দিল্লির বাঘবন্দি খেলা সবে শুরু বিরোধীদের বেড়া বাঁধা দিয়ে

দেবারুণ রায়  

দিল্লিতে বাঘবন্দি খেলাটা শুরু হল, কিন্তু হল না। বেশ খানিকটা আশা জাগিয়ে দিল্লি সফরে গিয়েছিলেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি।  কিন্তু অনেকটা ধোঁয়াশা রেখেই এ যাত্রা কলকাতায় ফিরতে হল তাঁকে।  একটি বড় রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী তিনি।  রাজনীতির হটবেড হিসেবে যে বাংলার খ্যাতি ও অখ্যাতি যুগপৎ বর্তমান।  সুতরাং নিজের কাজ ফেলে ব্যস্ততা ভুলে আর কতদিন দিল্লির বিরোধী ঐক্য দানা বেঁধে ওঠার অপেক্ষা করা যায়।  তিনি ঐক্যের বলটি গড়িয়ে দিয়ে এলেন।  বললেন, দুমাস অন্তর অন্তর আসবেন রাজধানীতে। বুঝিয়ে দিলেন বারবার, নেতা নিয়ে কোনও দ্বন্দ্ব নেই বা থাকবেনা।  ঠিক সময়েই নেতা ঠিক করা নেওয়া যাবে। বললেন বারবারই,  আমি তো ক্যাডার।  দেশ বাঁচানোটাই এখন সবচাইতে জরুরি কাজ।

মমতার সফরে এবার দু তিনটি তাৎপর্যপূর্ণ পয়েন্ট লক্ষ্যণীয়। প্রথম , মোদির  সঙ্গে সাত নং লোককল্যাণ মার্গে দেখা করতে যাওয়া।  আর ঠিক বিপরীত মেরুর সবচেয়ে বড় দলের নেতা সোনিয়া গান্ধীর  বাড়িতে গিয়ে চায়ের  টেবিলে প্রাথমিক রণনীতি  ছকে নেওয়াই ছিল রাজনীতি-কূটনীতির আদর্শ ভারসাম্য।  তারপরের ঘটনাবলী এই কুশলী  পদক্ষেপকে পরিপুষ্ট করেছে।  বিরোধী শিবিরের মূল শক্তি কংগ্রেসের মূলনেত্রীর সঙ্গে তৃণমূল নেত্রীর বৈঠকের মৌখিক ও শরিরী ভাষা মোদ্দা মুদ্দাটিকে খোলসা করার পক্ষে যথেষ্ট। হোঁশিয়ারোঁকে লিয়ে ইশারাহি কাফি হ্যায়।  যারা বোঝার তারা বুঝেছেন যে কংগ্রেস মুক্ত ভারত গড়ার ঘোষিত কর্মসূচি যাদের সেই শাসকদের বিরুদ্ধে কংগ্রেস বিরোধী বা অকংগ্রেসি কারা নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করলেন । মমতা কংগ্রেস ভেঙে বেরিয়ে এনডিএ সরকারের অন্যতম স্তম্ভ হয়েছিলেন। অকংগ্রেসি রাজনীতিতে সেটাই তাঁর উত্থানের পেডেস্টাল। কিন্তু সেই সঙ্গ ছিল ২০০৪ এর কিছুটা পর্যন্ত ।  ২০০৮ য়ের  বাম সিদ্ধান্ত তাঁর সেকুলার রাজনীতির নবপর্যায়ের সূর্যোদয়।  সর্বভারতীয় রাজনীতির মাঝমাঠ ছেড়ে  ভুল পাসে বামেদের সেমসাইড বা সুইসাইড।  এবং সেই মহাপ্রস্থানের সুবাদে বাম ভ্যাকুয়ামে রাতারাতি এল জাতীয় রাজনীতির রঙ্গমঞ্চে তৃণমূলী তরঙ্গ। মমতার প্রতি সতত দুর্বল সোনিয়াই বামদের জবাব দিতে তাঁকে ইউপিএতে আনেন। মনমোহন জমানার শেষলগ্নে ফের কংগ্রেসের সঙ্গে  ছাড়াছাড়ি হলেও ধর্মনিরপেক্ষ শিবিরের সঙ্গে হয়নি। বাংলায় তাঁর সরকারের কল্যাণে তিনি ওই শিবিরের অন্যতম মধ্যমণি। সেই চোদ্দ থেকে ঊনিশ এবং ঊনিশেই বিজেপি ফিনিস না হয়ে সবাইকে দেখিয়ে দিল ওরা কি জিনিস ! আঠারো আসন। কংগ্রেস চল্লিশ বছরে যা পায়নি বাংলা থেকে।  সুতরাং এতোটা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে তৃণমূলকে তুরুপের তাস বদলাতেই হল। পরিণামে সিপিএম-কংগ্রেসকে বাংলা ছাড়া করে বিজেপির তিন ইটের শিলান্যাসের (২০১৬) পর সাতাত্তরটি ইটের ইমারত হল সেই শূন্যস্থানে। বিজেপিকে রোখার এই অনন্য ইতিহাস বাংলার বিধানসভা থেকে সম্পূর্ণ মুছে দিল লাল ও ত্রিবর্ণের কালখণ্ডকে। অবশেষে নিজের ভষ্ম থেকে উঠে আসা উপকথার মত নন্দীগ্রামে নিজের ওপর প্রতিপক্ষের সমস্ত আক্রমণ স্বেচ্ছায় বরণ করে শেষ হাসি হাসলেন অপরাজিতা মমতা।  সুতরাং যে তিনবারের মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার সার্টিফিকেটে প্রধানমন্ত্রীর পদের দিকে নরেন্দ্র মোদির পদক্ষেপণ, সেই একই যোগ্যতা অর্জন তো করেইছেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী।  সেই সঙ্গে তাঁর মুকুটে শোভা পাচ্ছে এমন একটি পালক যা তিনি পেয়েছেন শক্তিশালী ভারত-শাসক বিজেপির কার্পেট বম্বিং এর মোকাবিলা করে বিজয় ছিনিয়ে নিয়ে। তাঁকে বিজেপি আরএসএসের বিরুদ্ধে জয়ের মুখ হিসেবে তুলে ধরেছে তৃণমূল।  যদিও এবার মমতার দিল্লি সফর বিরোধী জোটের মধ্যমণি মমতাকে অনেকটা কুশলী করেছে। তাঁর সহকর্মীরা যাই বলুন, মমতা কিন্তু বলছেন, তিনি এই সম্ভাব্য বিরোধী জোটের কর্মী মাত্র।  বিশেষ করে সোনিয়ার সঙ্গে বৈঠকের পর তাঁর রাজনীতি আরও আঁটোসাঁটো । রাহুলের সম্পর্কে তৃণমূলের বক্তব্য থাকলেও সোনিয়া কিন্তু মমতাকে বলেই নিয়েছিলেন যে, রাহুলও তাঁর সঙ্গে  আলোচনায় থাকবে। মুখ্যমন্ত্রীর দল সকালে কংগ্রেসের সংসদীয় দলের বৈঠকে না থাকলেও নেত্রী কিন্তু বিকেলের বৈঠকে উপস্থিত থেকেছেন।  এটা আগামী রাজনীতির শুভলক্ষ্মণ। সেকুলার শিবিরের ক্ষেত্রে ।

তাছাড়া, কংগ্রেসের তিন নেতা তাঁর কাছেই গিয়েছিলেন। আনন্দ শর্মা, কমলনাথ ও অভিষেক মনু সিংভি। যাঁদের সঙ্গে কংগ্রেস রাজনীতির বছরগুলোতে সখ্যের সম্পর্ক কখনও মলিন হয়নি।  লালুপ্রসাদ ফোনে যোগাযোগ করেন মমতার সঙ্গে।  সপার রামগোপাল যদিও আসেননি। এবং শরদ পওয়ারের সঙ্গে দেখা না দেখার বিষয়টি বিরোধী জোটের ভবিষ্যতের দিকে তাকালে পরিষ্কার হয়ে যায়। এখন  নেতা নিয়ে কোনও আলোচনার ছায়া মাড়াতেও মানা করছেন দুঁদে রাজনীতিকরা। জোটের ভেতরে কংগ্রেসকে রাখার বিষয়টি সুনিশ্চিত যখন , তখন স্বভাবতই শরদ পওয়ারের কাছে অপশন একটাই। কারণ মহারাষ্ট্রের জোটের কারিগর পওয়ার।  কিন্তু এখন থেকেই অস্ত্রশস্ত্রের ঝনঝনানি শুনিয়ে দেখিয়ে শত্রুকে সজাগ ও বন্ধুদের হাতের তাস দেখিয়ে দিতে রাজি নন কংগ্রেসের স্টলওয়ার্ট নেতৃবৃন্দ।   আঞ্চলিক ডিএমকে,আরজেডি, শিবসেনা, জেডিএস প্রমুখ দলের সঙ্গে কংগ্রেসের বোঝাপড়াটা বেশ স্পষ্ট।  এমনকি সপার সঙ্গেও।

আরও উল্লেখযোগ্য বিষয় হল  দিল্লির আপ মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়ালের সুপরামর্শ।  তিনি অন্যান্য বিরোধী নেতাদের বলেছেন, খুব সন্তর্পণে পা ফেলতে হবে। হাতের তাস দেখিয়ে রাজনীতি করে কী লাভ ? ঊনিশের অঙ্ক চব্বিশে মিলবেনা। এমনকি আজকে যে যেখানে দাঁড়িয়ে কাল মানে ‘২২য়ের বিধানসভা ভোটের ফলাফল সেই সব অবস্থানকে নড়িয়ে দেবে। সুতরাং এখনই তড়িঘড়ি কীসের  ? ধীরে ধীরে পা ফেলে এগোতে হবে। ভবিষ্যতেকে হাতের মুঠোয় আনতে।বাস্তবতা বুঝে কেজরিওয়াল অনেক বেশি পরিণত। দিল্লির কেন্দ্রীয় তখত তাউসে বিজেপির সর্বশক্তিমানের সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে এখনও অক্ষত। সারাদেশে জনপ্রিয়তার তুঙ্গে যখন মোদি তখনও দিল্লির আম জনতার মনে কেজরিওয়ালের বিকল্প নেই।  কংগ্রেসের ১৫ বছরের  পর থেকেই  তো  আপ সরকার লাগাতার।  কোনও ইনকাম্বেন্সি ফ্যাক্টর কাজ করেনা ঐ দিল্লি রাজ্যের এলাকায়। এই বাস্তবতা বোধগম্য হচ্ছে কংগ্রেসেরও। তাই কেজরির সম্পূর্ণ পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির গ্রহণযোগ্যতা অনস্বীকার্য।  দিল্লি দাঙ্গার দরুন কেজরিওয়ালের সাদা জামায় যে সাম্প্রদায়িক সমঝোতার কালো ছোপ লেগেছে তার রাজনীতিটাও বুঝিয়ে বলছে আপ। তারা বলছে, বিজেপিকে দাঙ্গা ভাঙিয়ে রাজনীতির ফয়দা লুটতে দিইনি আমরা।তাই কালি লেগেছে গায়ে। মানুষ সব বোঝে। না বুঝলে অরবিন্দ কেজরিওয়াল বোঝাবেন।  বাম নেতা কানহাইয়া কুমারের বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনের অনুমোদন দেওয়ার প্রশাসনিক রীতি মেনেছেন কেজরিওয়াল।  একথা জেনেই অনুমোদন দিয়েছেন যে, এমন কোনও তথ্য প্রমাণ নেই যা দিয়ে অভিযোগ প্রমাণিত হবে।

কেজরি কিন্তু দিদির সঙ্গে ঠিকই দেখা করে জানিয়েছেন, অল কোয়ায়েট অন দ্য নর্থ অ্যান্ড ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট।  মোট পাঁচটি রাজ্যে আপ লড়বে এবার। এবং আসন আনতে আত্মবিশ্বাসী।  গুজরাতেও লড়ছে। তবে তিনি কোনও হুংকার , আস্ফালনে নেই।  তিন বছর ধরে খেলতে হবে। ক্রিজে  টিকে থাকলে রান উঠবেই।  এই খেলাটা মোদি কিন্তু ভালোই বোঝেন।  তাই বিরোধীদের সম্ভাব্য জোটের দুই মধ্যমণিকে গুড হিউমারে রাখতে চান। পুঁতে ফেলবে বিজেপি শত্রুতার সব পুরনো ছক ? আর মমতাকে নিয়ে অন্য চিন্তা। সেটি হল ঘরের আকাশ ক্রমশই মেঘলা হয়েছে।  উষ্মা প্রকাশ করেছেন আরএসএসের নাগপুরপসন্দ নীতিন গডকরি । রাজনাথও সংঘপ্রিয়। কিন্তু  এখনও মুখে কিছু বলেননি। সংঘ যখন নির্দেশ দেবে তখন বলবেন।  বাংলার মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে  রাজনাথের বহুদিনের সুসম্পর্ক।  গডকরির সঙ্গেও। তাই গডকরির সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা ও গডকরির সহৃদয় সাড়া অর্থবহ। Pic courtesy DNA India

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *