যুব শক্তি – ক্রীড়া থেকে স্টার্ট-আপ

নিশিথ প্রামানিক, যুব বিষয়ক ও ক্রীড়া এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের প্রতিমন্ত্রী ।

ভারতে ক্রীড়া ক্ষেত্র দেশের যুব সমাজের প্রতিভা তুলে ধরতে এবং অন্য সব দেশের কাছে পরিচিতি বৃদ্ধি করতে একটি সেরা ক্ষেত্র । ক্রীড়া পরিকাঠামো, ব্যবস্থাপনা, ক্রীড়া প্রতিভার লালন এবং আন্তর্জাতিক স্তরে অংশগ্রহণে নজর দেওয়ার পাশাপাশি ভারতে ক্রীড়া ক্ষেত্র আজ পাঠ্য বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে । যাতে একজন ক্রীড়াবিদ ভবিষ্যত জীবিকার জন্য একসঙ্গে খেলাধুলোও চালিয়ে যেতে পারে আবার লেখাপড়াও  করতে পারে, যাতে তৈরি হয় দীর্ঘস্থায়ী ভবিষ্যৎ ।

বিশ্বের সবচেয়ে বেশি যুবা আছে ভারতে । দেশের তাই নজর দেওয়া উচিত ক্রীড়া সংক্রান্ত বিভিন্ন কাজে যুব সমাজকে শিক্ষিত এবং প্রশিক্ষিত করে তোলার ওপর । গবেষণা এবং অনুশীলনে দেখা গেছে, যুবক-যুবতীদের ক্রীড়া ক্ষেত্রের সঙ্গে যুক্ত করলে  তার একাধিক ইতিবাচক উপকার আছে । যেমন স্বাস্থ্য এবং সুস্থতা, আত্মবিশ্বাস, মানসিক স্বাস্থ্য, প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার মনোভাব, টিম ওয়ার্ক, মনোমালিন্য মেটানোর ক্ষমতা, নিয়ম-শৃঙ্খলা, সময় ব্যবস্থাপনা, লক্ষ্য এবং সাফল্য কেন্দ্রিকতা, সহমর্মিতা প্রদর্শন বৃদ্ধি পায় । সেই সঙ্গে খেলোয়াড়দের সম্মান করা, নেতৃত্বদান, সহনশীলতা,  বিশ্বাস, মনোযোগ সহকারে অনুশীলন, আত্মগরিমা বৃদ্ধি পায়। চরিত্র গঠন হয় । ঝুঁকি আছে এমন আচরণ কমে । উদ্বেগ এবং মানসিক দৌর্বল্যের ঝুঁকিও হ্রাস পায় ।

যুব সমাজকে ক্রীড়া এবং সুস্থতা সংক্রান্ত কাজে খুব সহজেই যুক্ত করা যায যেসব কাজের মাধ্যমে, সেগুলি হল – হাঁটা, দৌড়, সাইক্লিং, সাঁতার, জিমে গা ঘামানো, রাস্তায় আউটডোরগেম খেলা ইত্যাদি । প্রমাণ হয়েছে এর দ্বারা সাইকো-মোটর দক্ষতা বাড়ে, এনার্জি খরচ হয় এবং স্থুল হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমে যায় এবং অলস জীবন যাপন পাল্টে দেয় । কেরিয়ার হিসেবে খেলাকে বেছে নেওয়ায় একটা নিজস্ব সুবিধা আছে । যার ভাল ফলাফল পাওয়া যায় নিজের জীবনেই ।

শারীরিকভাবে এবং মানসিকভাবে সুস্থ ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তৈরি করতে এবং জনসংখ্যার এই বিপুল অংশকে সুস্থ রাখতে কেন্দ্রীয় যুব বিষয়ক এবং ক্রীড়া মন্ত্রক একাধিক পদক্ষেপ নিয়েছে, যা অন্তর্ভুক্ত হয়েছে জাতীয় যুব নীতিতে । কোভিড-১৯ অতিমারির নানা সমস্যা সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক ক্রীড়া ক্ষেত্রে ভারত উজ্জ্বল ছাপ ফেলেছে । টোকিও অলিম্পিক ২০২০-তে এবছর পেয়েছে ৭-টি পদক এবং প্যারালিম্পিকসে পেয়েছে অভূতপূর্বভাবে ১৯-টি পদক । ভারতে কেন্দ্র এবং রাজ্য সরকারের ক্রীড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা খুবই কম । ক্রীড়াবিদদের প্রশিক্ষণে যুক্তদের বেশিরভাগই শুধুমাত্র শারীরশিক্ষা বিশারদ ।

তরুণ খ্যাতিমান ক্রীড়া ব্যক্তিত্বকে চিহ্নিত করে উৎসাহ দিতে, পেশাদারি প্রশিক্ষণ দিতে এবং সাফল্য অর্জনে উৎসাহিত করতে ভারত সরকার নতুন দিল্লিতে ন্যাশনাল সেন্টার অফ স্পোর্টস্ সায়েন্সেস অ্যান্ড রিসার্চ (এনসিএসএসআর) গঠন করতে চলেছে । উচ্চমানের অ্যাথলিটদের দক্ষতা বাড়ানোর জন্য ক্রীড়া বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে শিক্ষা, গবেষণা এবং উদ্ভাবনের প্রসার ঘটাতে, ক্রীড়া বিজ্ঞান এবং ওষুধ সংক্রান্ত সহায়ক ব্যবস্থা তৈরি করতে  প্রাতিষ্ঠানিক নেটওয়ার্ক তৈরি করার পাশাপাশি এনসিএসএসআর একটি হাব হিসেবেও কাজ করবে । যেখান থেকে ক্রীড়া বিজ্ঞানের সরঞ্জাম দেওয়া হবে সাই-এর ন্যাশনাল সেন্টারস্ অফ এক্সেলেন্স অ্যান্ড হাই পারফরমেন্স সেন্টারগুলিকে । এই কর্মসূচিতে সারা দেশে ৬-টি বিশ্ববিদ্যালয়ে স্পোর্টস্ বায়োকেমিস্ট্রি, স্পোর্টস্ ফিজিওলজি, স্পোর্টস্ বায়ো-মেকানিক, স্পোর্টস্ ফিজিওথেরাপি, প্রশিক্ষণ প্রক্রিয়া এবং ক্রীড়া পুষ্টি, স্পোর্টস্ সাইকোলজি এবং স্পোর্টস্ মেডিসিনে  স্নাতোকোত্তর পাঠ্যক্রম চালু করতে ক্রীড়া বিজ্ঞানে পাঠ্য ও শিক্ষাব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা হবে ।

চোখে পড়ার মতো পরিষেবা দান নিশ্চিত করতে এনসিএসএসআর একটি সুসংহত, আদর্শ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে, যাতে নামী অ্যাথলিটরা আরও ভালভাবে ক্রীড়া দক্ষতা প্রদর্শন করতে পারে । এর জন্য ক্রীড়া প্রতিভা এবং সক্ষমতা লালন করা হবে । আহত হওয়ার হার কমানো হবে । হাব অ্যান্ড স্পোক মডেলের ভিত্তিতে স্পোর্টস্ সায়েন্স এবং স্পোর্টস্ মেডিসিন প্রযুক্তি ব্যবহার করে দ্রুত রিহ্যাবিলিটেশন মডেলের উপযোগ ঘটানো হবে । এর ফলে স্পোর্টস্ সায়েন্সেস এবং স্পোর্টস্ মেডিসিনের ক্ষেত্রে উচ্চ-দক্ষতা সম্পন্ন মানব শক্তি তৈরি করা যাবে । বিদেশী বিশেষজ্ঞদের ওপর নির্ভরতা কমবে । এর পাশাপাশি উপরোক্ত বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে ক্রীড়া নিয়ে গবেষণার উন্নতি হবে । ক্রীড়া ক্ষেত্রে আত্মনির্ভর ভারতের লক্ষ্যে এটা একটি নিশ্চিত পদক্ষেপ । তামিলনাড়ুর শ্রীপেরামবুদুরে অবস্থিত যুব বিষয়ক এবং ক্রীড়া মন্ত্রকের অধীন রাজীব গান্ধী ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অফ ইয়ুথ  ডেভেলপমেন্ট (আরজিএনআইওয়াইডি) একটি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান । সেখানে ক্রীড়া বিজ্ঞানে ২ বছরের বিশেষ স্নাতকোত্তোর ডিগ্রি দেওয়া হবে । এর মধ্যে যে বিশেষ পাঠ্যক্রমগুলি থাকবে, সেগুলি হল –  স্পোর্টস সাইকোলজি, স্পোর্টস্ ফিজিওলজি, স্পোর্টস্ মেডিসিন এবং স্পোর্টস্ ম্যানেজমেন্ট । আসন্ন ২০২২ শিক্ষাবর্ষ থেকে ক্রীড়া শিল্পের ভবিষ্যৎ প্রয়োজন মেটাতে সহায়তা করার জন্য ।

বর্তমানে কয়েক হাজার ভারতীয় ক্রীড়াবিদ কোটিপতি হয়ে উঠেছেন ক্রীড়া ক্ষেত্রের সঙ্গে যুক্ত হয়ে । এই ক্রীড়াকেই একসময়ে শুধু হবি-ই ভাবা হত । ক্রীড়া শিল্প আশা করা যায় লাভজনক কেরিয়ার তৈরির পথ দেখাবে – যেমন টিম ম্যানেজার, প্র্যাকটিশিয়ান, ফিটনেস এক্সপার্ট, ডায়েটারি অ্যাডভাইজার, পার্সোনাল ট্রেনার, রেফারি, আম্পায়ার, সাইকোলজিস্ট, থেরাপিস্ট, ফিজিওলজিস্ট, স্পোর্টস্ ফিজিশিয়ান, স্পোর্টস্ মিডিয়া এবং ক্রীড়া ক্ষেত্রের সঙ্গে সংযুক্ত অন্যান্য আধিকারিক পদের জন্য ।

ভারতীয় অর্থনীতিতে ক্রীড়া ক্ষেত্রের বড় ভূমিকা আছে । যুব সমাজের কর্মসংস্থান হয় । এছাড়াও ক্রীড়ার সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন বাণিজ্যিক কাজকর্মও আছে । সারা বিশ্বে ক্রীড়া শিল্পের আর্থিক পরিমাণ প্রায় ৫০০ বিলিয়ন ডলার এবং এটি ক্রমশই বাড়ছে । ক্রীড়া ক্ষেত্রে উদ্যোগপতিদের যুক্ত হওয়ার সুযোগ ঘটছে । এনসিএসএসআর এবং আরজিএনআইওয়াইডি-র মাধ্যমে যারা পড়াশোনা চালাচ্ছেন, ক্রীড়া ক্ষেত্রে তাদের চাহিদা বাড়বে । পাশাপাশি তাঁরা স্টার্টআপ শুরু করতে পারবেন । এছাড়াও চাকরির খোলা বাজারে বিভিন্ন পেশাদারি ভূমিকাও নিতে পারবেন তাঁরা । ক্রীড়া শিল্পের সঙ্গে যুক্ত সম্ভাব্য স্টার্টআপগুলি হল – ফটোগ্রাফি, মিডিয়া ম্যানেজমেন্ট, রিটেল স্টোর, স্পোর্টস্ রাইটিং, স্পোর্টস্ ক্লাব, জিমনাশিয়াম, স্পোর্টস্ রেডিও, পি আর এজেন্সি, প্রতিযোগিতার আয়োজক, ক্রীড়া প্রশিক্ষণ এবং ব্যক্তিগত প্রশিক্ষক, ফিটনেস বিশেষজ্ঞ, পুষ্টিবিদ, কোচিং অ্যাকাডেমি, ক্রীড়া প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, মার্শাল আর্ট, স্পোর্টস্ স্কুল, স্পোর্টস্ পরিকাঠামো প্রতিষ্ঠান, খেলাধুলোর সরঞ্জাম উৎপাদনকারী, স্পোর্টস্ থিমের রেস্তোরাঁ, খেলাধুলোর ব্যবস্থা স্থাপনে পরামর্শদান, ক্রীড়া শিবির, ক্রীড়া প্রতিযোগিতা/লীগ আয়োজক, দৌড়ের আয়োজক, গ্রীষ্মকালীন শিবির, সুইমিংপুলের সুবিধা, স্পোর্টস্ ব্লগার, স্পোর্টস্ অ্যাপ ডেভেলপার, ক্রীড়া পত্রিকার প্রকাশক, স্পোর্টস্ ওয়েবসাইট ডেভেলপার, ইউটিউব প্রশিক্ষক, ক্রীড়া সংক্রান্ত পোশাক-আশাক এবং উপকরণ প্রস্তুতকারী, স্পোর্টস্ ভিডিও গেমস্ ডেভেলপার, স্পোর্টস্ থেরাপিস্ট, স্পোর্টস্ ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট, কর্মচারীকে যুক্ত করার কাজকর্ম হিসেবে কর্পোরেটের সঙ্গে হাত মিলিয়ে ক্রীড়া সংক্রান্ত কাজকর্মের প্রসার এবং অন্যান্য ।

এই প্রয়াসগুলি অসাধারণ সুযোগ এনে দেবে যুব সমাজের কাছে । যারা ক্রীড়াবিদ হতে চান বা খেলাকে কেরিয়ার হিসেবে নিতে চান, এই উদ্যোগে তাঁরা নিজেদের শিক্ষিত এবং প্রশিক্ষিত করতে পারবেন ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *