ভাগ করলে ভাগ্য ফিরবে কি, ভাবছে বিজেপি

দেবারুণ রায়

বিজেপি নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে লোকসভায়  নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে ২০১৪-য়। পাঁচ বছর পর ২০১৯-য়ে বহরে বেড়ে তিনশো ছাড়িয়েছে তারা। শেষ ভোটে তাদের স্কোর ৩০৩। সংখ্যা সাংকেতিক হলেও থ্রি নট থ্রির বিজেপি কী কী করেছে দেখতে গেলে চোখ পড়বে সংঘ ও গৈরিক ব্রিগেডের কোর অ্যাজেন্ডায়। আর সব ফেলে ছ’ড়ে মোদ্দা তিনটি মূল হিন্দুত্বের কর্মসূচি তাদের। অযোধ্যায় রাম মন্দির নির্মাণ, জম্মু ও কাশ্মীরের জন্য প্রযুক্ত  বিশেষ ধারা ৩৭০ বিলোপ করা।এককথায়, জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যের জন্য লাগু বিশেষ সাংবিধানিক মর্যাদা প্রত্যাহার করা। এবং সাধারণ দেওয়ানি বিধি বা কমন সিভিল কোড চালু করা। আরএসএসের মতাদর্শের অনুসারী যে মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য তার আধারশিলা এই কোর কর্মসূচি।  তারা মনে করে এই তিনটি কর্মসূচির ত্রিশূলেই হিন্দুত্বের বিচারধারার সিদ্ধিলাভ সম্ভব। কারণ  এই ত্রিশূলের ত্রিফলাতেই “বিদ্ধ হতে পারে ভারত রাষ্ট্রের তথাকথিত ধর্মনিরপক্ষেতার বিভ্রান্তি।” তারা মনে করে নেহরুর নেতৃত্বে কংগ্রেস স্বাধীনতার লগ্নে বিজাতীয় কমিউনিস্ট ভাবাদর্শের ফাঁদে পা দিয়ে সংবিধানের যে কাঠামো তৈরি করেছিল, ইন্দিরা গান্ধী সেই পথে এগিয়ে ধর্মনিরপেক্ষ বা সেকুলার শব্দটি জুড়ে সেই ভ্রান্তির ষোলোকলা পূর্ণ করেন। মৌলিক এই শুদ্ধিই বিজেপির সরকারের মূল লক্ষ্য। কিন্তু এই মৌলিক পরিবর্তন করতে হলে সংবিধানের আমূল বদল চাই। নাহলে সর্বোচ্চ আদালতেই তা আটকে যাবে। তাই এজন্য চাই লোকসভায় দুই তৃতীয়াংশ গরিষ্ঠতা। শুধু নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার ম্যাজিক নাম্বার দিয়ে তা সম্ভব নয়। সুতরাং বাড়তি সংখ্যায় পৌঁছনোর লক্ষ্যে লাগাতার ধর্মীয় মেরুকরণের চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া।  রাজনীতির মেরুকরণে এই বিপুল সংখ্যক আসন জেতা বিজেপির পক্ষে সম্ভব নয়।  সংখ্যাগরিষ্ঠের ধর্মীয় ভাবাবেগের আগুনে হাওয়া দিয়ে ধাপে ধাপে সেই হিন্দু মৌলবাদী অ্যাজেন্ডা রূপায়নের স্বপ্ন পূরণের পথে হাঁটছে তারা। ধর্মীয় আবেগে আপ্লুত হয়ে মেরুকরণ সফল হলে ৮৫ /১৫ বিভাজন সম্ভব। যা সম্ভব হয়েছে বিজেপির মেরুকরণের ল্যাবরেটরি থেকে মডেল রাজ্য হয়ে ওঠা গুজরাতে।

তবে একটি রাজ্যের পরিস্থিতির সঙ্গে সারা দেশের বাস্তবতার তুলনা চলে না। সদ্য অনুষ্ঠিত বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফলই তার প্রমাণ। গুজরাতের জয়জয়কারের পাশাপাশি হিমাচলের মতো ছোট রাজ্যেই হালে পানি পেল না বিজেপি। যাদের  খোদ সভাপতি নাড্ডার কর্মভূমি হওয়া সত্ত্বেও। সেখানে কিন্তু মধ্যপ্রদেশ,  রাজস্থান বা গুজরাতের মতোই আরএসএস ও বিজেপির সংগঠন বহু পুরনো ও ঐতিহ্যবাহী। বিজেপিকে কংগ্রেসের বিকল্প দল হিসেবে তুলে ধরা ও রাম মন্দির নির্মাণের পরিকল্পনার পটভূমি তৈরির কাজেও হিমাচলের অবদান অনেকখানি। তাছাড়া,  রাম জন্মভূমি মামলায় আদালতের রায় তাদের আশাবাদী করলেও এবং ৩৭০ নিয়ে তারা  বিরোধীদের অর্থহীন করে দিতে পারলেও , কমন সিভিল কোড চালু করার পথ অত মসৃণ নয় বলেই দলের নেতৃত্ব মনে করে। সেজন্যই জল মাপতে মাপতে এগোচ্ছে। কমন সিভিল কোড চালু করার অপর নাম যে হিন্দুরাষ্ট্রের আধারশিলার স্থাপনা, নানাভাবে সেই বার্তাটি শুধু দিয়ে যাচ্ছে তারা। যথারীতি জল মাপার কাজ করছে বিশ্ব হিন্দু পরিষদ বা বজরং দলের মতো গণসংগঠন। এই পরিকল্পিত বিভাজনটি ব্রহ্মাস্ত্র বলেই তার বিপরীতমুখী পরিণতির কথাও ভাবতে হচ্ছে বিজেপিকে।  ভাগ করলে ভাগের মা যে গঙ্গা পায় না সেকথা না ভাবলে চলবে কেন ? কারণ কমন সিভিল কোড চালু হলে মুসলমানদের শরিয়ত মেনে বিয়ের মতো সামাজিক অনুষ্ঠান যেমন সিদ্ধ হবে না,  তেমনি হিন্দুদের ছাদনাতলায় বসে অগ্নি আর নারায়ণ সাক্ষী রেখে মেয়ে সম্প্রদান কিংবা পানিগ্রহণও তো আইনসম্মত বিয়ে বলে গণ্য হবে না। ” জন্ম মৃত্যু বিয়ে তিন বিধাতা নিয়ে” তো সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুদের সামাজিক ও ধর্মীয় রীতিনীতিকেই তুলে ধরে। সুতরাং কাজী বা যাজকের মতো পুরোহিতেরও আজকের মতো সংবিধানের সমান্তরাল ভূমিকা থাকবে না। এবং এখানেই হিন্দুরাষ্ট্রের বিসমিল্লায় বিভ্রাটের গেরো পড়বে।  পুরো সমাজ ধর্ম রাজনীতি ঘেঁটে নির্বাচন ঘ হয়ে গেলে কৃষ্ণ বিনা বৃন্দাবন দিয়ে কী হবে ? এই মোক্ষম ভাবনার পাশাপাশি ২০২৪এর নির্বাচনী পাশার ঘুঁটি সাজাচ্ছে শাসকদল। ভাবছে হিতে বিপরীত হলে ফের মোর্চা সরকার গড়ার পথটা তো রাখতে হবে। কোর কর্মসূচির আগাগোড়া রূপায়ণ করতে গিয়ে তো আর অটলবিহারী বাজপেয়ীর সরকারের মতো বিতর্কিত ইস্যু মুলতুবি রাখা যাবে না। সুতরাং ব্রহ্মাস্ত্র বেশ ভাবাচ্ছে বিজেপিকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.