ক্ষুধার পৃথিবী গদ্যময়,  অচ্ছে দিনের জবাব নিতে আসছে দিন

দেবারুণ রায়

বিশ্ব বুভুক্ষার সূচিতে আবার  বিদ্ধ ভারত। বিদ্ধ নয়, মতান্তরে সিদ্ধ। না , অভিশাপের এই কালো ছায়া সরকারের গায়ে লাগলেও তাদের আলোয় ভরা অচ্ছে দিনে আঁধার নামেনি। ক্ষুধার আঁধার গ্রাস করেছে তাদের যারা মুখের গ্রাস পুষ্টির খাবার পায়না কোনও দিন। এখানে কোনও রাজনীতির মত ও পথের ফারাক ফুটে ওঠেনা। রাজা বদলালেও তাদের অপুষ্টির সাজা বদলায় না। তবে যে যে সরকার দেশের রাজনীতি অর্থনীতির অগ্রাধিকার বদলাতে চেয়ে গরিবের পুষ্টির বদলে বড়লোকের তুষ্টি করেছে, যে সরকারের রাজত্বে আম জনতার খাদ্য নিরাপত্তার, সবার জন্য পেটের ভাতরুটির ব্যবস্থা করার  জায়গায় রাজা উজিরেরা নানা ধরনের  খাদ্য খাবার নিষিদ্ধ করার ফরমান আর ফরমুলা জারি করেছে, সেই জমানায় না খেতে পাওয়া মানুষের সংখ্যা বেড়েছে। হাঙ্গার ইনডেক্সে ভারতের অগ্রগতি লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েছে এবং আরও বেশি করে দেখিয়েছে অনেক বলা অচ্ছে দিনের সাচ্চা চেহারা চোখের সামনে রেখে। ২০১৪ থেকেই অচ্ছে দিনের সাচ্চা চেহারা স্পষ্ট হয়ে এসেছে। যিনি এই স্বপ্নের আদি ফেরিওয়ালা, বহুদিন ধরেই তিনি এই ক্লিশে হওয়া শব্দবন্ধ বর্জন করেছেন।  দু হাজার উনিশের অন্যতর অঙ্গসজ্জা তাঁর আগেকার অঙ্গীকার ভুলিয়ে দিয়েছে। মানুষ  ডোকালাম থেকে গালওয়ানে এসে থেমেছে। উনিশের ভোট  থ্রি নট থ্রিতে পৌঁছে দিয়েছে বিজেপির লোকসভা পুনর্জয়ের অঙ্ক। আর  কোভিডে অভিশপ্ত উনিশের বিষ মৃত্যুদূত হয়ে দস্তক রেখেছে। আলাস্কা থেকে আরাবল্লীর জনবহুল জনপদে  বিভীষিকাময় মৃত্যুর মিছিলে সামিল হয়েছে কুড়ি-একুশ-বাইশ সাল। কাশ্মীর আর কোভিডের আতঙ্ক কিন্তু পাশাপাশি বেড়েছে কমেছে আবারও বেড়েছে । এভাবেই ৩৭০, রামমন্দির, উত্তরপ্রদেশ, বিহার, গোয়া, মহারাষ্ট্রের মেওয়া ফলেছে। কোভিড বেড়েছে, আসনও  বিপুল বেড়েছে বিজেপির বঙ্গের ভোটরঙ্গে।

এদিকে দুবছর পর স্কুলের মিড ডে মিল সরকারের বাড়তি  প্রসাদ পেয়েছে। একেবারে ছোটরা পেয়েছে ৪৮পয়সা বাড়তি বরাদ্দ মাথাপিছু। আর উঁচু ক্লাসে মাথাপিছু বেড়েছে ৭২ পয়সা করে। এই দান দুটি সংকটের বছর শেষে সূর্যোদয়।  কোভিডে ড্রপ আউট বেড়েছে অনেক। তাই তো এত উদার হয়েছে সরকার। গরিবের  ছেলে মেয়েদের দলে দলে বিদ্যামঠতলে টেনে আনতে। খাবারের আয়োজন। এই মৌলিক ভাবনা থেকেই তো মিড ডে মিলের সৃষ্টি। কিন্তু সাকুল্যে মাথাপিছু কি ছ’টাকার স্পর্শ পাওয়া গেল ? কারণ ছ’টাকা একটা অশেষ অধরা স্বপ্ন। যে শিশুর ঘরে তেমন কিছুই জোটেনা তাদের বাবার ভোটে মায়ের ভোটেই তো সরকার। ওই শিশুরা স্কুলের খাবার খেতে আসে ডিম পাতে পেলে। কিন্তু একটা ডিম কিনতে ছ’টাকা লাগে।  তাই শুদ্ধ শাকাহারি। সংঘ প্রধানের কথা শোনো। আমিষ খেলে  পাপাচার হিংসার ফাঁদে পড়বে। অতএব নিরাপদ নিরামিষ। যদিও আসল আপদ হল ড্রপ আউট। একটাও ডিম ছাড়া স্কুলঘরে মন বসে না। কিন্তু বরাদ্দ মাথাপিছু  পৌনে ছ’টাকা হলে ডিম তো ডিলিট।

এবার আবার পোরবন্দর জেগেছে নাকি।  তাই  ভোট জলসায় ডাক পড়েছে নরেন্দ্র মোদীর। নরেন ওমনি ধরেন তাঁর ভিত্তিভূমির হাল। সবরমতীর মতিগতি নাকি গোলমাল। টালমাটাল গুজরাতে হারের গুজব সারাতে তাই তিনিসোমবার থেকে ভার্চুয়াল। এসেছি আমি এসেছি, নিয়ে এই শত উপহার। ভোটে তাঁর যোগদান শুরু । মঙ্গলবার থেকে সশরীরে রণক্ষেত্রে তিনি।  ঠিক এই মাহেন্দ্রক্ষণে এল ক্ষুধার্ত ভারতের চিত্র। অচ্ছে দিনের বাধা একটা অদৃশ্য দুষমন জুটে গেল। এবার দে গোরুর গা ধুইয়ে। অচ্ছে দিনের সাচ্চে ফলোয়ারদের মধ্যে গুজরাতের কিন্তু স্মৃতি কিন্তু নেতার মতোই উত্তর প্রদেশের কৃতি ইরানি নেমে পড়েছেন মাঠে, রাজারানির মেঠো রাজনীতির মনমাতানো মজলিশে।  রাহুল গান্ধীই তাঁর ফ্ল্যাগশিপ প্রজেক্ট।  মাস্তুলের সেই অমেঠি-অহং ছেড়ে ভারত জোড়ো যাত্রার মতো মুখরোচক খাবার ফেলে আপাতত স্মৃতি ক্ষুধার জ্বালায় কাতর। আপাতত তাই তিনিই মেহের আলি। ভোটের ক্ষুধা পেটের ক্ষুধার চেয়ে কম কীসে ?  গুজরাত ক্ষুধিত পাষাণ। বিজেপির ? কিন্তু এতটাও নয়। রাম ভরোসে  নরেন্দ্রভাই মোদী যখন ভারতের মধ্যগগনে তখন গুজরাতে কীসের গ্রহণ ? মাত্র খণ্ডগ্রাসের আশঙ্কায়  এত বিচলিত বিজেপি ? তাই প্রচারের মূল উপাচার “পাপ্পু”র প্রেম ভুলে নিকষিত নির্বাচনে তাঁর পহেলা গেম “আরবান নকশাল !” কেজরিওয়াল আর জিগ্নেশ মেবানি একাকার ? মেলাবেন তিনি মেলাবেন। মেরুকরণের মাতাল হাওয়ায় সবাইকে তিনি মেলাবেন।  এটা ইতিহাসের নয়াপাঠ। যদি বিরোধীরা অবশ্য সেই পাঠাভ্যাসে মন দেন। কিন্তু মোদী জানেন ওই পাঠের অভ্যাস নেই কংগ্রেসের।  তারা আঞ্চলিকদের পাত্তা দেবে না। ইস্যুতে ইস্যুতে জট পাকিয়ে যাচ্ছে শাসকদলের। ফাদারের মর্মান্তিক মৃত্যুর পর পাকিয়েছে শারীরিকভাবে  পঙ্গু অধ্যাপক সাইবাবার কারাবাস।সর্বোচ্চ  আদালতের রায়ের পর গঙ্গাজলে হাত ধুয়ে প্রস্তুত করা হয়েছে প্রচারের মঞ্চ। বিচারের বাণী প্রচারে রাখতে বাধা নেই।

 এদিকে কংগ্রেস কিন্তু প্রকৃতির নিয়মে পঞ্চায়েতে নাগপুরের পুরনো জমি ফেরত পাচ্ছে। এই  দৃশ্যে বেশ জেরবার দেখাচ্ছে মহারাষ্ট্র বিজেপিকে। এটা আর  যাই হোক, ” মহারাষ্ট্র বিজয়” পালার  চেনা দৃশ্য নয়। নতুন সংযোজন। অনেকটা চাঁদে জমি দান করার স্টাইলে। প্রয়াত  শিবসেনা বিধায়ক লাটকের শূন্য আসনে তাঁর পত্নীকে সমর্থন করেছে বিজেপি।  রাজ ঠাকরেকে শিখণ্ডী করে। কারণ, এম এম এস প্রধান রাজ একদিন আগেই বিজেপির উদ্দেশে বার্তা  দিয়েছিলেন, বিধায়ক পত্নীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে না নামতে। বিজেপি জপছিল কিন্তু বলছিল না। রাজ ঠাকরে বলা মাত্রই দেবেন্দ্র ফড়নবিশের ঘোষণা এল। তাছাড়া, এখন ক্ষুধার রাজ্যে বিজেপির পৃথিবী পুরোপুরি গদ্যময়। মহারাষ্ট্রে পূর্ণিমা। কিন্তু রাজা হল তো সেই শিবসেনা। শিণ্ডে তো আর মুণ্ডে নন। সুতরাং যে দুঃখে গঙ্গা পার, সে দুঃখই সঙ্গের সার। চাণক্যের নাম বদনাম হল। অমিত বিক্রমে অটুট বা পুরো শিবসেনাকে বড়ভাই মানতে নারাজ বিজেপি ঘুরে ফিরে ফের স্কোয়্যার ওয়ান। মানে পুনর্মুষিক পর্ব শুরু মহারাষ্ট্রে। শিবসেনার ভগ্নাংশকে নেতা মেনে হিন্দুত্বের দাসখত লিখে দিয়ে। এ কৌশল সিদ্ধ হবে কি না বলতে পারেন বিহারে বিজেপির ভাঙা কুলো সুশীল মোদী। মহারাষ্ট্রের মসনদ থেকে বুলেট ট্রেনে এক লহমায় গুজরাতকে ছোঁয়া, মারাঠা বিজয়ের  শিবাজিকে দিয়ে পোরবন্দর সবরমতীর গান্ধীকে  গুলিয়ে দেওয়া, এসব গুগলির অওজার রাখা ছিল আস্তিনে। গুজরাতের গর্ভগৃহেই শিবসেনার গর্ভযন্ত্রণা ও শিণ্ডে সরকারের জন্ম। তাই জন্মঋণের টানে তিনি ভোট প্রচারে যাবেন নিশ্চয়। আরও মুখ্যমন্ত্রীরা যাবেন গুজরাত আলো করে। কিন্তু মোদী একাই একশ।তিনি থাকতে কার্পেট বম্বিং কী দরকার। নির্বাচন কমিশনের হিমাচল ভোট ঘোষণার অঘোষিত অক্ষর পড়া যায়। গুজরাতের গড় সবার ওপরে। তাকে আলাদা করে দেখার কথা ভাবতেই হয়।

তবু গুজরাতেও তো গরিবের খিদে পায়। যেখানে ক্ষুধার রাজ্যে শ্রীলঙ্কা, নেপাল, বাংলাদেশ আর পাকিস্তানেরও নীচে নেমে গেছে ভারত, সেখানে গুজরাতের ভাগ্য কখনও আলাদা হতে পারে ? একমাত্র আমাদের নীচে আছে তালিবান। আমরা ১০৭ আর আফগানিস্তান ১০৯ নম্বরে। মৌলবাদের কি লীলা ! ক্ষুধার্ত ভারতের মৌল উপাদানের মধ্যে “চাইল্ড ওয়েস্টিং” ( শিশুর উচ্চতা  অনুযায়ী ওজন কম ) আর শিশুমৃত্যুর পরিসংখ্যানে অধোগতি নেই।  কিছুটা অগ্রগতি হয়েছে।  কিন্তু “চাইল্ড স্টানটিং” ( শিশুরা বয়স অনুযায়ী বেঁটে ) আর সার্বিক অপুষ্টি, মানে সাদা কথায় ঠিকঠাক খেতে না পাওয়ার খতিয়ানে আত্মসমর্পণ “আত্মনির্ভর ভারতের।” ভুলে যেতে চাইলেও ভুলতে না পারা অচ্ছে দিনের স্বপ্নভঙ্গের। প্রধানমন্ত্রীর প্রতিষ্ঠা যখন গুজরাতের অস্মিতার সঙ্গে একসূত্রে গাঁথা, তখন সবরমতীর সূত্রযজ্ঞ বুভুক্ষার পূর্ণাহূতি ছাড়া শেষ হবে ? দারিদ্র্য বুভুক্ষা অপুষ্টির শিকার মানুষ, রোগ ব্যাধি অকালমৃত্যুর অভিশাপে জর্জরিত মানুষকে পাচিলের ওপারে রেখে , ডোনাল্ড ট্রাম্পের সফরের সময় তোলা পাচিলের আড়াল রেখে অস্মিতার গর্বা নৃত্যে হাঙ্গারের হাঙরটাকে রোখা যাবে তো ? এই সাড়ে আট আর গুজরাতের পনের  বছরে রোখা যায়নি বলেই শিল্পায়ন, প্রগতির রোশনি সব সেই ক্ষুধার অসুরের পেটে গেছে। “অচ্ছে দিন”-এর জবাব নিতে আসছে দিন। Pic courtesy : Telegraph India

Leave a Reply

Your email address will not be published.