হাসিনার সফরে মৈত্রীর মানচিত্রে নয়া মোড়

দেবারুণ রায় 

শেখ হাসিনার সফর কতটা সফল হল। এই প্রশ্ন অসম্ভব তাৎপর্য ও গুরুত্বের বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতার নিরিখে। ভারত বাংলাদেশের মৈত্রী ইতিহাসের আকর। কোনও লোকদেখানো, চিড়ে ভেজানো রাজনীতির রং নয়। অদ্ভুত এক নকশিকাঁথার লৌকিক বুনন এই সম্প্রীতির চাদরে। এই সম্পর্ক মৌলবাদ আর সাম্প্রদায়িকতার ঘোলা জলের  বিপরীতমুখী সভ্যতা আর প্রগতির নীল ধারা। আঞ্চলিক দূষণকে দুর্বলতর করে সুস্থ নিঃশ্বাসের যে বাতাস এখনও আমাদের যৌথ আকাশ আলোকিত করে রেখেছে তা এই দুটি দেশের  সংস্কৃতির বন্ধন। এই বন্ধনের বেদিতে দাঁড়িয়ে রবীন্দ্রনাথ। গানের কথায় বললে, আমার হৃদয়ে রবীন্দ্রনাথ, চেতনায় নজরুল। এমনই হৃদয় মস্তিষ্ক মথিত করা, একই ভাষায় একই আশায় ও আখরে লেখা দুটি দেশের জাতীয় সঙ্গীতের রচয়িতা যখন  বাংলার একই আকাশে উদিত রবি , তখন মৈত্রীর স্বরলিপি তো তৈরি হয়েই আছে। শুধু তাতে হাতের লেখা আর পায়ের চিহ্ন রেখে যাওয়া।  রাজনীতির আর অর্থনীতির কাজটা কার্যত অনেক সোজা করে দিয়েছে  দুই বাংলার আর দুই দেশের রক্তের সম্পর্ক।  বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় রাজনীতির সিলমোহর দিয়েছে দুদেশের অভিন্ন ইতিহাসের চালচিত্রকে। আর এই জন্যই মৌলবাদী ও সাম্প্রদায়িকের এত গাত্রদাহ।  একাত্তরের মার ওরা ভুলবে কীকরে। প্রধানমন্ত্রী হাসিনার উপলব্ধিতে শুধু প্রধানমন্ত্রীত্বের কাল নয়, রীতিমত জাগ্রত আওয়ামী লীগ ও তাঁর পিতা এবং নেতার কোরবানি। স্বাধীনতার শত্রু, মৌলবাদী, লুটেরা, ধর্ষক, নারী ও শিশুঘাতী এবং বাংলা ও বাঙালির বিরোধীদের বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধুর আমৃত্যু লড়াই।  বাংলাদেশের এই পরিচয়কে লালন করতে চান বলেই হাসিনা সফর শেষে তাঁর বক্তব্যের সারাংশে ছুঁয়ে যান মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের পাশাপাশি  ভারতীয় সেনার শৌর্য, আত্মবলিদানের কথা। শহীদের রক্তঋণ অপরিশোধ্য। শুধু কর্মে ও ধর্মে তার স্বীকারোক্তি  মর্মে মর্মে মূর্ত হয়ে যায়।  এই স্বতোৎসারিত স্বীকৃতির কোনও রাজনীতি নেই।  কিন্তু আছে এক অটুট ও সুদূরপ্রসারী রেশ, যা কোনওদিন মুছে যাবে না। পদ্মার ইলিশ কিংবা তিস্তার জলের সাধ্য কি এই সাধু উদ্দেশ্যপ্রবণতাকে রোখে। সুতরাং মোটা দাগের রাজনীতিকে অন্যন্যবারের মতো এবারেও মাত করে দিয়েছেন মুজিবকন্যা।

ওঁর সতেজ স্মৃতিতে আছে প্রণব মুখার্জির মতো অভিভাবক রাজনীতিবিদের সময়োচিত পরামর্শ। এই প্রথম বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সফরে ভারতের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হল প্রণববাবুর অবর্তমানে। কিন্তু তিনি অতীত হলেও বিভিন্ন পদাধিকারে থাকাকালীন ভারত বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক সমস্যা সমাধানে বা নানা চুক্তি সম্পাদনে তাঁর যুক্তি ব্যাখ্যা সূত্র ও উপাদান এখনও প্রাসঙ্গিক ভারতের বিদেশমন্ত্রকের বাংলাদেশ সংক্রান্ত নানা  ফাইলে। ইন্দিরা মুজিব চুক্তির ধারাবাহিকতাকে যা সজীব রেখেছে। ইন্দিরা গান্ধীর  কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিপক্বতার সামনে জুলফিকার আলী ভুট্টোর মতো তীরন্দাজকেও হার মানতে হয়েছে। বাংলাদেশের সৃষ্টি ও গড়ে ওঠার পর্বে সেই প্রতিবেশী প্রধানমন্ত্রীকে পাশে নিয়ে আন্তর্জাতিক পরিবেশের প্রতিকূলতার মোকাবিলা করেছেন বঙ্গবন্ধু। সেই ঘরানার অনুসারী দলের সামনে ঐতিহ্যের ওই মৌলটুকুকেই বাঁচিয়ে রাখার লড়াই।  আসন্ন নির্বাচন তার একটা পর্যায় মাত্র।  ঠিক এইখানে দুদেশ একই নৌকার যাত্রী। বাংলাদেশের সরকার মৌলবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সফল হলে ভারতের স্বস্তি বাড়ে। এই কারণেই, ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির টানাপড়েন বাংলাদেশ বা ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সরকারের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রতিফলিত নয়। বাংলাদেশের প্রসঙ্গটি ভারতের বিদেশনীতির সর্বসম্মত পরিসরে এখনও বিদ্যমান।  তাই মোদি বিমানবন্দরের বদলে স্থিত প্রোটোকল মেনে রাষ্ট্রপতি ভবনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানালে লোকাল রাজনীতির মোড়ল মুরুব্বিদের কান খাড়া হলেও রাজনীতির মুনাফা মিলবে না। বাংলাদেশের প্রগতি ও সুস্থিতির পক্ষে গরিষ্ঠ মানুষ ও অ-মৌলবাদীরা রাজনীতি আর অর্থনীতির পরিকাঠামো বোঝেন। জানেন সস্তা কথার রাজনীতি তাদের কোন অভিশপ্ত যুগে ফিরিয়ে দিতে চায়। ভারত এবং চীন দুই বৃহত্তম আঞ্চলিক মিত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্য ও ভারসাম্যের নীতি বাংলাদেশকে উন্নতিশীল করেছে।  আর ভারতও জানে প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্কের উত্তেজনা নিরসনে বাংলাদেশের সদর্থক অবস্থান কতটা জরুরি।  ড. মনমোহন সিং প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন তাঁর বিদেশনীতি ছিল অর্থনীতি নির্ভর। তিনি বলতেন, অর্থনীতির হাত ধরে চলুক রাজনীতি।  তাহলে উন্নয়নই সব আঞ্চলিক অসাম্য ও উত্তেজনা কমিয়ে দেবে। তাঁর প্রদর্শিত পথে গাড়ি চলতে শুরু করেছিল বলেই তা থামেনি আজও। সাধারণভাবে রাজনীতি ও কূটনীতিই পথ দেখায় অর্থনীতিকে।

 কিন্তু পরিবর্তিত বিশ্বে অর্থনীতির হাতেই স্টিয়ারিং।  তার মধ্যে আঞ্চলিক অনুন্নয়নের সমস্যা থেকে সৃষ্ট স্থানীয় রাজনীতির চাপ তো থাকবেই। যে কারণে বাংলাদেশে হাসিনার বিরোধীরা ছিদ্রপথ দেখছেন তিস্তায়। যদিও  বরাকের ওপারের কুশিয়ারার জল দিয়ে তিস্তার উত্তাপ কমানোর চেষ্টা।  সেই সঙ্গে ই সাতটি স্থানীয় নদীকেই একইভাবে ধরা হয়েছে।  এতে অবশ্যই সদর্থক বার্তা রয়েছে। তাছাড়া তিস্তায় ভারত সরকার আগাগোড়াই পজিটিভ।  কিন্তু উত্তরবঙ্গে সবে পা রাখা কেন্দ্রের শাসক বিজেপির ভোট ভাবনাও তো আছে। তাই পশ্চিমবঙ্গের সরকারের সঙ্গে তিস্তা নিয়ে তিক্ততায় গেলে রাজ্যের শাসকদলেরই লাভ, অন্যদের ভরাডুবি।  এর পাশাপাশি আসছে গঙ্গার জল বন্টন চুক্তির নবীকরণের সময়। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকেও যেমন স্থানীয় ইস্যু ছুঁয়ে থাকতে হবে, তেমনি পশ্চিমবঙ্গের ও কেন্দ্রকেও অগ্রপশ্চাৎ ভেবে চলতে হবে। আর এর পাশাপাশি রাহুল গান্ধীর সঙ্গে হঠাৎ দেখা করার কর্মসূচিও আসবে।যেটা পারিবারিক প্রোটোকল। কারণ রাহুলের বিরোধী দলনেতার তকমা নেই। এতে মোদি বা মমতার অস্বস্তি হলেও তাঁদের কিছু করার বা বলার থাকে না। আর হাসিনা তো বলেই দিয়েছেন তাঁর এই সম্পর্কের টান পারিবারিক পরম্পরায় । এসব যাই ঘটুক   বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের লক্ষ্যে  ভারতের যোগদানের আগ্রহ ধারাবাহিকভাবে স্পষ্ট।  প্রধানমন্ত্রী মোদির বন্ধু শিল্পপতি গৌতম আদানি  বাংলাদেশে বিপুল বিনিয়োগের লক্ষ্যে এগোচ্ছেন। পশ্চিমবঙ্গের সরকারের উন্নয়ন যজ্ঞেও আদানিই এসেছেন মুশকিল আসান হয়ে। এই উদ্দেশ্যপ্রবণতা অবশ্যই  উন্নয়নের লক্ষ্যে। তবে এগুলো দেখতে শুধু অর্থনৈতিক হলেও , তার সঙ্গে কিছু ফাউ তো থাকেই।  এও এক অর্থে মনমোহনী পাশা। আশা, অর্থনীতির অর্থে  রাজনীতিরও উন্নয়ন হবে। আর বাণিজ্য বান্ধব হলে আধুনিক বিশ্বে সব বরফই গলে যায়। সুতরাং গঙ্গাচুক্তির নবীকরণের জল নতুন তরঙ্গ তুলবে এবং সেই স্রোতের টানেই হয়তো নতুন করে লেখা হবে তিস্তা পাড়ের বৃত্তান্ত । আসলে বাংলাদেশ আর পাঁচটা ভিন দেশের চেয়ে আলাদা কেন কীভাবে সেই প্রসঙ্গটি ভীষণভাবে জীবন্ত। শ্যাম বেনেগালের মুজিব বায়োপিক তার একটা রঙিন পালক মাত্র।  বছরের শেষেই মুক্তি পাওয়ার কথা। তার আগে পরিচালক হাসিনাকে একবার দেখিয়ে নেবেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published.