নিরানন্দ আনন্দ

সীমা ঘোষ 

এ বছরের মত কাশফুলের শোভা শেষ, দুর্গা পুজোও শেষ। এখনও কালী পুজো, জগদ্ধাত্রী পুজো আছে বটে, তবে দুর্গাপুজোর উন্মাদনার কাছে অন্য পুজো গুলো তেমন গুরুত্বপূর্ন হয়ে উঠতে পারে না। দুর্গাপুজো কে ঘিরে আমাদের আশা আকাঙ্ক্ষা, আনন্দ, আবেগ – সবই অতিরিক্ত কারন তিনি তো শুধু মা নন, ঘরের মেয়েও বটে। তাই এই সময় আড্ডা, কেনাকাটা, খাওয়া দাওয়া, বেড়াতে যাওয়া সব কিছুই একটা আলাদা মাত্রা পায় যেন।   কিন্তু গত বছর থেকেই এই আনন্দে লাগাম দিতে হয়েছে ভয়াবহ করোনার দাপটে। স্বয়ং দশভূজাও তাঁর দশ হাতে করোনাকে প্রতিহত করতে পারেননি। অথচ আমরা, কিছু মানুষ, যারা মোটামুটি মোক্ষ লাভ করেছি বলে মনে করি, তারা কিন্তু জেনে বুঝেও আনন্দতে লাগাম দিতে পারছি না, বা মৃত্যুই অমোঘ সত্য বলে জানি, তাই মৃত্যু ভয় তুচ্ছ করে হই হই করে বেড়িয়ে পড়েছি ঠাকুর দেখতে। কাল কে দেখেছে!!! যদি সামনের বছর না দেখা হয়!!!! অথবা এ বছর মন্ডপ সজ্জা, আলোক সজ্জায শিল্পী যে অপূর্ব নিদর্শন রেখেছেন, সেটা তো এ বছরই দেখতে হবে, আগামী বছর তো অন্য থিম, অন্য ভাবনা। কবি তো বলেছেন আমারই চেতনার রঙে ইত্যাদি, তাই আমাকে তো দেখতেই হবে, নইলে এত খরচ, এত পরিশ্রম কিসের জন্য, কার জন্য????     

হ্যাঁ, আমরা কিছু লোক এরকম করেই ভাবি। জন্মিলে মরিতে হবে, অমর কে কোথা কবে। বিশেষত বড় পুজোর উদ্যোক্তারা, তারাও এভাবেই ভাবেন। তাই সমস্ত নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করেও তারা সবাইকে তাক লাগিয়ে দেওয়ার কথা ভাবেন। নিজেদের ক্লাবের রজত জয়ন্তী সুবর্ণ জয়ন্তী উদযাপনের কথা ভাবেন। কোভিড বিধি চুলোয যাক, মন্ডপ তাক লাগানো হতে হবে। আলোক সজ্জা এমন হতে হবে, যার নাম ছড়িয়ে পড়বে দূর দুরান্তরে। বহু দূর থেকে এসে হাজার হাজার মানুষ আমাদের মন্ডপের সামনে অপেক্ষা করবে আমাদের শিল্পশৈলী দেখার জন্য। শহরে আর কোনও আলোচনা হবে না, শুধু আমাদের পুজোর গুনকীর্তন। এই যে হাজার হাজার মানুষ একসাথে ঠাসাঠাসি করে লাইনে দাঁড়িয়ে রইলো আমাদের পুজো দেখার জন্য, তাতে যদি করোনা সংক্রমণ বেড়ে যায়, তো যাক না। আমরা তো কাউকে নিমন্ত্রণ করিনি, আমরা শুধু আনন্দ দিতে চেয়েছি, তার চেয়েও বড় কথা, আমরা নিজেরাই আনন্দ করতে চেয়েছি। সরকারী অনুদান আছে, চাঁদা আছে, বিভিন্ন স্পন্সর আছে, অত পয়সা খরচ করতে হবে না? কত ছোট ব্যবসায়ী এই ক’দিন আমাদের মন্ডপের কাছে বসে কত সুন্দর ব্যবসা করেছেন, সে হিসেব আছে আপনার কাছে? না, সে হিসেব নেই, যেমন হিসেব নেই আপনারা ঐ ব্যবসা করার অনুমতি দেওয়ার জন্য এমন খুচরো ছোট ব্যবসায়ীদের থেকে কত টাকা নিয়েছেন। সেটাও তো একটা বড় আমদানি পুজো কমিটির জন্য।        

আশঙ্কা সত্যি করে করোনা আবার জাঁকিযে বসেছে। ঐ যে বললাম, পুজোর আনন্দ লুটে নিতে আমরা মুক্ত কচ্ছ হয়ে ছুটেছিলাম, তার ফল একেবারে হাতেনাতে। পুজো কমিটিগুলো এই করোনার সময়েও তাদের লোভ, লাভের হিসেব ছাড়তে পারলো না। আর আমরাও আলোর দিকে ছুটে চলা পতঙ্গের মত গিয়ে ঝাঁপ দিলাম।    

এই দুঃসমযে সত্যিই কী প্রয়োজন ছিল এত বড় করে, এত জাঁক করে পুজো করার। আমরা তো সবাই জানি, বহু মানুষ কাজ হারিয়েছেন, বহু মানুষ অকালে চলে গেছেন, বহু মানুষ চিকিৎসা করাতে গিয়ে সর্বস্ব হারিয়েছেন করোনার চিকিৎসায়, তবু এই পুজোয় আমরা তাদের দিকে সাহায্যের হাত বাড়ালাম না। আমরা মেতে রইলাম নিজেদের আমোদ আল্হাদে। সেই সঙ্গে ঐ রকম চোখ ধাঁধানো, মন ভোলানো মন্ডপ করে অগনিত মানুষকে সংক্রামিত করে দিলাম। আনন্দময়ীর আগমনে আনন্দ নয়, আমরা আমাদের ক্ষমতা, আমাদের প্রাচুর্যের প্রদর্শনী করলাম সপ্তাহ জুড়ে। অসুর দলন নয়, করোনা অসুরকে  আরও শক্তিশালী করে তুললাম। বৃথাই তুমি দশ হাতে অস্ত্র ধরে মহিষাসুরকে বধ করলে মাগো, আমরা নিজেরাই অসুরের সহযোগী হয়ে উঠলাম যে। আমাদের শুভ বুদ্ধি কবে যে বিসর্জন দিয়েছি, সে কথা আমরা আর মনেও করতে পারি না, এখন আমরা শুধুই মাটির প্রতিমা বিসর্জন দিই, আর অসুরকে রেখে দিই সাথী করে। 

One thought on “নিরানন্দ আনন্দ

  • October 24, 2021 at 4:23 pm
    Permalink

    লেখিকা একদম আমাদের মনের কথাটা সুন্দরভাবে তাঁর লেখনীর মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন। কিছু লোকের, কিছু পূজো কমিটির কাণ্ডজ্ঞানহীন আচরণের জন্যে আবার আমরা অবশ্যম্ভাবী তৃতীয় ঢেউয়ের ধাক্কায় ক্ষতিগ্রস্ত হতে চলেছি। প্রথম ঢেউয়ের সঙ্গে নাহয় আমাদের পরিচয় ছিল না, কিন্তু দ্বিতীয় ঢেউ!! তারপরেও ?? এমনকি কোন একটি পরিবার আছে যেখানে করোনার থাবা তার নির্মম আঘাত হানেনি, মানসিক বা আর্থিকভাবে বিধ্বস্ত করেনি?? তারপরেও এই আচরণ!! শুধু মাত্র সরকার কিভাবে মানুষকে শুধরাতে পারে, যদি আমরা নিজেরা সচেতন না হই??

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published.