বহুরূপে সম্মুখে তোমার….

29শে নভেম্বর 2008, মুম্বাই…..
ষাট ঘণ্টার কম্যান্ডো অপারেশন শেষে জঙ্গীদের হাত থেকে মুক্ত হলো দুই অভিজাত হোটেল তাজ ও ওবেরয় ট্রাইডেন্ট এর আবাসিকরা। তবে এই মুক্তি এলো ১৭১ জন মানুষের তাজা রক্তের বিনিময়ে, আহত আরও তিনশো জন। নিহতদের তালিকায় ছিলেন রাজন কাম্বলে, দুই দশকের ওপর চাকরিরত তাজ হোটেলের এক মেনটেনান্স স্টাফ। অভিশপ্ত ২৬ তারিখে মানুষটি দাঁড়িয়ে ছিলেন হোটেলের ফয়্যারে, মানে প্রবেশ পথের হলঘরে। হঠাৎই দেখেন চার অজ্ঞাত বন্দুকধারীকে ভেতরে ঢুকে এলোপাথাড়ি গুলি চালাতে। প্রাথমিক ধাক্কা কাটিয়ে চটপট উনি সার্ভিস বয়দের জন্য ব্যবহৃত ঘোরানো সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠে যান, আর তারপর !…

দেশি বিদেশী অতিথিরা তখন বারান্দায় গেটওয়ে অফ ইন্ডিয়ার দিকে তাকিয়ে বসে অলস সময় কাটাচ্ছিলেন। তড়িঘড়ি রাজন তাদের একটা বড় হলে ঢোকাতে শুরু করেন। একটু পরেই সেখানে হাজির এক পাক সন্ত্রাসবাদী। মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও রাজন পালিয়ে যাননি, বরং সবাইকে ঠেলে ঘরে ঢোকাতে থাকেন। উদ্দেশ্য ছিলো সবাই এসে গেলে ভেতর থেকে দরজা আটকে দেবেন। কিন্তু ততক্ষণে স্বয়ংক্রিয় কারবাইনের গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে যায় তার শরীরের নিম্নাঙ্গ।
—সাতদিন পর… #৪ঠা_ডিসেম্বর মুম্বাইয়ের এক হাসপাতালে মৃত্যু হয় তাঁর। বয়স হয়েছিল মাত্র সাতচল্লিশ। পরে হোটেলের এক ইজরায়েলি আবাসিক রয়টার্স কে বলেন, If he wasn’t there maybe many of us would have been hit.” ‌

……..লড়াইটা এবার শুরু হলো শ্রুতি’র, এগারো বছর আগে রাজন যাকে বিয়ে করে ঘরে এনেছিলেন। অসবর্ণ বিয়ে, তাই রাজনের বাবা-মা কোনদিন তাকে ঘরে তোলেননি। থাকতেন মুম্বাই থেকে ষাট কিমি দুরে গোরাই শহরের এক ছোট্ট বাসাবাড়িতে।
…….পাঁচ বছরের রোহন আর তিন বছরের অথর্ব-র মা এবং বাবা দুজনেরই দায়িত্ব সেদিন থেকে চলে এলো তাঁর কাঁধে। তারপর যা হয় এদেশে !!…
প্রথম প্রথম শুভানুধ্যায়ীরা পাশে ভীড় করলেও কয়েক মাস পরে দুই নাবালক সন্তানকে নিয়ে বিশাল দুনিয়ায় শ্রুতি হয়ে গেলেন একদম একা ! টাটা কোম্পানি অবশ্য রাজনের পাওনা টাকা এবং ক্ষতিপূরণ মিটিয়ে দিতে কার্পণ্য করেনি। কিন্তু মুম্বাইয়ের মতো জায়গায় এই টাকায় দুই ছেলের ভবিষ্যত ভেবে উদ্বিগ্ন হলেন শ্রুতি !!….

জানতে পারলেন পুরো পাঁচ বছর পর যখন সেই অভিনেতা হৃদযন্ত্র বিকল হয়ে দুবাইয়ের এক হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। দিনটি ছিলো ২৭শে ডিসেম্বর, ২০১৩। তিনদিন পরে ৩০ তারিখে মুম্বাইয়ের এক কবরখানায় তাঁকে সমাধিস্থ করা হয়। দুই পুত্রকে নিয়ে সেদিন ওখানে উপস্থিত ছিলেন শ্রুতি। কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে বলেন, ‘আমার ঈশ্বরকে জীবিত অবস্থায় ধন্যবাদ জানাতে পারলাম না। সারাটা জীবন এই আফসোস আমাকে তাড়া করে বেড়াবে।’ ‌……

রাজনের ইচ্ছা ছিলো বড়ছেলে রোহন আর্মি স্কুলে ভর্তি হবে আর ছোটটি হবে পাইলট, কিন্তু তারজন্য তো প্রাথমিক স্তরে ভালো স্কুলে ভর্তি হওয়া দরকার। এটা একদিন খবর হয়ে বেরুলো Indian Express কাগজে। অনেকের চোখেই পডেছিল নিশ্চয়, কিন্তু সদর্থক ভূমিকা নিতে এগিয়ে এলেন একজনই…….বলিউডের এক অভিনেতা। ‌

চিনতে পারলেন মানুষটিকে…..? ১৯৪৮ সালে জন্ম বরোদায়। ক্যারিয়ারে শুরুতে ছিলেন টিভি উপস্থাপক, পরবর্তী সময়ে ছোট ও বড় পর্দার এক সাবলীল অভিনেতা। কাজ করেছেন সত্যজিৎ রায়, মুজাফফর আলী, ঋষিকেশ মুখার্জি, কেতন মেহতা’র মতো নামকরা চলচ্চিত্র পরিচালকদের সাথে । ……পরিবার নিয়ে ছুটি কাটাতে গিয়েছিলেন দুবাই আর সেখানেই অসুস্থ হয়ে পঁয়ষট্টি বছর বয়সে দুনিয়াকে আলবিদা জানালেন এই মরমী অভিনেতা, ফারুক শেখ।

যোগাযোগ করেন তিনি ঐ খবরের কাগজ কর্তৃপক্ষের সাথে এবং দুজনের স্কুলে পড়ার যাবতীয় খরচ দিতে রাজি হন। তবে শর্ত একটাই, তাঁর নাম যেন ঘুণাক্ষরেও প্রকাশ না হয় ! ভাবুন শুধু একবার….., রাজনীতির লোকজন আজকাল যেখানে পায়খানা, শৌচালয়ের ভিত্তি স্থাপন করলেও মিডিয়াকে দিয়ে খবর করাতে বাধ্য করে, সেখানে কিনা এতোবড় ‌একটা কাজ, তাও বিনা প্রচারে !….. তারপর থেকে প্রতিটি শিক্ষাবর্ষের শুরুতে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস কাগজ থেকে ঐ বছরের খরচের পরিমাণ জানানো হতো তাঁকে এবং তিনি নির্দ্বিধায় চেক কেটে দিতেন। কোনদিনও জিজ্ঞেস করেননি টাকাটা কিভাবে খরচ হবে। দুই ছেলের পড়ার খরচ নিয়মিত ঠিক সময়ে জমা পড়াতে হতভম্ব হয়ে যান মা শ্রুতিও। কিন্তু কোনভাবেই জানতে পারেননি পরম উপকারী মানুষটির পরিচয়!‌…..

রাজন কাম্বলে ও ফারুক শেখের মতো মহামানব রা আজও তাই নমস্য ও শ্রদ্ধেয় …. (সংগৃহীত)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *