবারের সর্বাঙ্গসুন্দর প্রচারণা পরিষদ। এবার শুরু হল, “রাহুল কঠিন শীতে টি শার্ট পরে হাঁটছেন এসব ফালতু কথা। এই দেখুন শার্টের নীচ দিয়ে মুখ বের করেছে ইনার। বাছাধন তোমার চালাকি ধরে ফেলেছি।” তারপর , বক্তৃতা রেকর্ড করে তার ওপর ফটোশপ ও কাট অ্যান্ড পেস্ট করে রাহুলকে হাস্যকর করার মরিয়া ভিডিও ভাইরাল করার চেষ্টা। রাহুল বললেন, “আমি রাহুল গান্ধীকে মেরে ফেলেছি। যাকে দেখছেন এ সেই রাহুল নয়। অন্য মানুষ। পথ চলতে চলতে আমি নিজেকে বদলেছি। কতটা পথ চলতে হবে নিজের মনের মত নিজেকে করে নিতে জানার চেষ্টা করছি। ” এবার একটা মুখ দেখা গেল। ভূতের মতো মুখোশ খুলে এ এক ধোঁয়াশাহীন অবয়ব। মিম এর ওয়েসি। সবাই বলে বিজেপির চামচে। মুসলমানদের ভোট কাটুয়া। বিহারে বিজেপির সরকার গড়ার কারিগর।  বাংলায় পেট ভরেনি। কিন্তু কিছু সংখ্যালঘু মানুষ তো ওর হাতে তামাক খেয়ে বোকা বনেছে। ওয়েসি ফাঁকতালে ভোট কুড়িয়ে নিয়ে বলেছেন,  “হুজুর এখানে ভাঙা বেড়া নেই। তাই শেয়াল পণ্ডিতকে আরও সময় দিতে হবে। সবুর করুন। মেওয়া ফলিয়ে দেব।” আপাতত এক তাল এক ফাঁক। ক্যামেরা চলছে। তো ওয়েসি বহুকাল হায়দরাবাদে জিতে এসেছেন কংগ্রেসের হাত ধরে। সেকুলার সাজা ওখানেই। কিন্তু এখন বিজেপি সে খামতি পূরণ করেছে। মিমের মতে, “একদিকে চন্দ্রশেখর অন্যদিকে জগনমোহন। কংগ্রেসের ভাত দেওয়ার ভাতার হওয়ার মুরোদ নেই,  শুধু কিল মারার গোঁসাই। অতএব সংঘং শরণং গচ্ছামি। মুসলমানদের কদর আছে সংঘে।” কারণ ওখানে বিরলদের বোলিং ব্যাটিং করানো হয় প্রদর্শনী ম্যাচে।

যাত্রা শেষ হয়ে আসছে। মেরুকরণের রাজনীতি  নতুন মোড় নিচ্ছে। এতদিন শুধু বিজেপির দেওয়া অঙ্ক ছিল। ওদের নিজেদের জানা প্রশ্নে ওরা পাস, অন্য সব ফেল। এবার ওরাও অঙ্ক দিয়েছে। ধর্মীয় মেরুকরণের পাল্টা রাজনীতির মেরুকরণ। এবার সেয়ানে সেয়ানে। তুমি অক্টোপাসের আটটা মুখে একজন। আর আমরা বিরোধীরা তেঁতুল পাতায় ন’জন। তেঁতুল পাতাটা কী ? যেমন ধরুন বঙ্গে কী হবে অঙ্ক।  কোনও বিরোধী জোট নাই বা হল। কিন্তু বঙ্গ কখনও রণে ভঙ্গ দেবে না। ঊনিশে ফিনিশ না হলেও ঊনিশ তো ফিনিশ। এবার চব্বিশ। তেইশে রাহুল যাত্রা করবেন তৃতীয় দফায় বাংলায়। মূল যাত্রা শেষ হলে একটা দ্বিতীয় যাত্রা হবে। বাংলা থাকবে তৃতীয় দফার যাত্রায়। হয়তো সমস্ত  দলকে ডাকবেন রাহুল। বাম ও তৃণমূল সহ। এটা কোনও জোটের ডাক নয়। মঞ্চেরও নয়। শুধু একসঙ্গে হাঁটার জন্যে। বিজেপি তো পাপ্পুর সঙ্গে হাঁটবে না। মেরুকরণের ব্যবস্থা হবে। ধর্মনিরপেক্ষরা চাপে পড়বে। বামেরা নিশ্চয়ই আসবে। তৃণমূলের হবে উভয় সংকট। একদিকে কংগ্রেসের সঙ্গে যাওয়ার সমস্যা। আর অন্যদিকে মুসলমানদের কাছে ভুল বার্তার বিপত্তি।  যাই ঘটুক,  সংখ্যালঘুরা নিঃশ্বাসের বাতাস পাবেন। কে কোথায় দাঁড়িয়ে দেখে ভোটের সময় ভোট দেবেন এমনভাবে যাতে সাম্প্রদায়িক ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে ভোট সুনিশ্চিত হয়। যে কেন্দ্রে যে প্রার্থী বিজেপিকে হারাতে পারে তাকে ভোট। বিজেপির জেতা আঠারো আসনে এই রাজনৈতিক মেরুকরণ রামভরোসে ভোটের ইতি করবে।এই ইতিহাসটা ভাবছেন রাহুল। অনেকটা সময় নিয়ে। Pic Courtesy: NDTV.com

Leave a Reply

Your email address will not be published.